২৪ জুলাই, শনিবার ১৯৭১

২৪ জুলাই, শনিবার ১৯৭১

আজ আহাদ মিস্ত্রি টিউবওয়েল বসানো শেষ করল, আর আজই দুপুর থেকে ডাইরেক্ট ট্যাপটাতে চিরচির করে একটু একটু পানি আসা শুরু হলো। বিকেলের মধ্যে পাওয়ার লাইন ঠিক হয়ে গেল।

লাইট পানি আসাতে খুব আরাম লাগছে বটে কিন্তু মনে মনে কোথায় যেন একটা আশাভঙ্গের খচখচানি। ঢাকার মতো জায়গায় কারেন্ট থাকবে না, বিজলিবাতি জ্বলবে না, ট্যাপের পানি পাওয়া যাবে না, হারিকেন জ্বালিয়ে রাতে কাজ চালাতে হবে, টিউবওয়েল টিপে পানি নিতে হবে–এই রকম একটা পরিস্থিতির সম্ভাবনায় মনটা কি ২৫/৩০ বছর আগের শৈশবকালে ফিরে যাবার জন্য উন্মুখ হয়েছিল?

কদিনের এলোপাতাড়ি খাটুনিতে শরীরটা বড়ো কাহিল হয়ে গেছে, মনে হচ্ছে। কাজের ফাঁকে ফাঁকে মাঝে-মাঝে শুয়ে বিশ্রাম নিতে ইচ্ছে করে। ড্রয়িংরুমের। ডিভানটায় শোয়া যায় বটে কিন্তু মেহমান থাকলে তা আর সম্ভব হয় না। তাই আজ। ডাইনিং টেবিল আর সিড়ির মাঝামাঝি জায়গায় উত্তরের দেয়াল ঘেঁষে একটা ছোট চৌকি পেতে ফেললাম। তোষক বিছিয়ে সুন্দর একটি ফুলতোলা বেড় কভার দিয়ে ঢেকে দিলাম। এইবার ঠিক হয়েছে। বাইরের ঘরে মেহমান থাকলেও আমি রান্না করার ফাঁকে ফাঁকে এখানে শুয়ে বিশ্রাম করতে পারব। এটার পায়ের দিকে সিঁড়ির পাশে পুব ঘেষে দুটো সোফাও রাখলাম। মনু, দুলু, পারভেজ, রাজু, টাট্রু, এরা আজকাল প্রায় প্রায় আসে। আজকাল এ পাশেই বসাই যাতে বাইরের ঘরে হঠাৎ কেউ এসে ওদের

দেখে। কিছুদিন আগে একদিন পারভেজ জিগ্যেস করছিল : খালাম্মা, দুটো বাড়ির পরের বাড়িটার একটা ছেলে দেখি যখনি যাই বা আসি, আমাকে নানা কথা জিগ্যেস করে। আমি রুমীর কে হই, রুমী কোথায় গেছে–এই সব কথা।

ঐ শোনার পর থেকে পারভেজ, মনু, জিয়া, রাজু সবাইকে বলে দিয়েছি–কেউ জিগ্যেস করলে যেন বলে ওরা রুমীর চাচাত ভাই।

মাসুম সেই মার্চে দেশে গিয়েছিল। আজ সন্ধ্যার পর হঠাৎ দেখি সে এসে হাজির বাড়ি থেকে। ওকে দেখে খুব খুশি হয়ে উঠলাম। বাড়িটা বড়ো খালি হয়ে গিয়েছিল।

রাতে খাওয়া-দাওয়ার পর আমার বিশ্রামের চৌকিটাতে আরাম করে শুয়ে বললাম, এবার বল দেশের খবর। ২৫ মার্চের পর খাটুরিয়া, ডোমার–ওদিকে কি হয়েছিল?

খাটুরিয়া আমার শ্বশুরবাড়ির গ্রাম, ডোমার থানা।

মাসুম বলল, ২৫/২৬ মার্চ চিলাহাটি থেকে এক দল ই.পি.আর, খাটুরিয়ার ওপর দিয়ে সৈয়দপুরের দিকে মার্চ করে যায়।

কেন?

সৈয়দপুর ক্যান্টনমেন্ট আক্রমণ করবে বলে। খাটুরিয়ায় কয়েকটা বাঙ্কারও তৈরি করেছিল ওরা।

বাঙ্কার কেন?

ওদের কাছে যা শুনেছিলাম–চিলাহাটি থেকে শুরু করে মাঝে-মাঝেই ওরা বাঙ্কার বানাতে বানাতে আসছিল। যদি পরে সে রকম যুদ্ধ করতে হয়, তাহলে যাতে

সুবিধা হয় সেজন্য। যুদ্ধ হয়েছিল?

ওই দলটা সৈয়দপুর পর্যন্ত পৌঁছোতে পারে নি। মাঝপথে দারোয়ানীতে পাক আর্মি যুদ্ধ করে হটিয়ে দেয় ওদের। দুদিন পরে ওরা খাটুরিয়ার ওপর দিয়েই আবার ছত্রভঙ্গ হয়ে পালিয়ে যায়।

নীলফামারীর খবর জানিস কিছু?

নীলফামারী মহকুমার দূরত্ব খাটুরিয়া থেকে বেশি নয়। আমাদের অনেক আত্মীয়স্বজন নীলফামারীতে থাকেন। মাসুম বলল, ছয় এপ্রিল পর্যন্ত নীলফামারী মুক্ত ছিল। সাত তারিখে সকালে পাক আর্মি যুদ্ধ করে মুক্তিবাহিনীকে হটিয়ে দেয়।

জামী বলল, একটা ব্যাপার লক্ষ্য করেছ মা? ঢাকা ছাড়া বাংলাদেশের আর সব জায়গাতেই কিন্তু প্রথম কিছুদিন মুক্তিযোদ্ধারাই দখল নিয়েছিল। বাংলাদেশের সবগুলো জেলা সদরে প্রথমদিকে পাক আর্মি ক্যান্টনমেন্টের মধ্যে ছিল। তারপর তারা বেরিয়ে যুদ্ধ করে মুক্তিবাহিনীকে হটিয়েছে। তারপর তারা জ্বালাও-পোড়াও করতে পেরেছে। তার আগে নয়।

মাসুম বলল, আমরা তো ২৬ মার্চই আকাশবাণী, বি.বি.সি, ভয়েস অব আমেরিকা শুনে ভেবেছিলাম ঢাকা একেবারে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে।

আসলেও প্রায় তাই হয়েছিল। ঢাকায় যত বস্তি, যত বাজার, যত কাঁচা বাড়িঘর, সব পুড়িয়ে দিয়েছিল। নেহাৎ বিল্ডিং পুড়িয়ে ছাই করা যায় না, তাই গোলা মেরে মেরে যতটা পেরেছিল ইকবাল হল, জগন্নাথ হল, শহীদ মিনার চুরমার করে দিয়েছিল। শহীদ মিনার এখনো ওইভাবে আছে। ওখানে মসজিদ লেখা একটা সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে রেখেছে। ঢাকার রাস্তায় ট্যাঙ্ক নামিয়েছিল। জামী বলল, মাসুম ভাই, রমনা রেসকোর্সের কালীমন্দিরটা কিন্তু নেই–ওটা গোলা দিয়ে পুরোপুরি গুঁড়িয়ে ওখানকার মাটিটা পর্যন্ত সমান করে দিয়েছে।

আমি বললাম, তুই আরো আগে ঢাকা এলে পারতিস।

কি করব। বাবা কিছুতেই আসতে দেবেন না। ওদিকে তখন গুজব–ঢাকার মিরপুর-মোহাম্মদপুরে বাস-কোচ থেকে বাঙালিদের নামিয়ে মেরে ফেলে। এখন আবার ওদিকে নতুন উপদ্রব শুরু হয়েছে। সৈয়দপুরে এয়ারপোর্ট তৈরি হচ্ছে। তাতে চারপাশের এলাকা থেকে লোক ধরে এনে এয়ারপোর্ট তৈরির কাজে লাগানো হচ্ছে। ওদিককার সব ইউনিয়ন কাউন্সিলের চেয়ারম্যানদের ওপর হুকুম হয়েছে–নিজ নিজ। এলাকার গ্রামগুলো থেকে প্রতিদিন নির্দিষ্টসংখ্যক লোক পাঠাতে হবে। মাটিকাটা থেকে শুরু করে এয়ারপোর্ট বিল্ডিং বানানো, রানওয়ে তৈরি সমস্ত কাজই ওইসব লোকদের দিয়ে বিনা মজুরিতে করানো শুরু হয়েছে। পুরো অঞ্চলে একেবারে হাহাকার পড়ে গেছে। প্রত্যেক চেয়ারম্যান গ্রামভিত্তিক নির্দিষ্টসংখ্যক লোক পাঠাতে বাধ্য। কোনো গ্রামে কামলা-মজুর সব পাওয়া না গেলে শিক্ষিত, সচ্ছল লোকদের মধ্য থেকে নিয়ে হিসেব পুরো করে দিতে হচ্ছে। এর মধ্যে কোন ছাড়াছাড়ি নেই। যে এলাকা থেকে যতগুলো মজুর পাঠাবার কথা, ঠিক ততগুলো পাঠাতেই হবে। তাতে যদি গ্রামের মোড়লকে বা তার ছেলেকে বা অন্য কোন শিক্ষিত লোককে নিতে হয়, তাহলে তা ই নিতে হবে। এইবার বাবা একটু ভয় পেয়েছেন বলে ঢাকা আসতে দিলেন।

রাস্তায় কি রকম ভোগান্তি হলো? পৌঁছাতে এত দেরি হল যে?

দেরি হবার কারণ অনেক জায়গায় ব্রিজ নষ্ট। মুক্তিবাহিনী উড়িয়ে দিয়েছে। এক বাস ছেড়ে নৌকায় নদী পেরিয়ে অন্য বাস ধরা, বাসে ওঠার সময় আবার চেকিং। ঢাকা ঢোকার আগে থেকে আরো কড়া চেকিং বাস থেকে নামিয়ে লাইন ধরে দাঁড় করিয়ে বডি চেক করা–জিনিসপত্র সবনামিয়ে তন্নতন্ন করে চেক করা–প্রতিটি চেকপোস্টে একই ব্যাপার। শেষ পর্যন্ত যে এসে পৌঁছেছি এতেই আল্লার কাছে হাজার শুকুর।

জামী বেসুরো গলায় গেয়ে উঠল, মনে হল যেন বেরিয়ে এলেম অন্তবিহীন পথ আসিতে ঢাকার দ্বারে। (জামী শৈশবকালে কিছুদিন বাফায় গান শিখেছিল!)