২৬ অক্টোবর, মঙ্গলবার ১৯৭১

২৬ অক্টোবর, মঙ্গলবার ১৯৭১

আজ সকালে হঠাৎ চৈতন্য এসে হাজির। চৈতন্য আমাদের অনেকদিনের পুরনো কাঠমিস্ত্রি। খুব সৎ আর পরিশ্রমী। তাই বন্ধুবান্ধব কারো কাঠমিস্ত্রির দরকার হলে আমরা বিনা দ্বিধায় চৈতন্যকে পাঠিয়ে দিই। বেশি সৎ আর সরল বলে চৈতন্য জীবনে তেমন উন্নতি করতে পারল না, মাঝে-মাঝেই অভাব বেশি হলে আমাদের কাছে এসে বলে কোথাও কাজে লাগিয়ে দেন।

এখন ওকে দেখে আমরা হৈহৈ করে উঠলাম, কি চৈতন্য? কেমন ছিলে এতদিন? কোথায় ছিলে? ইন্ডিয়া যাও নি?

চৈতন্যরা সাতপুরুষের ভিটে ফেলে ইন্ডিয়ায় যেতে পারে নি। তাছাড়া বাড়ার ওদিকে ওদের গ্রামে ঠিক সরাসরি মিলিটারির হামলাও হয় নি। কোনমতে লুকিয়ে চুরিয়ে থেকেছে, প্রাণে বেঁচেছে। তবে কাজ-কারবার নেই বললেই চলে। প্রথম কিছুদিন বসে খেয়ে কোনমতে কাটিয়েছে। এখন দুইবেলা উপোষ দেবার পর্যায়ে এসে পৌঁছেছে, তাই সাহসে ভর দিয়ে বেরিয়ে পড়েছে।

আমি বললাম, খুব ভালো সময়েই এসে পড়েছ। এই বাড়িতেই বেশকিছু কাজ জমে রয়েছে তোমাদের জন্য।

মাঝে-মাঝেই একবার করে গুজব ওঠে মিরপুর-মোহাম্মদপুর থেকে বিহারিরা এদিকপানে আসছে সব লুটপাট করতে। তখন পাড়ায় হৈচৈ পড়ে যায়, সবাই নিজের নিজের বাড়ির দরজা-জানালার হুড়কো-ছিটকিনি ঠিক আছে কি না দেখতে থাকে। আমরাও অনেকদিন থেকে ভাবছি–আমাদের সামনের দিকের দরজা দুটোর পাল্লা বদলানো দরকার। পাল্লাগুলো এমন হালকা যে ভয় হয় এক লাথিতেই ভেঙে যাবে। তাছাড়া ডাইনিং রুম আর সিঁড়ির পাশের জানালা দুটোর কাচ বদলে কাঠ লাগিয়ে দেবার কথাও ভাবছি কিছুদিন থেকে। কাচের জানালা বন্ধ করলেও যেন নিরাপদ মনে হয় না। চৈতন্যদের খোঁজ পাচ্ছিলাম না, নিউ মার্কেট থেকে অচেনা কাঠমিস্ত্রি ডেকে কাজ করাননাতেও খুব সায় ছিল না। চৈতন্য নিজে থেকে এসে পড়াতে হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম।

চৈতন্য ওর ভাস্তে নিরঞ্জনকে সঙ্গে এনেছে। এর আগে সবসময় চৈতন্যই দরকারমত কাঠ কিনে এনেছে। এবার বলল, আমার দুকানে যাইতে ডর লাগে। কাঠটা যদি সায়েবে কিন্যা আনেন।

চৈতন্যরা যেখানে কাজ করে, সেখানেই থাকে। আগে বাড়ির উত্তরদিকের খালি গ্যারেজটায় থাকত। গেটটা এই গ্যারেজ বরাবর। গলিরাস্তা থেকে দেখা যায়। এবার ওদের থাকার ব্যবস্থা করে দিলাম দক্ষিণদিকের সারভেন্টস কোয়ার্টারের একটা ঘরে। বুড়া মিয়া একটা ঘরে থাকে, পাশের ঘরটা খালি।

চৈতন্যরা সারাদিন কাজ করে, দুপুরবেলা চিনি দিয়ে পাউরুটি খায়, সন্ধ্যায় বাজার করে রান্না করে। এবার চৈতন্য বলল, তাদের বাজারটাও যদি বুড়া মিয়া করে দেয়। তারা বাজারে যেতেও ভয় পায়।

আমি বললাম, ঠিক আছে। তোমাদের নিজেদের রান্না করা লাগবে না। আমাদের সঙ্গেই খাবে তোমরা। কি, আমাদের হাতের রান্না খেলে জাত যাবে না তো আবার?

চৈতন্য লজ্জা পেয়ে হাসল, কি যে বলেন আম্মা। এখন বলে পেরান লয়া টানাটানি–

বাড়ির ভেতরের উঠানে ওরা কাজ করে, দুপুরে-রাতে মাছ-তরকারি-ভাত ওদের ঘরে দিয়ে আসে বুড়া মিয়া। ওরা একদমই বাইরে বেরোয় না।