৬ সেপ্টেম্বর, সোমবার ১৯৭১

৬ সেপ্টেম্বর, সোমবার ১৯৭১

আজাদের মায়ের কাছে যাবার জন্য মনটা ছটফট করছে। এ কয়দিন তাল করে উঠতে পারি নি। আজ বেলা এগারোটার দিকে গেলাম। আজাদের মা আমাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদলেন, বললেন, বইন গো, কি সর্বনাশ হয়া গেল আমাদের। আপনের রুমীরেও তো লয়া গেছে শুনছি।

হ্যাঁ আপা, বাড়িসুদ্ধ সবাইকেই নিয়ে গেছিল। দুদিন-দুরাত পর রুমী ছাড়া বাকিরা ফিরে এসেছে।

বাড়িটার ওপর দিয়ে যেন ঝড় বয়ে গেছে। খাট ভেঙে পড়ে আছে, লোহার আলমারির পাল্লা ছ্যাঁদা হয়ে গেছে বুলেটে, দেয়ালে জায়গায় জায়গায় রক্তের ছিটে শুকিয়ে খয়েরি হয়ে আছে।

জিগ্যেস করে করে পুরো ঘটনাটা শুনলাম আজাদের মার মুখ থেকে।

২৯ আগস্টের রাতে তার বাসাতে অনেক লোক ছিল। বোনের ছেলে জায়েদ, চঞ্চল। এরাতো থাকতোই, তাছাড়াও অন্য জায়গা থেকে বেড়াতে এসেছিল আরেক বোনের ছেলে টগর, বোন-ঝি জামাই মনোয়ার। জুয়েল, কাজী, বাশার এরা তিনজন ছিল। আর কপাল মন্দ সেকেন্দার হায়াত খানের জয়েন্ট সেক্রেটারি এ. আর. খানের ছেলে–আজাদের বন্ধু, সে রাতে এ বাসাতেই ছিল।

রাত দুপুরে ঘুম ভেঙে সবাই দেখে আর্মি সারা বাড়ি ঘিরে ফেলেছে। এঘর-ওঘরের জানালা দিয়ে উঁকি মেরে বোঝা যায় সামনে, দুপাশে, ছাদে সর্বত্র মিলিটারি। ভেবেছিল পেছনদিকে মেথরের রাস্তাটায় নিশ্চয় কেউ নেই, ওইদিক দিয়ে পালানোর চেষ্টা করা যেতে পারে। জায়েদ হামাগুড়ি দিয়ে দিয়ে কোনমতে মেথর আসার চিকন দরজাটার কাছে গিয়ে নিঃশব্দে খুলতেই গলি থেকে কয়েকজন আর্মি উঠে এসে ঢুকে বাড়িতে। তারা ঘরে ঢুকে সামনের দরজা খুলে দেয়–সেদিক দিয়ে আরো মিলিটারি পুলিশ সব ঘরে ঢুকে পজিসন নিয়ে দাঁড়ায়। জুয়েলের দুটো আঙুলে তখনো একটুখানি ব্যান্ডেজ বাঁধা ছিল, ক্যাপ্টেন সেই আঙুল দুটো ধরে দুমড়ে ভেঙে দেয়। জুয়েল মা-গো বলে একটা প্রাণঘাতী চিৎকার দিয়ে ওঠে। আর তখনি ঘটে যায় সেই কাণ্ডটা। কাজী হঠাৎ ক্যাপ্টেনটার ওপর ঝাপিয়ে পড়ে। ক্যাপ্টেন টাল সামলাতে না পেরে খাটের ওপর পড়ে যায়। কাজী পড়ে তার ওপর। দুজনের আছড়ে পড়ার ভারে খাট ভেঙে যায়। কাজী ক্যাপ্টেনের স্টেন ধরে টানাটানি করতে থাকে। সেপাইরা ভাবতেও পারে নি এই রকম কিছু ঘটতে পারে। তারা ভয় পেয়ে এলোপাতাড়ি গুলি করতে থাকে। গুলিতে ভীষণ রকম জখম হয় জায়েদ আর টগর। এর মধ্যে ধস্তাধস্তি করতে করতে কাজী পালিয়ে যায় টানাটানির চোটে তার লুঙ্গি খুলে যায়। সেই অবস্থাতেই সে দৌড়ে বেরিয়ে যায়।

কাজীকে ধরতে না পেরে খানসেনাদের সব রাগ গিয়ে পড়ে বাড়ির বাকি লোকদের ওপর। মারের চোটে আজাদের নাকমুখ দিয়ে রক্ত বেরিয়ে আসে, বাশারের বাঁ হাত কবজি আর কনুইয়ের মাঝে দুটুকরো হয়ে ভেঙে যায়, জুয়েলের আঙুল তো আগেই ভেঙেছিল, এখন নাকমুখ দিয়ে রক্ত বেরোতে থাকে, মনোেয়ার, সেকেন্দারও প্রচুর মার খায়।

তারপর গুলিবিদ্ধ, অচেতন জায়েদ আর টগরকে রক্তের স্রোতের মধ্যে ফেলে বাকিদেরকে ধাক্কাতে ধাক্কাতে নিয়ে খানসেনারা চলে যায়। চোখের সামনে এরকম পৈশাচিক কাণ্ডকারখানা দেখে আজাদের মায়ের হুশ ছিল না বহুক্ষণ। চেতনা ফিরলে দেখেন ভোর হয়ে আসছে। দেখেন রক্তের থৈ-থৈ মেঝেতে দুটি প্রাণী তখনো অজ্ঞান। তিনি পাশের বাসায় গিয়ে মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ফোন করেন এম্বুলেন্স পাঠাবার জন্য। কিন্তু এম্বুলেন্স আসেনা। তিনি হলি ফ্যামিলি হাসপাতালে ফোন করেন, কিন্তু এম্বুলেন্স আসে না। এই করতে করতে সকাল আটটা-নটা হয়ে যায়। তখন তিনি নিরুপায় হয়ে রিকশা করে ইন্টারকনের সামনের ট্যাক্সিস্ট্যান্ডে গিয়ে একটা ট্যাক্সি নিয়ে আসেন। জায়েদ, টগরকে অনেক কষ্টে ধরাধরি করে ট্যাক্সিতে তোলা হয়। তিনি ড্রাইভারকে মেডিক্যাল কলেজে যেতে বলেন। ড্রাইভার তাকে পরামর্শ দেয় মেডিক্যালে না নিতে। কারণ মেডিক্যালে মিলিটারি ভর্তি। তারা গুলিবিদ্ধ পেসেন্ট দেখলে গুম করে ফেলবে। তখন আজাদের মা হোলি ফ্যামিলি হাসপাতালে যান।

হোলি ফ্যামিলিতে জায়েদ, টগর এখনো সঙ্কটজনক অবস্থায় রয়েছে। জায়েদ ছয়দিন অজ্ঞান ছিল। আজাদের মা স্টিল আলমারির পাল্লা দুটো খুলে দেখালেন স্টেনের গুলি পাল্লা ফুটো করে পেছনের লোহার পাত ফুটো করে ঘরের দেয়াল গিয়ে বিধেছে। ভাঙা খাট যেভাবে ছিল, সেভাবেই পড়ে আছে। মেঝের চাপ চাপ রক্ত শুকিয়ে কালচে হয়ে আছে, সেগুলো ধুয়ে পরিষ্কার করা হয় নি। কে করবে? তিনি তো একদিকে নিজের ছেলের শোকে কাতর, অন্যদিকে আহত বোনের ছেলে দুটোর জন্য হাসপাতালে দৌড়াদৌড়ি করছেন। এই আটদিনে ওর চেহারাও শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে, চুলে তেল নেই, পরনের কাপড় ময়লা। ঘরের দিকে, নিজের দিকে তাকাবার এক মুহূর্ত ফুসরত নেই ওঁর।

আজাদের মা জিগ্যেস করলেন, রুমীর কোন খবর করতে পারলেন বইন?

আপা, এখনো কোনদিকে কোন সুরাহাই করতে পারছি না। পাগলাপীর বাবা ভরসা দিয়েছেন উনি রুমীকে বের করে এনে দেবেন। আপা, আপনি যাবেন ওঁর কাছে? খুব ক্ষমতাবান পীর উনি। ক্যান্টনমেন্ট থেকে বড় বড় জেনারেলরা পর্যন্ত ওর কাছে আসে।

না বইন, আমার পীর সাহেব আছেন জুরাইনে, আমি গেছি তেনার কাছে। আল্লায় দিলে আজাদ আমার ছাড়া পায়া যাইব। আমি রমনা থানায় আজাদের লগে দেখা করছি।

আমার হৃৎপিণ্ড লাফিয়ে গলার কাছে চলে এল। আজাদের সঙ্গে দেখা করতে দিয়েছে।

না বইন। অরা দেখা করতে দেয় নাই। রাইতে রমনা থানায় আইনা রাখে, আমাদের চিনা এক লোক সিপাইরে ঘুষ-মুষ দিয়া কেমন কইরা জানি বন্দোবস্ত করছিল, রাইতে লুকাইয়া জানালার বাইরে দাঁড়ায় কথা বলছি।

কি কথা বললেন? কেমন আছে আজাদ?

বইনরে। বড় মারছে আমার আজাদরে। আমি কইলাম বাবা কারো নাম বল নাই তো? সে কইল, না মা, কই নাই। কিন্তু মা যদি আরো মারে? ভয় লাগে যদি কইয়া ফেলি? আমি কইলাম, বাবা, যখন মারবো, তুমি শক্ত হইয়া সহ্য কইরো।