৫ অক্টোবর, মঙ্গলবার ১৯৭১

৫ অক্টোবর, মঙ্গলবার ১৯৭১

আজ শবেবরাত। গত রাতে শরীফ ১৪০ রাকাত নামাজ পড়েছে–তাছাড়াও দোয়াদরুদ। একটুও ঘুমোয় নি। মা আর জাতীও সারারাতই জেগেছেন বলা যায় মাঝে ঘণ্টা তিনেক ঘুমিয়ে। আমি আরো কম জেগেছি। শরীর এত দুর্বল, রাতদুপুরের পর মাথা ঘুরতে লাগল। মা জোর করে শুইয়ে দিলেন।

আজকের রুটি-হালুয়া তৈরিতে অন্যান্যবারের মত কারুকার্য নেই। শুধু আটার রুটি, সুজির হালুয়া আর গরুর গোশত। পরিমাণে অন্যান্য বছরের চেয়ে অনেক বেশি। যত বেশি ফকিরকে দেওয়া যায়।

বাড়ির সবাই রোজা কেবল আমি বাদে।

টেবিলে এফতার সাজাচ্ছি, শরীফ, জামী, মাসুম একে একে ওজু করে এসে জড়ো হচ্ছে, হঠাৎকানে এল একটা শব্দ বুম্মম্। বেশ দূরে শব্দটাহয়েছে, তবে সারা শরীর শিউরে উঠল। বড় পরিচিত শব্দ–গত একমাসে খুব কম শুনেছি এশব্দ। আজ শব্দটা বেশ পরিষ্কার, বেশ জোরালো।

হাসি হাসি মুখ নিয়ে শরীফ এসে বসল একটা চেয়ারে, মৃদুস্বরে বলল শুনলে?

শুনলাম তো। বেশ দূরে মনে হল।

এখন থেকে কাছেও শুনবে।

তার মানে?

নতুন চালান এসেছে।

মা, লালু রান্নাঘরে ছিলেন, দুহাতে খাবারের বাটি নিয়ে তাঁদের আসতে দেখে শরীফ মুখ বন্ধ করে ফেলল।

এরপর ঘণ্টা দুয়েক আর নিরিবিলি কথা বলারই সুযোগ মিলল না। পড়শীদের বাড়ি থেকে রুটি-হালুয়া আসছে, দরজায় ফকিরদের ভিড়, তাদের সুস্থির করে একে একে রুটি-হালুয়া, গোশত বিলি করা প্রায় দুঃসাধ্য ব্যাপার। এরমধ্যে দাদা ভাই, মোর্তুজা ভাই একটি টিফিন কেরিয়ার ভর্তি রুটি-হালুয়া নিয়ে এসে উপস্থিত। ওঁরা আসতেই শরীফ ওদের সঙ্গে বসার ঘরে রেডিও নিয়ে বসল। স্বাধীন বাংলা বেতার অনুষ্ঠানের সময় হলেই আর অন্য কোন কথা নয়, যে যেখানেই থাকুক, রেডিও নিয়ে বসবেই।

রাতে শুতে যাবার সময় শরীফের কাছে শুনলাম মেলাঘর থেকে নতুন গেরিলা দল এসে ঢাকার উপকণ্ঠে সাভারের দিকে ঘাঁটি গেড়েছে। সেই দলের ডেপুটি লিডার বাচ্চু মঞ্জুর হোসেনের আপন ভাগনে। বাঁকার বউ ডলিও মঞ্জুরের এক ভাগনী, সেই সুবাদে বাচ্চু, বাঁকারও শ্যালক হচ্ছে।

ওরা আপাতত ফার্মগেটে আর ফকিরাপুলে দুটো বাড়িভাড়া নিয়েছে। এ সবের খরচ যোগাচ্ছে বাঁকা আর মঞ্জর। পরে সুযোগ বুঝে আরো দুটো জায়গায় বাড়ি ভাড়া করবে। আজ শবেবরাতের রাতে ওদের প্রথম অ্যাকশন করার কথা ছিল। শব্দ শুনে মনে হচ্ছে ওটা ওদেরই অ্যাকশন। কাল পরশু জানা যাবে ঘটনার বিবরণ।