২২ অক্টোবর, শুক্রবার ১৯৭১

২২ অক্টোবর, শুক্রবার ১৯৭১

আজ থেকে রোজা শুরু হয়েছে। শরীফ, জামী, বুড়া মিয়া তিনজনেই রোজা। মা আর লালু গত পরশুদিন নিজেদের বাড়িতে ফিরে গেছেন।

রুমির এখনো কোন হদিস বের করা সম্ভব হয় নি। পাগলা বাবা ক্রমাগত আমাদেরকে আশ্বাস দিয়ে যাচ্ছেন, আমরা ক্রমাগত বাবাকে প্রতি বৃহস্পতিবার একটি করে পঞ্চাশ টাকার নোট, পাঁচ-সাত সের মিষ্টি, এক কার্টন ৫৫৫ সিগারেট (বাবা ৫৫৫ ছাড়া খান না) নজরানা দিয়ে যাচ্ছি। যখনই দরকার, তখনই ড্রাইভারসহ গাড়ি পাঠিয়ে দিচ্ছি। এখন আর ফজরের নামাজের আগে যাই না, কারণ তিন সপ্তাহ ঝাড়ার পরও যখন লালুর মাইগ্রেন সারার কোন লক্ষণ দেখা গেল না, তখন স্বাভাবিক বুদ্ধি ও সৌজন্যবশতই নিঃশব্দে ভোরে যাওয়া বন্ধ করেছি। কিন্তু গতকাল বাবা আবার বললেন, কাল ভোরে আসিস। তাই আজ ভোরে গিয়েছিলাম। রোজার প্রথম দিন এত ভোরে কোথাও যাওয়া যে কি কষ্টকর। তবু গেলাম। গতকাল সাপ্তাহিক মিলাদের পর আমি বাবাকে চেপে ধরেছিলাম, খুব কান্নাকাটি করেছিলাম। বাবা তাই বলেছিলেন, তিনি সারারাত হুজরাখানায় আল্লার কাছে এবাদত করবেন, সকালে যেন যাই। খুব একটা আশা নিয়ে সকালে গিয়েছিলাম, কোন সুখবর নিশ্চয় তিনি দেবেন। কিন্তু তিনি শুধু বললেন রোববার পর্যন্ত দেখি, তারপর যা হয় করা যাবে। আটটায় বাড়ি ফিরে আবার গাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছি–পাগলা বাবার দরকার।

কিছু ভালো লাগছে না, মাথা ধরে উঠছে। কষ্টে, হতাশায়, অক্ষম রাগে চোখ দিয়ে দরদর করে পানি বেরোচ্ছে, ঠেকাতে পারছিনা। মাসুমা গতকাল একটা কাজের ছেলে এনে দিয়েছে–ওসমান। তাকেও কিছু কাজ দেখিয়ে দেওয়া উচিত, তাও পারছি না।

এই রকম পাগল পাগল অবস্থা থেকে রেহাই দিল মোতাহার, রেজিয়া আর মিনি। মোতাহারুল হক, শরীফের এক ইঞ্জিনিয়ার বন্ধু, রেজিয়া তার বউ, মিনি তার বড় ভাইয়ের মেয়ে।

রেজিয়া অর্থাৎ বাচ্চু আমার খুব ঘনিষ্ঠ বান্ধবী। ওরও শুধু ছেলে আমার মত, কোন মেয়ে নেই। তাই বোধ হয় মিনিকে প্রায় প্রায়ই ওদের সঙ্গে দেখা যায়। মিনি খুব চমৎকার মেয়ে, হাসিখুশি, মিশুক, ইন্টারমিডিয়েট ফার্স্ট ইয়ারে পড়ে, রবীন্দ্রসঙ্গীত গায় ভারি সুন্দর। অন্য সময় মিনিকে গান গাইতে বললে বাহানা করে, গা-মোড়ামুড়ি দেয়, আজ বলা মাত্র ও গাইতে শুরু করল। আমার কান্নায় ফোলা লাল চোখের দিকে চেয়ে ও গাইল :

দুঃখ যদি না পাবে তো
দুঃখ তোমার ঘুচবে কবে?
বিষকে বিষের দাহ দিয়ে
দহন করে মারতে হবে।

জ্বলতে দে তোর আগুনটারে
ভয় কিছু না করিস তারে।
ছাই হয়ে সে নিভবে যখন
জ্বলবে না আর কভু তবে।

এড়িয়ে তারে পালাস নারে
ধরা দিতে হোসনা কাতর।
দীর্ঘ পথে ছুটে ছুটে
দীর্ঘ করিস দুঃখটা তোর।

মরতে মরতে মরণটারে
শেষ করে দে একেবারে।
তার পরে সেই জীবন এসে
আপন আসন আপনি লবে।

মিনিরা থাকে রোকনপুরে–ওদের পৈতৃক বাড়িতে। মোতাহাররাও গুলশানের বাড়ি ছেড়ে রোকনপুরের বাড়িতে চলে গেছে। বাচ্চুর বাপের বাড়িও শ্বশুরবাড়ির দুটো বাড়ির পরেই। মার্চে ক্র্যাকডাউনের পর থেকেই আমাদের সকলের মধ্যে একটা প্রবণতা দেখা দিয়েছে আত্মীয়স্বজন মিলে কাছাকাছি একত্রে থাকার। সামরিক জান্তার প্রতিকারহীন নির্যাতনের মুখে অরক্ষিত অসহায় বাঙালি পরিবারগুলো কাছাকাছি থেকে এভাবেই বোধ করি শক্তি ও সাহস সঞ্চয় করার চেষ্টা করে।

আমার মানসিক অবস্থা দেখেই কি না জানি না, ওরা বহুক্ষণ রইল আমার সঙ্গে। মিনির কাছ থেকে জানতে পারলাম ঢাকার কিছু কিছু মুক্তিযোদ্ধার কার্যকলাপ।

বাচ্চুর বড় বোনের ছেলে জন, বাঙ্গুর বড় ছেলে দোলনের বন্ধুর ছোট ভাই আরিফ, তাদের বন্ধু ফেরদৌস–এরা সব স্কুলের ছাত্র, কিন্তু সবাই দুর্ধর্ষ বিন্দু। জন থাকে নারিন্দায়, ফেরদৌসমগবাজারে, আরিফ ধানমণ্ডিতে কিন্তু এরা সবাই মিনিদের বাড়িতে আসে, খায়, প্ল্যান-প্রোগ্রাম করে। এদের সঙ্গে সঙ্গে আরো অনেকে আসে–গান গায় যে মাহবুব, যাকে ওরা এল.পি. মাহবুব বলে ডাকে, সে আসে, সোহেল আসে, ফিরোজ আসে। এদের সঙ্গে যোগ রয়েছে নাসিরুদ্দিন ইউসুফ বাচ্চু, রাইসুল ইসলাম আসাদ, মানিক এবং অন্যান্য মুক্তিযোদ্ধা। ওরা বিরাট এক দল সাভারের কাছে কোন এক গ্রামে ঘাঁটি গেড়েছে, গ্রামের নাম মিনি জানে না, কিন্তু ওখান থেকে ঢাকা শহরে অস্ত্র আনতে মিনি আর ডালিয়া সালাহউদ্দিনের খালা শাহানা সাহায্য করে। আরিফ গাড়িতে করে মিনি আর শাহানাকে সাভারের কাছাকাছি এক নদীর ধার পর্যন্ত নিয়ে যায়, সেখানে গাড়িতে অস্ত্র ওঠানো হয়। গাড়িতে মহিলা থাকলে সাধারণত মিলিটারিরা চেকপোস্টে গাড়ি সার্চ করে না, কখনো-সখনো শুধু থামিয়ে দুএকটা কথা জিগ্যেস করে ছেড়ে দেয়। সেই জন্যেই মিনি আর শাহানা গাড়িতে বসে থাকে।

বুঝলাম, মিনি যে নাসিরুদ্দিন ইউসুফ বাচ্চুর কথা বলছে, সে-ই হচ্ছে মঞ্জুরের ভাগনে বা–যার কথা শরীফ আমাকে আগেই বলেছে। আমি মিনির কাছে ভাঙলাম না যে আমি ওদের কথা আগেই জেনেছি। আমি শুধু মিনির কথা শুনে যাচ্ছি, যত শুনছি, তত আমার বুকের ওপর থেকে চাপ চাপ ভার হালকা হয়ে যাচ্ছে, আমার মনের ভেতর থেকে কষ্ট, হতাশা আর রাগ উবে যাচ্ছে। ২৯-৩০ আগস্টের গ্রেপ্তারের পর মাত্র কয়েকটা দিন ঢাকা শহর নিথর ছিল। তারপরই আবার বিচ্ছুরা কিবিল্ করতে শুরু করেছে। আবার দলে দলে গেরিলারা ঢাকায় ঢুকছে বিভিন্ন দিক দিয়ে, ইউসুফ বাচ্চুরা সাভারের দিক দিয়ে, ইকুরা গোপীবাগের দিক দিয়ে। আরো কতো কতো দল কতো দিক দিয়ে ঢাকায় ঢুকছে, তার সব খবর কি আমি জানি।

এই যে গত পরশু বুধবার দুপুর একটার সময় স্টেট ব্যাঙ্কের ছয়তলায় একটা বাথরুমে বোমা বিস্ফোরিত হয়ে দুজন পাকিস্তানি কম্যান্ডো মরেছে, যে বিচ্ছুরা এ বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে, তাদের নাম আমি জানি না। তার আগের দিন মঙ্গলবার সকালের দিকে মতিঝিলে ই.পি.আই.ডি.সি, হাবীব ব্যাঙ্ক আর ডেন্সিয়াল বিল্ডিংগুলোর সামনের রাস্তায় বোমা বিস্ফোরিত হয়ে ওখানে পার্ক করা ছয়টা গাড়িনষ্ট হয়েছে, বিল্ডিং তিনটের সামনের দিকের সব জানালার কাচ ভেঙেছে। যে ছেলেরা দিনে-দুপুরে এই অসম সাহসিক বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে, তাদের নামও আমি জানি না। তারও দুদিন আগে ১৮ তারিখে রেসিডেন্সিয়াল মডেল স্কুলে বোমা বিস্ফোরিত হয়েছে। কে করেছে, জানি না।

কিন্তু নাম না জানলেও এটা বুঝতে পারছি তারা মুক্তিবাহিনীর গেরিলা, তারা আমাদেরই প্রত্যেকটি বাঙালি ঘরের দামাল ছেলে। সেই যে রুমী একটা কবিতা আবৃত্তি করেছিল :

পারলে নীলিমা চিরে বের
করতো তোমাকে ওরা, দিত ডুব গহন পাতালে।
তুমি আর ভবিষ্যৎ যাচ্ছো হাত ধরে পরস্পর।
সর্বত্র তোমার পদধ্বনি শুনি, দুঃখ-তাড়ানিয়া
তুমিতো আমার ভাই, হে নতুন, সন্তান আমার।

গেরিলা নামের সেই কবিতাটির কথা এখন আমার মনে পড়ল।

মিনির মুখে এই দামাল ছেলেদের আরো একটা কীর্তির কথা শুনলাম : জানেন চাচী, এবার ১৪ আগস্ট কি হয়েছিল? বেলুনে গ্যাস ভরে বেলুনের সাথে বাংলাদেশের ফ্ল্যাগ আর নৌকো বেঁধে ছেড়ে দিয়েছিল ওরা। জনের বড় দুলাভাইয়ের বেলুনের ফ্যাক্টরি আছে, সেইখান থেকে অনেক বেলুন এনে বাসার মধ্যে লুকিয়ে গ্যাস ভরা হয়েছিল। কায়েদে আজম কলেজের কয়েকটা ছেলে গ্যাস নিয়ে এসেছিল। আমরা সব। কাগজ দিয়ে ছোট ছোট ফ্ল্যাগ আর নৌকো বানিয়েছিলাম। ভোর রাতের দিকে আমাদের বাড়ির ছাদ থেকে ওগুলো ওড়ানো হয়। নৌকো বাধা একটা বেলুনের সুতো নবাবপুরের একটা ইলেকট্রিক তারে আটকে গিয়ে ঝুলছিল। তাই নিয়ে সেখানে কি হৈচৈ! রাজাকাররা সেইখানে আর কাউকে দাঁড়াতে দেয় না। মোহন চাচা নবাবপুরে বাজার করতে গিয়ে এই দৃশ্য দেখে বাজার-টাজার ভুলে বাড়ি চলে আসেন। এই নিয়ে সেদিন সারা পাড়াতেই টেনসান! কি জানি, যদি পাড়া সার্চ করতে আসে মিলিটারি এসেছিল?

মিনি ঝরঝর করে হেসে বলল, নাঃ, আসে নি।