৩ জুলাই, শনিবার ১৯৭১

৩ জুলাই, শনিবার ১৯৭১

আজ ডা. এ. কে. খান রাওয়ালপিন্ডির পথে করাচি রওয়ানা হয়ে গেছেন ডাঃ নূরুল ইসলামের সঙ্গে। পাকিস্তান মেডিক্যাল রিসার্চ কাউন্সিলের মিটিং ডাকা হয়েছে পিন্ডিতে। এঁরা দুজন পূর্ব পাকিস্তান থেকে কাউন্সিলের সদস্য। গেছেন মাত্র চার পাঁচদিনের জন্য। তবুদুশ্চিন্তা হয়। ঠিকমত ফিরে আসবেন তো?কতোজনেগ্রাম থেকে ফিরে শহরে চাকরিতে জয়েন করতে অফিসে গেছে, আর বাড়ি ফেরে নি। তবে একটা ভরসার কথা, ডাঃ ইব্রাহীম করাচিতে রয়েছেন। ওখানকার জিন্না পি.জি. হাসপাতালে পোস্টেড। উনি এই মেডিক্যাল রিসার্চ কাউন্সিলের চেয়ারম্যানও। এই মিটিংটা উনিই ডেকেছেন।

বিকেলে বাগানে চেয়ার পেতে বসে সানুর সঙ্গে সব কথাই বলাবলি করছিলাম। মাগরেবের আজান পড়তে সানু উঠে নিজের বাড়ির দিকে গেল। আর প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই শরীফের গাড়ি ঢুকল গেট দিয়ে। নেমেই মৃদুস্বরে বলল, ঘরে এস। তার দুই চোখ চকচক করছে, কি এক চাপা উত্তেজনায় সারা মুখ লাল হয়ে আছে।

বেডরুমে ঢুকে শরীফ বলল, রুমীর চিঠি—

রুমীর চিঠি! আমার হাত-পা কেঁপে সারা শরীর অবশ হয়ে এল। ধপ করে বিছানায় বসে পড়লাম। কই, কোথায়।

শরীফ প্যান্টের পকেট থেকে একটা ছোট্ট চিরকুট বের করে আমার হতে দিল, চেয়ে দেখলাম সেই প্রিয় পরিচিত হাতের লেখায় তিনটি ছত্র : আমি ভালো। মণি ভাইদের সঙ্গে আছি। এদের যা যা দরকার, সব দিয়ো।–রুমী।

কোথায় পেলো? কে এনেছে।

সেই ছেলে দুটো। সেই শাহাদত আর আলম, গেল শনিবারে যারা বাঁকার বাসায় গিয়েছিল। ওরা আজ আমাদের অফিসে এসেছিল।

টাকা নিতে?

না। ওরা এখন ব্রিজ চায়।

ব্রিজ? সে আবার কি?

শরীফ হাসল হা-হা করে। ওকে এরকম সুখী হয়ে হাসতে দেখি নি অনেকদিন।

এমনিতেই রাশভারী স্বল্পবাক মানুষ। হাসেও মেপে মেপে। এই রকম খোলামেলা হাসি খুব কম সময়েই হাসতে দেখেছি ওকে।

শরীফ বুঝিয়ে বলল : খালেদ মোশাররফ বাংলাদেশের সবকটা ব্রিজ আর কালভার্টের তালিকা চেয়ে পাঠিয়েছে। সেই সঙ্গে ব্রিজ ও কালভার্ট ওড়ানোর ব্যাপারে কতকগুলো তথ্য। ব্রিজের ঠিক কোন্ কোন্ পয়েন্টে এক্সপ্লোসিভ বেঁধে ওড়ালে ব্রিজ ভাঙবে অথচ সবচেয়ে কম ক্ষতি হবে অর্থাৎ দেশ স্বাধীন হবার পর খুব সহজে মেরামত করা যাবে তার বিস্তারিত তথ্য ও নির্দেশ। তাদের উদ্দেশ্য ভেতরে যতগুলো পারা যায় ব্রিজ আর কালভার্ট ভেঙে পাক সেনাবাহিনীর যোগাযোগ ও চলাচল ব্যবস্থাকে অচল করে দেওয়া।

রুমী সম্বন্ধে মুখে কিছু জিগ্যেস কর নি? জায়গাটার নাম, কি করছে–

ওরা আগরতলার কাছাকাছি, একটা জায়গায় আছে। ওটাকে ওরা নাম দিয়েছে দুই নম্বর সেক্টর। খালেদ মোশাররফ ওখানে সেক্টর কমান্ডার। ঢাকার বেশির ভাগ ছেলে ওইখানেই যায়। ঢাকা থেকে আগরতলার দিকটাই সবচেয়ে কাছে। রুমী ওখানে গেরিলা ট্রেনিং নিচ্ছে।

রুমী কবে নাগাদ আসবে কিছু বলেছে?

অত কথা জিগ্যেস করা যায়? যা লোকের ভিড় আর কাজের চাপ অফিসে!