১২ জুলাই, সোমবার ১৯৭১

১২ জুলাই, সোমবার ১৯৭১

বারেক-কাসেম পালিয়ে যাবার পর তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া হয়েছিল–ভালোই হল। এখন মুক্তিযোদ্ধারা মাঝে-মাঝেই আসবে। বাসায় কাজের লোক না থাকাই ভালো। পরশুদিন রাতে টেবিল লাগানো, খাবার গরম করা, খাওয়া শেষে টেবিল সাফ, থালাবাসন ধোয়া ইত্যাদি কাজে জামী-শরীফ দুজনই সাহায্য করেছে। গতকাল রোববার ছিল, বাপবেটা দুজনে মিলে বাজার করে এনেছে। রান্নাঘরের কাজেও হাত লাগিয়েছে। তাই ধকল টের পাই নি।

তবে এ বাসার যে একটা ব্যারাম রয়েছে–অত্যধিক মেহমান আসা–আমার মেহমান, শরীফের মেহমান, জামীর মেহমান, বাবার মেহমান, এখন আবার নতুন আরেক ধরনের মেহমান–সকাল-দুপুর, সন্ধ্যা, রাত-তাদের মেহমানদারী করার পরিশ্রমটা গায়ে লাগে না কাজের লোক থাকলে। গতকাল রোববার তবু শরীফ-জামী চা বানানো, ট্রেতে করে এনে দেওয়া ইত্যাদি কাজে হাত লাগিয়েছিল বলে অতটা টের পাইনি। তাই গতকাল সন্ধ্যার মুখে মালু মিয়া হন্তদন্ত অবস্থায় পলাতকদুজনকে ধরে আনলেও আমি বলে দিয়েছিলাম ওদের আর রাখব না। (মালু মিয়া গভঃ ল্যাবরেটরি স্কুলের পিওন, বহু বছর ধরে কাজের ছেলে সাপ্লাই দেওয়া ওর একটা বাড়তি কাজ।)

কিন্তু দুদিন যেতে না যেতেই এলে গিয়েছি। পুরনো ঠিকে ঝি রেণুর মাকে খুঁজে বের করলাম। দুবেলা দুটো কাজের জন্য আবার ওকে রাখলাম। কাজ করে দিয়ে চলে যাবে–এই ভালো। বাসায় কে এলো, কে গেল অত খেয়াল করবেনা। শাহাদত আর আলমের সঙ্গে রুমীর কথা বলতে পারি নি–সেইদুঃখে কদিন খুব কষ্ট পেয়েছি। কিন্তু এখন সেই কষ্ট আর নেই। রুমী যেখানে গেরিলা ট্রেনিং নিচ্ছে, সেই মেলাঘর থেকে বিভিন্ন দিনে এসে আমার সঙ্গে দেখা করেছে জিয়া, মনু, দুলু, পারভেজ।

পারভেজ বলল, খালাম্মা ওদিকে কি যে এক চোখের অসুখ শুরু হয়েছে

আমি কথা শেষ করতে না দিয়েই চেঁচিয়ে উঠলাম, এখানেও তো। গেল মাস থেকে। আমাদের চেনাজানা অনেকের হয়েছে। খুব কষ্ট। কপাল ভালো আমাদের বাড়িতে এখনো ঢোকে নি। তোমাদের ওদিক থেকেই নাকি এসেছে?

নতুন খবরটা দিতে না পেরে পারভেজ হতাশ হয়ে মুখ বন্ধ করেছিল, এখন বলল, সবাই তো বলে এদিক থেকেই ওদিকে গেছে।

এখানেকি গুজবজান? খানসেনারা এটার নাকিনাম দিয়েছে জয় বাংলা চোখ ওঠা। ওদেরই নাকি বেশি হচ্ছে এগুলো। ওরা বলে বি গেরিলাদের চেয়েও বেশি বিচ্ছ এই চোখ ওঠা।

সত্যি বিন্দু চোখ ওঠা খালাম্মা। এত জ্বালা-যন্ত্রণা হয়, তাকানো যায় না, খালি চুলকায় আর পানি পড়ে লাল হয়ে থাকে।

হ্যাঁ, এখানকার খবরের কাগজগুলোতেও এ নিয়ে বেশ লেখালেখি হয়েছে। ভাইরাল কনজাংটিভাইটিস না কি যেন বলে। সারতে আট-দশদিন লাগে। ওষুধ দিলেও সারতে ঐ একই সময় লাগে। আসলে ওষুধে সারে না, একটা সাময়িক আরাম হয় মাত্র।

তবে হোমিওপ্যাথিক একটা ওষুধ আছে, খালাম্মা, শুরুতেই খেলে আর চোখ ওঠে না।

তাই নাকি? নাম জান ওষুধটার?

হ্যাঁ, বেলেডোনা সিক্‌স্।

ঠিক আছে পারভেজ। আমি বেলেভোনা-৬ কিনে রাখব। তুমি মেলাঘর ফেরত যাবার আগে আমার কাছ থেকে নিয়ে যাবে।