১ আগস্ট, রবিবার ১৯৭১

১ আগস্ট, রবিবার ১৯৭১

তিনজন মার্কিন নভোচারী, অ্যাপোলো-১৯ নভোযানে চড়ে কোটি কোটি মাইল মহাশূন্য পাড়ি দিয়ে চাঁদের পিঠে নেমে আরামে ঘুরে বেড়াচ্ছে। আহা, আমি যদি কোন রকম একটা টুটাফুটা আকাশযান পেতাম, যেটায় চড়ে, মাত্র কয়েকশো মাইল দূরে মেলাঘর বলে একটা জায়গায় নেমে, মাত্র একপলকের জন্য আমার রুমীকে চোখের দেখা দেখে আসতে পারতাম!

রুমী গেছেআজ আটচল্লিশ দিন হলো। মনে হচ্ছে আটচল্লিশ মাস দেখি নি। একেক সময় মনে হয় রুমী বলে কেউ কি আছে? রুমী নামের কেউ কি ছিল কোনকালে? নাকি রুমী একটা অলীক মায়া?

আজ থেকে ডাঃনূরুল ইসলামের ব্যবস্থাপত্রে ওষুধ খেতে শুরু করেছি। উনি প্রথমে দেখে, রক্ত থেকে শুরু করে একত্স-রে পর্যন্ত যত ধরনের পরীক্ষা আছে, সব করাতে বলেন। সে সবের রিপোর্ট দেখে তারপর ওষুধ দিয়েছেন। দিয়েছেন তো বটে কিন্তু আমি জানি ওসব ওষুধে কোন কাজ হবে না। আমার আসল ওষুধ আছে মেলাঘরে। সেই ওষুধ কে এনে দেয়!

বিকেলে কলিম এসেছে। তারও খুব মন খারাপ। নীলফামারী থেকে তার ছোট শালা পাওয়ার (লতিফুর রহমান প্রধান) ঢাকায় এসেছে সপ্তাহখানেক হল। সে খবর এনেছে পাক আর্মি তার বড় দুলাভাইকে মে মাসের শেষ সপ্তাহে মেরে ফেলেছে। এই খবর শুনে কলিমের বউ সেলিনা খুব কান্নাকাটি করছে। সেলিনার বড় দুলাভাই মকবুল হোসেন চিলাহাটিতে থাকতেন। খুবই সজ্জন প্রকৃতির লোক ছিলেন। সেলিনার বাবা মা, পাওয়ারসহ অন্য দুই ছেলে নিয়ে মার্চ মাসের শেষ সপ্তাহ পর্যন্ত নীলফামারীতে নিজেদের বাড়িতেই ছিলেন। সে সময় নীলফামারীতে ই.পি.আর., ই.বি.আর, আনসার, মুজাহিদ ও স্থানীয় যুব সম্প্রদায় মিলে যে প্রতিরোধ বাহিনী গড়ে উঠেছিল, তাতে সেলিনার বড় ভাই আবু (রাশিদুর রহমান প্রধান) একজন থানা কমান্ডার হিসেবে কাজ করছিল। এপ্রিলের সাত তারিখে পাক আর্মি নীলফামারী দখল করে নিলে এই প্রতিরোধ ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়। আরো অনেকের সঙ্গে আবু ইন্ডিয়ায় চলে যায়। পাওয়ার তার মাকে নিয়ে কাছাকাছি এক গ্রামে চলে যায়। বাবাও আলাদাভাবে ইন্ডিয়া চলে গিয়ে তিন মাস পরে নীলফামারীতে ফিরে আসেন। মাকে নিয়ে পাওয়ারও নীলফামারীতে চলে আসে। নীলফামারী থেকে ইন্ডিয়াতে প্রায় প্রায় লোক যাতায়াত করে। লোকমুখে পাওয়ার খবর পেয়েছে যে আবু এখন স্বাধীন বাংলা বেতারে কাজ করছে।

ডাক্তার এ. কে. খান এক মাসের ছুটি নিয়ে রাজশাহী থেকে ঢাকা এসে পৌঁছেছেন আজ সন্ধ্যায়।