২ অক্টোবর, শনিবার ১৯৭১

২ অক্টোবর, শনিবার ১৯৭১

মা বললেন, রুমীর নামে আরেকটা সদকা কোরবানি দাও। আমি বললাম, এবার একটা গরু আনাই। রুমীর সঙ্গে আলতাফ, বদি, জুয়েল ওদের নামেও কোরবানি হোক।

একটা গরু কিনে আনা হয়েছে। সলিমুল্লাহ এতিমখানা কাছেই–আজিমপুরে।

সেখানে নিয়ে গিয়ে কোরবানি দেওয়া হবে। গরু নিয়ে আমিরুদ্দিন ড্রাইভার আর একজন পিওন হেঁটে রওনা হয়ে গেল। ওদের দুজনকে বেশ ভালো করে বুঝিয়ে দেওয়া হল–পথে যদি কোন মিলিটারি জিগ্যেস করে গরু কোথায়, কি জন্য নিচ্ছ? শুধু বলবে এতিমখানায় নিয়ে যাচ্ছি। খবরদার কোরবানি দেবার কথা বলবে না। যদি জিগ্যেস করে কোন বাড়ি থেকে আসছ, খবরদার আমাদের বাড়ির ঠিকানা বলবে না। বলবে মোহাম্মদপুর থেকে আসছি।

আধঘন্টা পরে মাসুমের হাতে রুমী, আলতাফ, বদি, জুয়েল, আজাদ, বাশার ও হাফিজের নাম লেখা কাগজ দিলাম। বললাম, কোন বাড়ি থেকে গরু এসেছে, বোলো না।

মাসুম বলল, তাতো হবে না। ওদের তো খাতায় ঠিকানা লিখতে হয়।

তাহলে যাহোক একটা বানিয়ে ঠিকানা দিয়ে দিয়ো–মোহাম্মদপুরেরই দিয়ো। আর ঈমাম সাহেবকে বোলো কোরবানির পর গোশত যেন বেঁধে এতিমদের খাওয়ানো। হয়। চারদিকে তাকিয়ে দেখে নিয়ে কোথাও কোন মিলিটারি দাঁড়িয়ে আছে কিনা। কোরবানি হওয়া মাত্রই সরে পোড়। আর পৌঁছেই আমিরুদ্দিদের চলে যেতে বোলো।

মিলিটারির সম্ভাব্য সন্দেহের হাত থেকে বাঁচবার জন্য এতসব আটঘাট বাঁধা। মুক্তিযোদ্ধাদের নামে সদকা কোরবানি দেবার অপরাধে আবার না ধরে নিয়ে যায়!

বুড়া মিয়াকে খবর দিয়ে আবার আনানো হয়েছে। বাসায় একটা চব্বিশ ঘন্টার বাঁধা কাজের লোক না থাকলে শুধু ঠিকা রেণুর মাকে দিয়ে আর চালানো যাচ্ছে না। তাছাড়া মা, লালুই বা আর কতদিন নিজের বাড়ি ছেড়ে এখানে থাকবে? সামনে রোজা আসছে।

বুড়া মিয়া গত ষোল বছর ধরে আমাদের বাসায় বাবুর্চির কাজ করেছে। আলসারে কাহিল হয়ে এ বছরই জানুয়ারি মাসে বাড়ি চলে গিয়েছিল। বাবুর্চির কাজ করলেও বুড়া মিয়া খুব ব্যক্তিত্বসম্পন্ন লোক। ধবধবে সাদা চুলদাড়ি আর রাশভারী ব্যবহারে ওকে মুরুব্বির মত লাগে। বুড়া মিয়া আসাতে হাঁফ ছেড়ে বেঁচেছি। বাড়িঘর নির্দ্বিধায় ওর হাতে ফেলে যখন-তখন বেরুনো যাবে। এমনকি দরকার হলে পালানোও যাবে।