৯ আগস্ট, সোমবার ১৯৭১

৯ আগস্ট, সোমবার ১৯৭১

আজ আমাদের বিয়ের তারিখ। ২৪ বছর হলো। প্রতি বছর আমরা বিবাহবার্ষিকীটা ঘনিষ্ঠ কয়েকজন বন্ধুবান্ধব নিয়ে উদযাপন করি। আমি তাকিয়ে আছি সামনের বছরের দিকে, আমাদের বিয়ের পঁচিশ বছর পুরবে। রজতজয়ন্তী উৎসবটা খুব ধুমধাম করে পালন করব।

সকাল থেকে বেশ বৃষ্টি, দুপুরে খিচুড়ি রাঁধলাম। সঙ্গে গোশতের কাড়ি আর শেষে ফজলী আম। এবার আর কাউকে দাওয়াত নয়–নিজেদের মধ্যেই। উদ্যাপনের মতো মন নেই। উচিতও নয়। তবে রুমী এসেই যেভাবে বলেছে দেখলে, তোমাদের বিবাহবার্ষিকীর আগের দিনটাতে কেমন এসে গেলাম–তাইতেই একটু কিছু করা।

রুমী দুপুর বারোটা পর্যন্ত ঘুমিয়ে উঠে গোসল সেরে খাবার টেবিলে এসে খুশি হয়ে গেল।

খেয়ে উঠেই রুমী বেরিয়ে যাচ্ছিল, আগের অভ্যাসবশে ডেকে ফেললাম, কোথায় যাচ্ছিস? রুমী ফিরে দাঁড়িয়ে হাসিমুখে কুটি করে তাকাল, আম্মা নো কোয়েশ্চেন এনিমোর। তবে এবারের মতো বলছি –সেলুনে যাচ্ছি দাড়ি কাটতে। তারপর অন্য কাজ আছে।

আমি বলে উঠলাম, দাঁড়া, দাঁড়া, ক্যামেরাটা নিয়ে আসি। একটা ছবি তুলে রাখি।

রুমী হাসিমুখে মাথা নাড়তে নাড়তে ননা ওয়ে বলে বেরিয়ে গেল।

রুমীর এই এক দোষ। কিছুতেই ছবি তুলতে চায় না। গেরিলা হবার অনেক আগে থেকেই ওর শখ–গেরিলা হবে। একবার তো প্যালেস্টিনিয়ান লিবারেশন আর্মিতে যাবার জন্য খুব ঝোঁক ধরেছিল। ওর মত হল, গেরিলাদের কোন ছবি থাকা উচিত নয়। তাহলে ওদের ধরা সহজ হয় না।

রুমী ফিরল সন্ধ্যার পরে। ডাইনিং টেবিল ঘিরে আমি, শরীফ, দাদাভাই, মোর্তুজা, ডাক্তার, ফকির–সবাই বসে খুব লো-ভলমে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের অনুষ্ঠান শুনছিলাম। বেল বাজতেই শরীফত হাতে স্টেশনের কাঁটা ঘুরিয়ে দিল। দরজা খুলতে রুমীকে দেখে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে আবার কাঁটা যথাস্থানে নিয়ে গেল। রুমীকে দেখে মোর্তুজা বলে উঠলেন, কি রুমী, তোমার যে দেখাই পাওয়া যায় না? যখনি আসি, শুনি তুমি ছাদের ঘরে জুডো প্র্যাকটিস করছ, না হয় বন্ধুর বাসায় গিয়েছে। এত ঘোরাঘুরি করা কি ভালো?

রুমী সবাইকে সালাম দিয়ে চৌকিটাতে বসল, হেসে মৃদুস্বরে বলল, বেশি তো ঘুরি না চাচা। ছাদের ঘরেই বেশি সময় কাটাই। জুডো কারাতে প্র্যাকটিস করি, বই পড়ি, ড্রয়িং করি।

মোর্তুজা হেসে বললেন, তোমার ছাদের ঘর একদিন দেখায়ো।

আমি বললাম, হ্যাঁ, দেখা উচিত আপনার। ওর খেয়াল মেটাতে কত খরচ করতে হয়েছে আমাদের, দেখবেন। পুরো ঘরের মেঝে জুড়ে তিন ইঞ্চি পুরু ছোবড়ার গদি বসাতে হয়েছে–ওনারা ধড়াম ধড়াম আছাড় খাবেন, তার জন্য। এককোণে ছাদে আংটা লাগিয়ে আর মেঝেতে তিনমণি কংক্রিট স্ল্যাব বসিয়ে পাঞ্চিং ব্যাগ ঝোলানো হয়েছে–ওনারা ঘুষি মেরে বক্সিং প্র্যাকটিস করবেন বলে।

দাদাভাই বললেন, খুব ভালোকথা তো। কলেজ, ইউনিভার্সিটি বন্ধ, বাইরে বিপদ, বাড়িতেই যদিব্যস্ত থাকার ব্যবস্থা করা যায়, তবে তার চেয়ে আর কি ভালো হতে পারে? আমাদের ছেলেগুলো তো ঘরে বসে বসে বোরড় হয়ে গেল। বাইরে বেরোতে দিতেও ভয় লাগে।