২০ জুলাই, মঙ্গলবার ১৯৭১

২০ জুলাই, মঙ্গলবার ১৯৭১

আজ সকাল থেকে পানি নেই। গত রাতে কারেন্ট না থাকার দরুন মিউনিসিপ্যালিটির পাম্প চালানো সম্ভব হয় নি–সেটা বোঝাই যাচ্ছে। বারেককে একটা ছোট বালতি হাতে ডাক্তারের বাসায় টিউবওয়েল থেকে পানি আনতে পাঠালাম। নিচের বাথরুমে দুটো বড় বালতি, রান্নাঘরে কয়েকটা ডেকচি ভর্তি করে নিলাম। ট্যাপে পানি না আসা পর্যন্ত কোনোমতে রাধাবাড়া আর হাত-মুখ ধোয়ার কাজ চালিয়ে নিতে হবে।

শরীফ অফিসে গিয়েই ফোন করেছে, শোননা, জামীকে পি.জির দিকে রাস্তায় যেতে বারণ করো। ধানমন্ডি পাওয়ার সাবস্টেশনের সামনে আর চারপাশে মেলাই মিলিটারি। পুরো জায়গাটা কর্ডন করে রেখেছে। রেললাইনের কাছ থেকে সব ট্রাফিক ঘুরিয়ে দিচ্ছে। আমি তো গাড়ি ঘুরিয়ে আবার আমাদের বাড়ির সামনে দিয়ে গিয়ে বলাকা-নীলক্ষেত হয়ে অফিসে এসেছি।

আর কোন খবর।

এখনো জানি না। জানলেই ফোন করব।

ধলু আর চিশতী এসেছে সাড়ে নটার দিকে। রাজশাহীতে ট্রাঙ্কল করবে। লাইন পেতে পেতে এগারোটা বাজল। অনেকক্ষণ গল্প করা গেল ওদের সঙ্গে।

পশ্চিম পাকিস্তানের সাধারণ লোকেরা নাকি জানেনা যে পূর্ব পাকিস্তানে মিলিটারিরা এত খুন-খারাবি করেছে। সরকারি প্রচার মাধ্যমের চমৎকার ব্যবস্থাপনার ফলে তারা জানে যে পূর্ব পাকিস্তানে ভারতীয়রা হামলা করছে, দেশের ভেতরের কিছু গাদ্দার বাঙালি তাদেরকে সাহায্য করছে, সেই জন্য পাকিস্তান আর্মি ভারতীয় দমন আর হিন্দু মারার কাজে ব্যস্ত রয়েছে।

বুবু, জানেন তো পশ্চিম পাকিস্তানিরা কি ভয়নক রকম অ্যান্টি-ইন্ডিয়ান। এটা আরো বেড়েছে ৬৫ সালের ইন্ডিয়া-পাকিস্তান যুদ্ধের পর থেকে। ইয়াহিয়া সরকার এই সেন্টিমেন্টটার সুযোগ নিয়ে এমন নির্লজ্জের মতো মিথ্যে প্রোপাগান্ডা চালাচ্ছে যে কি বলব! তাছাড়া ওদিককার জনসাধারণও এমন কট্টর পাকিস্তানপ্রেমিক যে, সরকার যা বোঝাচ্ছে, নির্বিচারে তাই বুঝে নিশ্চিন্তে দিন-গুজরান করছে।

ও দিকের লোকেরা কি বি.বি.সি, ভয়েস অব আমেরিকা, রেডিও অস্ট্রেলিয়া এসব শশানে না?

শোনে, কিন্তু বিশ্বাস করে না। ওরা সরকারের ছেলে ভুলানো ছড়া শুনেই সন্তুষ্ট।

শরীফ আবার ফোন করল এগারোটার দিকে, কাল রাতে উলান আর গুলবাগ পাওয়ার স্টেশনে শর্ট সার্কিট হয়েছে।

আর শাহবাগে?

না, ওখানে ঠিকমত হয় নি।

উলান কোথায়? গুলবাগ?

উলান রামপুরার দিকে। গুলবাগ-খিলগাঁওয়ে। আরেকটা খবর : পরশু বিকেলে শুধু গ্যানিজে নয়। ভোগ-এও।

তাই নাকি? বাঃ বেশ তো। একই দল নাকি?

ঠিক জানি না। কেউ বলতে পারল না।

শোনো, বাসায় ফেরার পথে আজই লো-ডাউন কিনে নিয়ে এসো। কমোড ব্যবহার করা যাচ্ছে না তো। বালতি দিয়ে পানি ঢাললে ঠিকমত ফ্রাশ হয় না।

আনব। তুমি আহাদ মিস্ত্রিকে বিকেলে আসতে বলে দাও।

চিশতীকে বললাম, তোমরা বাড়ি ফেরার পথে দুটো হারিকেন আর কিছু মোমবাতি কিনে নিয়ে যাও।

লুলু এল একটার দিকে। বলল, কি কাণ্ড জানেন মামী? ধানমন্ডি পনের নম্বর রোডে কাল রাতে কারা যেন একটা মোটরগাড়ি বোমা দিয়ে উড়িয়ে দিয়েছে। আজ ভোর ওখানে লোকে লোকারণ্য। কিন্তু মজা কি জানেন? যেই সূর্য উঠলো, অমনি লোকজন সব ফরসা!

কেন?

সূর্য ওঠার পরে মিলিটারি আসবে। মিলিটারিরা তো বিচ্ছুদের ভয়ে নিজেই নিজেদের কারফিউ দিয়ে রাখে সারারাত!

তুই না আজিমপুর রোডে থাকিস। তুই ধানমন্ডি পনের নম্বর রোডের খবর জানলি কি করে?

বারে, আমি রোজ ভোরে মর্নিং ওয়াক করতে বেরোই না?

লুলু, তুই কি উলান গুলবাগের কথা শুনেছিস আজ কারো মুখে? আর আমাদের পাড়ার ঘটনা?

লুলু, অবাক হয়ে বলল, না তো। কেন কি হয়েছে?

লুলুকে সংক্ষেপে বললাম, গতকাল রাতের ঘটনা আর সকালে শরীফের ফোনের কথা। তোর মামা এলে সব বিস্তারিত শোনা যাবে। বস্। খেয়ে যাবি।

আড়াইটে বেজে গেছে। শরীফ এখনো আসছে না। ছটফট করছি। ও এলে তবেই শোনা যাবে উলান-গুলবাগের ঘটনার পুরো বিবরণ। ফোনে খোলাখুলি কথা বলা বিপজ্জনক। তাই শর্ট সার্কিট শুনেই সন্তুষ্ট থাকতে হয়েছে।

শরীফ এসে বলল, গেরিলারা ঐ দুটো পাওয়ার স্টেশনের ট্রান্সফরমার উড়িয়ে দিয়ে ঠিকমতো ভেগে গেছে। খানসেনারা একটাকেও ধরতে পারে নি। তবে বিস্ফোরণের পর থেকে ঐদুই এলাকায় ত্রাসের রাজত্ব শুরু হয়েছে। ধরপাকড়, বাড়ি বাড়ি তল্লাশি, রামপুরা আর খিলগাঁও এলাকা নাকি খানসেনা দিয়ে গিজগিজ করছে। ওদিকের রাস্তা দিয়ে হাঁটাও নাকি বিপজ্জনক।

আমার ভয় হলো, ধানমিন্ড সাব-স্টেশনের দরুন মিলিটারি হামলা আমাদের বাড়ি পর্যন্ত গড়াবে না তো আবার? শরীফ বলল, মনে হয় না। আমাদের বাড়ি ও জায়গা থেকে বেশ দূরে–গলির ভেতরে। ওরা সাব-স্টেশনের চারপাশটা ঘিরে তল্লাশি করছে। ওখানে বিচ্ছুরা ভেতরে যন্ত্রপাতি বিশেষ নষ্ট করতে না পারলেও পুলিশ বেশ কয়টা মেরে দিয়ে গেছে।

শরীফ তিনটে লো-ডাউন কিনে এনেছে। আহাদ মিস্ত্রি কাজে লেগে গেছে। অন্তত একটা লো-ডাউন আজকের মধ্যে লাগাতেই হবে। প্রথমে দোতলায় বাবার বাথরুমটায় কাজ শুরু হয়েছে। আহাদ এ পাড়ারই লোক, দরকার হলে ও রাত দশটা পর্যন্ত কাজ করতে পারবে।

ডাক্তারের টিউবওয়েলটা খুব মোক্ষম সময়ে বসানো হয়েছিল। আজ বড়ো কাজে লাগলো। আমি তো সকালেই পানি আনিয়ে সেরেছি। বিকেলে দেখি, সব বাড়ি থেকে কলসি, বালতি, জগ সারে সারে চলছে ডাক্তারের বাড়ির দিকে।

দিনের বেলা ডোমেস্টিক অর্থাৎ লাইট ফ্যানের লাইনে দুএকবার কারেন্ট এসেছিল অল্পক্ষণের জন্য। পাওয়ার লাইন একেবারেই ছিল না। সন্ধ্যার পর সব লাইন চলে গেল। সারা ঢাকা শহর নিকষ কালো।

বিকেলেই তাড়াহুড়ো করে চারটে হারিকেন কিনে আনা হয়েছে। দোকানে শরীফ আর জামী গিয়েছিল। এসে বলল, হারিকেন আর মোমবাতি কেনার জন্য দোকানে যা ভিড়! সবাই কিনছে। দোকানীরা এই সুযোগে দামও বাড়িয়ে দিয়েছে।