১ মে, শনিবার ১৯৭১

১ মে, শনিবার ১৯৭১

চোখ বাঁধা, হাত বাঁধা লোকজনকে ট্রাকে উঠিয়ে নিয়ে যাওয়া, নদীতে চোখ-হাত বাধা বুলেটবিদ্ধ লাশ ভেসে যাওয়া এসব খবরের পাশাপাশি আরেকটা রক্ত হিম-করা খবরও মাঝে-মাঝে শুনছিলাম। দুএকজনের কাছে, অবিশ্বাসযোগ্যভাবে, অল্প-স্বল্প শুনতে শুনতে এখন সে খবরটাই সবার মুখে মুখে দ্রুত ছড়াতে ছড়াতে সারা শহরময় কালবৈশাখীর ঝড়ের মতো হয়ে উঠেছে। পাকিস্তান আর্মি যুবা ও বয়স্ক লোকদের ধরে নিয়ে এখন আর গুলি করে মেরে ফেলছে না, তাদের শরীর থেকে শেষ বিন্দু পর্যন্ত রক্ত বের করে নিয়ে তারপর লাশ ফেলে দিচ্ছে। এত রক্ত কেন দরকার হচ্ছে। দেশের বিভিন্ন জায়গায় তাদের যে যুদ্ধ হচ্ছে মুক্তিবাহিনীর সঙ্গে, তাতে প্রচুর সংখ্যায় পাকিস্তানি সৈন্য জখম হচ্ছে। তাদের চিকিৎসার জন্য প্রচুর রক্ত দরকার। এত রক্ত ব্লাড ব্যাঙ্কে নেই। তাই এভাবেই তারা রক্ত সংগ্রহ করছে।

প্রথম খবরটা কিভাবে বেরিয়েছিল? গুলি করে, ছুরি মেরে লাশ ফেললে বোঝা যায়, রক্ত বের করে নিয়ে লাশ ফেললে কিভাবে লোকে বুঝবে? শরীরের কোথাও কোনো আঘাতের চিহ্ন নেই, অথচ মৃত। প্রথমে লোকে বুঝে পায় নি কি করে মরল। দুএকজন ফেলে দেওয়া লোক মরে নি। তারা কোনমতে বেঁচে উঠে যখন এই খবর ছড়াল, তখন লোকে বুঝতে পারল কোনরকম আঘাতের চিহ্ন ছাড়াই মরে যাবার রহস্যটা কি।

সারা ঢাকা শহরে এখন ভয়ানক আতঙ্ক। অথচ কোন হাসপাতালের কোন ডাক্তার বলতে পারছে না কোথায় এসব কাণ্ড হচ্ছে। কারণ রক্ত বের করে নিতে হলে একটা টেবিল, একজন ডাক্তার বা কম্পাউন্ডার, রক্ত বের করার সিরিঞ্জ, রবারের নল, রক্ত ভরবার বোতল বা প্লাষ্টিক ব্যাগ–এসব দরকার। কোন হাসপাতালে এসব যত গোপনেই করা হোক, ব্যাপারটা জানাজানি হবেই। কোন হাসপাতালেই এসব হচ্ছে না, পরিচিত বহু ডাক্তার বলেছেন। তাহলে? পাকিস্তানিরা নিশ্চয় গোপন ক্লিনিক বসিয়ে ফেলেছে এসব কাজের জন্য। আমাদের জানাশোনা অনেক ডাক্তার ব্যাপারটা স্রেফ গুজব বলে উড়িয়ে দিলেন। আমরাও তো তাই চাই। কিন্তু আতঙ্ক যে ছাড়ে না।

রঞ্জু একটা রক্ত হিম-করা খবর আনল। মহাখালি থেকে যে রাস্তাটা টঙ্গী জয়দেবপুরের দিকে চলে গেছে, সেই রাস্তার বাঁদিকে বেশ কতকগুলো দোকানপাট আছে। মাঝে-মাঝে সরু গলি চলে গেছে বাঁদিকে ভেতরে। সেদিকে বাড়িঘর-পাড়া আছে। অন্যদিকে তো গুলশান। এই রকম জায়গায় একটা ওষুধের দোকানে রঞ্জুর এক বন্ধু এল.এম.এফ ডাক্তার রোজ সন্ধ্যায় বসে, দুচারটে রুগী দেখে। কদিন আগে সন্ধ্যার পরে দুজন পাকিস্তানি সৈন্য আর দুজন বিহারি বন্দুকের মুখে ডাক্তারটিকে উঠিয়ে নিয়ে যায়। ওরা প্রথমে ডাক্তারকে জিপে তুলে একটু এগিয়ে বাঁয়ে এক গলিতে ঢোকে, সেই সময় পেছন থেকে একজন ওর চোখ কালো কাপড়ে বেঁধে দেয়। তারপর মিনিট দশেক চলার পর জীপ থামলে ডাক্তারকে লোকগুলো ধরে ধরে একটা বাড়ির ভেতর নিয়ে তারপর চোখ খুলে দেয়। ডাক্তার দেখে, একটা টিনের ছাদওয়ালা বেড়ার ঘর। একপাশে একটা সরু লম্বা টেবিল, সেটার মাথার কাছে আরেকটা চৌকো ঘোট টেবিলে অনেক কয়টা বোতল, সিরিঞ্জ, রবারের নল ইত্যাদি সাজানো। আরেক পাশে লম্বা বেঞ্চে চোখ বাঁধা অবস্থায় বসা তিনটে লোক। সশস্ত্র পাকিস্তানি সৈন্য আর বিহারিদের নির্দেশে ডাক্তারটিকে ঐ লোক তিনটির শরীর থেকে রক্ত বের করতে হয়। রঞ্জুর বন্ধুটি কিন্তু এই রকম ভয়াবহ অবস্থাতেও বুদ্ধি হারায় নি। কাজ শেষে পাকিস্তানি সৈন্য আর বিহারিরা যখন তর্ক করছিল ডাক্তারটিকে মেরে ফেলা হবে কি না, তখন ডাক্তারটি ওদেরকে বলে : ওরা যখনই বলবে, সে এভাবে এসে ওদের কাজ করে দেবে। ডাক্তারটির কপাল ভালো ওরা তাকে বিশ্বাস করে। ছাড়া পাওয়া মাত্রই ডাক্তারটি ঊর্ধ্বশ্বাসে রঞ্জুর বাসায় এসে তাকে সব বলে সেই রাতেই পালিয়েছে বর্ডার পেরিয়ে ইন্ডিয়া চলে যাবার জন্য।

রঞ্জ চলে যাবার পরেও আমরা বহুক্ষণ স্তম্ভিত হয়ে বসে রইলাম। অনেকক্ষণ পরে আমি বললাম, আমার ঠিক বিশ্বাস হতে চায় না। রঞ্জুর বন্ধু যে বানিয়ে বলে নি, তার প্রমাণ কি?

রুমী রেগে উঠল, আম্মা সবটাতেই তোমার অবিশ্বাস। সবকিছুতেই তোমার প্রমাণ চাই।

শরীফ ধীর গলায় বলল, বিশ্বাস হতে চায় না এই জন্যে যে এত সুপরিকল্পিত নিষ্ঠুরতা মানুষের পক্ষে সম্ভব বলে ধরে নিতে কষ্ট হয়।

কেন, দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় হিটলারের গেষ্টাপোবাহিনী কি করেছে কনসেনট্রেশান ক্যাম্পে বন্দীদের ওপর, পড় নি? বাড়িতে কমপক্ষে দশটা বই রয়েছে এই বিষয়ে।

রুমীর মেজাজটা আজকাল খুব ভালো যাচ্ছে না। এখানো ও যুদ্ধে যেতে পারে নি। সঠিক যোগাযোগের লোক পাচ্ছে না। প্রায় প্রায় গজগজ করে, প্রথম চোটে আমার যে সব বন্ধুরা গেছে তাদের সঙ্গে গেলে কত সহজে বর্ডার ক্রস করতে পারতাম। তখন নিরাপদও ছিল। বর্ডার ঘেঁষে বহু জায়গা মুক্ত ছিল। এখন তো পাকিস্তানি সৈন্য বেশির ভাগ জায়গাই আবার দখল করে নিয়েছে। এখন যাতায়াতের রাস্তায় বিপদ অনেক বেড়ে গেছে।

আমি চুপ করে থাকি। এখন যেন মনে হয়, অনেক আগে যেতে দিলেই হতো। এই যে জলজ্যান্ত মানুষ ধরে নিয়ে, ঠাণ্ডা মাথায়, সাবধানে সিরিঞ্জ ঢুকিয়ে ধীরে ধীরে সবটুকু রক্ত বের করে নিয়ে মেরে ফেলছে–এই রকম আতঙ্কময় রটনার মাঝে রুমীর মতো তাগড়া ছেলে নিয়ে বসবাস করতে দম আটকে আসে। রাতে দুঃস্বপ্ন দেখে বিছানায় উঠে বসে থাকি।