১৬ জুন, বুধবার ১৯৭১

১৬ জুন, বুধবার ১৯৭১

কবীর চৌধুরী বারুদের স্কুপের ওপর বসে আছেন। বাংলা একাডেমিতে চিঠি সঙ্গে নিয়ে ঢোকা ঠিক হবে না। বোরহানও সেই কারণে নিজে যায় নি। দশটার সময় ফোন করলাম কবীর চৌধুরীকে। ওর ফোন ট্যাপ হয়। কথাবার্তা সাবধানে বলতে হবে। নামটাম কিছু না বলে শুধু বললাম, আপনার বন্ধুর যে খুব অসুখ। আজই একবার আসবেন।আমার যা মার্কামারা গলা, নাম না বললেও কারোরই চিনতে অসুবিধা হয়। উনি বললেন, সত্যি খুব অন্যায় হয়ে গেছে এতদিন খবর না নিয়ে। যাব।

ফোন সেরে হেঁটে হেঁটে গেলাম বলাকা বিল্ডিংয়ের নিচতলায় মুসলিম কমার্শিয়াল ব্যাঙ্কের মহিলা শাখায়। বিরাট একটা ঘর, ম্যানেজারের জন্য কাচের দেয়ালঘেরা আলাদা কোন কিউবি নেই। একেবারে হার্ট যেন। ম্যানেজার মিসেস শামসুন্নাহার মুসার টেবিল ঘিরেই একগাদা মহিলা। ঘরময় মহিলা থইথই করছে।

ওঁর কাছে দাঁড়িয়ে বললাম, একটা একাউন্ট খুলব। জাহানারা ইমাম নাম।

উনি খুব নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে বললেন, একটু বসতে হবে। যারা আগে এসেছেন, তাদের কাজগুলো আগে সেরে নিই।

দেয়াল ঘেঁষে একটা চেয়ার খালি হতেই সেখানে গিয়ে ঝুপ করে বসে পড়লাম।

বসে বসে মিসেস মুসাকে লক্ষ্য করতে লাগলাম। শ্যামলা, স্বাস্থ্যবতী, খুব স্মার্ট চেহারা, তীক্ষ্ণ মিষ্টি গলার স্বর। মনে হয় একই সঙ্গে দশ হাতে কাজ সারতে পারেন। অন্তত এই মুহূর্তে তার কাজ করার ধরন দেখে তাই মনে হলো।

টেবিলের সামনের তিন-চারটে চেয়ার খালি হলে তবে উনি আমাকে ডাকলেন। গিয়ে বসলাম। নতুন একাউন্ট খোলাম ফরম ইত্যাদি বের করে বললেন, একটা লকারও নেবেন নাকি? গহনাপত্র দলিল এসব রেখে দিলেন নিশ্চিন্ত। তাঁর চোখের দিকে তাকিয়ে বললাম, হ্যাঁ, নেব।

কি সাইজের নেবেন? একটু দেখে নিন। ছোট, বড়, মাঝারি সব সাইজের আছে। আসুন, স্ট্রংরুমে গিয়ে দেখে নিন।

স্ট্রংরুমের দিকে যেতে যেতে বললেন, খুবই নিরাপদ এই লকারগুলো। অনেকেই নিচ্ছে। একদম নিশ্চিন্ত থাকা যায়।

স্ট্রংরুমের ভেতর ঢুকে দরজাটা ভেজিয়ে দিতে দিতেই নাহারের মুখ-চোখের ভাব বদলে গেল, ফিসফিস করে বললেন, বোরহান ভাই আমাকে ফোন করে বলেছেন আপনার কথা। ওখানে ভিড়ে কথা বলা যেত না। তাই লকার দেখার নাম করে। তা আপনিও দেখি সঙ্গে সঙ্গেই বুঝে গেলেন। এবার বলুন কি কথা?

আমি মনে মনে একটু গুছিয়ে নিয়ে বললাম, মুক্তিযুদ্ধ ক্রমেই জোরালো হয়ে উঠছে, সে তো বুঝতেই পারছেন। গেরিলারা এখন ঢাকায় ঘনঘন আসছে, অপারেশন করছে। তাদের শহরে থাকা-খাওয়া প্রোটেকশনের জন্য কিছু কিছু বাড়িদরকার, জখম হয়ে গেলে লুকিয়ে চিকিৎসার জন্য ডাক্তার আর ক্লিনিক দরকার, ওষুধপত্র, কাপড় চোপড়ের জন্য টাকা দরকার। এসব কাজে আপনি আমাদের সাহায্য করতে পারবেন কি?

নিশ্চয় পারব। এবং করবও। এতো আমাদেরই বাঁচা-মরার প্রশ্ন। শুধু বলে দিন, কিভাবে সাহায্য করতে হবে।

বোরহান আপনাকে দরকারমত জানাবে।

স্ট্রংরুম থেকে বেরিয়ে এসে পাঁচ টাকা দিয়ে একটা একাউন্ট খুললাম।

বাসায় ফিরতে ফিরতে প্রায় বারোটা।

কবীর চৌধুরী এলেন একটায়। মিনিট দশেক বসে, উঠলেন। চিঠিটা আমি প্যান্ট্রিতে একটা মুড়ির টিনের নিচে চাপাদিয়ে রেখেছিলাম। সেখান থেকে এনে কুণ্ঠিত হয়ে বললাম, ময়লা লেগে গেছে। কিছু মনে করবেন না।

উনি হেসে ফেললেন।

১৭ মে খবরের কাগজে যে বিবৃতি বেরিয়েছিল সেইটাতেই সই নেবার জন্য কবীর চৌধুরীর কাছেও লোক গিয়েছিল। উনি সই করেন নি, অফিসেও নিয়মিত যাচ্ছেন।

বোরহান বলছিলেন, আমিও বলছি, একটু সাবধানে থাকবেন।

কবীর চৌধুরীর আপাত স্র বিনীতভাবের অন্তরালে একটা ইস্পাত কঠিন দৃঢ়তা লুকানো আছে, ওঁর হাসিতে সেটা যেন ঝলসে উঠল, মরার আগে আর মরতে পারি নে।

কবীর চৌধুরী যেতে না যেতেই ফকির এসে ঢুকল, শরীফ কই?

এখনো আসে নি। বসুন, এখুনি চলে আসবে। খেয়ে যাবেন কিন্তু।

শরীফ এলে আমরা চারজনে খেতে বসলাম। ফকির চারদিকে তাকিয়ে বললেন, রুমী কই?

ও হো, বলা হয় নি বুঝি। ওর বন্ধু খুরশীদ–ওই যে আমাদের সামনের বাড়িতে থাকে ওকে দেশে যেতে হলো। কি একটা জরুরি দরকার। একা যেতে ভয় পেল, তাই রুমীকে সঙ্গে নিয়ে গেল।

ও। ফকির চোখ নামিয়ে খাওয়ার মন দিলেন। ফকির জানেন রুমী মুক্তিযুদ্ধে গেছে। কিন্তু সে কথা মুখে উচ্চারণ করা বারণ। বাঁকার ভাগনে খালেদ মোশাররফ ক্র্যাকডাউনের সঙ্গে সঙ্গে ডিফেক্ট করে বর্ডার ক্রস করে গিয়েছিল। বহুদিন তার কোনো খবর ছিল না। সবাই ভেবেছিল হয়তো মেরেই ফেলেছে পাকসেনারা। এখন জানা গেছে সে আগরতলার দিকে বর্ডার রণাঙ্গনে যুদ্ধ করছে। কিন্তু আমরা কখনো তার কথা মুখ দিয়ে উচ্চারণ করি না। আমরা যে জানি, বাঁকা সেটা জানেন। বাঁকা যে জানেন আমরা সেটা জানি। কিন্তু আমরা আর বাঁকারা একত্র হলে কখনো তার সম্বন্ধে কোনো আলোচনা করি না। এইটাই নিয়ম। ফকির বুঝিবা ভুলে জিগ্যেস করে ফেলেছিলেন।

ঢাকাকে জাতে ওঠানোর জন্য সামরিক সরকার উঠেপড়ে লেগেছে। ঢাকার রাস্তাগুলোর নাম বদলানো হয়েছে। আজকের কাগজে লম্বা ফিরিস্তি বেরিয়েছে। লালমোহন পোদ্দার লেন হয়েছে আবদুল করিম গজনভী স্ট্রিট। শাঁখারিবাজার লেন গুলবদন স্ট্রিট, নবীন চাঁদ গোস্বামী রোড–বখতিয়ার খিলজি রোড, কালীচরণ সাহা রোড–গাজি সালাউদ্দীন রোড, এস. কে. দাস রোড–সিরাজউদ্দিন রোড শশীভূষণ চ্যাটার্জী লেন–সৈয়দ সলিম স্ট্রিট। খানিক পড়ার পর হয়রান হয়ে গেলাম। এত নাম পড়া যায় না। পড়তে পড়তে চোখে ধাধিয়ে ওঠে।

জামী বলল, একটা জিনিস লক্ষ্য করেছ মা, লেনগুলো সব স্ট্রিট কিংবা রোড হয়ে গেছে।

শরীফ হেসে ফেলল, ঢাকার অলিগলিগুলো এতদিনে একটু মান-মর্যাদার মুখ দেখল! কাগজের পাতা ওল্টাতে ওল্টাতে বলল, আরেকটা খবর দেখেছ? বহু বই বাজেয়াপ্ত ঘোষণা করা হয়েছে।

কাদের কাদের বই? কি ধরনের বই? দেখতো, আমাদের বাড়িতে কোন বই আছে কি না।

শরীফ পড়তে পড়তে বলল, সব ধরনের বই-ই তো দেখছি। রাজনীতি, সঙ্গীত, নাটক–তবে অনেক লেখকেরই নাম আগে শুনেছি বলে মনে হচ্ছেনা। শরীফনীরবে পড়ে চলল, আমি খানিক তাকিয়ে শেষে অধৈর্য হয়ে বলে উঠলাম, জোরে পড়না কেন, আমরাও শুনি। শরীফ লিস্টের ওপর চোখ বোলাতে বোলাতেই বলল, আমিও তোমার মত হাঁপিয়ে পড়ব তাহলে। শুধু দেখছি, কোন বই আমাদের বাড়িতে আছে কি না। খানিক পরে, এই যে, প্রবোধকুমার স্যান্যালের হাসু বানু কে. এম. ইলিয়াসের ভাসানী যখন ইয়োররাপে এই বই দুটো আমাদের বাসায় আছে। এ দুটো সরিয়ে ফেলতে হবে।

ভাসানী যখন ইয়োরোপে বইটা অনেক আগে থেকেই তো বাজেয়াপ্ত হয়ে আছে। আমরা তো সেই কবেই বইটা ড্রেসিংরুমে ওয়ার্ডরোবের তলায় লুকিয়ে রেখেছি।

কি জানি! মাঝখানে বোধহয় বইটা ছেড়ে দিয়েছিল। এখন তো অত মনে নেই। এবার কিন্তু বাসার ভেতর লুকিয়ে রাখা চলবে না। বাইরে কোথাও সরাতে হবে, না হয় পোড়াতে।

রুমী বাউন্ডারি ওয়ালের যেখানটায় মাওয়ের রচনাবলি রেখেছে, সেইখানে রেখে  দেব।

জামী অনেকক্ষণ থেকেই খবরের কাগজের ওপর হুমড়ি খেয়ে আঙুল বুলিয়ে বুলিয়ে কি যেন গুণছে মনে হলো। তাকিয়ে দেখলাম, ঢাকার রাস্তার নাম পরিবর্তনের তালিকার ওপর দিয়ে আঙুল বুলোচ্ছে আর মুখে বিড়বিড় করে গুণছে। অনেকক্ষণ পরে মাথা তুলে  বলল, উঃ! একশো পঞ্চাশটা রাস্তার নাম বদলেছে, তাও শেষে লেখা আছে অসমাপ্ত। তার মানে আরো নাম বদলানো হয়েছে। খবরের কাগজওয়ালারাও এত নাম ছাপিয়ে কুলিয়ে উঠতে পারেনি। আর যাদের ওপর ভার ছিল এতগুলো মুসলমানি নাম যোগাড় করার, তাদের অবস্থা কি রকম ছ্যারাব্যারা হয়েছে, তা বোঝাই যাচ্ছে।

জামী ছ্যারাব্যারা কথাটা শিখেছে চরমপত্র শুনে। আরো একটা শিখেছে গ্যাঞ্জাম। আমাদের শুনতে বেশ মজাই লাগে।