সহজাত মেধা যেন ক্ষয়ে না যায়

সহজাত মেধা যেন ক্ষয়ে না যায়

আমাদের মাঝে অনেকেই কোনো দিন আঁকার স্কুলে যায়নি কিন্তু ভালো আঁকতে পারে। অনেকেই ভালো লিখতে পারে অথচ কোনো দিন লেখার কোনো কর্মশালা করেনি। গানের ওস্তাদের কাছে না গিয়েও ভালো গাইতে পারে। এটা মানুষের মধ্যে। অহরহ হয়। আমরা এটাকে বলি সহজাত মেধা বা ইনেইট ট্যালেন্ট। অনেকেই এমন ইনেইট ট্যালেন্ট নিয়ে জন্মায়। অনেক কিছু না শিখেই করতে পারে। এই সহজাত মেধার সঙ্গে পরীক্ষায় বেশি বা কম নম্বর পাওয়ার কোনো সম্পর্ক নেই। যে সমাজ এই ধরনের মেধাকে পরীক্ষার নম্বর দিয়ে বিচার করে, সে সমাজ মূলত মেধাকে ধ্বংস করে। ইচ্ছাকৃতভাবে সম্ভাবনাকে গলা টিপে মারে।

গবেষণার নেশা, গবেষণায় ধৈর্য বা উদ্ভাবনক্ষমতাও একধরনের সহজাত মেধা। অনেকে পরীক্ষায় ভালো করতে পারে না, তবে সে দারুণ ভাবতে জানে। অদ্ভুত অদ্ভুত সব আইডিয়া দিতে পারে। নতুন কিছু ডিজাইন করতে জানে। যৌক্তিক প্রশ্ন করতে পারে। তাহলে এই ধরনের ছেলে-মেয়েদের আমরা কী। করে বাছাই করব? তাদের বাছাইয়ের জন্য তরুণ বয়সে বিভিন্ন রিসার্চ প্রজেক্ট বা গবেষণার সুযোগ দেওয়া হয়। সেখান থেকে তাদের আগ্রহ, ধৈর্য, সৃষ্টিশীলতা পর্যবেক্ষণ করা হয়।

কিন্তু আমরা কী করি? আমাদের দেশে থিসিস বা গবেষণা করার সুযোগ পান গোটা কয়েকজন শিক্ষার্থী। ইউনিভার্সিটিতে এই থিসিস করার শর্ত হলো, পরীক্ষায় একটা নির্দিষ্ট জিপিএ পাওয়া। এই যে জিপিএ-নির্ভর গবেষণায় সুযোগ দেওয়া, এটা হলো জাতীয় সম্ভাবনা ধ্বংস করা। ব্যাচেলর বা মাস্টার্স পর্যায়ে। সবাইকে গবেষণা করার সুযোগ দিতে হয়। এই কাজটা করা হয়। ইউরোপ-আমেরিকা কিংবা অন্যান্য দেশে। থিসিস ছাড়া দুনিয়ার খুব বেশি দেশে মাস্টার্সের সনদ পাওয়া যায় না। অথচ আমরা নাম দিয়েছি, থিসিস ও নন-থিসিস মাস্টার্স! নন-থিসিস মার্স্টাস কী জিনিস, এটা বিদেশে কাউকে বোঝানো যায় না। বিদেশে আসা বহু শিক্ষার্থীর জন্য এটা খুব মুশকিল হয়ে পড়ে।

স্টকহোম ইউনিভার্সিটিতে দেখেছি, যেসব ছেলেমেয়ে কোর্স পরীক্ষায় ফেল করেছেন, তাঁরা পর্যন্ত একসময় পিএইচডি করছেন। বিষয়গুলোতে খুব আশ্চর্যান্বিত হতাম! পরে বুঝলাম, প্রফেসর মূলত সে স্টুডেন্টকে নিচ্ছেন শুধু থিসিসের পারফরম্যান্সের ওপর ভিত্তি করে। সহজাত মেধাকে বের করতে হলে কাউকেই অবহেলা করা যায় না। বহু ছেলেমেয়েকে দেখেছি, যারা পরীক্ষায় ভালো করে গবেষণায় ভালো করতে পারেননি। আবার অনেকেই, পরীক্ষায় তুলনামূলক খারাপ করে গবেষণায় দারুণ পারফরম্যান্স দেখিয়েছেন। তাই প্রত্যেক শিক্ষার্থীকে গবেষণার সুযোগ না দেওয়া একটা প্রতারণা। শুধু নম্বরের ভিত্তিতে গবেষণার সুযোগ দেওয়া একটা প্রবঞ্চনা। এতে মেধাবীরা প্রবঞ্চিত হয়। সম্ভাবনা হারিয়ে যায়! সমাজ বঞ্চিত হয়। প্রিয় স্বদেশ কি এই প্রবঞ্চনা থেকে বেরিয়ে আসবে কখনো? স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ের সব শিক্ষার্থীর জন্যই কি আমরা রিসার্চ প্রজেক্ট, থিসিস ইত্যাদি চালু করব?