৯ জুন, বুধবার ১৯৭১

৯ জুন, বুধবার ১৯৭১

আজ শরীর একদম ভালো। গোসল করে সাড়ে এগারোটাতে তৈরি হয়ে নিলাম। নজলু আসবে এখুনি। ওকে নিয়ে মার বাসায় যাব। গহনা রাখার বন্দোবস্ত অবশেষে হয়েছে। মার বাড়ির একতলায় সিঁড়িঘরে সিঁড়ির নিচে ছোট্ট একটা বাথরুম আছে। কয়েক মাস আগেই বাথরুমটা করা হয়েছে, এখনো প্যান বসানো হয় নি। এই প্যান বসানোর খালি জায়গাটায় গহনার বাকস রেখে সিমেন্ট করে দেওয়া হবে। রাজমিস্ত্রির কাজটা আমরাই করব। বালি, সিমেন্ট মার বাড়িতেই রয়েছে। নজলুর বাড়িতে তার বউয়ের ছাড়াও কয়েকজন আত্মীয়ের গহনাও আছে। পরের আমানত নিয়ে তার দুশ্চিন্তার অন্ত নেই। নজলুও সেসব গহনা মার বাড়িতে পুঁতে রাখবে। নজলু এলে রিকশা করে মার বাড়ি গেলাম। আমার গহনা মার গহনা, নজলু এবং তার আত্মীয়ের গহনা–সবগুলো একটা বড় বিস্কুটের চ্যাপটা টিনে রাখা হলো। সব গহনার লিস্ট করে তার তিনটে কপি করা হলো। একটা লিস্ট গহনার বাকসে থাকবে বাকি তিনটে তিনজনের কাছে।

যার কাজ তারে সাজে, অন্য লোকে লাঠি বাজে। রাজমিস্ত্রির কাজ করতে গিয়ে তিনজনে মিলে একেবারে গলদঘর্ম হয়ে গেলাম। বিস্কুটের বাকস প্রথমে তিন-চার পরত প্লাস্টিক দিয়ে মুড়ে দড়ি বাঁধলাম। যাতে বাকসের ভেতর পানি না ঢোকে। বাকসটা গর্তে বসিয়ে তার চারপাশে ছোট ছোট ভাঙা ইটের টুকরো দিয়ে তারপর বালি বিছিয়ে ওপরটা সমান করলাম। তারপর সিমেন্ট করতে গিয়ে একেবারে হয়রান। যাই হোক, কাজ শেষ করে তিনজন খানিকক্ষণ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তারিফ করলাম। খুব খারাপ হয় নি। মাকে বললাম, আপনি কাল থেকে রোজ দুবেলা এটা পানি দিয়ে। ভেজাবেন চার/পাঁচ দিন। তারপর আমরা আবার এসে বাড়ির যত ড্রাম, টিন, মটকা, কলসি হাবিজাবি জিনিস আছে, সব এখানটায় ঠেসে এটাকে স্টোররুম বানিয়ে ফেলবো।

নজলু হেসে বলল, আশা করি তার আগেই খানসেনারা এসে হামলা করবে না।

আমি ধমকে উঠলাম, বালাই ষাট। অকথা কুকথা কেন বলছ?

মা বললেন, কোন ভয় কোরো না। রোজ আমি দোয়া-দরুদ পড়ে বাড়ি বন্ধ করি। আল্লার রহমতে কোন খানসেনা কি বিহারি এ বাড়িতে আসতে পারবে না।

মার প্রত্যয়ে আমরাও অনেকখানি ভরসা পেলাম।