২১ আগস্ট, শনিবার ১৯৭১

২১ আগস্ট, শনিবার ১৯৭১

সকালে রুমীর ফোন পেলাম রেবাদের বাসা থেকে। রুমী ওখানে রয়েছে, ওকে নিয়ে আসতে হবে।

গেলাম। রুমী ঢাকা আসার পর থেকে গাড়িটা বাড়িতেই থাকে, কখন লাগে–তার জন্য। শরীফ, বাঁকা কিংবা মঞ্জুরের গাড়িতে অফিসে যাওয়া আসা করে।

গিয়ে দেখি, রুমীর চেহারার অবস্থা করুণ। দুদিনের খোঁচা খোঁচা দাড়ি, উষ্কখুষ্ক চুল, রাতজাগা লাল চোখ, কুঁচকানো কাপড়-চোপড়। রুমী বলল, এই চেহারা-সুরত নিয়ে বেবিতে যেতে সাহস পেলাম না। গুলশান লেকের ঘাট থেকে মিনিমামার বাসাটা একদম কাছে, তাই এদিক দিয়ে এলাম।

বুঝলাম নদীর ওপারে যে গ্রামে ওদের ক্যাম্প আছে, সেইখান থেকে এসেছে।

বাড়ির দিকে গাড়ি চালিয়ে বললাম, ঠিক আছে। অসুবিধে তো কিছু নেই আমার। কিন্তু চেহারা-সুরত এরকম হলো কি করে, বলা যাবে?

যাবে বলে রুমী বিষন্ন হাসি হাসল, পেছনে মাথা হেলিয়ে চোখ বুজে আস্তে আস্তে বলল, পরশু রাতে দুটো নৌকায় করে আমরা কয়েকজন সিদ্ধিরগঞ্জ পাওয়ার স্টেশনের আশপাশটা একটু দেখতে বেরিয়েছিলাম। সামনের নৌকায় কাজী ভাই, বদি আর জুয়েল ছিল। অন্ধকার রাত, কিছু দেখা যায় না। আমরা পেছনের নৌকায় একটু দূরে। আসলে কাজী ভাইরা কি যেন একটা চেক করে দেখার জন্য এগিয়ে গেছে, আমাদের একটু পেছনে থাকতে বলেছে। হঠাৎ শুনি ভয়ানক গুলির শব্দ। কিছুই বুঝতে পারি না। অন্ধকারে শুনলাম চিল্কার, পানিতে ঝাপিয়ে পড়ার শব্দ। ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলাম। একটু পরে কাজী ভাইদের নৌকা কাছে এলে সব জানতে পারলাম। কাজী ভাইরা একটা মিলিটারি ভর্তি নৌকার সামনে পড়েছিল। মাঝিটা ছিল রাজাকার। সে বাংলায় শুধিয়েছিল কে যায়, মিলিটারিগুলো একদম চুপ করে ছিল। কাজী ভাই একটু ঘুরিয়ে জবাব দেয় সামনে। নৌকাটা একদম কাছে আসতেই ওরা দেখে নৌকাভর্তি মিলিটারি। কাজী আর জুয়েল তাদের স্টেনগান নৌকার পাটাতনে লুকিয়ে রেখেছিল। কিন্তু বদি তা রাখে নি। সে কোলের মধ্যে রেখেছিল। ভাগ্যিস রেখেছিল। তাই আমরা সবাই বেঁচে গেছি। বদি সঙ্গে সঙ্গে স্টেন তুলে ওদের নৌকার ওপর ব্রাশফায়ার করে। পুরো ম্যাগজিন একেবারে খালি করে দেয়। মিলিটারিরাও গুলি চালিয়েছিল, তবে বদির ব্রাশের মুখে একদম সুবিধে করতে পারেনি। কেবল জুয়েলের আঙ্গুলে গুলি লেগেছিল। মিলিটারিদের কয়েকটা মরে, বাকিরা পানিতে ঝাঁপিয়ে পড়ে। ওদের নৌকাটা উল্টে যায়। বদিও পানিতে পড়ে গিয়েছিল। ওকে পরে তুলে আমরা সবাই পিরুলিয়া গ্রামে ফিরে যাই। জুয়েলকে নিয়ে যা বিপদে পড়েছিলাম। সে রাতে কোনমতে ফার্স্ট এইড দিয়ে রাখা হলো। গতকাল কাজী বদি, জুয়েলকে ঢাকা নিয়ে এসেছে। ওর আঙ্গুলে অপারেশন করতে হবে।

আমার গা শিরশির করতে লাগল। একটু হলেই সবাই গুলি খেয়ে মরতে পারত, জখম হয়ে নদীর পানিতে তলিয়ে যেতে পারত। কোনোদিন জানতেও পারতাম না। ছেলেগুলোর কি হলো?

রুমীকে সে কথা বলতে সে হাসল, আমাদের সেক্টর কমান্ডার কর্নেল খালেদ মোশাররফ কি বলেন, জান? তিনি বলেন, কোন স্বাধীন দেশ জীবিত গেরিলা চায় না; চায় রক্তস্নাত শহীদ। অতএব মা মণি, আমরা সবাই শহীদ হয়ে যাব–এই কথা ভেবে মনকে তৈরি করেই এসেছি।

আমার হঠাৎ দুচোখে পানি এসে গেল। গাড়ি চালাতে অসুবিধে হবে, তাই আর কথা না বলে মাথা উঁচু করে চোখের পানি আবার ভেতরে পাঠাবার প্রয়াসে বড় বড় শ্বাস নিতে লাগলাম। রুমী বুঝতে পেরে কথা ঘুরিয়ে দিল, জান আম্মা, জুয়েল জখম। হওয়াতে আমাদের তৎপরতা একটু ঢিলে পড়ে যাবে। জুয়েলকে সাবধানে লুকিয়ে রাখতে হবে। আমাদেরও একটু বেশি সতর্ক থাকতে হবে। আসলে সিদ্ধিরগঞ্জ পাওয়ার স্টেশনটা এখনো ওড়াতে পারা গেল না, তাই মনে একদম শান্তি নেই। অথচ এই সিদ্ধিরগঞ্জ পাওয়ার স্টেশন ওড়াবার জন্য মেলাঘরে হায়দার ভাই আমাদের দলকে স্পেশাল ট্রেনিং দিয়েছে। কাজী ভাই এই দলের লিডার। এই কাজের জন্য আমরা সঙ্গে এনেছি প্রচুর অস্ত্রশস্ত্র। একটা ৩.৫” রকেট লাঞ্চার, সেটা চালাবার জন্য আর্টিলারি থেকে একজন গানারকেও আমাদের সঙ্গে দেওয়া হয়েছে। আটটা রকেট শেল, কি যে ভারি, বয়ে আনতে আমাদের জান বেরিয়ে গেছে। এ ছাড়া দুটো এস.এল.আর উইথ অ্যানাগালঞ্চার। প্রত্যেকের জন্য একটা করে স্টেনগান, চারটে করে ম্যাগজিন, অসংখ্য বুলেট, দুটো করে হ্যান্ড গ্রেনেড়। এখানে এসে দেখা গেল, যা হেভি সিকিউরিটি, তাতে শুধু বাইরে থেকে রকেটশেল মেরে কিছু করা যাবে না, মেরে দিয়ে পালানোও যাবে না। তখন ভেতর থেকেও স্যাবোটাজ করার কথা চিন্তা করা হলো। কাজী ভাই, আলম, শাহাদত ভাই, আরো কয়েকজন একত্রে বসে প্ল্যান অব অ্যাকশান ঠিক করা হলো। সেইমত আলম আর শাহাদত ভাই এখন কাজ করছে। পাওয়ার স্টেশনের ভেতরের দুজন কর্মচারীকে, বিস্ফোরক কিভাবে নাড়াচাড়া করতে হয়, সে বিষয়ে কিছু ট্রেনিং দিয়ে তাদের সাহায্যে একটু একটু করে পি. কে. স্টেশনের ভেতরে পাচার করা হচ্ছে। সবসুদ্ধ ৮০/৯০ পাউন্ড পি. কে, লাগবে। একেকবারে ৮/১০ পাউন্ড পি, কে, রুটির মতো বেলে গাড়ির দরজার ভেতর দিকের হার্ডবোর্ড কভার খুলে তার মধ্যে সেঁটে, আবার কভার এঁটে পাওয়ার স্টেশনের ভেতরে নিয়ে লুকিয়ে রাখা হচ্ছে। এই কাজে সময় বেশি লাগছে। তাছাড়া এত পি. কে. ঢাকাতে মজুত নেই। ওগুলোও আনাতে হচ্ছে। সব পি. কে. স্টেশনের ভেতরে নিয়ে যাওয়া শেষ হলে, তখন একটা তারিখ ঠিক করা হবে ভেতর থেকে ব্লাস্ট করানোর। এবং ঐ একই দিনে একই সময়ে আমরা বাইরে থেকে রকেটশেল মেরে খানসেনাদের ব্যতিব্যস্ত রাখব। এই প্ল্যান যদ্দিন কার্যকর না হয়, তদ্দিন আমরা অন্যসব অ্যাকশান চালিয়ে যাব।

রকেট লঞ্চার, এস.এল.আর, উইথ অ্যানাগালঞ্চার কি জিনিস বুঝলাম না। কিন্তু জিগ্যেস করতেও সাহস হল না। আমার চোখের পানি থামানোর জন্য রুমী গড়গড় করে এত কথা বলে গেল, যা সে কখনো করে না, তার ওপর আবার প্রশ্ন করে তার মুড নষ্ট করতে চাই না। পরে এক সময় জেনে নেব।

বাড়ি পৌঁছেই রুমী বলল, আম্মা, নাশতা রেডি কর। আমি শেভ, গোসল সেরে আসছি।

ধোপদুরস্ত কাপড় পরে নাশতা খেয়ে বলল, যাই, জুয়েলের খবর নিয়ে আসি। তাড়াতাড়ি ফিরিস। আমিও জুয়েলের খবর জানবার জন্য ব্যস্ত হয়ে থাকব।

কোথায় তাড়াতাড়ি ফেরা! ফিরল একেবারে সন্ধ্যা পার করে। সঙ্গে বদি। রুমী টুকেই বলল, আম্মা, এই দুর্দান্ত সাহসী ছেলেটাকে ভালো করে খাইয়ে দাও তো। ওর

জন্যই আমরা সেদিন সবাই প্রাণে বেঁচে গেছি।

বদি বিব্রত মুখে রুমীকে মৃদু ধমক দিল, খালি বেশি বকে।

আমি জিগ্যেস করলাম, জুয়েলের খবর কি?

জুয়েল ভালো আছে। কাল সন্ধ্যায় কাজী আর বদি জুয়েলকে ডাঃ রশীদউদ্দিন আহমদের চেম্বারে নিয়ে গিয়েছিল। কাজীর এক বন্ধু আছে, কুটু, ওর বাবা শামসুল আলম ডাঃ রশীদের বন্ধু। ঐ আলম সাহেবের গাড়িতে করে ওরা যায়। তবে ডাঃ রশীদের চেম্বারে অপারেশনের ব্যবস্থা নেই। তাই ডাঃ রশীদ জুয়েলকে ডাঃ মতিনের ক্লিনিকে নিয়ে যান। ওখানে অপারেশন থিয়েটার আছে। সেখানে গিয়ে ডাঃ রশীদ জুয়েলের আঙ্গুলে অপারেশন করে ব্যান্ডেজ করে দিয়েছেন। কয়েকদিন পরে আবার দেখাতে নিয়ে যেতে বলেছেন।

বদিবলল, ডাঃমতিনের ক্লিনিক কোথায় জানেন? রাজারবাগ পুলিশ স্টেশনের ঠিক উল্টো দিকে। তাই ডাঃ রশীদ তার ডক্টর লেখা ভোকসওয়াগনে জুয়েলকে বসিয়ে নিয়ে গেছেন। উনার সাহস আছে বলতে হবে। কিন্তু জুয়েলকে দেখবার জন্য আমরা আর যাচ্ছি না ওইখানে।

রুমী বলল, এই এলিফ্যান্ট রোডেই আজিজ মামার পলি ক্লিনিক আছে, সেখানে নিয়ে গেলেই হবে।