২৩ মার্চ, মঙ্গলবার ১৯৭১

২৩ মার্চ, মঙ্গলবার ১৯৭১

আজ প্রতিরোধ দিবস।

খুব সকালে বাড়িসুদ্ধ সবাই মিলে ছাদে গিয়ে কালো পতাকার পাশে আরেকটা বাশৈ ওড়ালাম স্বাধীন বাংলাদেশের নতুন পতাকা। বুকের মধ্যে শিরশির করে উঠল। আনন্দ, উত্তেজনা, প্রত্যাশা, ভয়, অজানা আতঙ্ক–সবকিছু মিলে একাকার অনুভূতি।

নাশতা খাওয়ার পর সবাই মিলে গাড়িতে করে বেরোলাম–খুব ঘুরে বেড়ালাম সারা শহরে বিভিন্ন রাস্তা দিয়ে। সবখানে সব বাড়িতে কালো পতাকার পাশাপাশি সবুজে-লালে-হলুদে উজ্জ্বল নতুন পতাকা পতপত করে উড়ছে। ফটো তুললাম অনেক। ঘুরতে ঘুরতে ধানমন্ডি দুই নম্বর রোডে বাঁকার বাসায় গিয়ে নামলাম। সেখানে খানিকক্ষণ বসে গেলাম ডাঃ খালেকের বাসায়। বাঁকার বাসার ঠিক সামনেই রাস্তার ওপাশে। ডাঃ খালেকের বাসায় দেখা হল তার শালী মদিরা ও তার স্বামী নভির অবসরপ্রাপ্ত কমান্ডার মোয়াজ্জেমের সঙ্গে। নেভি থেকে অবসর নেয়ার পর মোয়াজ্জেম

একটা রাজনৈতিক দল গঠন করেন দুবছর আগে নামটা বেশ বড়–লাহোর প্রস্তাব বাস্তবায়ন কমিটি। মোয়াজ্জেমের সঙ্গে যখনি দেখা হয়, তিনি হেসে হেসে বলেন, শেখ সাহেবের ছয় দফা, আমার কিন্তু এক দফা। তা হল পূর্ব বাংলার স্বাধীনতা।

আজ মোয়াজ্জেম বললেন, শেখ সাহেবও এখন একদফা অ্যাকসেপ্ট করতে বাধ্য হয়েছেন।

কি রকম?

আজ সকালে ওঁকেও স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা তুলতে হয়েছে ওঁর নিজের বাড়িতে।

মিসেস খালেক বললেন, পল্টন ময়দানে কুচকাওয়াজ দেখতে গিয়েছিলেন নাকি?

নাঃ। শুধু রাস্তায় রাস্তায় ঘুরলাম নতুন পতাকা দেখতে। অফিস বিল্ডিংগুলোতেও স্বাধীন বাংলার পতাকা উড়িয়েছে। ইন্টারকন্টিনেন্টালেও। ওখানে এত মিলিটারি থাকা সত্ত্বেও পারলো কি করে?

মোয়াজ্জেম বলে উঠলেন, বাংলার মাটি দুর্জয় ঘাঁটি। বাঙালির মনও তাই। বিদেশী দূতাবাসগুলোতেও নতুন পতাকা–কি যে ভালো লাগছিল দেখতে। সবচেয়ে ভালো লেগেছে শহীদ মিনারের সামনে গিয়ে। কামরুল হাসানের আঁকা কয়েকটা দুর্দান্ত পোস্টার দেখলাম। মিনারের সিঁড়ির ধাপের নিচে সার সার সেঁটে রেখেছে। প্রত্যেকটা পোস্টারে একটা মানুষের মুখ, নিচে লেখা এদেরকে খতম কর। মুখটা একদম প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার মুখের মতো।

বলেন কি? আমাদের যেতে হবে তো দেখতে!

টেলিভিশনের অনুষ্ঠান যে আজকে শেষই হয় না! অন্যদিন সাড়ে নটার মধ্যে সব সুমসাম। আজ দেখি মহোৎসব চলছে তো চলছেই। সুকান্তর কবিতার ওপর চমৎকার দুটো অনুষ্ঠান হল। একটা–ছাড়পত্র, মোস্তফা মনোয়ারের প্রযোজনা। ডঃ নওয়াজেশ আহমদের ফটোগ্রাফির সঙ্গে কবিতার আবৃত্তি। আরেকটা দেশলাই, বেলাল বেগের প্রযোজনা। সুকান্তর দেশলাই কবিতাটি আবৃত্তির সঙ্গে সঙ্গে টিভি পর্দায় দেখা গেল অসংখ্য দেশলাইয়ের কাঠি একটার পর একটা জ্বলে উঠছে। একটা কাঠি থেকে আরেকটা আগুন ধরতে ধরতে সবগুলো মশালের মতো জ্বলতে লাগল পুরো টিভি পর্দা জুড়ে।

এরপর শুরু হল আবদুল্লাহ আল মামুনের এক নাটক আবার আসিব ফিরে। উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের শহীদ একটি ছেলের বিস্মৃতপ্রায় স্মৃতি আবার উজ্জ্বল হয়ে ওঠে একাত্তরের গণআন্দোলনে। নাটক ২৩ মার্চের রাত পৌঁনে এগারোটায় শুরু হয়ে শেষ হয় ২৪ মার্চের প্রথম প্রহরে। রাত বারোটা বেজে নয় মিনিটে ঘোষক সরকার ফিরোজ উদ্দিন সমাপনী ঘোষণায় বলেন :

এখন বাংলাদেশ সময় রাত বারোটা বেজে নয় মিনিট–আজ ২৪ শে মার্চ বুধবার। আমাদের অধিবেশনের এখানেই সমাপ্তি।

এরপর পাকিস্তানি ফ্ল্যাগের সঙ্গে পাক সারজামিন শাদবাদের বাজনা বেজে উঠল।

এতক্ষণে রহস্য বোঝা গেল। ২৩ মার্চ প্রতিরোধ দিবসে বীর বাঙালিরা টেলিভিশন পর্দায় পাকিস্তানি পতাকা দেখাতে দেয় নি।