১০ জুন, বৃহস্পতিবার ১৯৭১

১০জুন, বৃহস্পতিবার ১৯৭১

দুপুরে খেয়ে কেবল একটু শুয়েছি, অমনি ফোন বেজে উঠল। একটু বিরক্তই হলাম। কে এমন অসময়ে–

ফোনে রেবার গলা : আপা, টাট্রু ফিরেছে। এই একখুনি।

ফোন রেখে তড়াক করে উঠে হাঁক পাড়লাম, রুমী, জামী, শিগগির তৈরি হয়। গুলশান যাব। টাট্ট ফিরেছে।

পনের মিনিটের মধ্যে তৈরি হয়ে চারজনে বেরিয়ে পড়লাম গুলশানের পথে।

রুমী বলল, আম্মা, তুমি যেন মেলাই প্রশ্ন কোরোনা। ও নিজে থেকে যেটুকু বলবে, সেইটুকু শুনে সন্তুষ্ট থেক।

একটু রাগতস্বরে বললাম, ঠিক আছে, মুখে তালা এঁটে রাখলাম।

রেবার বিছানার ওপর টাট্রু বসে আছে–এলোমেলো চুল, খোঁচা খোঁচা দাড়ি, গর্তে বসা লাল চোখ। এমনিতেই সে রোগা-পাতলা, মুখটা চিকন। এখন মনে হচ্ছে কতদিন না খেয়ে খেয়ে মুখ দড়িপানা হয়ে গেছে।

টাট্রু অসম্ভব ক্লান্ত। এর আগে নিশ্চয় বাড়ির সবাইকে বলতে হয়েছে তার উধাও হবার কাহিনী। তবু আমাদেরকে আবার সব বলল সে।

দুজন বন্ধুর সঙ্গে টাট্রু দাউদকান্দিতে নদী পেরিয়ে পর্যায়ক্রমে বাসে, রিকশায় ও পায়ে হেঁটে বর্ডার ক্রস করে। ওপারে নগরদা বলে একটা জায়গায় যে ক্যাম্পটা ছিল, সেখানে ওরা ওঠে। কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজের এক অধ্যাপক ওখানে এই ক্যাম্পটা অর্গানাইজ করেছেন। প্রতিদিনই নতুন নতুন ছেলে গিয়ে হাজির হচ্ছে। অধ্যাপক তাদেরকে রিক্রুট করে, বাছাই করে কোম্পানি গঠন করে তারপর পাটুনে ভাগ করে দিচ্ছেন। একজন ল্যান্স নায়েক ছেলেদেরকে ট্রেনিং দেন। তাকে সবাই ওস্তাদ বলে, নাম তোফাজ্জল মিয়া। প্রত্যেক দলের চারদিন করে ট্রেনিং। একেবারেই এলিমেন্টারি ট্রেনিং। টাট্রুরা যাবার পরদিন ওদের ট্রেনিং শুরু হলো। প্রথমদিকে গুলিগোলা বুলেট গ্রেনেড এসব কম ছিল বলে ট্রেনিং পাবার পর সব দলই অপারেশনে যেতে পারত না। টাট্রুর কপাল ভালো, সেই সময় কিছু গুলিগোলা গ্রেনেড পাওয়া গিয়েছিল। তাই টাট্রু দুএকটা অপারেশনে যেতে পেরেছিল।

রুমীর নিষেধ ভুলে মুখ ফসকে একটা প্রশ্ন বেরিয়ে এল, এত তাড়াতাড়ি চলে এলে যে?

টাট্টু বলল, আমাকে ঢাকাতেই কিছু কাজের ভার দিয়ে পাঠিয়েছে। ওখানে ক্রমেই ছেলেদের ভিড় বাড়ছে। থাকার জায়গার অভাব, খাবার অভাব। খাওয়া শুধু ভাত আর ডাল। তাও সব সময়ই চাল যোগাড়ের ধান্দায় থাকতে হয়। তার ওপর বৃষ্টি। সে যে কি কষ্ট। ভাতের কষ্ট তো ছিলই, বৃষ্টিতে ভিজে, সেঁতসেঁতে মাটিতে শুয়ে বহু ছেলের জ্বর হয়ে গেল। আর পেটের অসুখ। ওষুধেরও অভাব। তাই অধ্যাপক একেক দলকে একেক দায়িত্ব দিয়ে বিভিন্ন দিকে পাঠাতে লাগলেন।

আমি আবার একটা প্রশ্ন করে ফেললাম, একদিন ঘুম-খাওয়া কিছুই হয়নি নাকি?

টাট্টু হাসল, খাওয়া মোটামুটি হয়েছে। ঘুমোনোর সময় একেবারেই পাইনি। একে যাওয়ার পরিশ্রম, গিয়েই ট্রেনিং, তারপর অপারেশনের ধকল, আবার ফিরে আসা টেনশনও তো ছিল। তাছাড়া ওখানে যাবার চারদিন পর ক্যাম্প সরাবার অর্ডার হলো। সবভেঙেচুরে নিজেরাই মাথায় বয়ে তিন মাইল দূরে গিয়ে নতুন ক্যাম্প করা হল।

আমি আর থামতে পারলাম না। আবার প্রশ্ন : কি ভেঙে নিয়েছিলি?

ঘরের বেড়া, তাঁবু, বাঁশ, চাটাই। হাঁড়িকুড়ি, অন্যান্য জিনিসও মাথায় বইতে হয়েছে। সে খাটনিটাও কম ছিল না। তবে একটা সান্ত্বনা ছিল, নতুন ক্যাম্পে এসে একটা ফ্রেশ পুকুর পাওয়া গেল।

ফ্রেশ পুকুর মানে?

টাট্টু হেসে ফেলল, সাধারণত ক্যাম্প করা হয় পুকুর বা নদীনালার পাশে যাতে পানি পাওয়া যায়। নগরদা ক্যাম্পের পাশে একটা পুকুর ছিল, সেটার পানি নাওয়া খাওয়া, ঘোয়াপাখলা সব কাজ করতে করতে একেবারে পচে যাবার মতো হয়েছিল। তাই তিন মাইল দূরে যে পুকুরটার পাশে নতুন ক্যাম্প করা হলো, সেটার পানি তখনো ফ্রেশ ছিল। অবশ্য এটাও জানতাম–এতগুলো ছেলে ব্যবহার করতে করতে কয়েকদিনের মধ্যে সেটাও পচিয়ে ফেলবে।

আমরা উঠলাম। এতদিনে মুক্তিযুদ্ধের একটা বাস্তব ছবি মনের চোখে ফুটে উঠল। এর আগে বহুবার শুনেও যেন বিশ্বাস হতে চাইত না। মুক্তিযুদ্ধ সত্যি সত্যি হচ্ছে। এখন মুক্তিযুদ্ধের একটি ক্যাম্প থেকে ফিরে আসা একটি ছেলের মুখে শুনে মনে হলো সত্যি সত্যিই মুক্তিযুদ্ধ হচ্ছে। এবং দলে দলে ছেলে যুদ্ধ করতে ছুটে যাচ্ছে।

ঘর থেকে বেরোবার আগে রুমী বলল, এক কাজ কর। খুব ভালো করে সাবান ঘষে গোসল করে পেট ভরে ডাল-ভাত খাও। তারপর দরজা বন্ধ করে কষে একটা ঘুম দাও।

সারাটা সময় জামী একটাও কথা বলে নি।