৭ অক্টোবর, বৃহস্পতিবার ১৯৭১

৭ অক্টোবর, বৃহস্পতিবার ১৯৭১

ঝিনুরা বাসা বদল করেছে। আগের বাসাটা রাজারবাগ পুলিশ লাইনের উল্টো দিকে ছিল, আত্মীয়বন্ধু যেতে ভয় পেত। এই বাসাটা পাগলাপীরের বাসার পেছনে হয়েছে। দুই বাসার মাঝের বাউন্ডারি ওয়াল এত নিচু যে, দুপাশে দুটো টুল রেখে দিলে সিঁড়ির মত পা ফেলে যাতায়াত করা যায়।

আজ পাগলা বাবার সাপ্তাহিক মিলাদ শেষ হবার পর ঝিনুদের বাসায় এসেছি নুহেল আর দীনুকে দেখতে। ওদের দুই ভাইয়ের শরীর খুব খারাপ। পূর্ণিমা-অমাবস্যার সময় হলেই ওদের চার ভাইয়ের কোমরে, পিঠে, শরীরের গাঁটে গাঁটে ব্যথা বাড়ে। কিন্তু এবারে নুহেল আর দীনুর শরীরটা বেশি কাবু হয়ে পড়েছে। নুহেলের পিটুনিটা বেশির ভাগ পিঠে, কোমরে আর মাথায় পড়েছে।

দুতিনটে ইলেকট্রিক তার একত্রে পাকানো, মাঝে-মাঝে একটা করে গিঠ–এই রকম তারের দড়ি দিয়ে বেশির ভাগ সময় নুহেলকে মেরেছে। মেরুদণ্ডের হাড় নড়েচড়ে তো গেছেই, সারা পিঠ ফালা-ফালা, মাথার বিভিন্ন জায়গায় কাটা। দীনুর অবস্থাও সমান খারাপ। তার বা কানের পর্দা ফেটে গেছে এক ক্যাপ্টেনের প্রচণ্ড চড়ে, ডান হাতের কবজির একটু ওপরে হাড় ফেটে গেছে লাঠির বাড়িতে কপাল ভালো একেবারে ভেঙে দুটুকরো হয় নি। নূরজাহানের বোনের স্বামী ডাঃ আশেকুর রহমান মিটফোর্ডে আছেন –দীন তাঁর কাছ থেকেই চিকিৎসা নিচ্ছে মিটফোর্ড গিয়ে–কানের এবং হাতের। ডাঃ আশেকুর রহমান বলেছিলেন হাতটা প্লাস্টার করলে ভালো। হয়। তাড়াতাড়ি সারবে। কিন্তু দীনু ভয়ে হাত প্লাস্টার করতে পারে নি। যদি রাস্তায় মিলিটারি দেখলে মুকুত বলে ধরে। একেইতো তার চুল ঘাড় পর্যন্ত লম্বা ছিল বলে এম.পি.এ হোস্টেলে খানসেনারা তাকে ইয়ে শালা মুকুত হ্যায় বলে বেশি পিটুনি দিয়েছে। হাত প্লাস্টার না করার ফলে সারতে দেরি হচ্ছে। বাঁ কানটাও খুব কষ্ট দিচ্ছে। এর ওপর সব ভাইয়েরই হাতের আঙুলের গিঠ মচকানো, কোমরে প্রচণ্ড ব্যথা–এসব। তো আছেই।

জামী বলল, মামা, আমারো কোমরে মাঝে-মাঝে বেশ ব্যথা করে, আরও। তবুও তো আমাদের কাউকে হুকের সঙ্গে ঝোলায় নি, মাথা নিচে দিয়ে ফ্যানের সঙ্গে ঘোরায় নি, তাইতেই এই অবস্থা! স্বপন ভাই, উলফাত ভাইয়ের আব্বাদের যে কি খারাপ অবস্থা। ওঁরা তো এখনো নিজে নিজে হাঁটতে পারেন না, ধরে নিতে হয়। তবুতো ওঁদের ছেলেরা বেঁচে গেছে, সেইটাই ওঁদের মস্ত সান্ত্বনা।

জামীকে এভাবে কথা বলতে শুনে আমি ভেতরে ভেতরে চমকে গেলাম। রুমীর গ্রেপ্তার ওকেও কতোখানি কাবু করেছে, বুঝতে পারলাম। ছোটবেলায় দুই ভাই খুব মারামারি করত, কিন্তু একটু বড় হতেই রুমী ওর কাছে হিরো হয়ে উঠেছিল।

একটু পরে জামী আবার বলল, স্বপন ভাই কিভাবে পালিয়েছিল, তোমরা কেউ শুনেছ নাকি? মিলিটারি নাকি বাড়ির সামনের দিকটা ভরে ফেলেছিল, তারই মধ্যে স্বপনের মা ওকে ঠেলে পেছনের দরজা দিয়ে বের করে দিয়েছিলেন। ওদের বাড়িটা একতলা ছিল, আর পেছন দিকে কচু বন, ঝোপঝাড়, তারপর বস্তি এই সব ছিল। সামনের বারান্দার জানালা দিয়ে মিলিটারিরা নাকি দেখতে পেয়েছিল স্বপনের মা স্বপনকে ধাক্কা দিয়ে বের করে দিচ্ছেন। তাইতেই তো মিলিটারিরা আরো বেশি রেগে গিয়েছিল স্বপনের বাবার ওপর।

আমি অবাক হয়ে বললাম, তুই কার কাছে শুনলি এত কথা?

আমার স্কুলের এক বন্ধু ওই পাড়ায় থাকে। স্বপন ভাইদের বাড়ির খুব কাছে। আজ দুপুরে যে মিষ্টি কিনতে গেছিলাম মরণাদে, সেখানে ওর সঙ্গে দেখা। তখন বলল।

আমি ৩০ আগস্ট ভোরে স্বপনের উদ্ভ্রান্ত চেহারাটা মনে করে বললাম, ইস্, অতবড় বিপদ গেছিল রাতে, তাও সোনামানিক আমার সকালবেলা ছুটে এসেছিল খবর দিতে। আমি যখন বললাম, রুমীরা ধরা পড়েছে, তুমি এক্ষুণি পালাও। তখন কিন্তু একটা কথাও বেরোয় নি ওর মুখ দিয়ে। একেবারে নীরবে গাড়ি ঘুরিয়ে চলে গেল।

বলতে পারল না যে ওর বাড়িতেও সর্বনাশ ঘটে গেছে। আহারে! যেখানেই থাকুক, আল্লা ওকে ভালো রাখুন।