১৪ অক্টোবর, বৃহস্পতিবার ১৯৭১

১৪ অক্টোবর, বৃহস্পতিবার ১৯৭১

আজ সারা শহরে হৈচৈ! গতকাল রাতে দুজন মুক্তিযোদ্ধা বনানীতে মোনেম খানের বাড়িতে ঢুকে তাকে গুলি করে পালিয়ে গেছে। ভোররাতে মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে মোনেম খান মারা গেছে। খবর কাগজে ছবিসহ বেশ বিস্তারিতভাবেই তার হত্যাকাহিনী ছাপা হয়েছে। কাগজে অবশ্য দুষ্কৃতকারী এবং আততায়ী বলা হয়েছে। সন্ধ্যার পর মোনেম খান তার ড্রয়িংরুমে বসে মেহমানদের সঙ্গে কথা বলছিল। মেহমানরা ছিল প্রাক্তন প্রাদেশিক শিক্ষামন্ত্রী আমজাদ হোসেন, কয়েকজন মুসলিম লীগ নেতা আর মোনেম খানের জামাই জাহাঙ্গীর মোহাম্মদ আদেল। ড্রয়িংরুমের সদর দরজা খোলা ছিল, মোনেম খান দরজার দিকে মুখ করে বসেছিল। বাইরের বারান্দার বাতি নেভানে ছিল। এমনি অবস্থায় দরজার কাছ থেকে কে বা কারা মোনেম খানকে লক্ষ্য করে এক রাউন্ড গুলি ছোড়ে, গুলি তার পেটে বিদ্ধ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মোনেম খানের রক্তাক্ত দেহ সোফা থেকে মাটিতে পড়ে যায়। গুলি ছুড়ে আততায়ী অন্ধকারের মধ্যে পালিয়ে যায়। মোনেম খানকে হাসপাতালে নেওয়ার পর জানা যায় গুলি তার পেট-পিঠ ছেদা করে বেরিয়ে গেছে। অবস্থা খুব গুরুতর। মাঝরাতে অপারেশনও করা হয় কিন্তু রুগীকে বাঁচানো যায় নি।

আজ ফখরুকে হাসপাতালে দেখতে যাব ভেবেছিলাম। কিন্তু কাগজে মোনেম খানের ঘটনা পড়ার পর ভাবলাম আজ আর হাসপাতালের দিকে না যাওয়াই ভালো। নিশ্চয়ই মিলিটারিতে গিজগিজ করছে জায়গাটা। দাঁতের ডাক্তার ফখরুজ্জামানের কিডনিতে ক্যান্সার ধরা পড়েছে গত মাসে। সে আছে মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের নিউ কেবিনে। ফখরুর সঙ্গে আমাদের ঘনিষ্টতা বিশ বছরের। আপন ছোট ভাইয়ের মত। মনটা খুব দমে গেছে খবরটা শুনে। ক্যান্সারের মত ভয়াবহ রোগের ছোবল।

ফখরু বিলেতে গিয়ে অপারেশন করাবে, স্থির করেছে। তার যোগাড়যন্তর চলছে।

বেরোব বলে ঠিক করেছিলাম, তাই ঘরে বসে থাকতে মন চাইল না। ভাবলাম নিউ মার্কেটে গিয়ে কিছু ওষুধপত্র কিনে, মিষ্টির দোকান থেকে আজ বিকেলে পাগলাপীরের মিলাদের মিষ্টি কিনে নিয়ে আসি এখনই।

যে দোকানেই যাই, সবখানে চাপা উল্লাস আর ফিসফিস্ কথাবার্তা। মোনেম খান মরেছে–এর চেয়ে সুখবর আর বুঝি কিছু হতে পারে না! বিচ্ছুরা কি রকম অনায়াসে। বারান্দায় উঠে দরজার কাছ থেকে গুলি করে চলে গেল, ঘরভর্তি লোক কেউ কিছু করতে পারল না–এর চেয়ে সফল অ্যাকশন আর বুঝি কিছু হতে পারে না। মিষ্টির দোকানে গিয়ে আমি হতভম্ব। মিষ্টির দোকান সাফ! সকাল থেকে দলে দলে লোক এসে মিষ্টি কিনে নিয়ে গেছে। ঢাকা কলেজের উল্টোদিকে প্রায় পাশাপাশি দুটো দোকান মরণচাদ আর দেশপ্রিয়। দুটো দোকান থেকে কুচিয়ে-কাচিয়ে জিলিপি পেলাম সের দুয়েক আর রসগোল্লা-কালোজাম-চমচম সব মিলিয়ে সের দেড়েক! আর কিছু নেই দোকানে।

বাসায় ফিরে ভাবতে লাগলাম একটা অত্যাচারী লোকের ওপর কতখানি ঘৃণা থাকলে লোকে তার খুন হবার খবরে এরকম খুশিতে উল্লসিত হয়ে মিষ্টি কিনে দোকান সাফ করতে পারে! এই মোনেম খান–এই বাংলারই কুসন্তান মোনম খান, আইয়ুব খানের আমলে গভর্নর হয়ে বাঙালিদের বুকের ওপর অত্যাচারের স্টিমরোলার চালিয়েছিল ছয়-সাত বছর ধরে। মানুষ সহ্য করতে করতে শেষে আর না পেরে বিক্ষোভে ফেটে পড়ে উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানে। প্রভু আইয়ুব খানের পতনের আগেই তার বশংবদ তাবেদার মোনেম খানের পতন হয়। তারপর কয়েক বছর মোনম খান বাড়ির ভেতরেই দিন কাটিয়েছে। বাইরে আর বেরোয় নি কিন্তু একাত্তরের মাঝামাঝি আবার গা-ঝাড়া দিয়ে উঠে পাকিস্তানি শক্তির সঙ্গে হাত মিলিয়ে কিছু একটা করার তোড়জোড় করছিল।

বিকেলে পাগলাপীরের আস্তানাতেও দেখলাম সমাগত লোকজনের মুখে চাপা উল্লাস। কে একজন ফিসফিস করে বলল, পাগলা বাবার উচিত আজ মিলাদ শেষে ঐ বিচ্ছগুলোর জন্য দোয়া করা।

কিন্তু পাগলাপীরের মুখ আজ অসম্ভব গম্ভীর! মেজাজও বেজায় রুক্ষ! কিছুটা বিচলিতও মনে হচ্ছে। কে জানে কি কারণে!