৩ সেপ্টেম্বর, শুক্রবার ১৯৭১

৩ সেপ্টেম্বর, শুক্রবার ১৯৭১

আমার কি মাথা খারাপ হয়ে যাচ্ছে? কদিন থেকে স্রোতের মতো আত্মীয়, বন্ধু আসছে, রুমীর জন্য মাতম করছে, তা দেখে আমার মনে তো শান্তি হওয়া উচিত। কতোজনের বেলায় শুনি মিলিটারি এসে স্বামী বা ছেলেকে ধরে নিয়ে যাবার পর সে বাড়িতে আত্মীয়বন্ধু ভয়ে যাওয়া ছেড়ে দিয়েছে। আমার বেলায় উল্টো। তবু হঠাৎ আজ বিকেলে আমি ক্ষেপে গেলাম কেন? তখন বসার ঘর, খাওয়ার ঘর ভর্তি করে বসেছিলেন, বাঁকা, মঞ্জুর, ফকির, মোস্তাহেদ, মিনিভাই, নূরুজ্জামান, দাদাভাই, মর্তুজা ভাই এবং এদের মিসেসরা। শামি খাওয়ার ঘরের চৌকিটায় শুয়েছিলাম, মিসেসরা এদিকে আমার কাছে বসেছিলেন। মিস্টাররা ওদিকে বসার ঘরে।

দুপুরে একটু কেমন যেন হয়েছিল। খুব কান্না পেয়েছিল, কাঁদতে কাঁদতে হঠাৎ কেমন যেন উদ্ভ্রান্তের মতো হয়ে গিয়েছিলাম। বুঝতে পারছিলাম ব্যাপারটা আয়ত্তের বাইরে চলে যাচ্ছে, কিন্তু থামাতে পারছিলাম না। শেষে হিক্কার মতো উঠে চোখে অন্ধকার হয়ে মেঝেয় লুটিয়ে পড়ি। মনে হচ্ছিল গলার কাছে দমটা আটকে গেছে। শরীফ অফিসে ছিল। মা ভয় পেয়ে চিৎকার করে ওঠেন। সানু, খুকু, মঞ্জু এবং আরেক পড়শী আকবরের মা এসে শুশ্রুষা করেছিলেন। আকবরের মা মাথায় তেলপানি থাবড়ে দিতে দিতে খুব বিনয়ের সঙ্গে বলেছিলেন মগবাজারে পাগলাপীর খুব তেজী পীর, ওর পায়ের ওপর গিয়ে পড়তে পারলে রুমীর একটা উপায় হবেই হবে। পীরফকিরে জীবনে কখনো বিশ্বাস ছিল না। এখন রুমীর জন্য পাগলাপীরের কাছে যাব বলে স্থির করেছি। আগামীকাল আকবরের মা আমাকে নিয়ে যাবেন ওর কাছে।

আমার অসুস্থতার কথা শুনেও আরো আত্মীয়বন্ধু দেখতে আসছেন। ডাঃ এ. কে. খান আগেই এসে ব্লাডপ্রেসার চেক করে দেখে এখন ওপাশে শরীফদের সঙ্গে বসে কথা বলছেন। এই মুহূর্তে ঘরে ঢুকল আতিক, বুলু, চাম্মু, হাফিজ, জুবলী। আমি হঠাৎ বলে উঠলাম, আচ্ছা, তোমরা সবাই এত এ বাড়িতে আস কেন? জান না, মেইন রোডে ছদ্মবেশে আই.বির লোক সর্বক্ষণ নজর রেখেছে এ বাড়ির ওপর? তোমাদের সব্বার বিপদ হবে, দেখো।

আমার মন বিকল হবার আরো কারণ ছিল। কাল রাতে মাসুম এক সময় আমাকে একা পেয়ে চুপিচুপি বলে, চাচী, চাচা আমাকে বারণ করেছেন আপনাকে বলতে। কিন্তু না বলে পারছি না। চাচাকেও বেত দিয়ে খুব মেরেছে। পিঠে দাগ পড়ে গেছে। আপনি চালাকি করে এক সময় পিঠটা দেখে নেবেন, তারপর উনাকে জিগ্যেস করবেন। আমি বলেছি তা বলবেন না যেন।

আমি মনে খুব আঘাত পেয়েছিলাম। শরীফকে বেত মেরেছে, সেটা সে আমার কাছে লুকিয়েছে? উঃ! কি মানুষ! কোথায় সব খুলে বলবে, পিঠে তেল বা মলম লাগিয়ে দেব। তা না। তাই দেখি ফিরে আসার পর থেকে একদম জামা খোলে না। গোসলের আগে জামা পরেই বাথরুমে ঢুকে যায়।

আজ সকাল থেকে তক্কে তক্কে ছিলাম। বাথরুমের সঙ্গে লাগানো ড্রেসিংরুম। ড্রেসিংরুমে ঢুকে জামা খুলে বাথরুমে ঢুকতে যাবে, অমনি আমি দরজার কাছে এসে হাজির। একি তোমার পিঠে দাগ কিসের? দেখি দেখি। বলে ড্রেসিংরুমে ঢুকে গেছি। শরীফের তখন স্বীকার করা ছাড়া আর উপায় ছিল না। সে আরো স্বীকার করল, খানসেনারা বুট-পরা পা দিয়ে তার মাথাতেও মেরেছে। ফলে তার মনে হয় সবসময় মাথায় যেন একটা লোহার টুপি এঁটে বসানো আছে।

এই সব বলতে বলতে শরীফ হঠাৎ আমাকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেলল। ও আমাকে ধরেই ধীরে ধীরে মেঝেতে বসে পড়ল। ওর সঙ্গে সঙ্গে আমাকেও বসতে হল। আমরা দুজনে দুজনকে জড়িয়ে ধরে রুমী, রুমী বলে ডুকরে ডুকরে কাঁদলাম। আমি জীবনে কখনো শরীফকে কাঁদতে দেখি নি। এই প্রথম ও রুমীর নাম করে কাঁদল।

শলীফ শেভ, গোসল করে নাশতা খেয়ে অফিসে চলে যাবার পরও আমি সুস্থির হতে পারছিলাম না। শরীফের মানসিক অবস্থার কথাই ভাবছিলাম। ও চিরকাল ধীর, স্থির, দায়িত্বসচেতন। ওর মান-অপমান-জ্ঞান অন্য অনেকের চেয়ে বহুগুণে তীক্ষ্ণ। খানসেনাদের বর্বর নির্যাতনে ও শরীরে যত না যন্ত্রণা পেয়েছে, তার চেয়ে অনেক বেশি অপমান বোধ করেছে মনে। এ কয়দিন আমি শুধু দুঃখ বোধেই যেন আচ্ছন্ন ছিলাম, এখন শরীফের মনের ক্রোধ আর অপমান বোধটা আমার মনেও ছড়াতে শুরু করল।

খুব অস্থির হয়ে এঘর-ওঘর ঘুরে বেড়াচ্ছিলাম। জামী ডেকে বলল, মা, দেখে যাও। ওর ঘরে গিয়ে দেখি ও গত কয়েকদিনের খবর কাগজ সামনে নিয়ে দেখছে। একটা কাগজ তুলে বলল, এই দেখ।

এই কয়দিনে আমি খবর কাগজের কথা একেবারেই ভুলে গেছিলাম। এখন বসে কাগজটা মেলে দেখলাম অনেক রকম অস্ত্রশস্ত্রের একটা বড় ছবির নিচে লেখা :

শহরের বিভিন্ন এলাকা থেকে অস্ত্রশস্ত্র উদ্ধার : কয়েকজন গ্রেপ্তার।

জামী বলল, মা, মনে হচ্ছে এগুলোই আলম ভাইদের বাড়ির রান্নাঘরের নিচে থেকে বের করেছে।

খবর কাগজের ছবিটার দিকে চেয়ে রইলাম। ছবিতে দেখা যাচ্ছে অনেকগুলো স্টেনগান, রাইফেল, স্টেনের ম্যাগাজিন, পিস্তল, গ্রেনেড, মাইন, তারের বাণ্ডিল আরো কি কি যেন।

৩১ আগস্টের দৈনিক পাকিস্তান, পূর্বদেশ, পাকিস্তান অবজারভার, পাকিস্তান টাইমস–সব কাগজেই অস্ত্রশস্ত্রের ছবি বেরিয়েছে। সব কাগজে একই খবর ছাপা হয়েছে, গত রোববার রাতে ঢাকা শহরের বিভিন্ন অংশে একাদিক্রমে কয়েকটি সফল অভিযান চালিয়ে বেশ উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অস্ত্রশস্ত্র, গোলাবারুদ ও বিস্ফোরক উদ্ধার করা হয়েছে। এ ব্যাপারে কয়েক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

দেশপ্রেমিক নাগরিকদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে এই অভিযানগুলো চালানো হয়।

দেশপ্রেমিক নাগরিক! আল্লাহ, এই দেশপ্রেমিক নাগরিকদের জন্য তোমার নিকৃষ্টতম, ভয়াবহতম হাবিয়া দোজখও যথেষ্ট হবে না।

আমার মনের মধ্যে মাথার মধ্যে ক্রোধ আর ঘৃণা দপদপ করে জ্বলতে লাগল।

আমি জামীকে জিগ্যেস করলাম, একটা কথার জবাব দে দেখি। স্ট্রেইট উত্তর দিবি। রুমীকে কি রকম টর্চার করেছে?

জামী হঠাৎ চমকে যেন বোবা হয়ে গেল। আমার মনের মধ্যে রাগ, ঘৃণা, ক্ষোভ, দুঃখ সব যেন একসঙ্গে ফেনিয়ে ফেনিয়ে উঠছিল। আবার বললাম, তোরা তো এসে সবার কথাই বলেছিস, বদিকে কি রকম টর্চার করেছে, আলতাফ মাহমুদের রক্ত বের করে দিয়েছে, হাফিজের চোখ গেলে দিয়েছে, বাশারের হাত ভেঙেছে, স্বপনের বাবা, উলফাতের বাবা, শাহাদতের দুলাভাই, আলমের ফুপা সবাইকে হুকে ঝুলিয়ে পিটিয়েছে, পিঠের ওপর চড়ে পায়ে মাড়িয়েছে,জুয়েলের আঙুল ভেঙে দিয়েছে, চুলুকে আধমরা করে ফেলেছে। রুমীকে কতোখানি টর্চার করেছে, তোরা কেউ বলিস নি কিন্তু। এখন বল আমাকে–

জামী বলতে গেল, মা, মা শোন–

আমি চেঁচিয়ে বললাম, কোন কথা শুনব না। আমি জানতে চাই রুমীকে কতোখানি টর্চার করেছে। বল তুই। দেশপ্রেমিক নাগরিকের কাছ থেকে খবর পেয়ে মিলিটারি আমার রুমীকে ধরে কতোখানি টচার করেছে, আমি জানতে চাই।

জামী মাথা তুলে আমার চোখের দিকে সোজা তাকিয়ে বলল, ভাইয়াকে আমরা শেষ দেখি ৩০ তারিখের দুপুরে। তারপর সেই ছোট ঘরটা থেকে ভাইয়া, বদি ভাই আর চুল্লু ভাইকে নিয়ে যায়। তারপর আর ভাইয়াকে দেখি নি। সকালে ভাইয়াকে যখন ছোট ঘরে আনে, তখন ভাইয়া প্রথমে আমাদের চারজনকে এক সঙ্গে বলে, আমরা যেন সবাই আর্মির কাছে একরকম কথা বলি। একটু পরে ভাইয়া আন্ধুর কাছ থেকে একটু সরে বসে আমার সঙ্গে কিছুক্ষণ আলাদা কথা বলে। ঐ সময় বলেছিল, আমি শুধু নিজে পঁচিশের রাতের ঘটনা স্বীকার করেছি। ওরা আমাকে খুব মেরেছে, আরো অনেকের নাম বলার জন্য। আমি শুধুবদি ছাড়া আর কারো নাম জড়াই নি। সমস্ত ঘটনার দায়িত্ব বদি আর আমি নিয়েছি।আমি বলেছিলাম, ভাইয়া, যদি খুব বেশি টর্চার করে?ভাইয়া বলেছিল, তুইতো জানিস আমি কতো টাফ। ওরাও সেটা বুঝে গেছে। ওরা আমাকে ব্রেক করার জন্য এমনভাবে টর্চার করেছে বাইরে কোথাও কাটে নি, ভাঙে নি। কিন্তু ভেতরটা মনে হচ্ছে চুরচুর হয়ে গেছে! দেখিস, আম্মাকে যেন বলিস না এসব কথা। মা, তুমি জোর করলে, তাই বলে দিলাম। ভাইয়া কিন্তু বারণ করেছিল।

আমি প্রাণপণে নিজেকে শক্ত রেখে বললাম, আমার জানার দরকার ছিল। ভয় নেই, আমার কিছু হবে না। উঠে রুমীর ঘরে গেলাম। বইয়ের আলমারি খুলে বের করলাম একটা বই : হেনরী এলেগের জিজ্ঞাসা। রুমী এটা আমাকে পড়তে দিয়েছিল কিছুদিন আগে। বলেছিল, আম্মা, যার ওপর টর্চার করা হয়, খানিকক্ষণ পরে সে কিন্তু আর কিছু ফিল করে না। পরে যারা শোনে বা পড়ে তারাই বেশি শিউরায়, ভয় পায়। রুমী আরো অনেক কিছু আমাকে বলেছিল : শক্রর হাতে ধরা পড়ার পর কি কি উপায়ে তাদের টর্চার সহ্য করে নেয়া যায়। কি কি পন্থায় টর্চার সহনীয় করে মুখ বন্ধ রাখা যায়। এ সম্বন্ধে সে ইপক্রেস ফাইল এবং আরো কয়েকটা বই আমাকে পড়তে দিয়েছিল।

রুমী। রুমী। তুই কি সত্যিই ওই সব পন্থাতে ওদের সব অত্যাচার সহ্য করতে পারছিস? তুই কি সত্যিই খানিক পরে আর কিছু টের পাস না? আমি কেমন করে কার কাছে তোর খবর পাব?