১৪ সেপ্টেম্বর, মঙ্গলবার ১৯৭১

১৪ সেপ্টেম্বর, মঙ্গলবার ১৯৭১

একটা রক্ত হিম করা গুজব কানে এল। চার সেপ্টেম্বর রাতে নাকি অনেক মুক্তিযোদ্ধাকে গুলি করে মেরে ফেলা হয়েছে। পাঁচ সেপ্টেম্বর প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া যে সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করেন, তা নিয়ে সেনাবাহিনীর ভেতরে নাকি মতভেদ ছিল। একদলের মত ছিল এই সব দেশদ্রোহী দুষ্কৃতকারী কোনভাবেই সাধারণ ক্ষমা পাবার যোগ্য নয়। এদের ক্ষমা করে ছেড়ে দিলে দেশের সমূহ ক্ষতি। তাই প্রেসিডেন্টের সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা হবার আগের রাতেই তাড়াহুড়ো করে প্রায় শখানেক দেশদ্রোহীকে প্রাণদণ্ড দিয়ে গুলি করে মেরে ফেলা হয়েছে।

গুজবটা শুনে প্রথমে আমরা সবাই স্তম্ভিত বাকহারা হয়ে রইলাম। খবরটার সত্যাসত্য বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করলাম। তাহলে, শিমুল যে বলেছিল, চার সেপ্টেম্বরের রাত থেকে আলতাফ মাহমুদকে রমনা থানায় আনে নি, সে খবরটার মূল তাৎপর্য এই? তাহলে কি সত্যি সত্যিই ঐ চার সেপ্টেম্বরের রাতেই আলতাফ, বদি, জুয়েল, আজাদ, রুমী–?

আজাদের মার কাছে ছুটলাম। উনি বললেন, আজাদ ধরা পড়ার পর প্রথম সপ্তাহেই মাত্র দুদিন তিনি লুকিয়ে রমনা থানার জানালার বাইরে থেকে আজাদের সঙ্গে কথা বলতে পেরেছিলেন, তার পর আর সুযোগ পান নি। তিনি জানেনও না, আজাদকে এখনো রমনা থানায় আনে কিনা।

চুল্লুর ভাবী ইশরাতও আর কোন খবর বলতে পারল না। যে ভদ্রলোক এর আগে একটু ছিটেফোটা খবর এনে দিতেন, তাকেও অনেক বিপদের ঝুঁকি নিয়ে খবর জানতে হত। তারও বোধ হয় কিছু অসুবিধে হয়ে গেছে।

কি করি? কার কাছে যাই? আগা ইউসুফ সাহেব চেষ্টা করবেন বলেছেন। তবে তার অসুবিধে হল নিয়াজী নিজে থেকে তাকে চা খেতে না ডাকলে তিনি নিয়াজীর সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেন না। শুধু রুমী নয়। আহাদ সাহেব এবং সাইদুল হাসান সাহেবের খবর এনে দেবার অনুরোধও রয়েছে তার কাছে।

পাগলা বাবা কিন্তু ক্রমাগত বলে যাচ্ছেন ও গুজব সত্যি না। ওরা সবাই বেঁচে আছে। কিন্তু পাগলা বাবার কথায় ষোল আনা ভরসা করতে মন যেন আর সায় দিতে পারছে। পাগলা বাবার কাছে যাচ্ছি ঠিকই, কিন্তু মনের ভেতরের মনে যেন মাঝে মাঝে কেউ বলছে : রুমী নেই, আলতাফ নেই, জুয়েল নেই, বদি, বাশার, হাফিজ নেই, আজাদ নেই, নেই, নেই, ওরা কেউ নেই।

রুমী নেই? এই নবীন বয়সে–যখন পৃথিবীর রূপ-রস-মধু-গন্ধ উপভোগ করার জন্য সবে বিকশিত হচ্ছিল, তখনই সে নেই? এই সেপ্টেম্বরের দুই তারিখ থেকে তার ইলিনয় ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজিতে ক্লাস করার কথা। তার বদলে চার তারিখে কোথায় গেল সে?

মনে পড়ল, ডাইনিংরুমের এই চৌকিটার সামনে দাঁড়িয়ে মাত্র কয়েকদিন আগে ২৮ আগস্টে সে বলেছিল, যদি চলেও যাই, কোন আক্ষেপ নিয়ে যাব না। হয়তো জীবনের পুরোটা তোমাদের মত জানি নি, তবু জীবনের যত রস-মাধুর্য–তিক্ততা-বিষ সবকিছুর স্বাদ আমি এর মধ্যে পেয়েছি।

সেদিন সেই বিষন্ন বিকেলে রুমী চৌকির সামনে মেঝেতে পায়চারি করতে করতে বলেছিল তার জীবনের প্রথম ও শেষ প্রেম-বিরহ-মিলন-বিচ্ছেদের এক অনুক্ত কাহিনী।

একটি পরমা সুন্দরী মেয়ে, বিশ্ববিদ্যালয়ে তার চেয়ে দুএক ক্লাস ওপরে পড়ত, সেই মেয়ে তাকে হাতে ধরে প্রেমের আনন্দ-বেদনার রাজ্যে প্রবেশ করিয়েছিল। শেষমেষ মেয়েটি তাকে ছলনাই করেছিল, রুমী তাতে প্রচণ্ড দুঃখও পেয়েছিল। কিন্তু পরে মেয়েটির ওপর তার আর কোন রাগ ছিল না। কারণ মেয়েটি তখন তার কাছে রক্ত মাংসের কোনো মানবী ছিল না, তখন সে তার মনের মধ্যে হয়ে উঠেছিল বিশুদ্ধ প্রেমের প্রতীক স্বরূপিণী।

ঘরের এপাশ থেকে ওপাশ পর্যন্ত পায়চারি করতে করতে সেদিন রুমী রবিঠাকুরের একটি কবিতার কিছু অংশ আবৃত্তি করেছিল :

যা কিছু পেয়েছি, যাহা কিছু গেল চুকে,
চলিতে চলিতে পিছে যা রহিল পড়ে,
যে মনি দুলিল, যে ব্যথা বিধিল বুকে,
ছায়া হয়ে যাহা মিলায় দিগন্তরে,
জীবনের ধন কিছুই যাবে না ফেলা–
ধূলায় তাদের যত হোক অবহেলা,
পূর্ণের পদ-পরশ তাদের পরে।