তুষারে রক্তের দাগ

তুষারে রক্তের দাগ

০১.

 শ্রীনগর থেকে সোনামার্গ, তারপর কারগিল। অবশ্য কারগিলের অনেকটা আগে বাঁয়ে মোড় নিয়ে যেতে হবে স্কার্টুর দিকে। বেশ দুর্গম পথ। জায়গাটার নাম রিস্তা। শুধু রিস্তা নয়, রিস্তা ক্যাম্প নম্বর এক।

ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহ। ফিনফিনে হালকা ইলশেগুঁড়ি বৃষ্টির মতো বরফ পড়া শুরু হয়েছে। চারদিকের পাহাড় উপত্যকা আর টুকরোটাকরা সমতল জায়গা ক্রমশ বরফে ঢেকে সাদা হয়ে যাচ্ছে। রাস্তাও খুব বিপজ্জনক। শ্রীনগরে খবর নেওয়া হয়েছিল সোনামার্গ অব্দি তুষারবৃষ্টির পরিমাণ দু থেকে তিন ইঞ্চি। সোনামর্গে জানা গেল, সামনে এখন অন্তত ছয় থেকে আট ইঞ্চিও হতে পারে। রিস্তায় যারা যাবার, তারা নভেম্বরের মাঝামাঝি গিয়ে বসে আছে। এখন যথেষ্ট দেরি হয়ে গেছে। পৌঁছতে পারবে কি না বলা কঠিন। যাদের সঙ্গে দেখা হয়েছে, তারাই অবাক হয়েছে। বলে কী! এই বাঙালি বাঙালিনীর কী সাহস! একেই তো বলে বাঙালি বুদ্ধ! ঠাণ্ডা না হয় আটকাল গাড়ির ভিতর বসে; কিন্তু বরফে গাড়িশুদ্ধ চাপা পড়ে কবরস্থ হয়ে পড়বে যে!

আর কী প্রচণ্ড ঝোড়ো হাওয়া বইছে জায়গায়-জায়গায়। বিশীর্ণ পাইনের বন দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে বরফে ঢাকা পড়ছে। ভাপ উঠছে জঙ্গলের তলায়। বিস্তৃত বরফের ওপর আবছা সূর্যের ছটা কদাচিৎ নানারঙে প্রতিফলিত হচ্ছে। পরক্ষণে আবার সব আলো ঢেকে যাচ্ছে। গাড়ির হেডলাইট জ্বালতে হচ্ছে দিনদুপুরে।

সোনালি সেনের পা দুটো কখন থেকে জমে গেছে ঠাণ্ডায়, মাঝে-মাঝে অস্ফুট স্বরে জানিয়ে দিয়েছে ধ্রুব চৌধুরীকে। ধ্রুব একটু হেসেছে, কিছু বলেনি। এয়ারকন্ডিশন্ড মার্কিনি এই গাড়িটা বিশেষভাবে তৈরি। একটা তুষারদানব বললেই চলে। চাকাগুলো চমৎকার বরফ কেটে পথ চলতে পারে। কিন্তু ভিতরের কৃত্রিম ওম এবং পায়ের তলার তাপ আর শরীরে পৌঁছচ্ছে না। সমুদ্রতল থেকে হিসেব করলে কোথাও উচ্চতা আট হাজার ফুট থেকে দশ হাজার ফুট। পুরোপুরি শীতের রাজ্য। কোথাও কোন স্পন্দন নেই, প্রাণের চিহ্ন নেই–শুধু গরগর গর্জন করতে থাকা ধীরগামী এই গাড়িটা ছাড়া। কারগিলের ত্রিশ মাইল দূরত্বে বাঁদিকে রিস্তাগামী যে রাস্তা, তা নতুন। গত চীন-ভারত যুদ্ধের সময় তাড়াহুড়ো করে তৈরি। খুব অপ্রশস্ত। ওরা এ রাস্তায় নেমেই টের পাচ্ছিল, সত্যিকার বিপদের শুরু হল এবার। বরফ পড়াটা হঠাৎ বেড়ে গেল। গাড়ির উইন্ডো বেয়ে চাপচাপ বরফ পিছলে পড়তে থাকল। গাড়িটা বরফের পুরু ঢাকনায় যেন লুকিয়ে যাবার ষড়যন্ত্রে এবার লিপ্ত হয়েছে। কখনও হেডলাইটের ছটায় ঝলসে উঠছে সিল্ট-সিলুট সব গাছের কঙ্কাল। কখনও একটা বা কয়েকটা কাঠের বাড়ি পাহাড়ের খাঁজে-ধনীদের গ্রীষ্মকালীন বিলাস। তুষারের পাগড়ি আর জোব্বা পরে দরোয়ানের মতো দাঁড়িয়ে আছে গেটের কাছে দুএকটা লম্বাটে গাছ। আবার সোনালি অস্ফুট স্বরে বলে উঠল, সত্যি পা জমে গেছে, ধ্রুব।

ধ্রুব সামনে উঁচুতে একলা বাড়িটা দেখছিল। যথারীতি হাসল। আশ্রয়ের জায়গা দেখে সোনালি এবার ছটফট করে উঠেছে। রিস্তা ক্যাম্পের পাহাড়ে স্কি করার সাধ ওর নির্ঘাত চুকেছে। এখন ভালয়-ভালয় একটা গৃহকোণ আর খানিকটা আগুন তার দরকার।

সোনালি এবার একটু চটেছে এতক্ষণে।…কথা বলছ না যে? আমার পা দুটো সত্যি জমে গেছে।

সোনালি দুরন্ত খেলোয়াড় মেয়ে। তাকে এখন ভীতু গোবেচারা বালিকা দেখাচ্ছে। কয়েক স্তর পুরু পশমী পোশাকের ভিতর ও আড়ষ্ট। এবার কেঁদে ফেলবে না তো? ধ্রুবর আশঙ্কা হল। ধ্রুব বলল, আর মাত্র এক কিলোমিটার। বড়জোর পনের মিনিট লাগবে।

সোনালি কী বলতে ঠোঁট ফাঁক করল, কিন্তু বলল না। বাঁদিকে দূরে কয়েকটা আলো দেখা যাচ্ছে। সে সেদিকেই তাকিয়ে রইল।

ঘড়িতে এখন বেলা তিনটে। কিন্তু কেমন ছায়াধূসর দেখাচ্ছে পরিবেশ। বরফের হালকা বৃষ্টি সামনে ঝরছে। এখন একঘেয়ে লাগে। রিস্তায় ডাক্তার আছে কি না কে জানে। সোনালি ভাবছিল। নিশ্চয় বাজার বসতি ইত্যাদি আছে। একটা সামরিক ছাউনি আছে সে জানে। তার অনেকদিনের স্বপ্ন এই দুর্গম পাহাড় অঞ্চলের তুষারে স্কি করার। রিস্তায় যেখানে যাচ্ছে, সেটা একটা প্রাইভেট কোম্পানির স্কি ট্রেনিং সেন্টার। তাদের ওখানেই থাকার ব্যবস্থা আছে–ডরমিটরি আর হোটেল আছে। আছে স্কি করার সব সরঞ্জামের স্টোর, মেরামতের ব্যবস্থা এবং কয়েকজন ইনস্ট্রাক্টার। আর আছে–সবচেয়ে যেটা আকর্ষণীয়, পাহাড়ের মাথায় ওঠার একটা লিফট-হুঁইল-ঘুরন্ত নাগরদোলার মতো। তার গোল ফ্রেমে ঝুলছে দুজন বসার মতো একটা করে চেয়ার। পাহাড়ের ওপর ওঠার সঙ্গে সঙ্গে স্কিয়াররা ঝাঁপিয়ে পড়বে একের পর এক একেকটা চেয়ার থেকে। এবং ঢালু সমতল বরফের ওপর দিয়ে অনেকটা দূর স্কি করে চলে যাবে। এভাবেই ট্রেনিং-এর প্রাথমিক পর্যায় শেষ হবে।

একটা বিশাল পাহাড়ের তলায় দোতলা আর কয়েকটা একতলা বাড়ি রয়েছে। তার কাঠের গেটে ইংরাজিতে লেখা আছে : দুগাল স্কিং ট্রেনিং সেন্টার। গেটটা খেলা। ওদের গাড়িটা সোজা ভিতরে ঢুকে গেল।

দুজন লোক দুপাশ থেকে হাত নেড়ে গ্যারেজ নির্দেশ করছিল। ধ্রুব মুচকি হেসে বলল, ব্যবস্থা ভালই মনে হচ্ছে। গাড়িটা চওড়া লনে ঘুরিয়ে সে গ্যারেজে ঢোকাল। তখন সেই লোকদুটো এগিয়ে সেলাম দিল। দরজা খুলে ধ্রুব বেরোল প্রথমে। তারপর সোনালির দাস্তানাপরা হাত ধরে তাকে বেরোতে সাহায্য করল। সোনালি সোজা দাঁড়াতে পারছিল না। ওভারকোট দস্তানাপরা লোকদুটো কাশ্মীরী–সম্ভবত গ্যারেজের চার্জে থাকে। ভাঙা ভুল ইংরাজিতে বলল, সাহায্য করতে পারি?

ধ্রুব বলল, না–ধন্যবাদ। আপনাদের অফিসটা কোথায়?

পারভিজ, তুমি সায়েবকে অফিসে পৌঁছে দাও।

গাড়ির দরজা বন্ধ করে ধ্রুব বলল, কিন্তু জিনিসপত্র রইল যে?

ভাববেন না স্যার। লোক এসে নিয়ে যাবে।

পারভিজ নামে লোকটা আগে-আগে চলল। ধ্রুব সোনালিকে ধরে তাকে অনুসরণ করল।

সোনালির বেশ কষ্ট হচ্ছিল বিশ-পঁচিশ-ফুট লন পেরোতে। বরফে পিছল হয়ে আছে। আর এবার বাইরের খোলামেলায় ঠাণ্ডাটা কী জিনিস, সে হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছিল। ধ্রুব একটু ঠাট্টা করতে ছাড়ল না, কী? কেমন মনে হচ্ছে? যা ভেবেছিলে, তেমন নয়, না?

সোনালি ঝাঁঝালো স্বরে বলল, আমার কিছু হয়নি। ভারি আমার ঠাণ্ডা!

উঁহু, বেশ গরম লাগছে আমার। ধ্রুব সকৌতুকে বলল।

সোনালি ওর হাতদুটো কাঁধ থেকে সরিয়ে খোঁড়া মানুষের মতো একটু জোরেই এগোল। ধ্রুব জানে, ও ভীষণ জেদী মেয়ে। হয়তো ওই পা নিয়েই বরফের ওপর স্কেটিং শুরু করে দেবে ধ্রুবকে তাক লাগাতে। তুষার কামড় ফস্টাইটিং কি জিনিস, তা সোনালির জানা আছে। পাহাড়ে চড়া ক্লাবের মেম্বার সে ছেলেবেলা থেকে। অনেকবার অনেক দুর্গম পাহাড়ের চুড়োয় উঠেছে সে দলের সঙ্গে। আসলে গাড়িতে আসবার সময় ওর পা জমে গেছে অসাবধানতার দরুন। প্রথমে তো খালি স্লিপার পরেই বসে ছিল। পরে অবস্থা বুঝে মোজা জুতো পরেছিল। কিন্তু যা হয়েছে, তাতেই বেশ ভোগাবে ওকে। কাল সকালের ক্লাসে ওর পক্ষে যোগ দেওয়া কঠিনই হবে।

ঢাকা বারান্দায় উঠে একটা লম্বা করিডর পেল বাঁদিকে। একটু এগিয়ে লেখা দেখল : অফিস। পারভিজ দেখিয়ে দিয়ে চলে গেল।

বন্ধ দরজায় নক করল ধ্রুব। ভিতর থেকে ইংরাজিতে শোনা গেল, আসুন।

ওরা ঢুকল। ঘরটা যথারীতি এয়ারকন্ডিশন্ড। তার ওপর পিছনে একটা ইলেকট্রিক চুল্লী থাকায় বেশ ওম জমে রয়েছে। টেবিলের সামনে ধ্রুবর বয়সী এক ভদ্রলোক বসে রয়েছেন। বেশ ছিমছাম ভদ্র চেহারা। কিন্তু কয়েকটা ভাঁজ আর চোখের নিচে কালো ছোপ থাকায় কেমন, ক্লান্ত আর বিষণ্ণ দেখাচ্ছে। ওঁর গায়ে একটা সাদা শার্ট আর তার ওপর ঢিলে হরিণের চামড়ার মতো সোয়েটার। ডানদিকে হাতের কাছেই দেয়ালে ঠেকা দেওয়া আছে দুটো ক্রাচ।

ক্রাচ দেখেই ধ্রুবর চোখ টেবিলের তলায় গেল। হ্যাঁ, ডানপায়ে হাঁটু থেকে তলা অব্দি সিমেন্টপ্লাস্টার। ধ্রুব একটু চমকে সোনালির দিকে তাকাল। সোনালিও দেখেছে। সে ধরে নিল, ধ্রুব তাকে যেন বলতে চায়–এই দেখ, নির্ঘাত স্কি করতে গিয়ে দুর্ঘটনা ঘটেছে–অতএব সাবধান। সোনালি বাঁকা ঠোঁটে অন্যদিকে তাকাল।

ধ্রুব বলল, নমস্কার।

নমস্কার।…ভদ্রলোক মিষ্টি হাসলেন..বসুন। নিশ্চয় আমাদের লেটকামার স্কিয়ার মিঃ চাউড়ি এবং মিসেস চাউড়ি?

ধ্রুব বসে গম্ভীর মুখে বলল, না–মিস সোনালি সেন। আপনাদের রেজিস্টার দেখুন–এই নামেই বুক করা হয়েছে শ্রীনগর থেকে।

দুঃখিত, খুবই দুঃখিত মিঃ চাউড্রি।..ভদ্রলোক ব্যস্তভাবে রেজিস্টারের পাতা ওল্টাতে থাকলেন। তারপর দেখে নিয়ে বললেন, হা–তাই বটে। আপনাদের রুম নাম্বার আট আর নয়–দোতলায়। কিন্তু আবার দুঃখিত অ্যাটাচড বাথ মাত্র আট নম্বরে, আপনি সেটা মিস সেনের জন্যে বুক করেছেন। এদিকে ওটার সেন্ট্রাল হিটিং ব্যবস্থা নেই। নয়েরটায় আছে কিন্তু সেটার সঙ্গে কোন বাথ নেই। আপনাকে বাথের জন্যে একটু কষ্ট করে নিচে নামতে হবে। না–নিচের বাথ একা আপনারই। আসলে জায়গা ছিল না ওপরে, তাই এই ব্যবস্থা।

ধ্রুব খাপ্পা হয়ে বলল, সে কী! এসব তখন তো আপনার কোম্পানি আমাকে বলেনি!

ভুল ধরিয়ে দিলেন ভদ্রলোক–কোম্পানির ডাইরেক্ট কোন বুকিং সেন্টার শ্রীনগরে নেই স্যার। ওটা করে কোম্পানির এজেন্ট–একটা ট্রাভেল এজেন্সি। তাদের এসব জানার কথা নয়।

আশ্চর্য তো। ধ্রুব সোনালির দিকে তাকাল।

 সোনালি ভুরু কুঁচকে বলল, আট থেকে নয়ে ঢোকার দরজা নেই?

কেন।

তুমি আমার আটের বাথ ব্যবহার করবে।

 কিন্তু তোমার আট তো মড়ার মতো ঠাণ্ডা।

সোনালি কী বলতে যচ্ছিল, ভদ্রলোক বললেন, ক্ষমা করবেন। আপনারা কি বাংলাভাষায় কথা বলছেন পরস্পর?

ধ্রুব বলল, হ্যাঁ। কেন?

ভারি মিঠে ভাষা আপনাদের। রবীন্দ্রনাথ ট্যগোর! ওঃ চমৎকার। এবং শেখ মুজিবের বাংলাদেশ

ধ্রুব থামিয়ে দিয়ে বলল, দেখুন–ওসব তত্ত্ব আলোচনা পরে হবে, মিঃ, দুগাল। এখন…

পাল্টা ভদ্রলোক ওকে থামালেন।…আমি মিঃ দুগাল নই। মোহন শ্রীবাস্তব। মিঃ দুগাল গতকাল একটা জরুরী ব্যাপারে শ্রীনগর হয়ে দিল্লি গেছেন। এক সপ্তাহ বাদে ফিরবেন।

আপনি ম্যানেজার?

 উঁহু–তাও নই। শ্রীবাস্তব মিটিমিটি হাসতে থাকল।

ধ্রুব ধমকের সুরে বলল, তবে কে আপনি?

 আমি ট্রেনিং সেন্টারের একজন ইনস্ট্রাক্টার। মিঃ দুগাল নিজেই সব দেখাশোনা করেন। হঠাৎ চলে যেতে হলো বলে আমাকে এই দায়িত্ব দিয়ে গেছেন।

আর আপনি চমৎকার দায়িত্ব পালন করছেন।

শ্রীবাস্তব রাগল না–এমন চেহারার মানুষ রাগতে জানে না সম্ভবত। বলল, মিথ্যে অনুযোগ করছেন মিঃ চাউড্রি। আট নম্বরের সেন্ট্রাল হিটিং বরাবরই নেই–ওটা বাড়তি জিনিসপত্রে ঠাসা থাকে। তবে কেউ শেষের দিকে বুক করলে খালি করে দেওয়া হয়। তাছাড়া ওঘরে আপনাদের মোমবাতি জ্বেলে কাজ করতে হবে।

আর বরফজলে স্নান করতে হবে!

 না–বাথে ইলেকট্রিসিটি আছে। গরম জল পাবেন।

ধ্রুব সোনালির দিকে তাকিয়ে ইংরেজিতেই বলল, কোন মাথামুণ্ড বুঝতে পারছি না। ভারি অদ্ভুত তো! বাথে ইলেকট্রিসিটি আছে–অথচ ঘরে নেই। কী কাণ্ড।

সোনালি বাংলায় বলল, হয়েছে বাবা! যা হয়, শিগগির করো। আমার কষ্ট হচ্ছে।

শ্রীবাস্তব বোর্ড থেকে দুটো চাবি এগিয়ে দিল কাচুমাচু মুখে। বলল, সত্যি, কোন মানে হয় না। আমি অনেকবার বলেছি মিঃ দুগালকে–উনি কানেই নেন না। বলেন, কাহাতক বাড়তি খরচা! যাক গে, মিস সেনের পায়ে কি আঘাত লেগেছে?

সোনালি বলল, না–ঠাণ্ডা। আপনাদের এখানে ডাক্তার নেই?

আছে সে অনেকটা দূরে। ওদিকের রাস্তায় তো আজ দুপুর অব্দি খবর একফুট বরফ। ডাক্তার আসবেন কি না বলা কঠিন। তবে আমাদের কিছু ব্যবস্থা আছে।…শ্রীবাস্তব সহানুভূতির সঙ্গে বলল।…বুঝতেই পারছেন, স্কি করতে গিয়ে প্রায়ই ছোটখাটো দুর্ঘটনা তো হয়ই–সেজন্যে চিকিৎসা ব্যবস্থা নিজেরাই রেখেছি।

ধ্রুব ভুরু কুঁচকে চাবি দুটো নাড়াচাড়া করছিল। সে কিছু বলল না। সোনালি প্রশ্ন করল, আপনি নিশ্চয় অ্যাকসিডেন্ট করেছিলেন?

শ্রীবাস্তব কেমন চমকাল যেন। তারপর চোখ বুজে মাথা দোলাল। শেষে বলল, ওঃ, সে এক ভীষণ ব্যাপার। হুইল লিফটের চেয়ার থেকে স্কিয়ারদের ট্রেনিং দিচ্ছিলুম। হঠাৎ কীভাবে পড়ে গেলুম-আর ডান স্কিটা পা থেকে খুলে গিয়েছিল। তারপর তো…যাক গে। কফি বলি–আপনারা আমাদের সম্মানিত অতিথি!

সোনালি হেসে বলল, আপনি ইনস্ট্রাক্টার–কাজেই আমরা আপনার ছাত্র।

হো-হো করে হেসে উঠল শ্রীবাস্তব। ঘণ্টার চাবি টিপতে হাত বাড়াল। তখন ধ্রুব দুম করে দাঁড়িয়ে বলল, না–ধন্যবাদ। আমরা এখন ক্লান্ত-ঘরে যেতে চাই। আপনি কি দয়া করে আপনার লোক দিয়ে জিনিসগুলো ঘরে পাঠাবেন?

শ্রীবাস্তব শশব্যস্তে বলল, নিশ্চয়–অবশ্যই। এ আমাদের কর্তব্য।

ধ্রুব বেরোবার মুখে ঘুরে বাঁকা হেসে বলল, হ্যাঁ–একজন ঠাণ্ডায় পা জমে যাওয়া অসুস্থ মহিলাকে হিমঘরে বাসের বন্দোবস্ত করাও আপনাদের কর্তব্য বইকি!

শ্রীবাস্তব ভারতীয় ধরনের করজোড়ে অনুনয় করল, প্লিজ প্লিজ মিঃ চাউড্রি! ব্যক্তিগতভাবে সত্যি আমি দারুণ লজ্জিত। কিন্তু কোম্পানি কোন কথা কানে নেয় না–প্রাইভেট কনসার্ন তো! আমরা নিতান্ত বেতনভোগী কর্মী মাত্র।

ঘোরালো সিঁড়ি দিয়ে সরু ওপরের করিডরে পৌঁছল ওরা। সোনালির খুবই কষ্ট হচ্ছিল। বরফের কুচি দিয়ে ডললে অনেক সময় আড়ষ্টতাটা কেটে যায়। আগে এখন ঘর এবং বিছানাটাই জরুরী। তারপর দেখা যাবে।

ধ্রুব আট নম্বরের তালা খুলতে যাচ্ছিল, সোনালি বলল, এই! তুমি এত নৃশংস তা তো জানতুম না! ওই হিমঘরে আমাকে ঢোকাতে চাও! আমাকে আলু পেয়েছে–না কী?

ধ্রুব বলল, না–আমি এ ঘরে থাকব।

সোনালি বলল, এ ঘরে তোমার কোন অধিকার নেই। সত্যি বলছি, আমি পুলিস ডাকব। ওটা আমার নামে বুকড।

তাহলে আমি শোব কোথায়?

 তোমার ন’য়ে।

আর তুমি?

 বিপন্ন নারীকে একটু আশ্রয় দেবে।

 সে কী! ওটা তো সিঙ্গল বেড রুম। মেঝেতে শোওয়া অসম্ভব।

বারে! তোমাকে মেঝেতে শুতে বলব–আমি কি অত হৃদয়হীন?

কিন্তু তোমাকেই বা মেঝেয় শুতে দেব, আমি এত হৃদয়হীন?

মোটেও না। একটা বেড়ে দুজনে কীভাবে শুতে হয়–সে ট্রেনিং আমার আছে। চল তো বাবা, আর তর্ক করে না। সে খোঁড়াতে খোঁড়াতে ওকে টানল।

ন নম্বরের দরজা খুলে ধ্রুব অসহায় মুখে বলল, কিন্তু আমার যে ট্রেনিং নেই!

আমি দেব ট্রেনিং। সোনালি সুইচ টিপে আলো জ্বালাল।

ধ্রুব এতক্ষণে স্বাভাবিক হাসল।…সে তো তোমরা মেয়েরা মেয়েরা শুয়েছে। আমি যে পুরুষ। বিপজ্জনক হয়ে ওঠার চান্স থাকতে পারে।

বিপজ্জনক বস্তু বা প্রাণীকে কীভাবে শায়েস্তা করতে হয়–সেও ট্রেনিং নেওয়া আছে। বাবা রে বাবা। এত বকাটে মানুষ তো দেখিনি।

খাঁটি বাঙালি মেয়ের ঢঙে সোনালি এ কথা বলে আলখাল্লা ছাড়তে ব্যস্ত হলো। মেঝেয় বরফকুচি পড়ল অজস্র। ধ্রুবও ওভারকোট খুলতে খুলতে সেন্ট্রাল হিটারর চাবি ঘুরিয়ে দিল। ক্রমশ ঘরটা চমৎকার তাপে ভরে উঠতে থাকল। দুজন বিছানায় পাশাপাশি বসল। ধ্রুব এবার আরাম করে চুরুট জ্বালাল।

একটু পরেই দরজায় কে নক করল। কোম্পানির লোক। ওদের জিনিসপত্র বয়ে এনেছে। ধ্রুব সব গোছগাছ করতে ব্যস্ত হলো। সোনালি বলল, এই লোকটা নিশ্চয় ইংরেজি বোঝে না।

ধ্রুব লোকটাকে দেখে নিয়ে বলল, যা দেখছি–সবাই মনে হচ্ছে বোঝে। বলেই দেখ না।

সোনালি ইংরেজিতে বলল, কী নাম তোমার?

লোকটা–হ্যাঁ, ইংরেজিতেই জবাব দিল–আমার নাম শের সিং।

তুমি কাশ্মীরি?

না ম্যাডাম, পাঞ্জাবি।

 তুমি কি আমাদের দেখাশোনা করবে?

আমি সকলেরই দেখাশোনা করি, ম্যাডাম।

আর লোক নেই?

দরকার হয় না।

আমাদের খাবার আনবে কে?

নিচে ডাইনিং হলে যেতে হবে ম্যাডাম। সেলফ-সারভিস সিসটেম।

সর্বনাশ! দেখছ তো আমার পা গেছে!

শের সিং তার বিশাল জোব্বা থেকে একটা কাঠের বড় কৌটো বের করে বলল, ভুলে গিয়েছিলাম–শ্রীবাস্তব পাঠিয়েছেন। মলম আছে। হুঁশিয়ার ম্যাডাম, আগুনে পা সেঁকবেন না।

জানি। শোনো শের সিং, দু কাপ গরম কফি খাওয়া দরকার।

মাফ করবেন, সব সেলফ-সারভিস সিসটেম।

 ধ্রুব চটে বাংলায় বলল, ভ্যাট। আমি আনব। ওকে বিদেয় করো তো!

শের সিং, তুমি আসতে পারো।

শের সিং চলে গেল সেলাম বাজিয়ে। ধ্রুব বলল, যা ব্যাপার দেখছি, স্কিইং-এর সাধ জন্মের মতো ঘুচে-যাবে। এ তো সুইজারল্যান্ড নয়, ভারতবর্ষ। বললেই তো বলবে–আরে রাখো রাখো! এখনও কোটি কোটি লোকের ভাত কাপড়ের সংস্থানই করা হয়ে ওঠেনি তো তোমাদের ওই স্কি-বিলাস!

সোনালি বলল, দমে গেছে মনে হচ্ছে।

যাঃ। ধ্রুব ফের ওভারকোট চড়িয়ে মাথায় টুপি ঢেকে এগোল।…আমি কফি নিয়ে আসি। তুমি পোঁটলা খোলো ততক্ষণে। স্ন্যাকসের প্যাকেট বের। করো।

সোনালি বিছানায় পা তুলে দিয়ে মোজা খুলতে খুলতে বলল, রোখো বাবা! আগে ওষুধ লাগাই। এই পা নিয়ে যে আমার সব প্ল্যান ভেস্তে যাবে। ও মা, আমি কী করব! কান্নার ভান করে ঠোঁট কোঁচকাল সে–চোখে দুষ্টু হাসি।

ধ্রুব দরজা খুলে ঘুরে বলে গেল, বাইরে গেলে তোমার বাঙালি মেয়েসুলভ ন্যাকামিটা বেরিয়ে আসে সোনালি। কেন বল তো?

আনন্দে। বলে সোনালি কাঠের মোড়কটা খুলতে ব্যস্ত হল।

.

বেচারা সোনালি–তার দুর্ভাগ্য! ধ্রুব দুঃখিত হয়েছিল খুবই। নিচে অফিসের লাগোয়া ছোট্ট হল ঘরে ডিনারের আয়োজন। কাউন্টারে বড়ো বড়ো প্লেটে দেশী-বিদেশী পদ সাজানো হয়েছে। যে-যা খাবে, তুলে নিয়ে দাঁড়িয়ে খাচ্ছে এখানে ওখানে এবং পরস্পর গল্প-গুজব করছে। একটা জানালা খোলা আছে–তার ওধারে টিনের শেড দেওয়া লম্বা চওড়া আরেকটা হল দেখা যাচ্ছে। তার মেঝে পুরু বরফে ঢাকা। আলোও উজ্জ্বল। সেখানে কয়েকজন স্কি-চর্চা করছে। তাদের মধ্যে সোনালির বয়সী সুশ্রী একটি মেয়ে রয়েছে। স্কেটিং জুতো পরে একদিকে দাঁড়িয়ে সে কী সব নির্দেশ দিচ্ছে। এদের তাহলে মহিলা ইনস্ট্রাক্টারও রয়েছে। মাঝে মাঝে সে কারও হাত থেকে প্রায় চারফুট লম্বা স্কিপোল দুটো নিয়ে সম্ভবত শরীরের ব্যালান্স রাখার কৌশল বুঝিয়ে দিচ্ছে। ধ্রুব লক্ষ্য করছিল, আগের বছর সোনামার্গের কাছে একটা জায়গায় স্কি করতে গিয়ে যে স্কি দুটো সে পায়ে ব্যবহার করেছিল, এদের স্কি তার চেয়ে অনেক বড়ো–ক্ষুদ্র ছিপ নৌকোর মতো। তার সংশয় হলো, ওই পাঁচ-ছ ফুট একজোড়া স্কি পরে সোনালি সামলাতে পারবে কি না। অবশ্য এখন তো ওর পা জখম।

ট্রেনিং-এর দৃশ্যটা তন্ময় হয়ে দেখছিল ধ্রুব। সেইসময় তার পিছনে কে পরিষ্কার শুদ্ধ বাংলায় বলে উঠল, আপনি কি বাঙালি?

ধ্রুব ঘুরে দেখল এক ভদ্রলোক মাথায় টাক মুখে সাদা দাড়ি আর পিছনে কিছু শনের মতো চুল, খুব অমায়িক চেহারা, তার দিকে তাকিয়ে আছেন হাসিমুখে। হনুমান টুপিটি তার কাঁধে ঝুলছে। পোশাকের অবস্থা দেখে মনে হলো, এ আবহাওয়ায় বেশ অভ্যস্ত। এই বুড়োও কি স্কি খেলতে এসেছে। নাকি? তার অবাক লাগল। তার ওপর বাঙালি বুড়ো! এ বয়সে যার কিনা নাতিপুতি নিয়ে মাঠে ময়দানে বসে থাকার কথা।

ভদ্রলোক একটু হেসে নিজে থেকেই পরিচয় দিলেন।..আমি নীলাদ্রি সরকার-কর্নেল নীলাদ্রি সরকার। মিঃ দুগাল আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধু। প্রতি নভেম্বরে আমি রিস্তা ক্যাম্পে চলে আসি। কিন্তু এবার আবহাওয়ার গতিক ভালো দেখছি না, মাই ইয়ং ফ্রেন্ড!

ধ্রুব তক্ষুনি লাফিয়ে উঠল।…কর্নেল নীলাদ্রি সরকার! কী আশ্চর্য!

কর্নেল অবাক হয়ে বললেন, আপনি আমাকে চেনেন?

ধ্রুব বলল, চিনি মানে আপনার কথা আমি মামার কাছে ভীষণ শুনেছি। আমার মামা কেন্দ্রীয় তদন্ত ব্যুরো থেকে সম্প্রতি রিটায়ার করেছেন–অমলেশ রায়। মামার কাছে।

কী কাণ্ড, কী কাণ্ড! কর্নেল ওর কাঁধে হাত রাখলেন। অন্তরঙ্গভাবে ওকে দেখতে দেখতে বললেন, রায়ের ভাগ্নে তুমি! তুমি বলছি, ইয়ংম্যান। কিছু মনে করো না। নাম কী তোমার? স্কিতে ভীষণ নেশা আছে নিশ্চয়? ওঃ, বলো না–এর মতো চমৎকার গেম আর নেই। টানতে টানতে টেবিলের কাছে নিয়ে গেলেন ওকে। পাশাপাশি বসলেন।

ধ্রুব তার পরিচয় দিয়ে বলল, আমি দিল্লী বিশ্ববিদ্যালয়ে ফেরেনসিক বিভাগের লেকচারার। আমার নাম ধ্রুব চৌধুরী।

কর্নেল পরিহাস করে বললেন, হা ঈশ্বর! গোয়েন্দা ফোরেনসিক সবকিছু এই দুঃসময়ে ঠাণ্ডা পাহাড়ে এসে জমেছে বাকি থাকল কী? জাস্ট এ মার্ডার–একটা খুন। অ্যাঁ? হা হা করে হেসে উঠলেন তিনি।

ধ্রুব কথার ঝোঁকে বলল, সেও বাকি নেই, কর্নেল। আমার এক মহিলাবন্ধু– নাম শুনে থাকবেন, সোনালি সেন–অনেক পাহাড়ে চড়েছে…

সোনালি–সোনালি সেন! হ্যাঁ, হ্যাঁ কাগজে অনেকবার তার নাম পড়েছি মনে হচ্ছে। কোন পর্বত অভিযাত্রী দলের সদস্যা যেন। যাক গে, কী হলো সোনালি সেনের?

হাফ মারডার্ড! ধ্রুব হেসে উঠল।…পা জমে প্রায় খোঁড়া হয়ে গেছে।

পুওর গার্ল! কত নম্বরে বুকড় হয়েছে তোমরা?

এবার ধ্রুব একটু বেকায়দায় পড়ে গেল। একঘরে থাকছে বা শুতেই হচ্ছে–একই বিছানায় এই গুরুজনতুল্য ভদ্রলোকের সামনে সেটা প্রকাশ হয়ে পড়া লজ্জার ব্যাপার। অবশ্য সোনালি তার–যাকে বলে, বাগদত্তা বউ। একই বেড়ে শোওয়াটা যা কদিন আগে-পরের ব্যাপার। একদিন তো শোবেই দুজনে একখাটে। ধ্রুব বলল, আট আর নয়–দোতলায়।

চলো, আলাপ করে আসব। আমি অল্পস্বল্প ওষুধপত্তরও জানি ঠাণ্ডা বিষয়ে। কর্নেল উৎসাহী হয়ে উঠলেন।

ধ্রুব আরও আড়ষ্ট হলো। সোনালির জন্য খাবারের একটা প্যাকেট ব্যবস্থা করে নিয়ে সে বেরোল।

ওপরে উঠে ন নম্বরে নক করলে সোনালি খোঁড়াতে খোঁড়াতে এসে দরজা খুলে দিল। তারপর কর্নেলের দিকে জিজ্ঞাসু চোখে তাকিয়ে বিছানায় বসল। ডাক্তার পাওয়া গেছে নির্ঘাত। ধ্রুব অসাধারণ ছেলে।

কর্নেল নিজে থেকে আত্মপরিচয় দিয়ে একেবারে পাশে বসলেন তার।

 ডাক্তার নয়। সোনালি ক্ষুণ্ণ হতে গিয়েও অবশ্য খুশি হলো।

সে বলল, ভারি খুশি হলুম, কর্নেল। আমি আপনার কথা কোথায় যেন শুনেছিলুম।

ধ্রুব বলল, মামার কাছে শুনে থাকবে।

সোনালি চোখ পাকিয়ে বলল, আজ্ঞে না। তোমার মামা গোয়েন্দা বলেই তো সবজান্তা নন।

কী মুশকিল! মামা যে কর্নেলের বুজুমফ্রেন্ড!

সবাই একসঙ্গে হেসে উঠল।

প্রায় দুটি ঘণ্টা নানা ব্যাপারে কথা বলে কর্নেল যখন উঠলেন, তখন রাত প্রায় সাড়ে এগারোটা। ধ্রুব ভাবছিল, যাক্ গে–কর্নেল আট নম্বরের রহস্য টের পাননি-লজ্জার হাত থেকে বাঁচা গেছে।

কিন্তু কর্নেল দরজার কাছে হঠাৎ ঘুরে দাঁড়ালেন।…ইয়ে–ব। আমার মনে হচ্ছে, তোমাদের আট নম্বর ঘরটা অকেজো। সেন্ট্রাল হিটারটা নাকি জ্বলে গেছে আজ সকালে। শ্রীবাস্তব খুব ছোটাছুটি করছিল মিস্ত্রী নিয়ে। বলছিল, দুগাল যাবার সময় টের পেলে বলে দিত–কী একটা পার্টস গেছে, নতুন না হলে চলবে না। দুগাল আসবার সময় নিয়ে আসত।

ধ্রুব অবাক হয়ে গেল। সে কী! শ্রীবাস্তব তো অন্যরকম বলছিল তাকে। ঘরটায় নাকি বরাবর সেন্ট্রাল হিটিং ব্যবস্থা নেই। দুগালকে অত বলেও নাকি ফল হয়নি। আশ্চর্য তো! ব্যাটা আসলে হয়তো ভেবেছে, হিটার আছে জানলে বোর্ডার আবার মিস্তিরি ডাকানো আর মেরামতের জন্যে চাপ দেবে–তার কী অত হাঙ্গামার দায় পড়েছে। সে তো ম্যানেজার নয়–একজন ইনস্ট্রাক্টার। কাজেই কেন অত বাড়তি ঝুটঝামেলা করা! সে মিথ্যে বলে রেহাই পেতে চেয়েছে! তা না হলে অ্যাটাচড বাথে ইলেকট্রিসিটি আছে, ঘরে নেই–এ তো হয় না!

ধ্রুব অবশ্য কর্নেলকে ওসব ব্যাপার বলা দরকার মনে করল না। এখন ঝট করে শুয়ে পড়তে ইচ্ছে করছে। ভারি ক্লান্ত সে। কথায় কথা বাড়ে। কর্নেল আরও দেরি করিয়ে দিতে পারেন। সে শুধু বলল, হ্যাঁ–ঘরটা একেবারে ফ্রিজ।

তাহলে তো তোমার শোওয়া একটা ভীষণ সমস্যা!

ধ্রুব মাথা চুলকে বলল, না–দেখছি কী করা যায়!

উঁহু। শোন–নিচে আমার ঘরে একটা স্ট্রেচার আছে–জাস্ট এ স্ট্রেচার। তুমি এসো আমার সঙ্গে খুব হাল্কা! নিজেই বয়ে আনতে হবে কিন্তু। এদের সাহায্য পেতে পেতে তোমার রাত কাবার হয়ে যাবে। দুগালটা ভারি হিসেবী কি না–কম লোক দিয়ে জব্বর কাজ আদায় করতে চায়। এস, চলে এস এক্ষুনি।

ধ্রুব বলল, কেন? ও ঘরের খাটটা এ ঘরে আনব বরং।

পাগল! সারাদিনের ঠাণ্ডায় যা অবস্থা হয়েছে, শোবার উপযুক্ত হতে অন্তত বারো ঘণ্টার কড়া তাপ দরকার। আমি এ সব জানি, মাই ডিয়ার ইয়ংম্যান। বিলো জিরো ডিগ্রি টেম্পারেচার গেছে আজ। ফসিল হবার সাধ কেন? চলে এসো।

সোনালি মিটিমিটি হাসছিল! ধ্রুব করুণ চোখে তার দিকে একবার তাকিয়ে কর্নেলের সঙ্গে বেরোল।

নিচে কারো ঘুমোবার তাগিদ দেখা যাচ্ছিল না। করিডরে স্কিয়াররা আনাগোনা করছে, পায়ে স্কি-বুট। কাঠের মেঝেয় খটাখট আওয়াজ উঠছে সবখানে! সেই ট্রেনিং রুম থেকে কথাবার্তা আর হল্লার মৃদু আওয়াজ শোনা যাচ্ছে। বাইরের দুর্যোগ কল্পনা না করাই স্বস্তিকর অবশ্য।

কর্নেলের ঘর থেকে ভাঁজ করা খাটিয়াটা বয়ে আনছিল ধ্রুব। সিঁড়িতে ওঠার মুখে আটকে গেল–সিঁড়িটা খুব সংকীর্ণ কাঠের। তার ওপর ঘোরালো। সমস্যায় পড়ে গেল ধ্ৰুব। নিচে একজন ধরে উঁচু করে তুললে তবে খাটিয়া ওঠানো সম্ভব হয়। এখন কাকেই বা সাহায্য করতে বলবে। স্কিয়াররা নিজের তালে ঘুরছে। এখনও কারো সঙ্গে আলাপ হয়নি।

সেই সময় পাশেই দরজা খুলে বেরিয়ে এল একটি মেয়ে। ধ্রুব চিনতে পারল। স্কি রুমের সেই ইনস্ট্রাক্টার। চেহারায় মনে হয় কাশ্মীরি মেয়েই হবে। ধ্রুবর অবস্থা দেখে সে একটু হেসে বলল, আপনাকে সাহায্য করতে পারি কি?

ধ্রুব মুগ্ধ হয়ে গেল।…হা–যদি কিছু মনে না করেন…

না, না। মনে করার কী আছে? সানন্দে। বলে সে খাটিয়াটা ধরল।

ওপর অব্দি পৌঁছে দিয়ে মেয়েটি বলল, আপনি তাহলে সেই দেরি করে আসা ভদ্রলোক! আমি মিস ললিতা টোড়মাল-ইনস্ট্রাক্টার।

ধ্রুব বলল, অনেক ধন্যবাদ মিস টোমাল। আমি ধ্রুব চৌধুরী–ফ্রম ডেহি।

আপনি তো বাঙালি।

হ্যাঁ। আপনি?

এখন কাশ্মীরিই বলতে পারেন। অবশ্য আমার জন্ম সিংহলে। আচ্ছা, তাহলে এখন চলি। আবার দেখা হবে, কেমন?

ললিতা টোডমাল নমস্কার করে চলে গেল। ওর কণ্ঠস্বরে কী যেন আছে, কেমন সঙ্গীতময়। ধ্রুবর কানে লেগে রইল।

খাটিয়াটা ঘরে ঢুকিয়ে ধ্রুব বলল, বেঁচে গেলুম, বাবা। পাশে স্ত্রীলোক নিয়ে শোওয়ার অভ্যেস নেই। ঘুমের বারোটা বেজে যেত।

অভ্যেস বুঝি আমার আছে? সোনালি বাঁকা ঠোঁটে বলল।

থাকা উচিত।

 এই যা তা বলো না!

মোটেও বলিনি। বলছি–পাশে স্ত্রীলোক নিয়ে শোবার অভ্যেস। তা কি মিথ্যে?

সোনালি হাসল। দ্যাটস রাইট। সে অভ্যেস আমার আছেই তো।

বিছানা করতে করতে ধ্রুব বলল, কর্নেল দীর্ঘজীবী হোন। কী বাঁচা না বাঁচিয়ে দিলেন।

সোনালি বলল, কীভাবে একশয্যায় শুতুম জানো? আমার মাথা যেদিকে– তার উল্টোদিকে তোমার মাথা। তার মানে আমার পা তোমার মাথার পাশে–আর তোমার পা আমার মাথার পাশে। গ্র্যান্ড হত কিন্তু লাথি খেলে দুজনেই খেতুম পরস্পরের–কেমন শোধবোধ হয়ে যেত। আর ভক্তি শ্রদ্ধা জানতে হলে সেও খুব সুবিধে ছিল। তুমি আমার পায়ে মাথা ঠেকাতে…।

ধ্রুব দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, তোমার পায়ে চুমু খেতুম বরং!.কিন্তু ঘুম। আসছিল ধ্রুবর। নিচে কি সারারাত ওরা জেগে আছে? কাঠের মেঝেয় খটখট, শব্দ অবিশ্রান্ত শোনা যাচ্ছিল।

তারপর কখন একটি ঘুমের আবেশ এসেছে–হঠাৎ নিচে একটা চাপা অদ্ভুত ধরনের ঘরঘর শব্দ থেমে-থেমে শোনা যাচ্ছে। কিসের শব্দ? যেন একটা চাকা ঘুরছে কোথাও। কিসের চাকা? ঘরঘর শব্দটা কতক্ষণ ধরে চলল। তখন স্কেটিং জুতোর খটাখট আনাগোনার শব্দ আর নেই। আর কোন শব্দ নেই শুধু ওই চাকা ঘোরার শব্দটা ছাড়া। ধ্রুব চোখ বুজে পড়ে রইল। অসহ্য লাগছিল। যেন মাথার ভিতর একটা চাকা ঘুরছে থেমে-থেমে। অথচ ভালো ঘুম না হলে সকালে স্কি জমবে না তার। 

আবার একটু তন্দ্রা মতন এল। আবার জাগল ধ্ৰুব। সোনালির কোন সাড়া নেই।

সেই সময় হঠাৎ শুনতে পেল, ওপর তলায় পাশেই মেঝেতে (এখানেও কাঠের মেঝে) চাপা খটখট মচমচ একটা শব্দ হচ্ছে। কে যেন সিঁড়ি দিয়ে উঠে এল। দরজার সামনে দিয়েই চলে গেল।

এখন প্রচণ্ড স্তব্ধতা। কাজেই বাইরের ওই, সন্তর্পণ চাপা চলাফেরা শব্দ বদ্ধ ঘরের মধ্যে শুনতে পাওয়া যাচ্ছে। কে এতরাত্রে চলাফেরা করছে? অমন সাবধানে কেন?

তারপর মনে হলো, পাশেই কোন ঘরের দরজার তালা খোলার ক্লিক, তারপর দরজা খুলে যাওয়া, ফের কিছু চাপা হাঁটার শব্দ–তারপর স্তব্ধতা।

কে হয়তো নিজের ঘরে ফিরে শুয়ে পড়ল। ভাবতে ভাবতে এবার ঘুমিয়ে পড়ল ধ্রুব। সকালে সোনালি যখন তাকে ডাকাডাকি করছে, ধ্রুব তখন কিন্তু জেগে। সম্ভবত শেষরাত্রে নিচে কারা উত্তেজিত স্বরে কথা বলছিল, কিংবা ঝগড়া করছিল–সেটা স্বপ্ন কি না–সে ভাবছিল।

…খবর্দার, তুমি এসব ব্যাপারে নাক গলাবে না বলে দিচ্ছি।..স্ত্রীলোকের কণ্ঠস্বর। খুব পরিচিত লাগছিল। ললিতা নাকি?

পুরুষ কণ্ঠে : না–এটা ভীষণ অন্যায়। ইমমরাল! কেন তুমি…

স্ত্রীলোকটি : শাটআপ! এক্ষুনি চলে যাও এখান থেকে।

পুরুষটি : প্লিজ, প্লিজ! এখনও ভেবে দেখ–তুমি আমার ওপর অবিচার করছ।

স্ত্রীলোকটি : গেট আউট, গেট আউট ফ্রম হেয়ার! আই প্রমিজ..

কী সব নাটকীয় সংলাপ! ধ্রুব টের পাচ্ছিল–প্রত্যেকটি সংলাপ যখন তার মুখস্থ হয়ে গেছে, তখন সে নিশ্চয় স্বপ্নে শোনেনি। সে বলল, সোনালি, কারা সব ঝগড়া করছিল রাত্রে, শোননি?

সোনালি বলল, না। ভীষণ ঘুমিয়েছি। কিন্তু আমার পায়ের তো কোন উন্নতি হয়নি, ধ্রুব। ইস্, কী করব এখন বলো তো।

ধ্রুব উঠে বসল।…দেখি কর্নেলকে জিগ্যেস করে। কোথাও ডাক্তার পাওয়া যায় নাকি। তোমার পায়ে কি যন্ত্রণা আছে?

না–তাহলে তো ঘুমোতেই পারতুম না। মনে হচ্ছে, মলমের জন্যে যন্ত্রণা টের পাচ্ছি না। কিন্তু সত্যি পায়ে কোন সাড় নেই। সোনালি তার পা দেখতে থাকল।

.

০২.

বাইরে যা আবহাওয়া, দিন না রাত্রি, বোঝা খুব কঠিন। সারা আকাশ ঘন ধূসর। সূর্য আছে কি নেই কে বলবে? ঘড়ি চলছে, আটটা-কুড়ি। বেশ হাওয়া দিচ্ছে। আর বরফগুড়ি ঝরে পড়ছে সমানে। তার মধ্যে স্কি করতে বেরোনো–বেশ। দমে গেল ধ্ৰুব।

সোনালি বেচারা ঘরেই রয়ে গেছে। কর্নেল তার কাছে বসে আছেন। রিস্তায় একজন মাত্র ডাক্তার আছেন। তার কাছে এই দুর্যোগে তিনি ছাড়া শের সিংকে পাঠানো কারও পক্ষে সম্ভব ছিল না।

ধ্রুব স্টোরে টাকা জমা দিয়ে দুটো স্কি বুট, স্কি, স্কি-পোল নিল। লন থেকে বরফঢাকা পথ সোজা চলে গেছে পাহাড়ের তলায়। ওখানে লাইনে দাঁড়িয়ে, হুইলচেয়ারের জন্যে অপেক্ষা করতে হবে। ধ্রুবর কিছু অভ্যাস আছে। অসুবিধে হবে না। হুইলচেয়ার তখন স্থির নাগরদোলার মতো দাঁড়িয়ে রয়েছে। গুনে দেখল আটটা চেয়ার আছে মোটমাট। প্রত্যেকটায় দুজন বসার মতো চওড়া। পালাক্রমে উঠে বসতে হবে। আস্তে ঘোরানো হবে এই নাগরদোলা লিফট। পাহাড়ের ওপরে পর্যায়ক্রমে একটা করে চেয়ার পৌঁছবে। আর তক্ষুনি স্কিয়ার লাফ দেবে। বরফের গড়ানে স্কি করে চলে যাবে এদিকে-ওদিকে।

লাইনে অনেক লোক–পনেরজনেরও বেশি। মাঝামাঝি দাঁড়িয়েছিল ধ্রুব। হাওয়ার ঝাপটানি, তাই সবারই মুখ অব্দি পুরো ঢাকা। চোখে প্রত্যেকেই গগল্স পরেছে। ওই জোব্বার ভিতর কে পুরুষ কে মেয়ে চেনা যাচ্ছে না। মাত্র নাকের ডগাটা খোলা, চিবুক অব্দি স্কার্ফ জড়ানো সকলের। একেবারে আনাড়িদের ক্ষেত্রে একজন ইনস্ট্রাক্টার সাহায্য করবে–সে স্কিয়ারের পাশে বসবে উড়ুক্কু চেয়ারটাতে; তাই ডবল সিটের ব্যবস্থা। অন্যান্যরা একা পুরো চেয়ার দখল করবে। ধ্রুব জানিয়ে দিয়েছে লিফটম্যানকে–সে একা বসবে।

স্কি-পোল দুটো চার ফুট উঁচুলোহার রড। তার ডগায় গোল হাতল হাতে ধরার জন্য। অবিকল যেন তলোয়ারের মুঠো। রডের শেষপ্রান্তে একটা হালকা কাঠ আর রবারের একফুট বাই চার ইঞ্চি বাস্কেট, তলাটায় পাতলা লোহার মসৃণ পাত আছে। ওই পোল দুটো দুহাতে ধরে স্কিয়াররা সরু ছিপ নৌকোর মতো লম্বাটে স্কি চালিয়ে ছোটাছুটি করবে।

চেয়ারে ওঠার সময় যথেষ্ট ক্ষিপ্রতা চাই। কারণ দুপায়ে ওই স্কি পরে ওঠা ভারি কঠিন ব্যাপার। শরীর সামনের দিকে বেঁকিয়ে একলাফে পাশ থেকে শূন্যের ওপর দিয়ে চেয়ারে উঠতে হবে–পায়ের কোন সাহায্য এ অবস্থায়। পাওয়া অসম্ভব। ধ্রুবর একটু অস্বস্তি হচ্ছিল। পড়ে গিয়ে পা ভেঙে না যায় ওই শ্রীবাস্তবের মতো।

সে পিছনে আর সামনে তাকাল। কতকগুলো এস্কিমোর মূর্তি যেন স্থিরভাবে অপেক্ষা করছে। কিংবা কতকগুলো অদ্ভুত যন্ত্র যেন। কাকেও মানুষ বলে মনে হচ্ছে না। গায়ের ওপর দিয়ে অবিশ্রান্ত বরফ গড়াচ্ছে। টুপিতে কিছু জমে উঠছে–আবার খসে পড়ছে ঘাড়ে–ঘাড় থেকে পিঠে, পিঠ থেকে নিচে।

লিটম্যানের মূর্তিটি অস্পষ্ট। মাত্র ফুট বিশেক দূরে সব ভাসাভাসা লাগছে। লিফটম্যানের পাশে আরও দুজন সাহায্যকারী দাঁড়িয়ে রয়েছে। এতক্ষণ পরে লিফটম্যানের গর্জন শোনা গেল–বি রেডি এভরিবডি। ওয়ান টু থ্রি…।

লিফট-হুইল নড়ে উঠল। আস্তে ঘুরতে থাকল। ওপর থেকে দুলতে দুলতে দেবযানের মতো চেয়ার নেমে আসছে। আস্তে আস্তে ধ্রুবর সামনের লোকগুলো। পটপট করে উধাও হয়ে যাচ্ছে আকাশপথে। কোথায় পৌঁছচ্ছে একটুও দেখা যাচ্ছে না। একে সব ঝাপসা–তার ওপর চোখে গগল্স। হঠাৎ ধ্রুব দেখল, তার সামনের লোকটি নেই। অমনি সে ওপরে তাকাল। পঁয়তাল্লিশ ডিগ্রি কোণ থেকে শুন্যে একটা, এগিয়ে আসা চেয়ার দেখতে পেল। সে তৈরি হলো মুহূর্তেই। তারপর সামনে ঝুঁকে লাফ দিয়ে চেয়ারে উঠে বসতেই হাত ফসকে তার স্কি-পোল দুটো পড়ে গেল। সর্বনাশ। সে চেঁচিয়ে উঠল সঙ্গে সঙ্গে–লিফটম্যান! আমার স্কি-পোল!

লিফট কিন্তু বন্ধ হলো না। ধ্রুব ভীষণ ভয় পেয়ে গেল। চেয়ার দুলতে দুলতে উঠে পড়েছে ওপরে। আবছা দেখা গেল তার পোল দুটো ছিটকে চলে যাচ্ছে নিচে। স্কি-পোল ছাড়া নিচে নামা যে অসম্ভব। কোনমতেই অ্যাকসিডেন্ট ঠেকানো যাবে না।

তার চেয়ার চুড়োয় পৌঁছলেও সে লাফ দিয়ে নামতে পারল না। চুপচাপ বসে পড়ল। এবার তলা দিয়ে যাচ্ছে তার চেয়ার। ভয় হলো, লাইনের কাছে ফিরে যাওয়ামাত্র কেউ লাফ দিয়ে নির্ঘাত তার ওপর চড়ে বসবে এবং হয়তো অ্যাকসিডেন্ট ঘটাবে। সে লিটম্যানের কাছ ঘেঁষে যাবার সময় তাকে ডেকে বিপদটা বলার জন্যে যেই চেঁচিয়েছে, অমনি–অবাক কাণ্ড, তার চেয়ারের সামনেই পোলদুটো দেখতে পেল–নিচে লিফটম্যান চেঁচাল, হাই ম্যান। তোমার পোল। খাপ করে ধরে ফেলতে চেষ্টা করল ধ্রুব–কিন্তু পারল না।

পাশ দিয়ে যাবার সময় ওদের হো-হো হাসি শুনতে পেল সে। যাক, আবার ঘুরে এলে চেষ্টা করবে। অবশ্যি যদি ফের পোলদুটো ওরা এগিয়ে দেয় তাকে।

তার চেয়ার ফিরে এল লাইনের কাছে। কিন্তু আর কোন লোক নেই লাইনে। সব উঠে গেছে এবং চুড়ো থেকে নেমে পড়েছে অনেকে। ওপাশের উপত্যকায় এতক্ষণ জোর স্কি শুরু হয়েছে। আফসোস হতে লাগল ধ্ৰুবর।

তার মাথার ওপর যে চেয়ারটা–তা অন্তত ছফুট দূরে। ওঠবার মুখে আবছা দেখা গেল যেন দুজন পাশাপাশি বসে রয়েছে। তাহলে অবশ্যই একজন ইনস্ট্রাক্টার, অন্যজন নতুন স্কিয়ার। ওপরে ওঠার পর সে লক্ষ্য করল ওই চেয়ার থেকে দুটো স্কি-পোল হঠাৎ নিচে পড়ে গেল। কীভাবে পড়ে গেল্প, বুঝতে পারল না ধ্রুব। এত আবছায়া স্পষ্ট কিছু বোঝা গেল না। এও আনাড়ি একজন–তার চেয়েও হয়তো আনাড়ি। বরফবৃষ্টির মধ্যে স্পষ্ট দেখার চেষ্টা দিয়ে নামতে এবং প্রচণ্ড বেগে স্কি করে অদৃশ্য হতে দেখল ধ্রুব। আরেকজন বসে রইল–তার মতোই বেচারা! তাকে নিয়ে চেয়ার তলা দিয়ে ঘুরে চলে গেল আগের মতো।

ধ্রুবর কানে লিফটম্যানের সেই হাসিটি ভাসছিল। এ মুহূর্তে মনে পড়ামাত্র সে খেপে গেল। রোসো ব্যাটারা! ধ্রুব চৌধুরী নিজে তার পোল কুড়িয়ে আনবে।

সে লাফ দিল।

কিন্তু তেমন কিছু ঘটল না। বরফের ওপর আটকে গেল তার দু পায়ের দুটো স্কি–কিন্তু আর নড়াচড়া করা কঠিন–ব্যালান্স রাখা যাবে না। সে খুব তাড়াতাড়ি হেঁট হয়ে স্কি দুটো খুলে রাখল পা থেকে। তারপর ঘুরে দাঁড়াল।

যতক্ষণ একজন স্কিয়ারও চেয়ারে থাকবে, লিফট বন্ধ হবে না–ঘুরতে থাকবে। সেই চেয়ারটা লক্ষ্য করল ধ্রুব। ভীষণ অস্পষ্ট দেখাচ্ছে। একটু পরে মাথার ওপর এলে কিছু স্পষ্ট হলো। তখন চমকে উঠল সে।

স্কিয়ারের বুকের ওপর কী যেন উঁচু হয়ে আছে। কেমন অস্বাভাবিক দেখাচ্ছে লোকটাকে। ওভাবে বসে থাকা চেয়ারটা নিচের দিকে ঘুরে যাবার মুহূর্তে সেই উঁচু জিনিসটা আবছা দেখতে পেল–একটা স্কি-পোল। কিন্তু ওভাবে বুকের ওপর অর্ধেকটা হাতলশুদ্ধ উঁচু হয়ে আছে কেন?

ওই চেয়ারে ছিল চারটে স্কি-পোল–দুজনের। দুটো পড়ে যেতে দেখেছে। বাকি দুটো নিয়ে ওর সঙ্গী স্কি করতে চলে গেছে। তাহলে ওটা এল কোত্থেকে? অবশ্য দক্ষ স্কিয়ার একটা পোলের সাহায্যেও স্কি করতে পারে। কিন্তু পোলটা ওভাবে ওর বুকের ওপর কেন?

 লিফট এখনও থামেনি। স্কি দুটো বগলে ধরে ধ্রুব হামাগুড়ি দিতে দিতে বরফ ভেঙে উঠতে থাকল। সেইসময় চমকাল দ্বিতীয়বার।

সাদা বরফের ওপর চাপচাপ কালোরঙের ওগুলো কী?

গগলস খুলল সে। পিটপিটে চোখে দেখল, রক্ত। রক্ত! মুহূর্তে শিউরে উঠল ধ্রুব। পোলটা বুকের ওপর ওই ভাবে থাকার স্পষ্ট অর্থ টের পেল সে। মার্ডার–খুন! ওই স্কিয়ারটার বুকে পোলটা বিঁধিয়ে দিয়েছে কে।

ভাঙা গলায় চেঁচিয়ে উঠল সে– লিফটম্যান! স্টপ দা হুইল! থামাও! রোখকে!

অতদূরে নিচে তার চিৎকার শোনা অসম্ভব কারো পক্ষে। সেই চেয়ারটা আবার আসছে। ধ্রুব স্কি দুটো রেখে তৈরি হয়ে একপাশে দাঁড়িয়ে গেল।

তারপর চেয়ারটা মাথার কাছাকাছি উচ্চতায় পৌঁছানোমাত্র সে স্কিয়ার লোকটির পায়ের একটা স্কি ধরে জোরে হ্যাঁচকা টান দিল। অমনি সে ছিটকে নিচে গিয়ে পড়ল। উবুড় হয়ে পড়ায় স্কি-পোলটা হয়তো আরো ঢুকে গেল। বুকে–হয়তো পাদুটোও ভাঙল। অদ্ভুত ভঙ্গিতে পড়ে রইল লোকটা।

তর তর করে নামল ধ্রুব। ওকে দুহাতে ধরে চিত করার চেষ্টা করল। একটু কাত করা গেল মাত্র। রক্তে বরফ লাল হয়ে যাচ্ছে।

ধ্রুব লোকটার চোখের গগল্স আর স্কাফটা খুলে ফেলতেই বিস্ময়ে পাথর হয়ে গেল কয়েকমুহূর্তের জন্যে।

ললিতা–মিস ললিতা টোডমল!

স্কি-পোলের ডগা থেকে বাস্কেটটা খুলে কেউ ধারালো ডগাটা তলোয়ারের মতো ওর বুকে এফেঁড়-ওফোঁড় করে বিঁধিয়ে দিয়েছে।…

.

রিস্তায় ক্যাম্প নং একত্র একটা পুলিস ফাঁড়ি আছে মাত্র। বড় থানা ক্যাম্প নং দুই–সে আরও তিন মাইল পশ্চিমে। ফাঁড়ির চার্জে যে লোকটা সে একজন হাবিলদার। নাম গুলাব সিং। কুমড়োর মতো চেহারা। কিন্তু পাহাড় টাহাড় ওর কাছে সমতল মাঠের ব্যাপার। সঙ্গে দুজন সেপাই। সে এসে সোজা হুকুম দিল–আভি জখমী আদমীকো উঠাকে লে আও।

অমনি একজন সেপাই ললিতা টোড়মলের বুক থেকে একটানে পোলটা উপড়ে ফেলল। খানিকটা কালচে রক্ত বেরিয়ে এল। স্কিয়াররা ভিড় করে দাঁড়িয়েছিল। তাদের চোখে গগল্স–একেবারে পুতুল সব। সেপাইটা স্কিপোল অবহেলায় ধরে নাক কুঁচকে বলল, অ্যাকসিডিন হুয়া সির!

ধ্রুব চেঁচিয়ে উঠতে যাচ্ছিল–আরে করছ কী, কিন্তু ওদের ব্যাপার দেখে খারাপ লাগলেও চুপ করে থাকল। এই আবহাওয়াগত দুর্যোগ, ফোরেনসিক পরীক্ষার কোন উপায়ও নেই কীই বা করা যেতে পারে!

হ্যাঁ–অ্যাকসিডিন। জরুর! গুলাব সিং, লিম্যানের সহকারী দুজনকে হুকুম দিল–জখমী উঠাও জলদি।

লোকদুটো তাই করতে যাচ্ছিল, ধ্রুব বলল, ঠারো, ঠারো! দেখুন হাবিলদারসায়েব, এটা একটা মার্ডার কেস। অ্যাকসিডেন্ট নয়। আর কেউ জখমী আদমীও নয়–স্রেফ লাশ। মিস টোডমলকে কেউ ডেলিবারেটলি খুন করেছে।

গুলাব সিং তেড়ে বলল, আপনি দেখেছেন? নিজের চোখে?

 ধ্রুব অপমানিত বোধ করছিল। বলল, কতকটা দেখেছি বই কি।

তবে বলুন, কে খুন করেছে? আমি তাকে পাকড়াব এক্ষুনি।

এই পরিস্থিতিতে ধ্রুব কী করবে, ঠিক করতে পারল না। সে আপাতত কর্নেলের কথাই ভাবল। কর্নেল নিশ্চয় খবর পেয়ে গেছেন এতক্ষণ। আসছেন। আসছেন না কেন?

ওকে চুপ করে থাকতে দেখে ভিড়শুদ্ধ হাসিয়ে গুলাব সিং হো হো করে হাসল।… বাঙালি লোক যেখানে থাকবে, সেখানেই গোলমাল বানাবে।

ধ্রুব রেগে গেল এবার।… হাবিলদারসায়েব, এটা একটা মার্ডারকেস। এর রীতিমতো তদন্ত হওয়া দরকার–আইনের এলাকা থেকে রিস্তা রেহাই পায়নি নিশ্চয় জানেন!

হাঁ হাঁ। আইনের জিম্মাদারই তো আমি–গুলাব সিং। আবার কে?

আপনি একটা সারকেলের প্রাথমিক তদন্তের মালমশলা নষ্ট করে ফেলেছেন–আরও নষ্ট করতে হুকুম দিচ্ছেন। এর জন্যে আপনাকে উপরওলার কাছে জবাবদিহি করতে হবে।

কিউ, কিউ? গুলাব সিং একটু ভড়কে গেল এবার।

 কোন এক্সপার্ট লাশ পরীক্ষা করার আগে…

ধ্রুবর কথা কেড়ে একজন স্কিয়ার বলল, কিন্তু মিঃ চাউড্রি, এখানে এক্সপার্ট পাচ্ছেনই বা কোথায়? শ্রীনগরে ট্রাঙ্ককল করতে হবে তারপর যদি ওঁরা আসেন! সে প্রায় কমপক্ষে চব্বিশ ঘণ্টার ব্যাপার।

আরেকজন স্কিয়ার বলল, তাহলেও ট্রাঙ্ক করা দরকার ছিল। মিস টোমলের বাবা শ্রীনগরের একজন বড় ব্যবসায়ী। তাঁকে খবর দেওয়া হয়েছে?

লিফটম্যান বলল, হ্যাঁ–মিঃ শ্রীবাস্তব ট্রাঙ্ককল বুক করেছেন।

একজন মেয়ে স্কিয়ার অস্ফুটকণ্ঠে মন্তব্য করল, শ্রীবাস্তব বেচারার কপাল! স্কি-সিজন শেষ হলেই ললিতার সঙ্গে ওর বিয়ে হত।

ধ্রুব একথাটা শুনে উৎসাহী হয়ে বলল, দেখুন মিঃ গুলাব সিং, তাহলে বুঝতেই পারছেন–অ্যাকসিডেন্ট কেস বলে মিথ্যে রিপোর্ট দিয়ে এটা ধামাচাপা দিতে পারবেন না।

গুলাব সিং রেগেমেগে বলল, কে বলেছে আমি ধামাচাপা দিচ্ছি?

ধ্রুব বলল, বেশ তো। তাহলে আমার কথা শুনুন। আমি আপনাকে সাহায্য করতে চাই। ফোরেনসিক ব্যাপারে আমার কিছু জ্ঞান আছে। আপনি লাশটার পাহারা: রাখুন।

আপনি পাগল স্যার, নির্ঘাত পাগল! এই বরফ ঝড়ের মধ্যে লাশ পাহারা দিতে গিয়ে কেউ নিজেই লাশ হয়ে যাবে না?..গুলাব সিং হেসে উঠল–তবে আগের মতো জোরে নয়।

ধ্রুব বলল, না–ওই দেখুন, মাত্র বিশ-পঁচিশ ফুট তফাতে স্কিয়ার গার্ডদের একটা কাঠের গুমটি ঘর রয়েছে, ওখানে দাঁড়িয়ে লাশে চোখ রাখলেই চলবে– যতক্ষণ না তদন্তটিম আসে। আর আপনি আপনাদের সদর থানায় খবর দিন। দেখবেন, সব ম্যানেজ হয়ে যাবে।

সেপাই দুজন বিরক্ত হয়ে চাপা গলায় বলল, যাহা বাংগলী, উঁহা ভি জঞ্জালী! শালালোগ বহৎ ঝামেলা পছন্দ করে ভাই রাম সিং!

গুলাব সিং ততক্ষণে মতলব বদলে অন্য মানুষ। সেপাই দুজনকে কড়া হুকুম দিয়ে সেই সাতফুট উঁচু ফুট পাঁচেক চওড়া গুমটি ঘরে ঢুকিয়ে বলল, বন্দুক তাগ করে বসে থাকো। লাশের কাছে কাছে কাকেও দেখলেই হুঁশিয়ারী দেবে। অগ্রাহ্য করলে সোজা গুলি ছুঁড়বে। আসুন সায়েব, কোম্পানির অফিসে যাই। সদর থানায় ফোন করব।

স্কি বরবাদ–যতক্ষণ না একটা হেস্তনেস্ত হয়। স্কিয়াররা চুপচাপ চলে গেল একে একে। সেই রক্তাক্ত স্কি-পোলটা লাশের পাশে পড়ে আছে। মুঠোয় খুনীর কোন ছাপ থাকা সম্ভব নয় কারণ হাতে দস্তানা ছিল। থাকবেই। এই ঠাণ্ডায় হাত খোলা রাখা মানুষের পক্ষে একান্ত অসম্ভব।

ধ্রুব পোলটা পরীক্ষা করে দেখল। ডগায় যে বাস্কেট লাগানো থাকে, সেটা কোথায় গেল? পাহাড়ের কোথাও নিশ্চয় পড়ে রয়েছে। এই ডগাটা বাস্কেটের ভিতর ঢুকিয়ে দুমড়ে বাঁকা করা হয়। কিন্তু বোঝা যাচ্ছে, এটা বাঁকানোই হয়নি–কোনমতে বাস্কেটে আটকানো ছিল–যাতে সুযোগমতো বাস্কেট থেকে খুলে বিধিয়ে দেওয়া যায় ললিতার বুকে। আর, স্কি-পোলের ডগা তো এত সুচলো হয় না মোটেও! এতে বোঝা যাচ্ছে, খুনী ওটা ঘষেঘষে সূক্ষ্ম আর ধারালো করেছিল। তার মানে, খুনী আগে থেকে তৈরি হয়ে এসেছিল।

গুলাব সিং পা বাড়িয়ে বলল, আসুন স্যার, আমরা এগোই।

ওরা চলতে থাকল। যেতে যেতে গুলাব সিং গজগজ করছিল–আমার কী কসুর ছিল? ফাঁড়িতে ফোন করল–একটা অ্যাকসিডেন্ট হয়েছে, আমি ভাবলাম ফি বচ্ছর তো হয়। তাই হয়েছে। গত সালে একটা লোক স্কি করতে গিয়ে বেমক্কা ঘাড় ভেঙে মারা পড়েছিল। সেইমতো রিপোর্ট করেছিলাম। এবারও ভেবেছিলাম তাই। স্কি করতে গিয়ে বুকে পোল ঢুকে গেছে-সোজা ব্যাপার!

ধ্রুব বলল, অ্যাকসিডেন্ট হয়েছে বলে ফোন করেছিল কেউ?

জী হাঁ।

কে ফোন করেছিল?

কোম্পানির ম্যানেজার-ট্যানেজার হবে। আবার কে?

নাম বলেনি?

এক মিনিট।..পকেট থেকে নোট বই বের করতে গিয়ে থামল গুলাব সিং।…চলুন, বলছি। বরফবৃষ্টির মধ্যে খাতা খোলা সম্ভব নয়।

 লন পেরিয়ে করিডরে একবার দাঁড়িয়ে নোটবই দেখল সে। বলল, হ্যাঁ–মিঃ–সঞ্জয় ওয়াড়েকার।

সঞ্জয় ওয়াড়েকার! ধ্রুব বিস্মিত হল। লিফটম্যানকে সে তক্ষুনি অফিসে শ্রীবাস্তবের কাছে জানিয়ে থানায় ফোন করতে বলেছিল। সারাক্ষণ ধ্রুব ললিতার লাশের কাছেই ছিল–অন্তত চারঘণ্টা। বরফের মধ্যে অতক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিল কীভাবে, এখন ভাবলে অবাক লাগে। হয়তো উত্তেজনা আর মার্ডারকেস সম্পর্কে তীব্র অনুসন্ধিৎসাই তাকে প্রতিকূল পরিবেশে তাপ যোগাচ্ছিল। এখন তার শরীর ক্রমশ যেন জমে যাচ্ছে ঠাণ্ডায়। ভারি ক্লান্তি লাগছে। কিন্তু সে বিস্মিত যে সঞ্জয় ওয়াড়েকার কে–সে কেন অ্যাকসিডেন্ট বলে ফোন করল? এই নির্বোধ গুলাব সিং এখানে এসে প্রথমে কি তার সঙ্গে দেখা করেনি? ধ্রুব বলল, সঞ্জয় ওয়াড়েকার সঙ্গে দেখা হয়েছে আপনার?

না। কী দরকার? এসেই তো ওখানে দৌড়ে গেছি।…গুলাব সিং বলল।

অফিসে শ্রীবাস্তবকে এক অদ্ভুত অবস্থায় দেখা গেল–সেটাই স্বাভাবিক। অন্তত সেই স্কিয়ার মেয়েটির মুখে সবিশেষ জানার পর। বাগদত্তা স্ত্রীর এই আকস্মিক মৃত্যুতে বেচারা একেবারে ভেঙে পড়েছে। দুহাতে মুখ ঢেকে টেবিলে হুমড়ি খেয়ে পড়ে নিঃশব্দে কাঁদছে।

এদের দেখে– সে মুখ তুলল। চোখ দুটো লাল ফুলো মুখ ভিজে। …আসুন। বসুন। মিঃ গুলাব সিং, কী দেখলেন বলুন? সত্যি কি ললিতা খুন হয়েছে? নাকি নিছক অ্যাকসিডেন্ট? আমি যে কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারছি না–অত ভালো মেয়েকে কেউ খুন করবে! ওঃ ঈশ্বর! এ তুমি কী করলে?

এরা গম্ভীর মুখে বসল। গুলাব সিং আফসোসে মাথা দোলাল। ধ্রুব বলল, মিঃ শ্রীবাস্তব, সঞ্জয় ওয়াড়েকার কে?

একটু চমকাল যেন শ্রীবাস্তব। ..কেন? সে আমাদের একজন নতুন স্কিয়ার।

ধ্রুব বলল, তার সঙ্গে একবার কথা বলতে চাই।

শ্রীবাস্তব নড়ে উঠল। হঠাৎ দুহাতে চুল আঁকড়ে ধরে বিকৃত মুখে বলল, আমার এই পা–এই পাটা! উঃ ঈশ্বর, এই ভাঙা পায়ের জন্যে কিছু করা যাবে না! আমার ললিতাকে খুন করে শয়তানটা চোখের সামনে দিয়ে কেটে পড়ল। সে পাগলের মতো টেবিলে মাথা ঠুকতে লাগল।

ধ্রুব ওকে শান্ত করতে চেষ্টা করল। গুলাব সিং উত্তেজিত হয়ে উঠেছে। সে বলল, তাহলে ওই ব্যাটাই মিছিমিছি অ্যাকসিডেন্ট বলে ফোন করে মিসগাইড করতে চেয়েছিল? কী মুশকিল! কই সে, কোথায় সেই শুওরের বাচ্চা? তাকে এক্ষুনি আমি পাকড়াতে চাই।

ধ্রুব বলল, শান্ত হোন মিঃ শ্রীবাস্তব। কী হয়েছে বলুন!

ভাঙা গলায় শ্রীবাস্তব বলল, জাস্ট নটায় সে আমার কাছে এসেছিল। বললাম, আপনি স্কি ছেড়ে ফিরে এলেন যে? ও বলল, হঠাৎ টেলি এসেছে মায়ের খুব অসুখ। বাধ্য হয়ে তাকে এক্ষুনি ফিরতে হবে। শ্রীনগর থেকে চার্টাড প্লেনের ব্যবস্থা করেছে ওর বাবা। সেই প্লেনে পুনায় গিয়ে মায়ের সঙ্গে দেখা করবে। আমি একটুও টের পাইনি। তক্ষুনি ও চেকআউট করল। গাড়ি নিয়ে চলে গেল। শ্রীবাস্তব হাঁফাতে লাগল।

ধ্রুব মনে মনে হিসেব করল–হ্যাঁ, ললিতা লিট চেয়ারে খুন হয়েছে। সকাল সাড়ে আটটা থেকে নটার মধ্যেই। এতে কোন ভুল নেই। কিন্তু যদি নটা থেকে সাড়ে নটার মধ্যে সে চেকআউট করে থাকে তাহলে গুলাব সিংকে সে ফোন করে খবর দিল কীভাবে? আর শ্রীবাস্তবই বা অমন খবরের পর থানায় না জানিয়ে চুপচাপ আছে কেন? বড় গোলমেলে ব্যাপার। সে বলল, মিঃ শ্রীবাস্তব, একটা কথা স্পষ্ট বলুন। সঞ্জয় ওয়াড়েকার নতুন স্কিয়ার বলছেন। সে মিস টোডমলকে খুন করবে কেন?

টেবিলে ঘুষি মেরে সখেদে শ্রীবাস্তব বলল, প্রতিহিংসা! আমি আগে টের পেয়েছিলাম অথচ–অথচ…আমার এই ব্লাডিবাচ্চা পা!

কিসের প্রতিহিংসা, মিঃ শ্রীবাস্তব?

ওই মারাঠি ললিতার সঙ্গে প্রেম করতে উঠে পড়ে লেগেছিল। ভেবেছিল, ব্যবসায়ী বাবার পয়সা আছে–সেই জোরেই ও ললিতার মন পাবে। আজ সকালে স্কিতে যাবার আগে ললিতা আমাকে জানিয়েছিল, গত রাত্রে শয়তানটা ওকে ভীষণ জ্বালাতন করেছে। আমি সঞ্জয়কে সতর্ক করে দেব ভাবছিলাম। তারপর তো ও টেলি পেয়ে চলে গেল, তখন ভাবলাম–যাক গে, আপদ গেল। কিন্তু তখন হারামী কুত্তা–ওঃ! শ্রীবাস্তব দুহাতে মুখ ঢাকল।

ধ্রুবর মনে পড়ল গত রাতের সেই উত্তেজিত সংলাপের কথা। হ্যাঁ, ঠিকই এ তথ্য।

গুলাব সিং বলল, রেজিস্টারে ওর ঠিকানা আছে নিশ্চয়। বলুন।

আছে। দিচ্ছি। বলে রেজিস্টারের পাতা ওল্টাতে ব্যস্ত হলো শ্রীবাস্তব।

 ধ্রুব বলল, মিঃ গুলাব সিং, আপনি ওই একটাই ফোন পেয়েছিলেন?

জী হ্যাঁ।

 তখন কটা বাজে?

নটা কুড়ি। নোট করা আছে।

শ্রীবাস্তব খাতা থেকে মুখ তুলে বলল, তাহলে যাবার সময় সে ফোন করে মিসগাইড করে গেছে। হ্যাঁ–এই যে ওর ঠিকানা।

গুলাব সিং ঠিকানা নোট করে নিয়ে সদর থানায় ফোন করতে ব্যস্ত হলো।– ধ্রুব বলল, আপনাদের ফোনের কটা এক্সটেনসান, মিঃ শ্রীবাস্তব?

দুটো। একটা ডাইনিং হলে, অন্যটা স্টোর রুমে।

 তাহলে যে কোন একটা ফোন সঞ্জয় ব্যবহার করতে পারে।

স্টোরেরটা নিশ্চয় নয়। কারণ, ঘর তালাবন্ধ ছিল। ডাইনিং হল তখন ফাঁকা ছিল–আর দরজাও সবসময় খোলা থাকে।

আচ্ছা মিঃ শ্রীবাস্তব, আপনি, লিফটম্যানের কাছে খবর পান ঠিক কটায়?

ধরুন–সঞ্জয় ওয়াড়েকার চলে যাবার আধঘণ্টা পরে। তার মানে–প্রায়। দশটার কাছাকাছি। একটু আগেও হতে পারে। মনে পড়ছে না।

 কিন্তু আমি লিফটম্যানকে আটটা পঁয়তাল্লিশে পাঠিয়েছিলাম খবর দিতে।

সে কী! শ্রীবাস্তব চমকাল।..ওখান থেকে আসতে ওর তো মাত্র মিনিট দশেক লাগবার কথা। এতক্ষণ কী করছিল সে? ব্যাটাকে এক্ষুনি ডাকছি। সব ষড়যন্ত্র। বুঝলেন? সঞ্জয় ওকে নির্ঘাত ঘুষ খাইয়েছে।

হ্যাঁ, ডাকুন। কিন্তু আপনি কি খবর পেয়ে কোন ফোন করেছিলেন?

শ্রীবাস্তব উত্তেজিত মুখে বলল, কী বলছেন মশায়! আমি এখানকার সবকিছুর দায়িত্বে আর আমি চুপচাপ বসে থাকব? প্রথমে ফাঁড়িতে ফোন করলাম। জবাব এল-কোথায় কী অ্যাকসিডেন্ট হয়েছে–সেখানে গেছেন ওদের অফিসার। আমি বললাম, স্কি ট্রেনিং কি? ওরা বলল, তাই হবে। তখন ভাবলাম, কোন স্কিয়ার আগেই বুদ্ধি করে খবর দিয়েছে। তার দোষ কী? ভাবলাম–হঠাৎ ললিতা খুন হয়েছে, এ বিশ্বাস করা তো কারো পক্ষে শক্ত। আমিও তো বিশ্বাস করতে পারছিলাম না!

ললিতার বাবা-মায়ের কাছে কোন খবর দিয়েছেন?

নিশ্চয়। তক্ষুনি ট্রাঙ্ককল বুক করেছি। এখনও লাইন পাইনি। দুগালকেও খবর দিতে হবে। এসবের জন্যেই তো ফোনের কাছে বসে থাকতে হয়েছে। আমাকে। আমার ললিতা খুন হয়েছে আর আমি এমনি বসে থাকব? কী বলছেন!

আপনি লিফটম্যানকে একবার ডাকবেন?

ডাকছি। শ্রীবাস্তব হঠাৎ ভুরু কুঁচকে বলল, কিন্তু আপনি–মানে আপনার এত ব্যস্ত হবার বা খোঁজ-খবর করার কারণ আমি বুঝতে পারছি না মিঃ চাউড্রি। আপনি কে? একজন স্কিয়ার বলেই তো জানি আপনাকে। আপনি কি কোন। ডিটেকটিভ অফিসার?

ধ্রুব একটু ঘাবড়ে গেল। সেও তো ঠিক। সে কে? সে একটু কেশে বলল, আমি ফোরেনসিক ব্যাপারে কিছু বুঝি। দিল্লী বিশ্ববিদ্যালয়ে ও-বিষয়ে একজন লেকচারার। তাই আমার এত কৌতূহল, মিঃ শ্রীবাস্তব। তাছাড়া ললিতা আপনার বাগদত্তা স্ত্রী শুনলাম। এ অবস্থায় যদি আমি কোন সাহায্য করতে পারি আপনাকে আপনার কি সেটা অবাঞ্ছিত হবে?

শ্রীবাস্তব আক্ষেপে মাথা দোলাল।..কিন্তু ললিতা মারা গেছে। আর তো তাকে আমি পাব না মিঃ চাউড্রি। ইচ্ছে করছে, সব ফেলে কোথাও একলা গিয়ে চুপচাপ শুয়ে থাকি। অথচ দুগাল আমাকে এইসব দায়িত্ব দিয়ে গেছেন! সে একটু থেমে ফের বলে উঠল, কিন্তু আপনি কী ফোরেনসিক তদন্ত করতে চান? বুঝিয়ে বলবেন একটু?

বলব। এখন প্লিজ একবার লিফটম্যানকে ডাকুন।

গুলাব সিং ফোনে কার সঙ্গে এতক্ষণ চাপাস্বরে কথা বলছিল। এবার ফোন রেখে সে হাত তুলল, সবুর, সবুর! সদর থানা থেকে অফিসাররা আসছেন। তারা কাকেও কিছু জিগ্যেস করার আগে আমি আপনাকে এ ব্যাপারে আর এগোতে নিষেধ করছি মিঃ চাউড্রি। হা-অফিসিয়ালি। প্লিজ, আপনি নিজের ঘরে যান। মিঃ শ্রীবাস্তবের সঙ্গে আমার কিছু কথা আছে।

গম্ভীর হয়ে তক্ষুনি বেরিয়ে এল ধ্রুব। বেশ অপমানিত বোধ করছিল সে। তাই এবার ভাবল, মরুক গে। তার এতে নাক গলিয়ে লাভ নেই। সোনালি বেচারার দুটোর কী অবস্থা এখন কে জানে? আর কর্নেল ভদ্রলোকই বা কোথায় গেলেন? সোনালির কাছে ডাক্তার এল কি না দেখা দরকার। তবু যাবার সময় একবার সে কর্নেলের দরজা হয়ে গেল। বাইরে থেকে বন্ধ–উনি নেই। স্কি করতে তো যাননি–এ বয়সে ওঁর পক্ষে তা সম্ভব নয়। নাকি এখনও সোনালির ঘরেই বসে আছেন?

হঠাৎ সেই সময় ধ্রুবর মনে পড়ে গেল, কর্নেল নীলাদ্রী সরকার একজন প্রখ্যাত প্রাইভেট গোয়েন্দা। কী আশ্চর্য! এতক্ষণ কথাটা একটুও মনে ছিল না তার! অতোবড়ো একটা সূর্যের মতো প্রতিভা এখানে বর্তমান থাকতে সে কিনা একটা খুদে পিদিম হয়ে গোয়েন্দাগিরি করতে মেতে উঠেছিল।

সিঁড়িতে হনহন করে উঠতে থাকল সে। মনে পড়ে গেল, কাল রাতে খাটিয়া ওঠানোর সময় ললিতা নিচের ঘর থেকে বেরিয়ে তাকে সাহায্য করেছিল। একবার থেমে সে একটু ঝুঁকে নিচের তলায় ললিতার ঘরটা দেখে নিল। আরে! ললিতার ঘরের ওপরই তো ধ্রুবদের সেই আট নম্বর অব্যবহৃত হিমঘরটা!

ধ্রুব দরজায় নক করল। সোনালি দরজা খুলে দিল। ধ্রুব অবাক হয়ে দেখল, সোনালি দিব্যি হেঁটে বেড়াচ্ছে। পা সেরে গেছে। আর কর্নেল ইজিচেয়ারে চুপচাপ গড়িয়ে পাইপ টানছেন। ধ্রুব খুশি হয়ে বলল, তোমার পা সেরে গেছে?

সোনালি কর্নেলকে দেখিয়ে বলল, আমার মোস্ট বিলাভেড অ্যান্ড ওয়ান্ডারফুল মামা থাকতে আমার ভাবনা? ও মামা, বলুন না ওকে কীভাবে আপনি আমার মামা হলেন?

কর্নেল হাসলেন।… ধ্রুব, সোনালির মা জয়ন্তী আমার মাসতুতো বোন বেবীর সহপাঠিনী ছিলেন লেডি ব্র্যাবোর্ন কলেজে। বেবী এখন ক্যানাডায়।

সোনালি বলল, শোন–আট নম্বরে সেন্ট্রাল হিটারটা ঠিক হয়ে গেছে। মামার কীর্তি।

সে কী! আপনি সেরে দিলেন, কর্নেল? ধ্রুব প্রশ্ন করল।

কর্নেল বললেন, দ্যাটস এ ফানি থিং, ধ্রুব। ওসব ইলেকট্রিকাল ডিভাইস আমি ভয়ে অবশ্য ছুঁইনে। তবে কী জানেনা, এ ব্যাপারটা খুব সহজেই করা গেল। ওপরের দেয়ালে যে ফিউজ বক্সটা আছে, সেটা খুলে দেখি–একটা তার ছেঁড়া। জুড়ে দিতেই সব ঠিক হয়ে গেল।

আশ্চর্য তো!

হ্যাঁ–আশ্চর্য। ওটার কথা মিস্ত্রিরা হয়তো ভাবেইনি। অবশ্য যদি সত্যি, মিস্ত্রি দেখানো হয়ে থাকে।

কেন? বলছিলেন যে শ্রীবাস্তব মিস্ত্রি নিয়ে ছোটাছুটি করছিল গতকাল।

সে তো শ্রীবাস্তবের ভাষ্য। যাক গে, শোন–দ্বিতীয় আশ্চর্য হলো, তোমার আট নম্বর রুমের কোনার দিকে মেঝেয় একটা ফুটো আবিষ্কার করলুম। এক ইঞ্চি। ওখানে চোখ দিলে নিচের ঘরের একটা অংশ পরিষ্কার দেখা যায়– মানে, বিছানাটা। এবং এই ফুটোটা খুব টাটকা ধারালো কিছু দিয়ে করা হয়েছে।  

কনেল, কর্নেল! ধ্রুব উত্তেজিতভাবে চাপা গলায় বলে উঠল। নিচের ওঘরে ললিতা টোডমল থাকত। ললিতা টোডমল খুন হয়ে গেল আজ সকালে। নিশ্চয় সব শুনেছেন ইতিমধ্যে।

কর্নেল হাত তুলে বললেন, সোনালির সঙ্গে সেই নিয়েই এতক্ষণ কথা বলছিলাম। খবর আমরা শের সিং-এর কাছে তক্ষুনি পেয়েছিলাম। তারপর সোনালিকে নিয়ে বেরিয়ে নিচেটা ঘুরেও এসেছি। খোঁজখবরও করেছি। অকুস্থলে যাইনি–কারণ, আমি যেতে পারলেও আমার প্রিয় ভাগ্নীটির পক্ষে সেটা উচিত হত না। সবে তো হাঁটিহাঁটি পা অবস্থা ওর।..কর্নেল হেসে উঠলেন।

সোনালি বলল, ডাইনিং হলের কী অবস্থা? খিদে পেয়েছে কিন্তু। আমরা তোমার জন্যেই অপেক্ষা করছিলাম। মামাকে বলছিলাম, খুন পেয়েই তো ওর এখন লোভে জিভ লকলক করে উঠেছে! ঝাঁপিয়ে পড়েছে তক্ষুনি।

ধ্রুব গম্ভীর স্বরে বলল, আমি জীব বিশেষ নই যে জিভ লকলক করবে।

কর্নেল উঠে দাঁড়ালেন।..ঝগড়াঝাটি পরে হবে কিডিজ! চলো–দেখি ডাইনিং হল কী বলছে।

রিস্তা দু নম্বর ক্যাম্প থেকে পুলিস অফিসাররা এসে পড়েছেন ততক্ষণে। সঙ্গে এসেছে ছোটখাটো একটা বাহিনী। খুব ধুমধামের মধ্যে তারা তদন্ত শুরু করেছেন–দাপটের চোটে সবাই ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেছে। ডাইনিং হলে বসে একে একে প্রত্যেককে ডেকে জিগ্যেস-পত্তর জেরা ইত্যাদি চলেছে। প্রথমেই অবশ্য ডাক পড়েছিল ধ্রুব চৌধুরীর–কারণ সেই ব্যাপারটা প্রথমে আবিষ্কার করে।

প্রথম অফিসারটি তাকে শাসাতে শুরু করেছিলেন গোড়ার দিকে কেন সে চেয়ার থেকে মিস টোডমলকে অমনভাবে টেনে ফেলে দিয়েছিল? এমনও তো হতে পারে যে ধ্রুব চাউড্রিই ললিতার বুকে পোলটা বিঁধিয়ে দিয়েছে। পারিপার্শ্বিক সাক্ষ্য ও অবস্থাদৃষ্টে এ সন্দেহ খুব স্বাভাবিক এবং সঙ্গতভাবেই ওঠে। সুতরাং তাকে ছেড়ে দেওয়া যায় না।

কিন্তু সৌভাগ্যক্রমে দ্বিতীয় অফিসার মিঃ ইউসুফ তেঙ ধ্রুবকে চেনেন। ফোরেনসিক ট্রেনিং সূত্রেই এই আলাপ। একসময় ভদ্রলোক দিল্লিতে ছিলেন। তাই ধ্রুব জোর বেঁচে গেল আপাতত।

বেঁচে গেল। কিন্তু একটা শর্তে। পুলিসের বিনা অনুমতিতে সে এই সেন্টার ছেড়ে যেতে পারবে না–অন্তত যতক্ষণ বা যতদিন না প্রকৃত খুনীকে পুলিস উপযুক্ত প্রমাণসহ আবিষ্কার করতে পারে।

সোনালি সব শুনে বলল, বাঃ, চমৎকার! নাক গলিয়ে যেখানে-সেখানে গোয়েন্দাগিরির ফলটা এবার হাতেনাতে পেয়ে যাবে।

ধ্রুব গম্ভীর হয়ে রইল। বিকেলে আবহাওয়া প্রকৃতির খামখেয়ালিতে আজ মোটামুটি ভালই বলতে হবে। বরফ সামান্য পড়ছে। কিন্তু ঝড়োহাওয়াটা নেই। মাঝে মাঝেই ক্ষীণ পাতলা কিছু রোদ বেরিয়ে পড়ছে। ঝকঝকে সাদা তুষারের ওপর অজস্র রঙের ছটা ফুটছে। খালি চোখে তাকালে চোখের ক্ষতির সম্ভাবনা আছে।

করিডরের শেষপ্রান্তে কাচের বিশাল জানলার পাশে কর্নেল দাঁড়িয়ে ছিলেন। এরা কাছে গেলে ঘুরে যেন আপনমনে অস্ফুট বলে উঠলেন, আঃ, বোকা সঞ্জয় ওয়াড়েকার।

সোনালি বলল, সঞ্জয় ওয়াড়েকারের বোকামির কী হল মামা? দিব্যি তো সে খুন করে কেটে পড়েছে!

কর্নেল বললেন, হ্যাঁ–কেটে নিশ্চয় পড়েছে। তবে—

 ধ্রুব বলল, তবে কী কর্নেল?

 বোকা, বড্ড বোকা। কর্নেল বললেন।

সোনালি বলল, হ্যাঁ মামা–ঠিকই বলেছেন। পুলিস তো ওর জন্যে ওদিকে কারগিল, আরদিকে সোনামার্গ থেকে শ্রীনগর অব্দি রেডিওতে জানিয়ে দিয়েছে। পথেই ধরা পড়ে যাবে। গাড়ি-ফাড়ি নিয়ে গেছে। কাজেই লুকোবার স্কোপ নেই।

কর্নেল বললেন, ইয়ে ধ্রুব–লিটম্যানের সঙ্গে একটু আগে আমার কথা হচ্ছিল। খুব কায়দা করে ওকে জিগ্যেস করলুম যে চাউড্রিসায়েব তোমাকে খবর দিতে বলেছিলেন শ্রীবাস্তবের কাছে, তা তুমি বাপু অত দেরি করলে কেন? ও বলল—

 ধ্রুব রুদ্ধশ্বাসে প্রশ্ন করল, কী বলল, কী বলল?

কর্নেল জবাব দিতে যাচ্ছিলেন, সেই সময় শের সিং দৌড়ে এল।…কর্নেলসায়েব, কর্নেলসায়েব! খুব খারাপ খবর, ভীষণ খারাপ। আর করিডরের অন্যদিকে স্কিয়ার, লিফটম্যান, আরও কিছু লোক বেরিয়ে উত্তেজিত মুখে জটলা করতে থাকল।

কর্নেল বললেন, শের সিং, সঞ্জয় ওয়াড়েকার..

জী সাহাব, সঞ্জয় ওয়াড়েকার খুন হয়ে পড়ে আছেন গাড়ির মধ্যে।…শের সিং উত্তেজিতভাবে বলল।..এইমাত্র সাত মাইল দূরে টোগড়ি থেকে ফোন এসেছে।

একটু পরেই সব পুরোপুরি জানা গেল।

এখান থেকে সাত মাইল দূরে টোগড়ি নামে একটা ছোট্ট বসতি আছে। বসতি নিচ দিয়ে রাস্তা গেছে এঁকেবেঁকে। আরও নিচে জঙ্গল। রাস্তা থেকে গাড়িটা মুখ ঘুরিয়ে দশফুট নিচে কিছু গাছের গুঁড়িতে আটকে রয়েছে। গাছগুলো না থাকলে তলিয়ে যেত নিচে খাদে। আর সেই গাড়ির ভিতরে সঞ্জয় ওয়াড়েকার অবিকল সেই ললিতার মতো বুকে পোল-বিদ্ধ অবস্থায় মরে পড়ে রয়েছে। এক ভেড়াওয়ালা এটা আবিষ্কার করে। এবং তক্ষুনি স্থানীয় ফাড়িতে খবর দেয়। ফাঁড়ি থেকে সঙ্গে সঙ্গে ফোনে জানিয়ে দিয়েছে এখানে।

একটা লক্ষ্য করার ব্যাপার–সঞ্জয়ের গাড়িটা ষাটসত্তর গজ পথ স্বাভাবিকভাবে যায়নি, চাকার দাগ দেখে বোঝা যায়। ভীষণ যেন ধস্তাধস্তি করে এগিয়েছে। বরফ সেখানে প্রায় একফুট পুরু। কিন্তু সম্ভবত সেকারণে গাড়ির গতি অমন হয়নি–সঞ্জয় নিজেই ড্রাইভ করছিল। তার সঙ্গে নির্ঘাত খুনীর যোঝাযুঝি হয়েছিল প্রচণ্ড।

.

০৩.

রাত তখন বারোটা। সোনালি আজ প্রচুর ওমসমন্বিত আট নম্বরে আরামে শুয়েছে। ধ্রুব নম্বরে। কর্নেল সেই যে বিকেলে পুলিসভ্যানে অফিসারদের সঙ্গে টোগাড়ি চলে গেলেন সঞ্জয়ের মড়া দেখতে, রাত দশটা ত্রিশ অব্দি তাঁকে ফিরতে দেখা যায়নি। কী অদ্ভুত মানুষ! আর এ বয়সেও তার শরীরকে বাহাদুরি দিতে হয়। ভীষণ ঠাণ্ডায় বরফের মধ্যে এখনও ঘোরাঘুরি করতে যেন একটুও কষ্ট হয় না।

 ওপরে ও নিচে করিডরে কড়া পুলিস পাহারা আছে। সদর দরজাতেও রয়েছে। বিনা হুকুমে কারও বেরোবার সাধ্য নেই। আর বেরোবেই বা কোথায়? গত রাতে জুতোর খটাখট আর হইচইতে ঘুমোনো কঠিন ছিল। আজ সব নিঃঝুম।

কিন্তু ধ্রুব অস্থির। তাকে একবার বেরোতেই হবে। করিডর দিয়ে যাওয়া, অসম্ভব। আলো আর পুলিস আছে। সে দাঁত কামড়ে ধরে ভাবছিল। সেই পাহাড়ের চুড়োটা তাকে তীব্রভাবে আকর্ষণ করেছে।

খাটের তলা থেকে বরফের পাহাড়ে চড়ার জন্যে বিশেষভাবে তৈরি জুতো বের করল, সে। টাইট একটা চামড়ার পোশাক পরে নিল। পা থেকে মাথা অব্দি। সুরক্ষিত করে একটা ছোট্ট টর্চও নিল। তারপর জানলার কাছে গেল। গরাদবিহীন জানলা সাবধানে খুলে ফেলতেই তীব্র ঠাণ্ডা একঝলক হাওয়া বরফের গুঁড়িসুদ্ধ, তার গায়ে মুখে এসে ধাক্কা দিল। কিন্তু ধ্রুবর মাথায় যখন ঝোঁক চাপে, তখন। কিছুই গ্রাহ্য করে না। এ তার চরিত্রগত ব্যাপার। এরজন্যে অনেকবার তাকে। বিপদে পড়তে হয়েছে। ভাগ্যের জোরে এবং কিছুটা বুদ্ধিচাতুর্যে বেঁচেও গেছে।

জানলার একমিটার দূরে একটা পাইপ আছে দেখেছিল। নিঃশব্দে সে জানলা গলিয়ে সেই পাইপটা ধরল। তারপর জানলার কপাট দুটো বাইরে থেকে ঠেলে বন্ধ করে দিল। পাইপ বেয়ে অদ্ভুত দক্ষতায় নিচে নামল।

এটা বাড়ির পিছনদিক। অজস্র পাতাঝরা গাছের জঙ্গল আছে। সে জঙ্গল পেরিয়ে অনেক কষ্টে পাহাড়টার পশ্চিম সীমানায় পৌঁছল। এদিকে পাহাড়টা খাঁজকাটা। বড় বড় পাথরের ওপর বরফ জমে রয়েছে। উঠতে অসুবিধে হলো না। কিন্তু এবার সামনে বিপদ। পাহাড়টা পুব-পশ্চিমে লম্বা। এখান থেকে তাকে পুবে এগোতে হবে। একটু গেলেই লিফটের কাছে পৌঁছতে পারবে। কিন্তু ডাইনে–অর্থাৎ দক্ষিণদিকে সামান্য তফাতে স্কিয়ার-গার্ডদের সেই গুমটি ঘরে গুলাব সিং-এর সেন্ট্রিরা বন্দুক তাগ করে আছে। একটা ভরসার কথা যে অন্ধকার। আছে। তবে বরফের রাজ্যে অন্ধকার অনেকটা রঙ হারিয়ে স্বচ্ছ হয়ে ওঠে।

হামাগুড়ি দিয়ে এগোল ধ্রুব। লিফটের চাকার কেন্দ্রটা পাহাড়ের উত্তরে। ঢালু গায়ে রয়েছে। ধ্রুব যখন মাথা তুলল, দেখল আবছাভাবে একটা চেয়ার ঝুলে আছে শূন্যে। সে এবার বুকে হেঁটে বাঁদিকে ঢালু গায়ে নামতে থাকল। কিছুটা নেমেই সোজা হয়ে বসল। আর কোন ভয় নেই। সেন্ট্রিরা পাহাড়ের ওপারে। সামনে কিছুদূরে হোটেল ও ট্রেনিং সেন্টারের আলো দেখা যাচ্ছে। সে নির্ভয়ে নিচে টর্চ জ্বালল। কী সর্বনাশ! ব্যাটারি ফুরিয়ে গেছে নাকি? মাত্র কয়েক বর্গফুট পরিধিতে ক্ষীণ লালচে ছটা পড়ল। নতুন ব্যাটারি ভরে আনা উচিত ছিল। সে কুঁজো হয়ে হুইল চেয়ার চলার পথ বরাবর ওই সামান্য আলোর সাহায্যে খুঁজতে আরম্ভ করল। কিন্তু ক্রমশ ঠাণ্ডায় তার শরীর জমে যাচ্ছে। পোশাক বরফগুড়িতে ভারি হয়ে উঠেছে। বার বার বিশ্রাম নিতে হচ্ছে তাকে। বরফ ঝেড়ে ফেলতে হচ্ছে। খোলা মুখটা নির্ঘাত নীল হয়ে যাচ্ছে আস্তে আস্তে। দাঁত ঠকঠক করে কাঁপছে।

বার বার এই আড়াই-তিনশো ফুট পাহাড়ী ঢাল বেয়ে ওঠানামা করা তার পক্ষে অসম্ভব। তাছাড়া যে জিনিসটা খুঁজতে বেরিয়েছে, তা সারাদিনের বরফে নিশ্চয় তলিয়ে গেছে কোথাও। এবার তার মনে হলো, কী কাজে লাগবে ওই ছোট্ট জিনিসটা?

নিজের বোকামিতে নিজের ওপর রাগ হলো তার। এই হঠকারী অভিযানের কোন মানে হয় না। এই জিনিসটা থেকে সে সত্যি কি কোন সূত্র পাবে আশা করেছিল?

কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে সে এবার পালাক্রমে ডাইনে আর বাঁয়ে খুঁজতে থাকল। নিছক চোখ বুলিয়ে নয় বরফ আঁকড়ে বরফ সরিয়ে আবিষ্কার করতে চাইল জিনিসটা। আবার দাঁড়াল। উড়ন্ত গতিশীল চেয়ার থেকে কোন জিনিস পড়লে–সে জিনিসটা খুব ভারি ছিল না কতদূরে ছিটকে পড়তে পারে? পা বাড়াল আবার। বরফের ওপর একটুকরো রবারের মতো কালো কী পড়ে রয়েছে। ঝাঁপিয়ে পড়ল সে। হা–এটা সেই জিনিসটার একটা অংশ। তাহলে কাছাকাছি কোথাও নিশ্চয় আছে। চারপাশে দ্রুত হাতড়ে এবং বরফ সরিয়ে সে ক্লান্ত হয়ে পড়ল। ফের বিশ্রাম নিয়ে আবার বরফ সরাতেই একটা অস্পষ্ট শব্দ শুনতে পেল। অমনি হামাগুড়ি দিয়ে বসল ধ্রুব। আলো নেভাল তক্ষুনি। কিন্তু আর তেমন সন্দেহজনক কোন শব্দ নেই। পুবদিকে কিছু তফাতে পাইনের জঙ্গলে ঝোড়ো হাওয়া উঠেছে সদ্য। গাছ থেকে বরফ পড়ার শব্দেই হয়তো ঢেকে গেছে সেই শব্দটা।

কিন্তু আর এখানে থাকা অসম্ভব। ঠাণ্ডায় আড়ষ্ট হয়ে গেছে সারা শরীর। হি হি কাঁপুনি শুরু হয়েছে। মরিয়া হয়ে আরেকবার শেষ চেষ্টার মতো হাত বাড়িয়ে বরফ সরাতেই সে লাফিয়ে উঠল। ইউরেকা! পাওয়া গেছে। পাওয়া যেতই। সে তুলে ধরল জিনিসটা। একটা জুতোর চেয়ে কিছু বড়ো–স্কি পোলের ডগায় লাগানো থাকে যা–সেই বাস্কেট। এটাই স্কি-পোল থেকে খুনী খুলে পোলটা বিঁধিয়ে দিয়েছিল ললিতার বুকে।

বাস্কেটটা ধরে পরমুহূর্তে নিরাশ হলো ধ্রুব। পাওয়া তো গেল কিন্তু কী কাজ হবে এ দিয়ে–তা তো জানা নেই। ভ্যাট, মিছিমিছি এর জন্যে এত প্রচণ্ড কষ্ট করার কোন মানে হয় না! টর্চ নিবিয়ে ফেলল সে।

আচমকা তার বাস্কেট ধরা হাতের ওপর হাতুড়ির মতো কী পড়ল। যন্ত্রণায় অস্ফুট চেঁচিয়ে উঠল সে। পরক্ষণে ফের তাকে কে ধাক্কা মারল। বাস্কেটটা ছিটকে পড়েছিল। ধ্রুব মুহূর্তে ব্যাপারটা টের পেয়ে গেল। সে সামনে ঝাঁপিয়ে পড়ল এবং কার সঙ্গে অনিবার্যভাবে ধস্তাধস্তি শুরু হয়ে গেল।

লোকটা তার চেয়ে শক্তিমান সন্দেহ নেই। প্রচণ্ড ধাক্কায় তাকে ছিটকে ফেলে দিতেই ধ্রুব গড়িয়ে অনেকটা নিচে পড়ে গেল।

উঠে ঝোঁক সামলে সে ওপরে তাকাল। কিছু দেখা যায় না। আবছা শব্দ হচ্ছে বরফের ওপর দৌড়ে যাওয়ার। টর্চটা কোথায় পড়ে গেছে কে জানে। রাগে ক্ষোভে ধ্রুব মরিয়া হয়ে শব্দ লক্ষ্য করে দৌড়তে চেষ্টা করল।

শব্দটা পুবদিকে। তাহলে আততায়ী জঙ্গলের দিকে পালাচ্ছে। একটু সমতল জায়গায় পৌঁছনোমাত্র ধ্রুব যেই দৌড়তে গেছে, অমনি কার গায়ের ওপর পড়ল। সে তক্ষুনি তাকে দুহাতে জাপটে ধরল। লোকটা বরফে পড়ে তাকে ধাক্কা দেবার চেষ্টা করছিল দুপায়ের সাহায্যে। ধ্রুব তার একটা পা দুমড়ে দিতেই সে বলে উঠল–বাই জোভ! ধ্রুব, ধ্রুব, করছ কী?

কর্নেল! ধ্রুব বিস্ময়ে হতবাক।

কর্নেল উঠে দাঁড়িয়ে পোশাক থেকে বরফ ঝেড়ে চাপা গলায় বললেন, বাস্কেটটা পেয়েছ?

পেয়েছিলাম। বেহাত হয়ে গেল।

সে কী!

হ্যাঁ–আমার একটা হাত জখম করে দিয়েছে মনে হচ্ছে।

 চলো। ফেরা যাক।

দুজনে ঢালু বেয়ে আস্তে আস্তে নামতে থাকল। একজায়গায় দাঁড়িয়ে কর্নেল বললেন, হুম! পথ ভুল হয়ে যাচ্ছে। দাঁড়াও, এখানে একটা ভালো রাস্তা আছে। জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে অনেকটা ঘুরে যেতে হবে। পাহাড়ের এদিকটা আস্তে আস্তে নেমে গেছে–চলতে অসুবিধে হবে না।

ধ্রুব বলল, আপনি টর্চ আনেননি?

কর্নেল বললেন, মাই গুডনেস! টর্চটা তোমার সঙ্গে ধস্তাধস্তির সময়ে পড়ে গেছে। যাক্ গে, আর দেরি করা ঠিক হবে না।

ট্রেনিং সেন্টারের কাছাকাছি এসে ধ্রুব বলল, কিন্তু এবার ঢুকবেন কী করে?

তুমি কি জানলা গলিয়ে পাইপ বেয়ে নেমেছিলে?

আজ্ঞে হ্যাঁ। আপনি?

আমিও তাই। তবে আমার ঘর তো নিচে।

তাহলে সেইভাবে ঘরে পৌঁছতে হবে। ধ্রুব একটু হাসল।

বাস্কেটটা পেলে ভালো হত। ওর তলায় নাম্বার লেখা থাকে। ওই নাম্বারের স্কিপোল কার নামে ইস্যু হয়েছে খাতাপত্র থেকে জানা যেত। তাছাড়া দুটো স্কিপোলে একই নাম্বার এঁটে একজন স্কিয়ারকে দেওয়া হয়। এই একই নাম্বার তার একজোড়া স্কিবুট আর একজোড়া স্কিতেও থাকে। তুমি তো একজন স্কিয়ার–তোমার নাম্বার কত?

ধ্রুব বলল বারো।

তোমার স্কি-বুট, স্কি-পোল–প্রত্যেকটার গায়ে বারো খোদাই করা আছে দেখনি?

দেখেছি। আচ্ছা কর্নেল, আপনি তো সঞ্জয়ের লাশ দেখতে গিয়েছিলেন। ওর বুকেও তো স্কি-পোল বিঁধিয়ে খুন করা হয়েছে। ওটার বাস্কেট পাননি?

খুব খোঁজা হয়েছে–পাইনি। পুলিস অবশ্য এখনও এ ব্যাপারটা ভাবেনি। আমি ওদের তাক লাগাতে চাই–তাই কিছু বলিনি।

তাহলে খুনী ওটা সামলে ছিল। এটার বেলায় পারেনি।

তুমি ভীষণ কাঁপছ। চুপ করো।…

.

পরদিন সকালে দেখা গেল আবহাওয়া প্রচণ্ডভাবে আয়ত্তের বাইরে চলেছে। যাকে রিজার্ভ বলে, তাই। এই মারাত্মক তুষারঝড়ে বাইরে যাবার সাধ্য কারও নেই। এমন কি লন পেরিয়ে গ্যারেজ বা স্টোর রুমে যাওয়াটাও বেশ বিপজ্জনক। উত্তাপ জিরো পয়েন্টের নিচে দশডিগ্রি নেমে গেছে। ঘন তুষারে ছেয়ে যাচ্ছে সবকিছু।

পুলিস অফিসার ইউসুফ তে কাশ্মীরি মুসলমান। কর্নেলের সঙ্গে তাঁর খুব জমে গেছে। শের সিং এ খবর জানাল ধ্রুবকে। শের সিং কর্নেলের অনুগত কাজেই আগের রাতের সেই নির্বিকার ভাবটা আর তার মধ্যে লক্ষ্য করা যাচ্ছিল না। বরং এমন ভাব দেখাচ্ছে যেন সোনালি আর ধ্রুবকর্নেলের দুটি স্নেহধন্য আত্মীয়ের সেবা করতে পারলে তার জীবন ধন্য হবে।

শের সিং যেচে দুটো ব্রেকফাস্ট বয়ে আনল নিচে থেকে। ডিম ভেজিটেবল রোল, দুপট কফি। ধ্রুবর ডানহাতে ব্যথা–শরীরও প্রায় ধরাশায়ী গত রাতের যুদ্ধে। সে কোনক্রমে বাথরুম থেকে ফিরে শুয়েছিল। সোনালি তার খাটের সামনে চেয়ারে বসে কফি টেবিলে ব্রেকফাস্ট সাজাল। কিছু আপেলও কাটল নিজেদের স্টক থেকে। শের সিংকে ধ্রুব অপেক্ষা করতে বলেছে, তাই সে সোজা অ্যাটেনশান দাঁড়িয়ে আছে।

ধ্রুব বলল, তাহলে কর্নেলের ঘরে পুলিস অফিসারকে দেখে এলে, শের সিং! কিন্তু তোমাদের গুলাব সিং কী করছেন?

শের সিং হাসল।…গুলাব সিং মনমরা হয়ে বসে আছেন ডাইনিং হলে।

মনমরা কেন?

 ওয়েদার খারাপ হয়ে গেল। হয়তো তাই।

 লাশদুটো এতক্ষণ নিশ্চয় শ্রীনগরে পৌঁছে গেছে! তাই না শের সিং?

 হারাতেই পৌঁছে যাবার কথা। এদিকে ওয়েদার খারাপ হয়ে গেল। ওখান থেকে আরও পুলিস অফিসার আসবেন। তদন্তও খুব জব্বর হবে। যতক্ষণ না ফয়সালা হয়, ততক্ষণ তো গুলাব সিং-এর ছুটি নেই।…শের সিং হাসতে লাগল।

আচ্ছা শের সিং, তুমি কোম্পানিতে কতদিন আছো?

জি, তিনবছর হবে প্রায়। দুগাল সায়েবের একটা ফার্ম আছে দিল্লীতে আমি সেখানেই কাজ করতাম। স্কি ট্রেনিং সেন্টার খোলার গোড়া থেকেই আমি আছি।

শ্রীবাস্তব কি এ বছর নতুন?

না স্যার। শ্রীবাস্তবজিও গোড়া থেকে আছেন।

 মিস ললিতাও কি গোড়া থেকে ছিলেন এখানে?

ললিতাজি গতবছর প্রথম আসেন।

শ্রীবাস্তবজির সঙ্গে ললিতাজির আগে থেকে চেনাজানা ছিল নাকি?

 জি হ্যাঁ। উনিই ললিতাকে আনেন এখানে।

শের সিং, তুমি তো খুব বুদ্ধিমান লোক…

না স্যার, আমার মাথায় কিছু নেই বড় সায়েব দুগালজি বলেন।

আচ্ছা শের সিং, সঞ্জয় ওয়াড়েকার এবার নতুন এসেছিল, নাকি আগেও এসেছে? কবে প্রথম আসে সে?

এবারই নতুন ট্রেনি হয়ে আসে।

শের সিং, তুমি তো এখানকার অনেক খবর রাখো। ললিতাজির সঙ্গে– তোমার মতে কার মেলামেশা বেশি ছিল? শ্রীবাস্তব, না সঞ্জয়ের?

ললিতাজি খুব দিলখোলা মেয়ে ছিলেন স্যার। সবার সঙ্গেই যেচে পড়ে মিশতেন। আমরা জানতাম, শ্রীবাস্তব সায়েবের সঙ্গে ওঁর বিয়ে হবে। কিন্তু শেষের দিকে উনি সঞ্জয়জির সঙ্গে বেশি মেলামেশা শুরু করেন।

তার জন্যে নিশ্চয় তিনজনের মধ্যে মনকষাকষি কিছু হয়ে থাকবে?

শের সিং একটু চুপ করে থেকে বলল, আপনাকে বলা যায়–আপনি এদের মধ্যে সবচেয়ে ভদ্র মানুষ, স্যার। ট্রেনিং ক্যাম্পের সব কটা মানুষ বেলেল্লা–শরাব খায়, মস্তানি করে সারারাত। কেবল আপনি আর এই দিদিজি বাদে।

সোনালি বলল, আমরাও কম নই শের সিং।

শের সিং সেলাম করে জিভ কেটে বলল, কক্ষনো না দিদিজি। আমি মানুষ দেখলেই চিনতে পারি।

ধ্রুব বলল, তা শের সিং, ওদের মধ্যে নিশ্চয় মনকষাকষি হয়েছিল?

খুব হয়েছিল। শ্রীবাস্তবজি সঞ্জয়জিকে কদিন থেকে শাসাচ্ছিলেন। ললিতাজি বাধা না দিলে তো ভীষণ মারামারি হয়ে যেত দুজনে। ললিতাজি দুজনের কাঁধ ধরে নিজের নিজের ঘরে ঢুকিয়ে দিয়েছিলেন। তবে স্যার, সঞ্জয়কে শ্রীবাস্তব কাবু করতে পারতেন না। কারণ মানুষের আসল জোর তো পায়ে। পা যার জখম, সে লড়বে কীভাবে?

ওর পা কবে জখম হলো? কীভাবে?

সে এক ভয়ানক অ্যাকসিডেন্ট, স্যার। দিন সাতেক আগে লিটচেয়ার থেকে উনি বেমক্কা পড়ে যান। পাহাড়ের ওপিঠে না পড়লে পা জখম হত না হয়তো-ওপিঠ তো বেশ ঢালু করা আছে স্কি করার জন্যে। ওঠবার মুখেই পড়ে যান একদিকে কাত হয়ে। পায়ে স্কি পরা ছিল যথারীতি। এত জোরে পড়েন যে ডানস্কিটা ভেঙে যায়। কিন্তু ভাগ্য ভালো যে পায়ের হাড় মচকে যায়। ডাক্তার এলেন। তখন ওয়েদার বেশ ভালো ছিল। ডাক্তার বললেন, অন্তত মাসখানেক লাগবে সেরে যেতে। ব্যান্ডেজ বেঁধে দিলেন। চলাফেরা করতে নিষেধ করলেন। কিন্তু শ্রীবাস্তবজি খুব গোঁয়ার আর চঞ্চল মানুষ। অগত্যা পরে ক্রাচের ব্যবস্থা হলো। উনি কিছুতেই একজায়গায় বসে থাকতে রাজি নন। ক্রাচ নিয়ে হরদম হাঁটাহাঁটি করেন।

ওঁর ভাঙা স্কিটা ফেলে দিয়েছিলে তোমরা নাকি…

শের সিং একটু অবাক হয়ে বলল, কেন স্যার?

এমনি বলছি। স্কিয়ের তো বেশ দাম আছে। আর তুমিই বলেছিলে, দুগাল সায়েব খুব হিসেবী লোক। নিশ্চয় মেরামত করার চেষ্টা তিনি করেছিলেন?

তা ঠিক। দুগালজি স্কি ভাঙার জন্যে যতটা দুঃখ পেয়েছিলেন, ততটা ওঁর পা জখম হবার জন্যে নয়।..শের সিং হেসে বলল।…অথচ হিসেব করে দেখলে এই মরশুমে একজন ইনস্ট্রাক্টার অকেজো হয়ে যাবার ফলেই ক্ষতিটা বেশি। স্যার, দুগালজি একটা ঝাড়তি-পড়তি জিনিসও আবর্জনা ভাবতে রাজি নন। স্টোররুমে আপনি লেডিজ হেয়ার ক্লিপও খুঁজে পাবেন। সব কুড়িয়ে রাখা অভ্যেস আছে দুগালজির। আমাদেরও তাই হুকুম আছে। বলেন, কিছুই ফেলবার জিনিস নয়–কোন এক সময় সব কাজে লাগবে।

সোনালি বলল, আমাদের বাংলায় বলে–যাকে রাখো, সেই রাখে।

ধ্রুব বলল, তাহলে ভাঙা স্কিটা নিশ্চয় স্টোররুমে আছে?

আছে। কিন্তু… হঠাৎ শের সিং নড়ে উঠল। স্যার, এই ব্যাপারটা তো ভেবে দেখিনি। স্কি দুটো–ভাঙা ও ভালোটা রাখা হয়েছে। স্কি-বুট জোড়াও রয়েছে। কিন্তু স্কি-পোল দুটো শের সিং ভুরু কুঁচকে মেঝেয় কী খুঁজতে থাকল যেন।

ধ্রুব একটু উঠে বসল বিছানা থেকে। বলল, স্কি-পোল দুটো রাখা হয়নি?

 না স্যার। তক্ষুনি তো রাখা হয়েছিল। অ্যাকসিডেন্টের পরই। কিন্তু…

কিন্তু কী শের সিং?

স্যার গতকাল দুপুরে স্টোররুমে ঢুকে যখন স্কিয়ারদের স্কি-সেট ফেরত জমা নিচ্ছিলাম, তখন শ্রীবাস্তবজির সেটটার দিকে চোখ পড়েছিল। তখন এতটা ভাবিনি। কিন্তু স্টোর বন্ধ করার পর অনেকক্ষণ ধরে মনে কী একটা অস্বস্তি থেকে যাচ্ছিল-স্টোররুমে কী যেন অদ্ভুত খাপছাড়া লাগল, কী যেন গোলমাল আছে! তারপর ভুলে গেলাম ভাবনাটা। এইমাত্র হঠাৎ মনে পড়ে গেল স্যার, স্টোরে কী গোলমাল ছিল।

কী গোলমাল ছিল?

স্যার, শ্রীবাস্তবজির সেটের সঙ্গে স্কি-পোলদুটো ছিল না। আগের দিন ছিল–অথচ গতকাল দুপুরে ছিল না। ঠিক, ঠিক। স্কি-পোল দুটো দেখতে পাইনি।

উত্তেজনা চেপে ধ্রুব বলল, তোমার চোখের ভুল হতেও পারে।

অসম্ভব স্যার। শের সিং হন্তদন্ত হয়ে উঠল।…একমিনিট। স্টোরের চাবি আমার কাছেই থাকে। এক্ষুনি ফের দেখে এসে বলছি। সে তক্ষুনি বেরিয়ে গেল।

সোনালি বলল, উঃ কান ঝালাপালা করে দিল দুজনে। ভ্যাট, এলুম ফুর্তি করতে–এসে পড়লুম খুনখারাপি আর গোয়েন্দাদের পাল্লায়। আমি উঠি।

কোথায় যাবে?

 রিটা মবলঙ্করের সঙ্গে আড্ডা দিইগে।

 সে আবার কে?

একজন স্কিয়ার। তুমি তো সার্কাস দ্যাখো না। গ্রেট এশিয়ান সার্কাসদলের বিখ্যাত খেলোয়াড় রিটা মবলঙ্করের নামও তুমি শোননি। তাকে হঠাৎ এখানে আবিষ্কার করেছি।

একমিনিট। নামটা শোনা মনে হচ্ছে। আচ্ছা, যাকে ওয়াইল্ড গুজ– বনহংসী বলা হয়েছিল খবরের কাগজে?

আজ্ঞে হ্যাঁ–তিনিই। কোম্পানি ছেড়ে এখন ঘুরে বেড়াচ্ছেন মনে সুখে। কী স্বাস্থ্য আর সৌন্দর্য! তোমার চোখ কপালে উঠে যাবে মশাই।

কী যে বলো! আমি ছবিতে দেখেছি–এমন কিছু রূপসী নয়। তবে ইয়া হোঁকা গদার মতো দুটো পা আছে বটে। ওই গদাই লস্করী পা দিয়ে স্কি পরতে পারবেন তো?

খুব পারবেন। তুমি গোয়েন্দাগিরি করো–আমি আসছি।.বলে সোনালি দরজার কাছে গেল। দরজা খুলল।

ধ্রুব গলা চড়িয়ে বলল, যাকে ইংরেজিতে বলে–চেজিং আফটার দা ওয়াইল্ড গুজ। বুনো হাঁসের পিছনে দৌড়চ্ছো!

সোনালি একটু ঘুরে বলে গেল—তা তোমার রেড হেরিং মাছের পিছনে দৌড়নোর চেয়ে অনেক ভালো।

ধ্রুব স্কি-পোল দুটোর কথা ভাবতে থাকল। নির্ঘাত ওদুটো দিয়েই খুনী ললিতা আর সঞ্জয়কে খুন করেছে কিন্তু স্টোররুমের চাবি তো থাকে শের সিং–এর কাছে। তার অজান্তে খুনীর পক্ষে স্কি-পোল নেওয়া অসম্ভব। স্টোর রুম একটা গুদাম বিশেষ। একটি মাত্র দরজা। কোন জানলা, এমন কি ভেন্টিলেটারও নেই। অবশ্য ডুপ্লিকেট চাবি থাকতে পারে। সে চাবি কার কাছে থাকে? সম্ভবত

কিন্তু খুনীর পক্ষে কি চাবি ছাড়া তালা খোলাটা শক্ত ব্যাপার? তেমন দুর্ভেদ্য তালা পৃথিবীতে আজও কি আবিষ্কৃত হয়েছে?

বাইরে পায়ের শব্দ শোনা গেল। দরজার নক করতেই ধ্রুব বলল, এস শের সিং।

শের সিং নয় কর্নেল। ঢুকে বললেন, ব্লিজার্ড শুরু হয়েছে। কী দুর্যোগ, ভাবা যায় না। ইউসুফ সায়েব বলল–অন্তত চব্বিশ ঘণ্টা এ বরফঝড় বইবে। ইয়ে–সোনালির সঙ্গে দেখা হল নিচে। তুমি বেরোচ্ছ না?

ধ্রুব বলল, না কর্নেল। বসুন। এইমাত্র শের সিং-এর সঙ্গে শ্রীবাস্তবের স্কিসেট নিয়ে কথা হচ্ছিল। স্টোররুমের চার্জে…।

কর্নেল বসে বললেন, জানি। স্কি-পোল দুটো হারিয়ে গেছে।

 সে কী! আপনি কখন শুনলেন? কার কাছে?

কর্নেল হাসলেন না অবশ্য।..আরে, আমি তো শ্রীবাস্তবের অ্যাকসিডেন্টের সময় এখানে উপস্থিত ছিলুম। ওর স্কি সেটটা স্টোরে রাখা হয়েছিল–তাও জানি। কাল বিকেলে সঞ্জয়ের লাশ দেখতে যাবার আগে শ্রীবাস্তব আমাকে বলল, স্টোরে ওর স্কি-পোল দুটো আছে না নেই–দেখা দরকার। ওর কাছে ডুপ্লিকেট চাবি ছিল। আমাকে দিল। দেখে এলুম–সব আছে, স্কি-পোল নেই।

ডুপ্লিকেট চাবি শ্রীবাস্তবের কাছে আছে?

হ্যাঁ। কিন্তু একটা ব্যাপার কিছুতেই বুঝতে পারছিনে–শ্রীবাস্তবের স্কি-পোল নিয়েই যদি খুন করা হয়ে থাকে, তাহলে খুনী বাস্কেট লোপাট করতে চাইছে। কেন? শ্রীবাস্তবের সেট নম্বর হচ্ছে তিন। কাজেই তার পোলদুটোর বাস্কেটের নম্বরও তিন। বুঝলে ধ্রুব, বাস্কেট দুটোই একটা ধাঁধার সৃষ্টি করেছে। মাথামুণ্ডু কিছু বোঝা যায় না।

ঠিক বলেছেন। শ্রীবাস্তবের, ধরা যাক, পায়ের জখমটা বানানো এবং সেই খুনী। তাহলে নিজের স্কি-পোল দিয়ে খুন করা সম্ভব হলেও বাস্কেট লুকিয়ে কী লাভ হবে তার? নাম্বার তো জানা। খাতা দেখলেই বোঝা যাবে–ওই তিন নম্বর সেট কাকে ইস্যু করা হয়েছে। কাজেই বাস্কেট লুকিয়ে ফেলেও তো লাভ নেই। আবার, খুনী যদি অন্য কেউ হয় এবং শ্রীবাস্তবের কাঁধে দায় চাপানোর। মতলব থাকে, তাহলে সে বাস্কেট লুকোতে ব্যস্ত হবে না। বাস্কেট দুটো প্রকাশ্যে পড়ে থাকলেই সে গা বাঁচাতে পারবে বরং। তা সে করেনি।

কর্নেল দাড়িতে মৃদু আঙুল বোলাতে বোলাতে বললেন, আমার মনে হচ্ছে এই হত্যারহস্যের চাবিকাঠি ওই বাস্কেট দুটোর মধ্যেই রয়েছে।

সেইসময় দরজায় নক করল কে। এবার শের সিং। ঘরে ঢুকে উত্তেজিত মুখে কী বলতে গিয়ে কর্নেলকে দেখে একটু থতমত খেল। সেলাম করে বলল, কর্নেল সায়েব, আপনি এখানে? আমি খুব মুশকিলে পড়ে গেলাম যে কর্নেল সায়েব?

তোমার আবার কী হলো শের সিং?

চাউন্ড্রি সায়েব জানেন সব। স্টোরে…

হুম। জানি। দুটো স্কি-পোল হারিয়েছে।

 জি সায়েব।

কর্নেল ওকে হাত তুলে আশ্বস্ত করে বললেন, ঘাবড়ানোর কিছু নেই। এখন আমার একটা কথার জবাব দাও তো শের সিং।

বলুন সায়েব।

 খুনের দিন–পাঁচই ডিসেম্বরের আগের রাত্রে তুমি কটা অব্দি জেগে ছিলে?

শের সিং-এর মুখটা কেমন গম্ভীর হয়ে গেল। নিচের দিকে তাকিয়ে সলজ্জ আড়ষ্টতার সঙ্গে বলল, বেয়াদপি মাফ করবেন কর্নেল সায়েব। সে রাতে স্কিয়াররা সবাই ডাইনিং হলে শরাব খেয়ে নাচ গান হল্লা করছিলেন। তো

হ্যাঁ। আমি বেরিয়ে নিজের ঘরে যাবার পরে হইহল্লা হচ্ছিল খুব।

তো স্যার, আমি একপাশে চুপচাপ দাঁড়িয়েছিলুম। তখন সবাই মিলে আমাকে তেড়ে এলেন–এই শের সিং, তুমি চুপচাপ কেন? এস, ফুর্তি করো। আমি বললাম, অনারেবল লেডিজ অ্যান্ড জেন্টলম্যান, আমি নিতান্ত নোকর মানুষ। আমার কি তা উচিত হবে? ওঁরা তখন পুরোদস্তুর মাতাল। আমাকে চেপে ধরলেন জেন্টলম্যানরা–আর, লেডিজ, মানে মিস রিটা মবলঙ্কর আর দুতিন জন লেডি আমার মুখে মদ ঢেলে দিলেন।

তারপর?

আমি স্যার, অল্পস্বল্প খাই কখনও সখনও। তেমন অভ্যেস নেই। ওঁরা আমাকে নিয়ে এমন মাতালেন যে আমি আর আপত্তি করতে পারলাম না। অনবরত খেয়ে নাচতে গাইতে শুরু করেছিলুম–এ অব্দি মনে পড়ছে। তারপর ওঁরাই হয়তো আমাকে ধরাধরি করে আমার ঘরে শুইয়ে দিয়ে এসেছিলেন। ঘুম ভাঙল ভোরবেলা। উঠতে গিয়ে টের পেলাম–সারা গায়ে ব্যথা। মাথা ভার হয়ে আছে। শরীর ভীষণ দুর্বল। কিন্তু উপায় নেই–উঠতেই হবে। আটটার মধ্যে স্কিয়ের সরঞ্জাম তৈরি করতে হবে। তাই উঠে পড়তে হলো। সারাদিন শরীর খারাপ রইল।

সর্বনাশ! তোমাকে আমি ওই অবস্থায় ডাক্তারের কাছে পাঠিয়েছিলাম!

না স্যার–তাতে ক্ষতি হয়নি। আমি ডাক্তার সায়েবের কাছে ওষুধ খেয়ে এসেছিলাম। সেইজন্যেই তো বলামাত্র চলে গেলাম।

তাহলে সেরাতে কোন শব্দ বা কিছু শোননি, দেখও নি।

না স্যার।

অনেকেরই সেরাতে ওই অবস্থা ছিল নিশ্চয়।

ধ্রুব বলল, সেটাই সম্ভব। তা না হলে সেই ঘরঘর শব্দ সবাই শুনতে পেত। আপনি শোনেননি কর্নেল?

উঁহু। আমার ঘরটা তো পিছনে। তোমার ঘর থেকে শোনা সম্ভব। কারণ স্টোরটা এখান থেকে সামনা-সামনি–মাত্র বিশ পঁচিশ গজ তফাতে।

স্টোর? স্টোর থেকে ঘরঘর আওয়াজ হবে কিসের?

ওখানে একটা গ্রাইন্ডিং হুইল আছে। চাকায় ঘষে কোনকিছু ধারালো করার যন্ত্র ওটা।

কী কাণ্ড! তাহলে খুনী কী ওই দিয়ে স্কি-পোলের ডগা ছুঁচলো করছিল?

হ্যাঁ–ঠিক তাই। তারপর আসা যাক, তোমাদের আট নম্বর রুমে। চাপা শব্দ শুনেছিলে। একটু ফুটোও মেঝেতে আবিষ্কার করেছি আমরা।

তার মানে…। তার মানে খুনী স্কি-পোলে শান দেওয়ার পর চুপি চুপি ওঘরে ঢোকে। সে ললিতাকে দেখতে এসেছিল—কি অবস্থায় আছে। কিংবা ধরা যাক, সন্দেহভঞ্জন করতে এসেছিল।

কিসের কর্নেল?

ললিতা একা আছেনা, অন্য কেউ তার সঙ্গে আছে।

 কিন্তু শ্রীবাস্তবের পক্ষে ক্রাচ নিয়ে…

আহা, তুমি ঝট করে শ্রীবাস্তবের ঘাড়েই বা চাপাচ্ছ কেন? অন্য কেউও তো হতে পারে।

না কর্নেল। শ্রীবাস্তবের সঙ্গেই তো ললিতার বিয়ের কথা ছিল। কাজেই তার পক্ষে এমন আচরণ সম্ভব। অবশ্য দ্বিতীয় ব্যক্তি সঞ্জয়–সঞ্জয়ের পক্ষেও এটা সম্ভব।

কিন্তু সঞ্জয় খুন হয়েছে। যে খুন হয়েছে–সে খুনী নয়।

ধ্রুব তর্কে মেতে বলল, খুনী এক্ষেত্রে দুজন নয়–তাই বা বলি কেমন করে? হয়তো শ্রীবাস্তবের ধারণা মতো সঞ্জয়ই ললিতাকে খুন করে পালাচ্ছিল তারপর পথে অন্য কেউ তাকে খুন করেছে।

বেশ–তাই যদি হয়, তবে সে কে? শ্রীবাস্তব কি?

মোটেও অসম্ভব নয়।

শ্রীবাস্তবের পায়ের জখম সম্ভবত জেনুইন, ধ্রুব। তার পক্ষে এই বরফ বৃষ্টির মধ্যে সাত মাইল পাখির বেগে এগিয়ে খুন করা অসম্ভব। বিশেষ করে মোটরে চেপে যাচ্ছিল সঞ্জয়।

শের সিং এবার বিনীতভাবে বলল, কর্নেল সায়েব, আমি একটা কথা বলব?

কর্নেল বললেন, আলবৎ। বলো, কী তোমার ধারণা?

শের সিং বলল, মোটর রাস্তার পথে টোগাড়ি এখান থেকে সাত মাইল। কিন্তু এখান থেকে একটা সোজাসুজি নাক বরাবর হাঁটা পথ আছে–সে পথে। মাত্র দুমাইল। পাহাড়, পাহাড়তলি, জঙ্গলের তলা–সব জায়গায় এখন পুরু বরফ পড়ে গেছে। স্যার, একজন ভালো স্কিয়ারের পক্ষে দুমাইল যাওয়া মাত্র দশ মিনিটের ব্যাপার।

কর্নেল হেসে উঠলেন।…রাইট, রাইট। আমি এদিকটা একেবারে ভাবিনি তা নয়, কিন্তু সরেজমিনে এই হাঁটা পথের অবস্থা কোনদিন দেখিনি–তাই ভেবেছিলুম খাড়া পাহাড় আর জঙ্গল থাকা সম্ভব।

খাড়া পাহাড় আছে, জঙ্গলও আছে স্যার। কিন্তু বরফের মরশুমে এ পথটা অন্তত স্কিয়ারদের পক্ষে মোটামুটি ভালই।

সবাই কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে রইল। তারপর ধ্রুব বলে উঠল, কর্নেল, কাল লিফটম্যানের প্রসঙ্গ তুলেছিলাম। আপনি জবাব দিতে গিয়ে বাধা পড়ল।

কর্নেল বললেন, লিফটম্যান তোমার কথামতো ললিতা খুন হওয়ার খবর দিতে যথেষ্ট দেরি করেছিল। তার দেরি হয়েছিল কেন–এর জবাবে একটা অদ্ভুত ব্যাপার বলেছে সে। সত্যি, বড় অদ্ভুত। আমি বিশ্বাস করিনি।

কী বলেছে, বলুন কর্নেল? ধ্রুব অধৈর্য হয়ে বলল।

খবর দিতে আসবার পথে লিফটম্যান নাকি একটা অদ্ভুত ব্যাপার দেখতে পেয়ে থমকে দাঁড়ায়। লিট হুইল থেকে এখানে আসবার পথটা আশা করি লক্ষ্য করেছে। একটা বাঁধমতো রাস্তা–দুধারে নিচে যথেষ্ট জঙ্গল রয়েছে। জঙ্গলের একটা অংশ ট্রেনিং সেন্টারকে বেড় দিয়ে স্টোররুমের পিছনে এসে মিশেছে। সেখানে কিছুটা সমতল জায়গা ফাঁকা–তারপর আবার ঢালু জঙ্গল। নেমে গেছে উপত্যকার দিকে। লিম্যান বাঁধের মাঝামাঝি এসে তার ডানদিকে জঙ্গলের ভিতরে কাকে স্কি করে যেতে দ্যাখে। বরফ পড়ার ফলে কুয়াশামতো থাকায় স্বভাবত দশফুট দূরের কিছু স্পষ্ট দেখা যায় না–আবছা লাগে। কিন্তু একটা নিস্পন্দ জায়গার মধ্যে কিছু নড়াচড়া করলে যত দূরেই হোক–খানিকটা আভাস পাওয়া যায়। লিফটম্যানের এই ধারণা। যাই হোক, সে একজনকে স্কি করে যেতে দেখেছিল। তার অবাক লেগেছিল দুটো ব্যাপার দেখে। প্রথমে ওখানে কেউ স্কি করে যেতে সাহস পায় না। কারণ, জায়গাটা কোম্পানির বলে। প্রায়ই নিজেদের কাঠের দরকারে গাছ কাটা হয়। সেই গাছের কাটা গুঁড়িগুলো যেখানে সেখানে বরফের মধ্যে মাথা উঁচিয়ে থাকো স্কিয়ারের পক্ষে ভারি বিপজ্জনক। দ্বিতীয় ব্যাপারলিফটম্যান হলফ করে বলল, সেই স্কিয়ারের হাতে একটামাত্র স্কি-পোল ছিল।

ধ্রুব অস্ফুটে বলল, দা মারডারার।

হ্যাঁ। লিফটম্যানের বর্ণনা সত্যি হলে অন্তত আমরা বুঝতে পারছি, সে খুনীকেই দেখতে পেয়েছিল। যাই হোক, সে ভাবল কোন আনাড়ি স্কিয়ার লিট হুইলে চাপার হুজ্জত না পোহাতে চেয়ে এভাবেই নিজের খুশিমতো স্কিয়ের সখ মেটাচ্ছে। অতএব ওকে সাবধান করা এখনি দরকার।

শের সিং বলে উঠল, কিন্তু যে সদ্য খুনের খবর দিতে যাচ্ছে, তার পক্ষে ওসব নিয়ে ভাবা কি যুক্তিসঙ্গত কর্নেল সায়েব? অবশ্য আমাদের লিফটম্যানটি বয়সে জওয়ান–গায়ে তাকতও আছে প্রচুর। ব্যাটার নার্ভও খুব কড়া।

কর্নেল বললেন, তোমাদের লিফটম্যানটির গায়ে জোর আছে বলেই সম্ভবত নিজেকে দারুণ বুদ্ধিমান মনে করে। অতিবুদ্ধি যাকে বলে। এ ছাড়া আর ব্যাখ্যা কিছু খুঁজে পাচ্ছিনে।

ধ্রুব বলল, তারপর সে কী করল?

সে বাঁধে নেমে চেঁচিয়ে উঠল হুশিয়ার করে দিতে চাইল। তারপর দেখল স্কিয়ারটা ট্রেনিং সেন্টারের পিছন দিকে এগোচ্ছে। তখন জঙ্গলের পথে না গিয়ে লিফটম্যান ট্রেনিং সেন্টারে ঢুকে এক দৌড়ে পূর্বপ্রান্তে কাঠের বেড়ার কাছে চলে যায়। এখানে একটা ব্যাপার আমি নোট করে রেখেছি। লিফটম্যান ট্রেনিং সেন্টারে ঢুকে লক্ষ্য করেছিল, স্কিয়ারটা স্টোররুমের পিছনে অদৃশ্য হলো। কিন্তু শেষ প্রান্তে বেড়ার ধারে পৌঁছে আর তাকে দেখতে পেল না কোথাও। তার ভয় হলো। নির্ঘাত পিছনের সেই সমতল ফাঁকা জমি পেয়ে মনের সুখে যেই স্কি চালিয়েছে, গিয়ে পড়েছে ঢালুতে কোন গর্তে বা খাদে। তখন সে লোকটাকে খুব খোঁজাখুঁজি করে কিছুক্ষণ–তারপর তার নাকি খেয়াল হয় যে সে ললিতা টোমলের খুনের খবর দিতে যাচ্ছিল অফিসে। বোঝো কাণ্ড! কর্নেল হেসে উঠলেন।

শের সিং মাথা নাড়তে থাকল অবিশ্বাসে। ধ্রুবও মাথা দুলিয়ে বলল, এ বর্ণনার মধ্যে আগাগোড়া গোঁজামিল আছে। এ সম্পূর্ণ বানানো। লিটম্যানের আচরণ ভীষণ সন্দেহজনক। অবিশ্বাস্য। শের সিং ঠিকই ধরেছে–যে খুনের খবর দিতে যাচ্ছে, সে… চিন্তিতভাবে ধ্রুব নেমে গেল।

কর্নেল বললেন, কিন্তু লিফটম্যান যা দেখেছিল, তা সত্য, ধ্রুব।

তার মানে?

আমি ও জায়গাটা ঘুরে দেখে এসেছি সেদিনই। ওই জঙ্গলে স্কিয়ের দাগ দেখেছি। স্কি-পোল যে একটা ছিল, বাস্কেটের দাগেই তার প্রমাণ। ভাগ্যিস, খুব বেশি দেরি করিনি–তাহলে বরফে সব চাপা পড়ে যেত। তাছাড়া সবচেয়ে অদ্ভুত ব্যাপার-স্টোররুমের পিছনের দেয়ালের নিচে একজায়গায় প্রায় তিনফুট বাই তিনফুট কেউ কাঠ ছাড়িয়ে ফের আলগা করে চেপে রেখেছিল। আমি একটু টানতেই খুলে গেল। স্টোররুমের চারটে দেয়ালই কাঠের।

শের সিং লাফিয়ে উঠল। কর্নেল সায়েব, কর্নেল সায়েব। নির্ঘাত আমার চাকরি যাবে। আমি একেবারে অন্ধ কিছু লক্ষ্য করিনে। দুগালজি ফিরে এসেই আমাকে ছাড়িয়ে দেবেন।

কর্নেল হাত তুলে বললেন, সবুর। তোমার কোন দোষ নেই। ভিতরে ঢুকলে ওই জায়গাটা তোমার চোখে পড়বে না। কারণ ওখানে স্কিসেটের গাদা আছে। আমার ধারণা, খুনী আগের রাত্রে তোমাকে বেঁহুশ করে তোমার পকেট থেকে চাবি নিয়েছিল।

শের সিং চমকে উঠল, বেহুশ করে?

হ্যাঁ। আমার এটা অনুমান অবশ্য। তোমাকে মদ খাওয়ানোর সময় খুনী কোন ফাঁকে কোন ড্রাগ মিশিয়ে দিয়েছিল। সেকথায় পরে আসছি। খুনী চাবি নিয়ে স্টোরে ঢোকে। তারপর গ্রাইন্ডিং মেশিনে নিজের স্কি-পোল দুটো বাস্কেট থেকে খুলে ধারালো করে নেয় এবং বাস্কেটে যথারীতি বিঁধিয়ে রাখে মাত্র। একজন ভালো স্কিয়ারের পক্ষে ওভাবে আলগা অবস্থায় বাস্কেটে পোল বিধিয়ে রেখে স্কি করা কঠিন নয়। হাতে খুব চাপ রাখলে সহজে খুলে পড়ে যাবার চান্স নেই। যাই হোক, তারপর সে কোন ধারালো জিনিস দিয়ে দেয়ালের কোনটা অতখানি চারকোনা করে কাটে–যাতে বাইরে থেকে চাপ দিলে বা টানলে তিনফুট বাই তিনফুট কাঠ খসে যায়। ওখানেই সে শ্রীবাস্তবের তিন নম্বর স্কি পোল দুটো এমনভাবে রাখে, যাতে কাঠের কাটা অংশটা সরালেই বাইরে থেকে হাতে পড়ে। শের সিং, তুমি সকালে স্কিসেট ইস্যু করার সময় কোন গরমিল লক্ষ্য করোনি? খুব ভেবে জবাব দেবে কিন্তু।

শের সিং একটু ভেবে বলল, দেখুন কর্নেল সায়েব, স্টোররুমের ভিতরে তো আজকাল সবসময় অন্ধকার লাগে। একটা বাতি আছে–মাত্র চল্লিশ ওয়াট। দুগালজি খুব হিসেবী মানুষ, সে তো জানেন। তাছাড়া পিছনের দিকের দেয়ালে স্কিসেট ছাড়াও অজস্র কাঠ জড়ো করা আছে। আমি খুঁটিয়ে দেখিনি অতটা। আমারই কসুর, স্যার। এখনই গিয়ে ওটা মেরামত করতে হবে।

উঁহু। পুলিস যতক্ষণ না অনুমতি দেয়, আর ওতে হাত দেওয়া ঠিক হবে না শের সিং। কর্নেল বললেন।…এখন আরেকটা কথার জবাব দাও। সেরাতে তোমাকে মিলে মদ খাওয়াতে ব্যস্ত হয়ে উঠেছিল বলছ। কিন্তু নিশ্চয় জোকটা সকলের মাথায় একই সঙ্গে আসেনি। প্রথমে একজনের মাথায় এসেছিল–তখন সবাই সায় দিয়েছিল। তাই না?

জি–সে তো ঠিকই।

প্রথমে কে তোমাকে মদ খাওয়াতে চেয়েছিল–কিংবা ওই জোকের প্রস্তাব দিয়েছিল শের সিং?

শের সিং বিপন্নমুখে ভাবতে ভাবতে বলল, ঠিক মনে করতে পারছি না স্যার। কে প্রথম আমাকে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে বলে উঠেছিল, আরে, শের সিং তুমি কেন ফুর্তি করছ না..কে যেন…কে…

মেয়ে না পুরুষ?

মেয়ে? উঁহু–পুরুষ। না, না কর্নেল সায়েব–একটুও মনে নেই। মানে লক্ষ্য করিনি একেবারে। মেয়ে-না পুরুষকে প্রথমে বলেছিল!

তুমি ভাবতে সময় নাও শের সিং। আজ সারাটি রাত তুমি সময় পাবে। কাল সকালে আমাকে বলবে। কর্নেল গম্ভীরভাবে যেন হুকুমই দিলেন।…ঠিক আছে। এবার এসো। তোমাকে হয়তো খুঁজছেন শ্রীবাস্তব।

শের সিং আস্তে আস্তে চলে গেল। ধ্রুব বলল, আপনার প্রকল্পটি বাস্তব সাক্ষ্য অনুসারে খুব চমৎকারই বলব। কিন্তু তাহলেও লিটম্যানের ব্যাপারটা মানে, তার অমন আচরণ আমার কেমন ঠেকছে। তাকে পাঠিয়েছি একটা সাংঘাতিক খবর দিতে–আর সে অতক্ষণ ওইভাবে পরোপকার করতে দৌড়াদৌড়ি করে সময় নষ্ট করল? এটা একেবারে অ্যাবসার্ড।

তার বিবরণ সত্য। বর্ণনায় গোলমাল থাকতে পারে।

অস্বীকার করছি না। বলছি, তার আচরণ অ্যাবসার্ড।

ধ্রুব, ওর বিবরণের ফ্যাক্টটুকু যদি সত্যি হয়, তাহলে আচরণও সত্যি। দুটোই পরস্পর সম্পর্কিত ব্যাপার–একটা সত্য হলে অপরটাও সত্য হতে বাধ্য।

কিন্তু…।

ধ্রুব, তবু তুমি স্বস্তি পাচ্ছ না কেন, তা বুঝি। আসলে দুটো সত্যকে একজায়গায় মেলানোর কমন ভিত্তি তুমি হাতড়াচ্ছ। তাই না?

সম্ভবত তাই।

ধ্রুব, এই ভিত্তি হলো–লিফটম্যান স্কিয়ারকে চিনতে পেরেছিল। কিংবা আরও স্পষ্ট করে বললে লিফটম্যান তাকে ভালো চেনে। এবং সম্ভবত তাকেই লিফট চেয়ারে খুন করতে দেখেছিল বলেই ওই জঙ্গলে তাকে আবিষ্কার করে সে ভীষণ উত্তেজিত হয়ে পড়েছিল। মনে রেখো, লিট হুইলের কেন্দ্রে নিচে লিফটম্যান দাঁড়িয়ে থাকে–হেলপার দুজন থাকে খানিকটা দূরে। যত অস্পষ্ট হোক, সবগুলো চেয়ার লিটম্যানের পক্ষে লক্ষ্য রাখা সম্ভব। ললিত চেয়ার মাঝামাঝি আসার পর যদি খুনী ওর বুকে পোল বিধিয়ে থাকে, লিফটম্যানের  পক্ষে পরিষ্কার দেখতে পাওয়া সম্ভব। আগের বা পিছনের চেয়ার থেকে তা দেখা যাবে না। তাই না?

ধ্রুব সায় দিয়ে বলল, হ্যাঁ–ঠিকই বলেছেন।

এখন প্রশ্ন : সব স্কিয়ারের পোশাক একরকম এবং আপাদমস্তক ঢাকা। চোখে গগস। ঠোঁট আর নাকও স্কার্ফে ঢাকা। ও চিনল কীভাবে তাই না?

হ্যাঁ কর্নেল। আমি তো চিনতেই পারিনি–অথচ খুনীকে ললিতার পাশে বসতে দেখেছি।

দ্যাখ ধ্রুব–খুব চেনা মানুষের অনেক ভঙ্গি লক্ষ্য করে তাকে ডিটেক্ট করা সম্ভব। যতই ঢাকা থাক, দেহের কোন অংশের ভঙ্গি থেকেই সে ধরা পড়তে বাধ্য। তাছাড়া লিফটম্যানটি অভিজ্ঞ। কতদিন ধরে সে এখানে একই কাজ করছে। তাই স্কিয়ারদের চেয়ারে ওঠা, নামা এবং স্কি করার ভঙ্গি তার মুখস্থ হয়ে যাওয়া স্বাভাবিক।

ধ্রুব উত্তেজিত মুখে বলল, দা আইডিয়া! লিফটম্যান খুনীকে চেনে। দেখেছেও তার কীর্তি। কিন্তু যে কোন কারণে হোক, সে প্রকাশ করতে চায় না। এবং সেজন্যেই তার ফ্যাক্ট অংশ সত্য, আচরণও সত্য–শুধু বর্ণনার মধ্যে কিছু অংশ মিথ্যে হতে পারে।

সোনালি এল এতক্ষণে।

কর্নেল বলল, হ্যাল্লো সোনালি, খুব আড্ডা দেওয়া হলো নিশ্চয়। স্কিয়াররা সব কে কী করছে?

সোনালি বলল, কারো খবর জানিনে। আমি মিস মবলন্ধরের ঘরে আড্ডা দিচ্ছিলুম। তার অভিজ্ঞতার গল্প শোনা হলো অনেক রীতিমতো থ্রিলিং।

রিটার ঘরে ছিলে? বাই জোভ! কর্নেল হেসে উঠলেন!..রিটা মেয়েটি ভারি চমৎকার কিন্তু এখানে কারো সঙ্গে বিশেষ মিশতে দেখি নে। তোমার সঙ্গে বুঝি খুব ভাব হয়ে গেছে?

সোনালি মাথা দুলিয়ে বলল, হু-উ! এই মিঃ ধ্রুব চৌধুরী, রিটা তোমার সঙ্গে আলাপ করবে। বিকেলে আসবে। কোথাও যাবে না কিন্তু।

ধ্রুব বলল, পাগল। এই ব্লিজার্ডে কোথায় বেরোব?

কর্নেল উঠে দাঁড়ালেন। বললেন, চলি। লাঞ্চের সময় হয়ে এল। সোনালি, ধ্রুব! তোমরা একটু পরে এসো তাহলে। এক টেবিলেই বসব আমরা।

কর্নেল চলে গেলে সোনালি ধ্রুবর পাশে চুপ করে বসে ওর গলা জড়িয়ে ধরল। চাপা গলায় বলল, আজ রাতে দুজন একঘরে শোব কিন্তু। কাল সারারাত আমার ঘুম হয়নি। যা ভয় লাগছিল। নিচেই যে ললিতার ঘর।

ধ্রুব ওর গালে ঠোঁট রেখে বলল, আমিও তাই ভাবছিলুম।

.

০৪.

রাত তিনটেয় নিচে খুব চেঁচামেচির শব্দে ঘুম ভেঙে গেল বর। সে স্লিপিং ব্যাগ থেকে ধুড়মুড় করে বেরিয়ে ডাকল, সোনালি, সোনালি!

পাশের খাট থেকে সোনালির ঘুম-জড়ানো অস্ফুট সাড়া এল।

ধ্রুব গায়ে ওভারকোটটা দ্রুত চাপিয়ে তাকে ঠেলাঠেলি করে জাগাল।…এই, নিচে কী গণ্ডগোল হয়েছে মনে হচ্ছে! আমি যাচ্ছি। তুমি দরজাটা ভিতর থেকে লক করে দাও।

সোনালি জাগল, কিন্তু উঠল না। বলল, পাগল পাগল! রাত দুপুরে গোয়েন্দাগিরি করবে, বায় চড়েছে মাথায়। ভ্যাট!

আহা, দরজাটা…

 থাক্। কেউ আমাকে খুন করবে না।

অগত্যা ধ্রুব বেরোল। কাঠের মেঝেয় খুব হাঁটাহাঁটির শব্দ হচ্ছে। গোলমাল বেড়েছে মনে হলো। ধ্রুব নিচের করিডরে আসতেই গ্যারেজম্যানের সঙ্গে দেখা হলো। ধ্রুব বলল, কী হয়েছে? অত গোলমাল কেন?

গ্যারেজম্যান হেসে বলল, শ্রীবাস্তবজির মাথা খারাপ হয়ে গেছে।

তার মানে?

গিয়ে দেখুন না সায়েব! বলে লোকটা পাশ কাটিয়ে চলে গেল।

ডাইনিং হলের উল্টোদিকে অফিস। অফিসের সামনে ভিড় জমে গেছে। গুলাব সিং, ইউসুফ সায়েব, জনাচার সেপাইও দাঁড়িয়ে রয়েছে সেখানে। কর্নেল আছেন। আর শ্রীবাস্তব ভীষণ চেঁচামেচি করছে।

ধ্রুবকে দেখে কর্নেল একটু হাসলেন।

শ্রীবাস্তবের হাতের দিকে চোখ গেল ধ্ৰুবর। ক্রাচে ভর দিয়ে সে দাঁড়িয়ে রয়েছে, এবং তার দুহাতে দুটো বাস্কেট–স্কি-পোলের তলায় যা লাগানো থাকে। ধ্রুব চমকে উঠল! শ্রীবাস্তব খেপে গিয়ে বলছে, সব ব্যাটাকে আমি ফাঁসিকাঠে ঝোলাব। এখানে সব্বাই খুনী–এভরি বডি ইজ দা মার্ডারার!

ব্যাপার কী? ধ্রুব গুলাব সিংকে ইশারায় ডেকে একটু তফাতে দাঁড়াল। গুলাব সিং গম্ভীর। কাছে এসে বলল, এক আজব ব্যাপার, চাউন্ড্রি সায়েব। আমার মাথায় আসছে না কিছু। শ্রীবাস্তব সায়েবের দরজায় কিছুক্ষণ আগে কে নক করছিল। দেমাগ খারাপ থাকার দরুন ওঁর ঘুম হচ্ছে না দুরাত থেকে। তো, উনি জেগেই ছিলেন নাকি। বার বার নক করাতে উনি অনেক কষ্টে উঠে দরজা খোলেন। অমনি কে ওঁর ঘরের ভিতরে ওই বাস্কেট দুটো ছুঁড়ে ফেলে ওঁকে ধাক্কা মেরে পালিয়ে যায়। ওই বাস্কেট দুটো নাকি শ্রীবাস্তব সায়েবেরই স্কি-পোলের।

ধ্রুব সবিস্ময়ে বলল, তিন নম্বর?

হ্যাঁ সেট নাম্বার থ্রি।

লোকটাকে চিনতে পারেননি উনি?

না। লোকটা নাকি মুখে রুমাল ঢেকে এসেছিল। আর ধাক্কা খেয়ে উনি নাকি পড়ে গিয়েছিলেন। পায়ে জখম আছে–উঠতে উঠতে লোকটা ততক্ষণে হাওয়া হয়ে গেছে।

ধ্রুব চোখ টিপে হাসল।..গুলাব সিংজি, আপনার বিশ্বাস হচ্ছে এ ঘটনা?

গুলাব সিং গোঁফের নিচে মৃদু হেসে চাপা গলায় বলল, মোটেও না। শ্রীবাস্তব সায়েব আরও অনেক নাটক করবেন এবার। দেখুন না, করিডরে সেপাইরা কড়া পাহারা দিচ্ছে তার মধ্যে কোন লোক গিয়ে শ্রীবাস্তবের দরজা নক করল, আর তারা কিছু দেখতে পেল না?

কর্নেল এসে ধ্রুবর হাত ধরে টানলেন!..এস ধ্রুব, আমার ঘরে একটু বসবে।

কর্নেলের ঘরে, ঢুকে ধ্রুব বলল, সোনালি একা আছে। বেশিক্ষণ বসব না কর্নেল!

কর্নেল বললেন, না–বসতে ডাকিনি। তিন নম্বর বাস্কেটটা তাহলে পাওয়া গেল! ব্যাপারটা লক্ষ্য করছ? আমি ঠিক এ রকমই আশা করেছিলাম। ওটা কোন না কোনভাবে পাওয়া যেতই।

ধ্রুব বলল, শ্রীবাস্তবের আর বাঁচার পথ নেই, কর্নেল। ব্যাটা নিজে থেকে যেন ধরা দিতে চায়।

কেন, কেন?

এমন নাটকীয়তা ওর না করলেও চলত।

ব্যাপারটা সত্যি হতেও তো পারে।

অসম্ভব, কর্নেল। করিডরে সেপাইরা ছিল তাদের চোখ এড়িয়ে…

কর্নেল বাধা দিয়ে বললেন, সেপাইদের পাহারার কথা বলো না। এই তুষার ঝড়ের রাতে ওরা কোণঠাসা হয়ে জড়োসড়ো বসেছিল। করিডর ঢাকা হলে কী হবে? ওখানে তো কোন হিটিং ব্যবস্থা নেই–কী ঠাণ্ডা দেখছ না? ব্যাটারা আগাগোড়া কুমড়োর বস্তার মতো কম্বল মুড়ি দিয়ে দেয়ালে এঁটে থাকে। পাশ দিয়ে কেউ গেলেও তখন কারো মুখের ঢাকনা সরিয়ে দেখতে ইচ্ছে করে না।

ধ্রুব বলল, কিন্তু তাহলে শ্রীবাস্তবই যে খুনী, আর আমার কোন সংশয় নেই।

কর্নেল হাসলেন, তোমার এ সিদ্ধান্তের কারণ?

অনেক। তবে একটা একেবারে ভাইটাল। লিফটম্যান খুনের খবর দিতে যাবার পথে কাকে স্কি করে যেতে দেখেছিল। আমি ভেবে দেখেছি সেই স্কিয়ার নিশ্চয়ই শ্রীবাস্তব। কারণ, যার কাছে খুনের খবর নিয়ে যাচ্ছে, তাকে ওইভাবে ওখানে দেখেছিল বলেই লিফটম্যান অত দৌড়াদৌড়ি করেছিল বা দেরি করে ফেলেছিল। এইটাই যুক্তিসঙ্গত।

হ্যাঁ-মন্দ যুক্তি নয়। স্বীকার করছি। কিন্তু শের সিংকে তাহলে বেঁহুশ করা হলো কেন? স্টোরের ডুপ্লিকেট চাবি তো শ্রীবাস্তবের কাছেই ছিল।

বেঁহুশ সত্যি করা হয়েছিল কি না–তার প্রমাণ কোথায় কর্নেল? ও তো আপনার অনুমান। শের সিং যে গ্লাসে মদ খেয়েছিল, সেটা পরীক্ষা না করে কীভাবে প্রমাণিত হবে?

কর্নেল মাথা নেড়ে বললেন, রাইট, রাইট। সেও তো ঠিক। তুমি একজন ফোরেনসিক এক্সপার্ট। তোমার যোগ্য কথাই বলেছ। পরক্ষণে হাসলেন…আমার দুর্ভাগ্য, গ্লাসটা সকালে ধুয়ে ফেলা হয়েছিল সম্ভবত। আর আমার থিওরি প্রমাণের কোন উপায় নেই!

ধ্রুব বলল, এখন আসি। সওয়া তিনটে বেজেছে। এখনও যথেষ্ট ঘুম হবে।

কর্নেল দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, হ্যাঁ–ঘুমোও গিয়ে। আমার ইনসমনিয়াটা আবার বেড়ে গেছে।…

ধ্রুব বেরিয়ে দেখল ভিড় কমেছে। শ্রীবাস্তব নেই। ইউসুফ সায়েব স্কিয়ারদের সঙ্গে কথা বলছেন। ধ্রুব পাশ কাটিয়ে চলে এল।

সিঁড়িতে পা দেবার সঙ্গে সঙ্গে হঠাৎ ধ্রুবর কানে এল ওপরে কে যেন চাপা চিৎকার করে উঠল। একমুহূর্ত থামল। না–কানের ভুল নয়। গোঙানির শব্দ বেশ স্পষ্ট। সে কয়েকটি লাফে ওপরে পৌঁছল! সর্বনাশ! তার ঘরেই কে যেন গোঙাচ্ছে এবং প্রচণ্ড ধস্তাধস্তির শব্দ হচ্ছে। সে চেঁচিয়ে উঠল, সোনালি! সোনালি! তারপর দরজার হাতল ঘোরাল। পরক্ষণে আচমকা দরজা খুলে কে ভীষণ জোরে তার বুকে ধাক্কা মারল। পড়ে গেল ধ্ৰুব। পড়ে গিয়েই চেঁচিয়ে উঠেছিল সে–চোর! চোর!

চোর বলে কেন চেঁচাল, সে-মুহূর্তে বলা কঠিন ধ্রুবর পক্ষে। যাই হোক, সে মেঝে থেকে উঠে একলাফে প্রথমে সোনালির কাছে গেল। টেবিলল্যাম্পটা তেমনি জ্বলছে। সোনালি স্লিপিং ব্যাগের ভিতর অর্ধেক শরীর ঢুকিয়ে বিছানায় বসে রয়েছে। চুল বিস্রস্ত বড়ো বড়ো চোখ। ভীষণ হাঁপাচ্ছে। খাটের পাশেই তার রেশমি স্কার্ফটা পড়ে রয়েছে।

ধ্রুব রুদ্ধশ্বাসে বলল, কী হয়েছে, কী হয়েছে সোনালি?

সোনালি ঠোঁট কাঁপছে। কিছু বলতে পারল না। আঙুল তুলে নিচে স্কার্ফটার দিকে দেখাল মাত্র। ভয়ে তার মুখটা সাদা হয়ে গেছে।

স্কার্ফটা তুলে ধ্রুব বলল, আঃ, কী হয়েছে বলবে তো? কে এসেছিল?

 দরজার বাইরে শের সিং-এর গলা শোনা গেল, সায়েব, সায়েব!

সিঁড়িতে অনেকগুলো পায়ের দৌড়ে আসার শব্দ হলো। অনিবার্যভাবে আবার একটা নাটকীয় ভিড় জমে যেতে থাকল ধ্রুবর ঘরের সামনে।

ধ্রুব বড়ো আলোটা জ্বেলে দরজা খুলতেই শের সিং, গুলাব সিং, ইউসুফ তেঙ, আর কর্নেল ঢুকে পড়লেন। আরো অনেকে দৌড়ে আসছে শোনা গেল।

সোনালি অস্ফুট স্বরে বলল, জল খাবো।

জল খাবার পর সুস্থ হয়ে সোনালি যা বলল, তাতে সবাই আতঙ্কে বিস্ময়ে কাঠ। ধ্রুবর চোয়াল শক্ত হয়ে গেল।

কে দরজা খুলে সোনালির ঘরে ঢুকে ওর মাথার কাছ থেকে স্কার্ফটা নিয়ে গলায় পেঁচাতে থাকে। ধ্রুব বেরোবার পর তখন সোনালির একটু ঘুম এসেছিল ফের–সে কিছু টের পায়নি। হঠাৎ দম আটকে আসায় সে জেগে ওঠে। তারপর দ্যাখে, কে ওর বুকে বসে গলায় স্কার্ফটা পেঁচাচ্ছে। দম আটকে যেতে থাকে সোনালির। যথাশক্তি দুহাতে ও নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করে কিন্তু পারে না।

লোকটার মুখে কালো রুমাল ঢাকা ছিল। চিনতে পারেনি। কিন্তু তার গায়ের জোর প্রচণ্ড। ধ্রুবও টের পেয়েছে। এবং চিনতে পারেনি সেও।

হ্যাঁ–এটা স্পষ্ট, সোনালিকে শ্বাসরুদ্ধ করে খুন করতে এসেছিল সে। ভাগ্যিস, ঠিক সময়ে ধ্রুব এসে পড়েছিল। তা না হলে সোনালিকে এতক্ষণ লাশ হয়ে পড়ে থাকতে হত বিছানায়।

কিন্তু কেন সোনালিকে খুন করতে এসেছিল সে? কে সে? সেই কি ললিতা কিংবা সঞ্জয়ের হত্যাকারী? সোনালিকে খুন করে কী উদ্দেশ্য চরিতার্থ হত তার?

নানা প্রশ্ন সবার মাথায় ভিড় করে এল। বাকি রাতটা আর কেউ ঘুমোল না।…

.

সকাল হলো। কিন্তু আবহাওয়া বিশ্বাস্যভাবে চমৎকার। দুরন্ত তুষারঝড় আর নেই। আজ সূর্যের চেহারা দেখা যাচ্ছে মাঝে মাঝে। বরফ পড়া প্রায় বন্ধ। কেবল কুয়াশার আবছায়া ঘুরে বেড়াচ্ছে সবখানে। গাছের পাতা আর ঘরবাড়ি থেকে চাপচাপ বরফ খসে পড়ার জন্যে ধোঁয়াটে হয়ে যাচ্ছে রোদটা। চমৎকার অনুকূল আবহাওয়া স্কিয়ারদের পক্ষে। কিন্তু স্কি আপাতত বন্ধ। পুলিস কাকেও বিনা অনুমতিতে বেরোতে দেবে না।

ধ্রুবর ঘরে কর্নেল এসে ব্রেকফাস্ট সেরেছেন। সোনালি কিন্তু রাতের সেই ভয়ঙ্কর দুর্ঘটনা একেবারে ভুলে বসেছে যেন। যথারীতি হাসিখুশি দেখাচ্ছে। ওকে। ধ্রুব শুধু অসম্ভব গম্ভীর।

অনেকক্ষণ ধরে সে কর্নেলের সঙ্গে হত্যা রহস্যের আলোচনায় ব্যস্ত থেকেছে। সোনালিকে খুঁটিয়ে প্রশ্ন করে জানতে চেয়েছে অনেক কিছু। সোনালির জবাব খুব ভাসা ভাসা। কর্নেলের ধারণা, সোনালি নিজের অবচেতনার মধ্যে খুনী সম্পর্কে কোন মারাত্মক তথ্য জানে–খুনী সেটা টের পেয়েছে বলেই তাকে হত্যা করতে চায়। তাই সোনালিকে অত প্রশ্ন করা। কিন্তু সোনালির জবাবের মধ্যে তেমন কোন সূত্র পাওয়া যাচ্ছে না। ধ্রুব বিরক্ত।

একসময় কর্নেল বললেন, যাই হোক, ধ্রুব–তুমি কক্ষনো সোনালিকে একা কোথাও যেতে দিও না! সোনালি, তুমি সাবধান হও। তোমার ওপর আবার একটা চেষ্টা করতে পারে খুনী। দিস ইজ সিরিয়াস।

সোনালি খিলখিল করে হেসে উঠল, ভ্যাট।

উঁহু–এত হালকাভাবে নিও না ব্যাপারটা। সম্ভবত খুনী ক্রমশ মরিয়া হয়ে উঠেছে।

ধ্রুব বলল, কর্নেল, আপনি বলছিলেন–বাস্কেটের মধ্যেই রহস্যের চাবিকাঠিটি রয়েছে। কিন্তু বাস্কেট দুটো তো পাওয়া গেছে।

কর্নেল বললেন, হ্যাঁ–পাওয়া যেতই। কিন্তু এভাবে পাওয়া যাবে, আমি মোটেও ভাবিনি। খুনী ভীষণ চতুর বোঝা যাচ্ছে। তবে ধ্রুব, এই তিন নম্বর সেটের বাস্কেট নিয়ে সে-রাতে তোমার সঙ্গে পাহাড়ে লড়াই হয়নি খুনীর–সে বিষয়ে আমি নিশ্চিত। সেই বাস্কেটটা ছিল খুনীর নিজের স্কি-পোলের।

তার মানে?

সেদিনকার খুনের ঘটনাটা মনে মনে সাজিয়ে নাও। বেশি কল্পনার দরকার নেই। কারণ আমাদের হাতে প্রচুর ফ্যাক্টস রয়েছে। খুনী হুইল চেয়ারে ললিতাকে খুন করে। তার সেই হত্যার ইনস্ট্রমেন্ট অর্থাৎ একটা স্কি-পোলের বাস্কেটটা পাহাড়ের ওপর পড়ে যায়। ওই বাস্কেটে তার সেট নাম্বার খোদাই ছিল। তাই রাতে সে সেটা কুড়িয়ে আনতে যায় এবং তোমার সঙ্গে ধস্তাধস্তি করে সেটা হাতায়। এবার হুইল চেয়ারে ফেরা যাক আবার। একটা স্কি-পোলে ললিতাকে হত্যা করল সেতার হাতে তখন রইল আরেকটা স্কি-পোল। ওই একটা দিয়েই সে কি করে অনেক দূর চলে যায়। তারপর সবার অজান্তে ঘুরপথে ট্রেনিং ক্যাম্পের পিছনের জঙ্গলে আসে। লিফটম্যানের সঙ্গে তার দেখা হয়ে যায়। তাই না?

হ্যাঁ বলুন।

আগের প্ল্যান মতো সে স্টোরের পিছনের দেয়ালে কাটা কাঠের টুকরো সরিয়ে শ্রীবাস্তবের স্কি-পোল দুটো নেয়।

কেন?

মনে রেখো–তার দ্বিতীয় লক্ষ্য সঞ্জয়কে খুন করা। এবং যেভাবেই হোক, সে জানত–সঞ্জয় টেলি পেয়েই গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে গেছে টোগাড়ির পথে। স্টোরের পিছনের সমতল জায়গার পর দুমাইল বিপজ্জনক পথ তাকে স্কি করে যেতে হবে এবং ফিরতে হবে। কাজেই দুটো স্কি-পোল তার দরকার। তার নিজের স্কি-পোল তো মার্ডার ইনস্ট্রমেন্ট–কোন মতে আলগাভাবে বাস্কেটে বসানো রয়েছে মাত্র। এখন তার একটা জরুরী কাজ হাতে রইল। তা হলো শ্রীবাস্তবের পোল থেকে বাস্কেট দুটো খুলে নিজের বাস্কেট দুটো পরানো। ব্যস, আর কোন ঝামেলা রইল না।

কিন্তু শের সিং স্কিসেট ফেরত জমা নিয়েছিল সেদিন–যতটা আমার মনে পড়ছে, প্রায় আড়াইটে নাগাদ। খুনের গণ্ডগোলের দরুন সবাই ব্যস্ত ছিল। একসঙ্গে নিশ্চয় কেউ ফেরত দ্যায়নি। শের সিংকে ডাকব?

ডাকো। ব্যাপারটা পরিষ্কার হওয়া ভালো।

ধ্রুব বেরিয়ে গেল এবং তক্ষুনি শের সিংকে নিয়ে ঢুকল।..শের সিং আমাদের কাছেই আসছিল।

শের সিং সেলাম দিয়ে দাঁড়াল। কর্নেল বললেন, বসো শের সিং। তোমাকে খুঁজছিলাম।

শের সিং বলল, দিদিজির জন্যে সব সময় আমি আশেপাশে আনাগোনা করছি, স্যার। আমার চোখ ফাঁকি দিতে আর কেউ পারবে না।

সেজন্যে নয় শের সিং। তোমাকে একটা কথা জিগ্যেস করব!

নিশ্চয়। বলুন।

খুনের দিন তুমি কটা নাগাদ স্কিয়ারদের বা ইনস্ট্রাক্টারদের স্কিসেট জমা নিয়েছিলে?

দেরি হয়েছিল, স্যার। তখন তো হইচই চলেছে। একে একে ডেকে জমা নিতে অনেক দেরি হয়েছিল। স্কিসেট নিতে তিনটে বেজে যায়।

শেষ জমা কে দিয়েছিল? কত নম্বর?

একজন নতুন স্কিয়ার–প্যাটেল। রণজিৎ প্যাটেল। সেট নাম্বার নয়।

প্রত্যেকটার সেট নাম্বার নিশ্চয় মিলিয়ে দেখেছিলে?

নিশ্চয়।

ইসু রেজিস্টারের সঙ্গে মিলিয়ে নিয়েছিলে?

শের সিং একটু ইতস্তত করে বলল, না স্যার-রেজিস্টার খোলা দরকার মনে করিনি। ফেরত নেবার সময় কোন দিনই রেজিস্টার মিলিয়ে দেখিনি। ইসুটাই তো জরুরী–সই দিয়ে নিতে হয় স্কিয়ারদের। সিজন শেষ হলে তখন মিলিয়ে নিই। কারণ তখন সবাই সেন্টার থেকে বিদায় নিয়ে চলে যায়।

শের সিং, এমনও তো হতে পারে, কেউ তার সেট ফেরত দিল না কোনদিন?

শের সিং একটু ভেবে বলল, তা অসম্ভব নয়। কিন্তু অত ঝামেলা করে কে আর স্কিসেট নিজের ঘরে বয়ে নিয়ে যাবে? সবাই তো স্কি শেষ হলে জমা দিয়ে যায়।

ধরো–এমনও হতে পারে, খুনের দিন কেউ সেট ফেরত দ্যায়নি?

আমি অবশ্য অত গুনে দেখিনি–শুধু নম্বর মিলিয়ে রাখা ছাড়া। কারণ, বুঝতেই পারছেন–অমন একটা খুন-খারাপি হয়ে গেছে তখন। কোনরকমে তাড়াহুড়ো করে জমা নিয়েছি মাত্র।

…একটু ভেবে কর্নেল আপন মনেই বললেন, খুনের দিন অবশ্য অনেককেই বগলে স্কি আর স্কি-পোল নিয়ে হোটেলে লনে সবখানে ঘুরে বেড়াতে দেখেছি আমরা। তখন তো সবাই ভীষণ উত্তেজিত ছিল।

হ্যাঁ স্যার। আমিই তো সবাইকে তাড়া দিয়ে সেট জমা নিয়েছিলুম।

তাহলে সেই সময় কেউ তার স্কিসেট নিয়ে নিজের ঘরে ঢুকলেও আমরা অতটা লক্ষ্য করিনি। তাই না? ধ্রুব কী বলো?

ধ্রুব বলল, ঠিক বলেছেন। আমিও তো স্কিসুদ্ধ অফিসে গিয়ে ঢুকেছিলুম।

এবং কেউ জমা না দিলেও শের সিং টের পায়নি।

শের সিং চিন্তিত মুখে বলল, হ্যাঁ–তাও সম্ভব।

কর্নেল সোজা হয়ে বসলেন হঠাৎ… কিন্তু শের সিং, তার পরদিন কি কেউ তোমাকে স্কি সেট জমা দিতে গিয়েছিলেন? মানে গতকাল?

না, স্যার!

তুমি একবার দেখবে–রেজিস্টারের সঙ্গে মিলিয়ে? সবার সেট জমা পড়েছে কি না।

এক্ষুনি দেখে আসছি। বলে শের সিং বেরিয়ে গেল।

.

ডাইনিং হলে সবাই লাঞ্চ খাচ্ছে, তখন শ্রীনগর থেকে বিশেষ তদন্তটিমটি এসে গেছে জানা গেল। বিশেষজ্ঞরা এসেছেন সরেজমিন তদন্তে। ললিতা ও সঞ্জয়ের অভিভাবকরা উচ্চবর্গীয় মানুষ। মন্ত্রিসভা অব্দি কাঁপিয়ে দেবার ক্ষমতা আছে তাঁদের। পুলিসের গোয়েন্দা ও ফোরেনসিক বিভাগ শশব্যস্তে দৌড়ে এসেছে। দুগালও এসেছে ওঁদের সঙ্গে।

বিকেলে কর্নেল ইউসুফ তেঙের কাছে একটা অদ্ভুত খবর জানতে পারলেন। ললিতার বদ্ধ দাঁতের ফাঁকে এক চিলতে চামড়া পাওয়া গেছে–সে চামড়া খুনীর গায়ের। তার মানে ললিতা খুনীর শরীরের কোথাও কামড়ে ধরেছিল নিজেকে বাঁচাতে। কিন্তু কোন অংশের চামড়া হতে পারে? সারা শরীর তো পুরু পোশাকে ঢাকা ছিল সকলের। বিশেষজ্ঞদের মতো চামড়াটা খুনীর কঁধ বা গলার। কারণ–শরীরের ওই অংশে মাত্র একটা স্কার্ফ জড়ানো ছিল। চামড়াটা মুখেরও হতে পারে–তবে এ বিষয়ে এঁদের মধ্যে মতভেদ আছে। তাছাড়া চামড়ায় যে রক্ত পাওয়া গেছে, তা ললিতার নয়। র বিশ্লেষণ করে দেখেছেন। ওঁরা। ও রক্ত অন্য গ্রুপের।

তাহলে খুনীর গলায় বা ঘাড়ে ক্ষতচিহ্ন থাকবেই। এখানে কারো গলা বা ঘাড়ে সেই ক্ষতচিহ্ন আছে? পুলিস কি এবার প্রত্যেকের শরীর হাতড়াবে?

শ্রীবাস্তবের দুর্ভাগ্য। ধ্রুব দৌড়ে এল কর্নেলের কাছে। শের সিং সোনালিকে পাহারা দিচ্ছে। ধ্রুব চুপিচুপি বলল, কর্নেল, আমারই ধারণা সঠিক প্রমাণিত হয়েছে। শ্রীবাস্তবের গলা আর চোয়ালের মধ্যে একটা টাটকা কাটা দাগ রয়েছে–প্লাস্টার করা ছিল। আশ্চর্য, আমরা তো সবাই দুদিন থেকে ওর প্লাস্টারটা দেখেছি। কিছু টের পাইনি।

বল কী! কর্নেল নিরাসক্তভাবে বললেন। 

হ্যাঁ–ওকে তো গোড়া থেকেই পুলিস সন্দেহ করে রেখেছিল। সব খোঁজখবর করার পর ডিটেকটিভ অফিসারদেরও সন্দেহ ওর ওপর গিয়ে পড়ে। তারপর ওর প্লাস্টারটাই ওকে খেল।

ওকে কি অ্যারেস্ট করল খুনের দায়ে?

বলেন কী! হাতে হাতকড়া পরিয়ে দিয়েছে। এক্ষুনি নিয়ে যাবে।

 ক্ষতচিহ্নের জন্যে? আশ্চর্য তো!

আপনি কী বলছেন ঠিক বুঝতে পারছিনে কর্নেল। এতে আশ্চর্যের কী আছে?

 হুম! শ্রীবাস্তব কী কৈফিয়ত দিল ক্ষতচিহ্নের?

আবার সেই গোয়েন্দাগিরি! ভ্যাট! মামা, আপনি ওসব ছাড়ুন তো এবার। শ্রীবাস্তব খুন করে ধরা পড়েছে–চুকে গেল।

না সোনালি–প্লিজ। দিস ইজ ভেরি ইম্পরট্যান্ট।

শের সিং পট হাতে ঢুকল। সোনালি বলল, এত শিগগির পাওয়া গেল?

শের সিং বলল, নিচে যজ্ঞ হচ্ছে যে। সব সময় কফি তৈরি রাখতে হচ্ছে। অফিসাররা যাবার আগে গরম হয়ে বেরোতে চান কিনা।

ধ্রুব এল সেই সময়।

কর্নেল বললেন, ধ্রুব, বসো। দিস ইজ এ সিরিয়াস কনফারেন্স।

 ধ্রুব হাসলো…কনফারেন্স! কিসের?

হত্যা রহস্যের। কর্নেল গম্ভীর মুখে বললেন…শের সিং, মাই বয়, প্লিজ একবার পুলিস অফিসার মিঃ ইউসুফকে খবর দেখে তার সঙ্গে আমার কথা হয়েছে। খবর দিলেই আসবেন।

শের সিং বেরিয়ে গেল তক্ষুনি। সোনালি কফি ভাগ করে দিতে দিতে বলল, মামা, আপনি বড্ড গোলমেলে মানুষ। হত্যারহস্য দিব্যি সমাধান করল পুলিস– বাই দা বাই, ধ্রুব, শ্রীবাস্তব সায়েবের পায়ের জখম নিশ্চয় মিথ্যে তাহলে?

এখনও সেটা জানা যাচ্ছে না। ডাক্তারি পরীক্ষা হলে ধরা পড়বে।

 বারে! তাহলে ওকে ধরল যে?

গালের নিচে ক্ষতচিহ্নই তো বড়ো প্রমাণ। ললিতার দাঁতের কামড়ে যে চামড়া পাওয়া গেছে…

সোনালি হাত তুলে থামাল ওকে। ভুরু কুঁচকে বলল, ললিতা খুনীকে , কামড়ে দিয়েছিল, তার দাঁতে খুনীর চামড়া আছে–সবাই জেনেছে। কিন্তু ক্ষত চিহ্ন থাকলেই যে সে খুনী হবে… বলতে বলতে হঠাৎ থেমে গেল সোনালি। তার মুখটা কেমন বদলে গেল। উত্তেজিত দেখাল তাকে। বিড়বিড় করে বলল, ললিতা কামড়েছিল…ক্ষতচিহ্ন..

কর্নেল ওর দিকে স্থিরদৃষ্টে তাকিয়েছিলেন, হুম! সোনালি?

সোনালি লাফিয়ে উঠল।..মামা, মামা! আমি বুঝতে পেরেছি, কেন খুনী আমাকে গতরাতে খতম করতে চাইছিল।

ধ্রুব হাঁ করে রয়েছে।

কর্নেল বললেন, কেন?

আমি তার গলার একপাশে পিঠের দিকে একটা ক্ষতচিহ্ন দেখতে পেয়েছিলুম। শুধোলে সে আমাকে বলেছিল–স্কি করতে গিয়ে গাছের শুকনো ডালের খোঁচা লেগেছিল। মামা, আশ্চর্য, ভারি আশ্চর্য। কিন্তু…

কর্নেল বললেন, কে সে?

সোনালি স্তম্ভিত মুখে বলল, কিন্তু তা তো অসম্ভব–মানে, ও কেন সঞ্জয় বা ললিতাকে খুন করবে?

তার নাম বলো, সোনালি!

ধ্রুব বিরক্ত মুখে বলল, বড় জট পাকাতে ওস্তাদ। সোজা বলো না বাবা-শ্রীবাস্তব, না মিঃ প্রসাদ, না মিঃ ভেঙ্কটেশ, না মিস রিটা, না মিস প্রভাবতী? তোমাকে তো সবার সঙ্গেই দেখেছি আড্ডা দিতে।

সোনালি কড়ামুখে বলল, তুমি থামো!

কর্নেল সস্নেহে বললেন, সোনালি, তার নাম কী?

বলছি। বলে সোনালি হেঁট হয়ে কফির কাপ ওঁর হাতে এগিয়ে দিল।…

.

ওরা একটু পরেই নিচে নামল। রিস্তা ক্যাম্পের পুলিস অফিসার ইউসুফ তেঙ দৌড়ে গিয়ে গেটের কাছে ডিটেকটিভ অফিসারটির কানে কিছু বললেন। পুলিসের গাড়ির সবে স্টার্ট দিতে যাচ্ছিল, চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল। গাড়িটি প্রিজন ভ্যান নয়–স্টেশনওয়াগন। তার মধ্যে শ্রীবাস্তব বন্দী। দুজন সশস্ত্র সেপাই তার দুপাশে বসে রয়েছে।

ডিটেকটিভ অফিসার কর্নেলের সঙ্গে কিছু পরামর্শ করলেন। একটু তফাতে লনের ওপর ভিড় করে ট্রেনিং সেন্টারের লোকজন দাঁড়িয়ে রয়েছে চুপচাপ। তাদের মধ্যে সোনালিও রয়েছে–রিটা মবলঙ্করের কাঁধে তার হাত। সোনালিই কেবল রিটাকে চাপা গলায় হেসে-হেসে কিছু বলছে। রিটাও হাসছে–তবে। নিঃশব্দে। খুনী চালান যাচ্ছিল, হঠাৎ কী কারণে অফিসাররা আবার ব্যস্ত হয়ে পড়লেন এবং ফিসফিস করে কী পরামর্শ করছেন–সবাই তা দেখে বিস্মিত এবং কৌতূহলী।

ওরা আরও অবাক হলো। বন্দী শ্রীবাস্তবকে গাড়ি থেকে নামানো হচ্ছে। কী ব্যাপার? গুলাব সিং ভিড়ের দিকে আসছিল। সোনালি তাকে জিজ্ঞেস করল, কী হলো মিঃ সিং? আপনাদের আসামীকে নামানো হলো যে গাড়ি থেকে? চালান দিচ্ছেন না?

গুলাব সিং অকারণ গলা চড়িয়ে ঘোষণা করলেন, এইমাত্র ওয়ারলেসে খবর এসেছে, রাস্তায় ধস নেমেছে–গাড়ি যাবে না।

স্কিয়াররা হইচই করে উঠল। সর্বনাশ, তাহলে সব ফিরে যাবে কেমন করে? আগামীকাল সকালে সবাই যে-যার জায়গায় ফিরে যাবার জন্যে তৈরি হয়ে রয়েছে। অনেকে বোঁচকাকুঁচকি বেঁধে ফেলেছে ইতিমধ্যে। আর এ অভিশপ্ত স্কি কেন্দ্রে একমুহূর্তও থাকার ইচ্ছে নেই কারও। হঠাৎ রাস্তায় ধস নামার দুঃসংবাদে সবাই উত্তেজিত হয়ে উঠেছিল।

ধস কোন জায়গায় নেমেছে–কত মাইলে এবং শিগগির রাস্তা মেরামত করার সম্ভাবনা আছে কি না এইসব প্রশ্নের উত্তর দিতে দিতে গুলাব সিং প্রায় কোণঠাসা হয়ে পড়ল। তাকে ঘিরে স্কিয়ারদের ভিড় হোটেলে গিয়ে ঢুকল।

এতক্ষণ কর্নেল, ইউসুফ তেঙ, ডিটেকটিভ অফিসার মিঃ রাঘবন, ফোরেনসিক বিশেঃ উঃ শর্মা, ধ্রুব চৌধুরী তার কি ট্রেনিং সেন্টারের কর্তা মিঃ দুগাল আরেকটা ভিড় করে বাইরে গেটের কাছে কথা বলছিলেন। সেপাইরা কাকেও সেদিকে এগোতে দিচ্ছিল না। এখন ওঁরা সবাই অফিসে গিয়ে ঢুকলেন।

শ্রীবাস্তবকে আবার অফিসঘরে নিয়ে গিয়েছিল পুলিস। হঠাৎ দেখা গেল, সে ক্রাচে ভর করে করিডর পেরিয়ে ডাইনিং হলের দিকে চলেছে। স্কিয়াররা আরেকদফা অবাক হলো। তারা গুলাব সিংকে ঘিরে ইতিমধ্যে ডাইনিং হলে ঢুকেছে। কফি খাওয়া চলেছে চূড়ান্তভাবে। শ্রীবাস্তব ঢুকে বলল, হ্যাল্লো লেডিজ অ্যান্ড জেন্টলমেন!

সবাই মুখ তাকাতাকি করতে লাগল। হলে তখন অগাধ স্তব্ধতা। কেবল সোনালি জনান্তিকে মুখ টিপে হেসে একবার শের সিং-এর দিকে কটাক্ষ করল। শের সিং সব সময় তার কাছে-কাছে ঘুরছে কর্নেল আর ধ্রুবর নির্দেশে।

শ্রীবাস্তব বলল, আপনারা নিশ্চয় খুব অবাক হয়েছেন আমাকে ওঁরা হঠাৎ ছেড়ে দিলেন দেখে। তাই না? হ্যাঁ–এখন আমি আপনাদের মতনই একজন মুক্ত মানুষ।

কেউ টু শব্দটি করছে না। শ্রীবাস্তবের ঠোঁটের কোনায় অদ্ভুত একটু হাসি ফুটে উঠল। সে বক্তৃতার ঢঙে গম্ভীর এবং উদাত্ত গলায় ফের বলতে থাকল, মাননীয় ভদ্রমণ্ডলী এবং ট্রেনিং সেন্টারের সহকর্মী বন্ধুগণ! পাপ কখনও চাপা থাকে না। বাইবেলে বলা হয়েছে–পাপের বেতন মৃত্যু। আমি কোন পাপ করিনি বলেই ঈশ্বরের করুণায় এখন আমি মুক্ত মানুষ।

ভিড় থেকে লিফটম্যান বলে উঠল, মিঃ শ্রীবাস্তব, আপনিই কিন্তু আট নম্বর রুমের ইলেকট্রিক লাইন নিজের হাতে কেটে রেখেছিলেন। মেঝেয় ফুটো। করেছিলেন। নিচের ঘরে মিস টোড়মলের বিছানায় লক্ষ্য রাখবার জন্যে। আমি নিজের চোখে আপনাকে এসব করতে শুধু দেখিইনি–আমার মুখোমুখি ধরাও পড়েছিলেন। আপনার সৌভাগ্য যে পুলিসকে এখনও তা বলিনি! বলে সে অদ্ভুত মুখভঙ্গি করে হেসে উঠল।

শ্রীবাস্তব একটুও ঘাবড়াল না। বলল, খুব সত্যি। টেন্ডুলকার, তুমি একটুও মিথ্যে বলোনি। তোমার মুখ চাপা দেবার জন্যে তোমাকে আমি প্রচুর টাকা ঘুষও দিয়েছি–সেটা ভুলে যেও না।

লিফটম্যান টেন্ডুলকার বিকৃতমুখে বলল, আপনার টাকা আমি এখনই ফেরত দিতে প্রস্তুত আছি, স্যার। চান তো এক্ষুনি দিয়ে দেব।

শ্রীবাস্তব হঠাৎ গর্জে উঠল, টেন্ডুলকার! ললিতা টোডমল আমার বাগদত্তা স্ত্রী। ওই বাঁচাল শুয়োরের বাচ্চা সঞ্জয় ওয়াড়েকার তার পিছনে জোঁকের মত ঘুরত। আমি তাই আট নম্বরের মেঝের ফুটো দিয়ে রিভলবারের নল তৈরি রাখতে চেয়েছিলুম–যদি তাকে ললিতার বিছানায় দেখতে পাই, তাহলে গুলি করে মারব। কিন্তু সে-সুযোগ পেলুমই না।..

টেন্ডুলকার বলল, পরে তো পেয়েছিলেন। স্কি-পোল বিঁধিয়ে…

 শ্রীবাস্তব আরও জোরে চেঁচিয়ে উঠল, শাট আপ মিথ্যেবাদী।

আমি নিজের চোখে দেখেছি।..টেন্ডুলকার হেসে উঠল।

 কী, কী? একটু এগিয়ে এল শ্রীবাস্তব তার দিকে।

টেন্ডুলকার দমল না। নির্বিকারভাবে বলল, হ্যাঁ–আমি আপনাকেই লাফ দিয়ে মিস টোডমলের পাশে বসতে দেখেছি হুইল চেয়ারে। তারপর একটামাত্র পোল নিয়ে আপনি বাঁধের নিচেকার জঙ্গলে স্কি করে স্টোরের দিকে যাচ্ছিলেন। আমি খুব অবাক হয়েছিলাম। তারপর দৌড়ে গিয়ে আপনাকে ধরে ফেললাম আপনি আবার আমাকে মোটা টাকা বকশিশের লোভ দেখালেন। তারপর…

হল খুব স্তব্ধ। দরজার ওপাশে কর্নেল, ধ্রুব, মিঃ দুগাল আর ডঃ শর্মা প্রমুখ। অফিসাররা এসে দাঁড়িয়ে রয়েছেন কখন–এবার দেখতে পেল সবাই।

শ্রীবাস্তবের মুখটা আস্তে আস্তে লাল হয়ে গেল। কিন্তু সে প্রচণ্ড চেষ্টায় নিজেকে শক্ত রেখে বলল, সত্যি নাকি টেন্ডুলকার? তাহলে তো দেখছি, তুমি একজন জব্বার প্রত্যক্ষদর্শী। একমাত্র প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষী তুমিই। কিন্তু কই, তুমি তো পুলিসকে এসব তথ্য জেরার সময় জানাওনি। বলেছ নাকি যে তুমি চিনতে পারোনি সেই এক পোলওয়ালা স্কিয়ারকে। কেন টেন্ডুলকার? মোটা টাকা পাবার প্রতীক্ষায় ছিলে বলে? বেশ চমৎকার। তাহলে এখনই বা বলছ কেন? টাকা আমি দিইনি তাই–কেমন?…শ্রীবাস্তব একটু হাসল। ঠোঁটের কোনায় বিদ্রূপ। …টেন্ডুলকার, পুলিস এখন আমাকে বেকসুর খালাস দিয়েছে। তুমি যতই আমার নামে মিথ্যে সাক্ষী দাও–জিজ্ঞেস করো ওঁদের, ওঁরা আমাকে আর গ্রেপ্তার করতে রাজি নন। কারণ, জানো না-হঠাৎ ওঁরা এমন মারাত্মক প্রমাণ পেয়েছেন, যাতে খুনীকে স্পষ্ট জানা গেছে।

টেন্ডুলকারের মুখ সাদা হয়ে গেল হঠাৎ। অস্ফুট স্বরে বলল, কে–কে খুনী?

যাকে তুমি বাঁধের নিচেকার জঙ্গলে সেদিন খুনের পরই দেখতে পেয়েছিলে?

সে তো আপনি!

 চুপ মিথ্যেবাদী!

বা রে! আপনাকে তাড়া করে ধরে ফেললুম–কারণ, আপনার একটা মাত্র স্কি পোল এবং সেটা বার বার বাস্কেট থেকে খুলে যাচ্ছিল। তাই জোরে এগোতে পারছিলেন না। তাছাড়া গাছের কাটা গুঁড়ি বরফের ঢিপির মতো ছড়িয়ে থাকার দরুন আপনার স্কি বাধা পাচ্ছিল–আছাড় খাবার উপক্রম হচ্ছিল আপনার। তারপর আপনার কাছাকাছি যেতেই আপনি বকশিশের লোভ দেখালেন!

শ্রীবাস্তব খেপে গিয়ে বলল মিথ্যা, মিথ্যা কথা!

টেন্ডুলকার দমল না।…মিথ্যে কথা! কেন? ঠোঁটে আঙুল রেখে ইশারায় চুপ করতে বললেন না? তারপর স্কি-পোলটা গায়ে ঠেক রেখে দুহাতের সবগুলো আঙুল দেখালেন। তখন আমি বললাম, কত? দশ মানে? আপনি দস্তানাপরা আঙুল অনেকটা ফাঁক করে পরিষ্কার দশটা আঙুল দেখালেন। আমি বললাম, দশ হাজার? আপনি তখন মাথা দোলালেন। আমি চলে যেতে দিলাম আপনাকে। ইচ্ছে করেই দেরি করলাম–যাতে আপনি পেছন ঘুরে নিরাপদে অফিসে পৌঁছতে পারেন।

শ্রীবাস্তব বলে উঠল, ওঃ হো! তাই তুমি আমাকে অফিসে ললিতার খুনের খবর দেবার পর ফিসফিস করে বলেছিলে–কখন পাচ্ছি স্যার? আমি ভাবলুম– তোমার ছুটির কথা বলে রেখেছিলে, তাই বললাম–হবে, হবে। পাবে। তুমি চলে গেলে। আসলে আমি দুগালজি ফিরে আসার পর ছুটি দেওয়া সম্ভব হতে পারে ভেবে ওকথা বলেছিলাম। আশ্চর্য তো!

ভিড় থেকে শের সিং প্রশ্ন করল, টেন্ডুলকার, মিঃ শ্রীবাস্তব তাহলে জঙ্গলে বকশিশের লোভ দেখানোর সময় তোমার সঙ্গে মুখে কথা বলেননি–ইশারায় বলেছিলেন? তাই না?

টেন্ডুলকার মাথা দোলালো। …হ্যাঁ–অত ঠাণ্ডায় তখন দাঁত কাঁপছে।

শের সিং বলল, তাহলে কেমন করে জানলে যে উনিই শ্রীবাস্তবজি?

টেন্ডুলকার রেগে গেল।…তোমার মতো বুন্ধু নাকি আমি? আগের রাতে আট নম্বরের ফুটো দিয়ে ললিতাজিকে দেখার সময় ওঁকে হাতে নাতে ধরেছি– ঘাঁর ফিরে পঞ্চাশ টাকা বকশিশ দিয়েছেন। আর পরের সকালে ললিতাজি খুন হলেন–আর আমি ওই অবস্থায় দেখতে পেলাম আগাগোড়া–আমি তো বুঝেই নিলাম, লোকটা কে। ওতে আবার কথা বলা লাগে নাকি?

শের সিং বলল, তুমি আট নম্বরে রাতের বেলায় তাহলে ওঁকে ফলো করেছিলে। কেন টেন্ডুলকার?

আট নম্বরের ইলেকট্রিক লাইনে ফিউজ বক্স খুলতে দেখেছিলাম। মেঝেয় ফুটো করতেও দেখেছিলাম। তখনই সন্দেহ হয়েছিল–কেন উনি এমন করছে?

শ্রীবাস্তব গুম হয়ে পড়েছিল। এবার বলল, স্কিয়াররা পোশাক পরে যখন বেরোয়, তখন তাদের তুমি চিনতে পারো তাহলে! তোমার কি ভেতরে দেখার আরেকটা চোখ আছে টেন্ডুলকার?

আলবাৎ। এ লাইনে এত বছর কেটে গেল! পোশাকে ঢাকলে কী হবে? ভঙ্গি দেখেই চিনতে পারি পোশাকের ভিতরে কে আছে। টেন্ডুলকার সগর্বে হাসল।

ললিতার পাশে হুইল চেয়ারে যে উঠে বসেছিল, তার ভঙ্গি নিশ্চয় লক্ষ্য করেছিলে?

নিশ্চয়।

 সে আমি?

হুঁ-উ। পোল যখন বেঁধালেন, তখন আপনার চেয়ার সবে আমার ডানদিকে পাহাড়ের ওপর কাত হয়েছে। স্পষ্ট দেখলাম ব্যাপারটা। স্বয়ং আপনি বলেই মুখ বন্ধ করে থাকলাম।

কিন্তু টেন্ডুলকার, আমাদের নিয়ম আছে কোন ইনস্ট্রাকটারের পাশে শুধু ট্রেনি স্কিয়ারই চাপবে। ললিতা নিজে একজন ইনস্ট্রাকটার। সে তার পাশে আমার মতো একজন ইনস্ট্রাকটারকে চাপতে অ্যালাউ করবে কেন? লাইনে দাঁড়ানোর সময়ই তো আপত্তি করবে। বিশেষ করে সবাই জানে, তখন তার সঙ্গে আমার ভীষণ মন কষাকষি চলেছে। সে আমাকে পাশে নিতে ওই দুটো কারণেই চাইবে না। লাইন থেকে সরে দাঁড়াবে।

টেন্ডুলকার বলে উঠল, কী বলেন স্যার! অত বরফ পড়ার ধোঁয়া-বাতাস বইছে জোরে। কনকনে ঠাণ্ডা। তার মধ্যে কে কার দিকে লক্ষ্য রাখে?

লক্ষ্য রাখাটা জরুরী কিন্তু। ট্রেনি স্কিয়ারের জীবন-মরণ নির্ভর করে পাশের ইনস্ট্রাক্টারের ওপর। তার সাহায্য ছাড়া চলে না।

কী মুশকিল। পোশাকে আগাগোড়া ঢাকা সবাই, নাক পর্যন্ত স্কার্ফ জড়ানো, চোখে গগ–পুরুষ না মেয়ে তাই চেনা যায় না! তো মিস টোডমল কেমন করে জানবে, কে তার পাশ দাঁড়িয়ে আছে?

ঠিক বলেছ। ললিতা তো তোমার মতো ঝানু নয় যে ভঙ্গি দেখে চিনবে কে তার সহযাত্রী! ব্যঙ্গ হেসে উঠল শ্রীবাস্তব।…কিন্তু তুমি ঠিক চিনেছিলে! আচ্ছা প্রিয় লিফটম্যান সায়েব, যদি এখন সব স্কিয়ার-ইনস্ট্রক্টারদের পোশাক পরে লাইনে দাঁড় করানো হয়, তুমি চিনতে পারবে?

লিফটম্যান টেন্ডুলকার মাথা নেড়ে বলল, তার গ্যারান্টি দিতে পারি না। আমি যার-যার চলাফেরার ভঙ্গির সঙ্গে খুব পরিচিত, তাদের শনাক্ত করতে পারি। যেমন আপনাকে তো বেশি করেই পারি।

এতক্ষণে কর্নেল দরজা থেকে সরে এসে বললেন, মাই অনারেবল ফ্রেন্ড টেন্ডুলকার, আপনাকে গোটা কতক প্রশ্ন করতে চাই।

লিফটম্যান বিব্রতমুখে তাকালো ওঁর দিকে। এই কর্নেল ভদ্রলোকের প্রতি তার বরাবর কেমন অদ্ভুত ভীতি আছে। ভিড় থেকে অনেকেই বলে উঠল, করুন, করুন। রিটা মবলঙ্কর সোনালির কাঁধে হাত রেখে দাঁড়িয়েছিল। হেসে সোনালিকে বলল, ভেরি ইনটারেস্টিং জেন্টলম্যান। তাই না মিস সেন? সোনালি জবাবে শুধু হাসল।

কর্নেল বললেন, আচ্ছা মিঃ টেন্ডুলকার, ভঙ্গি দেখে চেনার কথা বলছিলেন। নিশ্চয় সেগুলো ব্যক্তিবিশেষের বিশেষ বিশেষ ভঙ্গি।

টেণ্ডুলকার মাথা নেড়ে বলল, হ্যাঁ স্যার।

শ্রীবাস্তবজির কী কী বিশেষ ভঙ্গি বলতে পারেন–যা দেখে ওঁকে অন্যের থেকে স্পষ্টত আলাদা করা যায়?

টেন্ডুলকার যেন মুখস্থ বলে দিল।…উনি লাইনে দাঁড়ানোর সময় বাঁ হাতের স্কি-পোল বগলদাবা রাখেন, ডানটার হাতল বাড়িয়ে সামনে উঁচিয়ে রাখেন। তাছাড়া আরও অনেক আছে। স্কি করার সময় উনি কখনো স্পিড দেবার মুখে হাঁটু দুমড়ে বসেন না–একটু ঝুঁকে পড়েন মাত্র। এরকম কেউ করে না। তবে সব থেকে ওঁর বিশেষ ভঙ্গি হলো–লাইনে দাঁড়িয়ে বার বার ঘুরে চারদিকে মুখ উঁচু করে তাকানো।

তাহলে ঠিক এইসব ভঙ্গি সেদিন লাইনে এবং পরে জঙ্গলে সেই স্কিয়ারের মধ্যে লক্ষ্য করেছিলেন?

আলবাৎ।

আর কার-কার বিশেষ ভঙ্গির সঙ্গে আপনি পরিচিত?

দুগালজির। তারপর ইনস্ট্রাকটার মিঃ গুটা আর মিস প্রভাবতী নিরালার।

স্কিয়ারদের মধ্যে?

সামান্য দু-একজনের।

 যেমন?

 মিঃ প্রসাদ, মিস মবলঙ্কর, মিঃ ভেঙ্কটেশ।

এঁরা এবার নতুন স্কিয়ার?

প্রসাদজি আর ভেঙ্কটেশজি আগের বছরও এসেছিলেন–একেবারে আনাড়ি নন। মিস মবলঙ্কর এবার নতুন–আনাড়ি। প্রথমদিনই অ্যাকসিডেন্ট করে ফেলেছিলেন প্রায়।

কর্নেল হাসলেন। ভিড়ের অনেকেই রিটা মবলঙ্করের দিকে তাকিয়ে হেসে উঠল। রিটা অপ্রস্তুত মুখে বলল, আমি সার্কাসের মেয়ে। কিন্তু কী দুর্ভাগ্য, স্কিতে একেবারে যাকে বলে–আই ওয়াজ বর্ন ইয়েস্টারডে!

টেন্ডুলকার রিটার দিকে তাকিয়ে বলল, উনি পোশাক পরলেই হোঁচট খান– আর স্কি-পোল ধরে থাকেন–ঠিক এইভাবে… বলে সে ভঙ্গি দেখিয়ে দিল।

আরও হাসি শোনা গেল চারপাশে। কেবল শ্রীবাস্তব গম্ভীর।

টেন্ডুলকার ফের বলল, আর যখন ঝাঁপ দেবেন–তখন দেখে মনে হয় স্রেফ পাখি হয়ে যাচ্ছেন। দুটো স্কি-পোল একেবারে দুপাশে ছড়িয়ে…

রিটা চটে মটে উঠল, দিস ইজ ক্যারিকেচার! ইট শুড নট বি অ্যালাউড। তারপর হনহন করে বেরিয়ে গেল।

কর্নেল বললেন, আচ্ছা টেন্ডুলকার, কোন স্কিয়ার ইনস্ট্রাকটার যদি অবিকল শ্রীবাস্তবজির ভঙ্গিতে লাইনে দাঁড়ায়, চেয়ারে ওঠে, কিংবা স্কি করতে থাকে– তুমি তাহলে নিশ্চয় শ্রীবাস্তবজী বলে ভুল করবে?

টেন্ডুলকার ভেবে, একটু ইতস্তত করে বলল, ভুল হতে পারে স্যার। তা হওয়া স্বাভাবিক স্বীকার করছি।

ভালো করে ভেবে বলো।

 হ্যাঁ–ভুল হবেই। কিন্তু…

 কোন কিন্তু নয়–স্পষ্ট বলো, ভুল হবে কি না?

 হবে স্যার।

বেশ–সেদিন যদি অন্য কেউ ললিতাকে…।

টেন্ডুলকার উত্তেজিতভাবে বাধা দিয়ে বলল, অন্য কেউ নয় স্যার। কেন অন্য কেউ শ্রীবাস্তবজির ভঙ্গি নকল করবে?

নকল করবে কারণ সে খুনী এবং খুনের দায় শ্রীবাস্তবজির কাঁধে চাপাতে চায়।

কিন্তু আট নম্বর রুমে শ্রীবাস্তবজি..

এবার কর্নেল বাধা দিয়ে বললেন, টেন্ডুলকার, যে তোমার মুরগির ডিমগুলো চুরি করেছে, সেই যে তোমার মুরগিটাও পরে চুরি করল–তার কি মানে আছে?

স্যার। বড্ড ধাঁধায় পড়ে গেছি।

তুমি যাকে স্পষ্ট আলোয় হাতে-নাতে ডিম চুরি করতে ধরেছ, পরে অন্ধকারে যখন তোমার মুরগি চুরি যাচ্ছে–তখন সে যে সেই চোরটাই বটে, তোমার নিশ্চয় ধারণা হবে। তাই না?

হ্যাঁ স্যার, নিশ্চয় তা হবে। সেটাই স্বাভাবিক।

কিন্তু এই মুরগি চোর অন্য লোক হতেও পারে। ভেবে দ্যাখো।

তা পারে স্যার।

তুমি মূলত একজন সৎ লোক টেণ্ডুলকার–কিন্তু তোমার টাকার লোভ প্রচণ্ড

আমি খুব গরিব মানুষ স্যার। পহেলগাঁওয়ে আমার একদল পুয্যি আছে।

বুঝতে পারছি। কিন্তু টেন্ডুলকার, ফ্যামিলিম্যান বলেই তুমি একজন অত্যন্ত দায়িত্বশীল নাগরিক দেশের। প্রকৃত খুনীকে ধরিয়ে দেওয়া তোমার কর্তব্য।

কিন্তু শ্রীবাস্তবজি যদি খুনী না হন, কে সেই খুনী? আমি আর কেমন করে জানব স্যার?… লিফটম্যান বিপন্নমুখে তাকালো।

 জানো। একমাত্র তুমিই প্রত্যক্ষদর্শী। এবং তুমিই চেষ্টা করলে খুনীকে কখনও বের করতে পারবে। অবশ্য আমরা ইতিমধ্যে কিছুটা জেনেও ফেলেছি। শুধু…

টেন্ডুলকার আহত স্বরে বলল, আপনারা যদি জানেন, কে আসল খুন তাহলে আমার ওপর জুলুম করছেন কেন?

জুলুম নয়। তোমার সহযোগিতা চাইছি ভাই। খুনী কে আমরা জানি– কিন্তু তাকে আইনত ন্যায্য শাস্তি পাইয়ে দিতে হলে ভারতীয় বিচার পদ্ধতি অনুসারে প্রত্যক্ষ সাক্ষ্য চাই। ফোরেনসিক পরীক্ষায় যা সামান্য একটু তথ্য পাওয়া যেতে পারে, তা অনেকসময় পারিপার্শ্বিক সাক্ষ্যের জোর থাকলেও প্রমাণ করা অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। তাছাড়া এক্ষেত্রে প্রত্যক্ষ সাক্ষী যখন একজন পাওয়ার সম্ভাবনা–তখন সে চেষ্টা আমরা ছাড়তে চাইনে টেন্ডুলকার।

টেন্ডুলকার বিপন্নমুখে একটু চুপ করে থেকে বল, কিন্তু আমার সব গুলিয়ে যাচ্ছে। কিছু বুঝতে পারছিনে।

তুমি অভিজ্ঞ মানুষ। ব্যক্তিবিশেষের বিশেষ বিশেষ ভঙ্গি লক্ষ্য করার প্রবণতা তোমার আছে। তাই বলছি, তুমি ভালো করে স্মরণ করো তো টেন্ডুলকার। খুনী অবশ্যই শ্রীবাস্তবজির ভঙ্গি নকল করেছিল। কিন্তু তাহলেও তোমার দৃষ্টি এড়ানো কঠিন মনে করি। লিফটে চড়ার আগে থেকে জঙ্গলে মুখোমুখি হওয়া অব্দি সেই স্কিয়ারের আর কী বিশেষ ভঙ্গি লক্ষ্য করেছিলে– স্মরণ করো। দেখবে, ঠিক মনে পড়ে যাবে। চিনতেও পারবে।

টেন্ডুলকার তাকাল কর্নেলের দিকে।  

হ্যাঁ –জাস্ট থিংক।

টেন্ডুলকার মুখ নামিয়ে মেঝে দেখতে দেখতে ফের মুখ তুলে তাকাল।

 ইয়েস, ইয়েস মাই ডিয়ার ফ্রেন্ড। থিংক।

টেণ্ডুলকার দুটো মুঠো পাকিয়ে নিচে তাকাল। ফের মুখ তুলল।

 ইয়েস, টেণ্ডুলকার!

হঠাৎ টেন্ডুলকার লাফিয়ে উঠল। উত্তেজিত হয়ে বলল, স্যার! লাইনে দাঁড়ানোর সময় একবার কি দুবার স্কিয়ার ডান পায়ের স্কি ঘষেছিল মাটিতে!

নেক্সট?

জঙ্গলে স্কি করে যাবার সময়… হঠাৎ থামল সে।

হ্যাঁ বলো।

জঙ্গলে স্কি করে যাবার সময় মাথাটা সামনে পিছনে দোলাচ্ছিল।

এ ভঙ্গি কার টেন্ডুলকার? তুমি আগে কনভিনণ্ড হও নিজে। এক্ষুনি বলো না।

টেন্ডুলকার চারপাশের মুখগুলো দেখে নিয়ে বলল, সবার সামনে বলব স্যার?

না, না। তুমি আমার কানে কানে বলো। কর্নেল প্রায় চেঁচিয়ে উঠলেন।

টেন্ডুলকার কর্নেলের কানের কাছে মুখ আনল।…

.

রাত বারোটা। লিফটম্যান টেন্ডুলকার তার নিজের ঘরে শুয়ে রয়েছে। তার দরজায় নক করল কে। টেন্ডুলকার ঘুমোয়নি। সে উত্তেজিতভাবে দরজা খুলে দিল। অমনি মুখে কালো রুমাল ঢাকা একটি মূর্তি তার গলায় ফাঁস পরিয়ে হ্যাঁচকা টানে তাকে ধরাশায়ী করে ফেলল। টেন্ডুলকার জানত এমন একটা কিছু ঘটতে পারে–কিন্তু কিভাবে ঘটবে আঁচ করেনি। তাই সে বেমক্কা ধরাশায়ী। হয়ে গোঁ-গোঁ করতে থাকল। তার বুকে হাঁটু চেপে মূর্তিটা বসেছে।

অমনি টর্চের আলো পড়ল খাটের তলা থেকে। দরজা ঠেলে কারা সব ঢুকে গেল হুড়মুড় করে। আওয়াজ শোনা গেল–হ্যান্ডস আপ!

মুর্তিটি ঝটপট টেন্ডুলকারকে ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। কর্নেল এগিয়ে তার মুখের রুমাল সরিয়ে দিলেন একটানে। গম্ভীর গলায় মিঃ রাঘবন বললেন, রিটা মবলঙ্কর! মিস ললিতা টোডমল এবং মিঃ সঞ্জয় ওয়াডেকারকে খুন করা এবং মিস সোনালি সেন আর এই টেন্ডুলকারকে খুনের চেষ্টার অভিযোগে আপনাকে আমরা গ্রেফতার করলাম। মিঃ গুলাব সিং! এদিকে আসুন।…

.

সেই রাতদুপুরে ডাইনিং হলে আবার ভিড় জমে গেছে। কর্নেল আগাগোড়া খুনের মডুস অপারেন্ডি ইত্যাদি খুঁটিয়ে বর্ণনা করছিলেন। রিটার গোড়া থেকেই প্ল্যান ছিল শ্রীবাস্তবের ওপর খুনের দায় চাপানোর। শ্রীবাস্তবের সঙ্গে সঞ্জয়-ললিতার রেষারেষি লক্ষ্য করেছিল। তাছাড়া সম্ভবত শ্রীবাস্তব যে আট নম্বর ঘরে ইলেকট্রিক সংযোগ ছিন্ন করে মেঝেয় ফুটো তৈরি করে ললিতার ঘরে লক্ষ্য রাখতে চেয়েছিল, তাও রিটা যে কোন উপায়ে জেনে থাকবে। এর ফলেই রির্টা আরও উৎসাহী হয়ে পড়ে।

দুগাল সায়েব প্রশ্ন করলেন, কিন্তু মোটিভ কী? রিটা মবলঙ্কর কেন ওদের খুন করল?

কর্নেল বললেন, প্রণয়ের প্রতিহিংসা। সঞ্জয়ের সঙ্গে তার সম্পর্ক ছিল। রিটা সার্কাসের মেয়ে। সে একজন দক্ষ স্কিয়ার। সুইজারল্যান্ডে স্কি করার প্রচুর, অভিজ্ঞতা তার আছে। রিটার ব্যাকগ্রাউন্ড আমি কিছুটা জানতাম। কিন্তু সঞ্জয়ের সঙ্গে তার প্রণয়ের কথা জানতাম না। জানা গেল রিটার ঘরের কাগজপত্র হাতড়ে। আমি গতকাল একফাঁকে ওর ঘরে হানা দিয়েছিলাম। রিটাকে তখন সোনালি আমারই প্ল্যানমাফিক নিজের প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে নিজের ঘরে আড্ডা দিতে ডেকেছিল। রিটা আরেকবার চান্স নিতেই গেল–সোনালি তার ক্ষতচিহ্ন দেখেছে, তাকে না সরালে অস্বস্তিতে ভুগছিল রিটা। কিন্তু সফল হলো না– শের সিং-এর উপস্থিতির জন্যে। এদিকে তখন রিটার ঘরে আমি সার্চ করে সঞ্জয়ের সঙ্গে তার নিবিড় সম্পর্ক আবিষ্কার করে ফেলেছি। তারপর পাতলাম এই ফাঁদ। চান্স ছিল নিতান্ত পঞ্চাশ পারসেন্ট। ভাবিনি যে সত্যি রিটা এভাবে হাতে-নাতে ধরা দেবে। কিন্তু ও তো আজ সন্ধ্যার পর মরিয়া। সবার সামনে রাগের ছলে বেরিয়ে গেলেও আড়ালে দাঁড়িয়ে শুনছিল। আমি হলের বাঁ দিকের জানলার কাছে স্পষ্ট তার ছায়া দেখতে পাচ্ছিলাম। টেন্ডুলকার যে ওকে অবশেষে চিনতে পেরেছে, এটা অনুমান করার মতো ধুরন্ধর বুদ্ধি ওর ছিল। অবশ্য ওর ঘাড়ের ক্ষতচিহ্ন সোনালি দেখে ফেলেছে, তাতে উৎকণ্ঠা ছিল প্রচণ্ড। কিন্তু শ্রীবাস্তবের দাড়ি কাটতে গিয়ে ব্লেডে চেরা গাল রিটাকে বাঁচিয়ে দিয়েছিল আপাতত। শুধু একটা ব্যাপার তেমন আমল দেয়নি রিটা। স্টোরে সে তার স্কিসেট জমা না দিয়ে ঘরেই রেখেছিল-কারণ নিজের বাস্কেট পরিয়ে নিয়ে শ্রীবাস্তবের বাস্কেট পাচার করা দরকার। শের সিং খাতা দেখে এসে আমাকে জানায়। একটা সেট জমা পড়েনি। এখন সেটা রিটার ঘরে পাওয়া। গেল। যাই হোক, এবারকার স্কি তেমন জমল না–আমাদের দুর্ভাগ্য। দুগালজিরও দুর্ভাগ্য।…

এক সময় সোনালি আর ধ্রুব বেরিয়ে নিজেদের ঘরে এল। ন নম্বরে। তারপর সোনালি বলল ভ্যাট, আমার সব বরবাদ হলো। এই, দুগালজিকে বলো না–আমরা যারা এখানে থেকে কি করতে চাই, করব। সত্যি, যেতে ইচ্ছে করছে না। তাছাড়া যাব কেমন করে? রাস্তায় ধস নেমেছে? না?

ধ্রুব বলল, ওটা গুলাব সিং-এর বানানো। কিন্তু এই অভিশপ্ত জায়গায় আর থাকতে পারব ভাবছ? তোমার আমার কেসও তো তাই। বলা যায় না– তোমার যদি কোন পূর্বপ্রেমিক থাকে, তাহলে নির্ঘাত স্কিয়ার সেজে এসে আমাকে খুন করে বসবে।

সোনালি বলল, না মশাই–তোমারই কোন প্রণয়িনী থাকলে এখনও বলো। সাবধান হয়ে যাবো।

ধ্রুব দরজা লক করে দুহাতে সোনালিকে জড়িয়ে ধরে বলল, এখানে থাকতুম–কিন্তু থাকব না। কালই শ্রীনগর ফিরে সেখান থেকে দিল্লী–তারপর সটান ম্যারেজ রেজিস্ট্রারের আপিসে। অন্তত খুন হলেও সান্ত্বনা থাকবে সোনালি আমার ধর্মপত্নী তো ছিল।

সোনালি বলল, এই! তাহলে আমরা একটু অ্যাডভান্স ট্রায়াল হিসেবে আজ একই শয্যায় শুয়ে দেখতে পারি।

ধ্রুব ওকে নিজের বিছানায় ঠেলে দিয়ে বলল, ভ্যাট! আসলে বলো যে একা শুতে ভয় করছে।