লক্ষ্য হোক দক্ষতা অর্জন

লক্ষ্য হোক দক্ষতা অর্জন

তরুণদের কাছ থেকে প্রায়ই কিছু প্রশ্নের সম্মুখীন হই আমি। প্রশ্নগুলো এমন–গবেষণার জন্য কোন দেশ ভালো হবে, গবেষণার জন্য কি ইউরোপ ভালো, নাকি আমেরিকা? আমার। সাবজেক্টে পড়াশোনার জন্য কোন দেশ ভালো হবে? আমি। মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান, আমি কি গবেষণা করতে পারব? ইত্যাদি নানান ধরনের প্রশ্ন।

এই প্রশ্নগুলো থেকে বোঝা যায়, আমাদের মেধাবী তরুণদের মধ্যেও গবেষণা ও উচ্চশিক্ষাবিষয়ক ধারণাগুলো পরিষ্কার না। এটা অস্বাভাবিকও কিছু নয়। ইউনিভার্সিটি থেকে বের হওয়া একজন তরুণ-তরুণীর কাছে এ বিষয়গুলো তখনই পরিষ্কার থাকত, যখন আমাদের দেশের ভেতর ভালো গবেষণার সংস্কৃতি চালু থাকত। আমাদের দুর্ভাগ্য যে সেটা এখনো গড়ে ওঠেনি। তবে সে সংস্কৃতি গড়ে উঠবে শিগগির। আশার বিষয় হলো, ছেলেমেয়েরা গবেষণায় ঝুঁকছে। গবেষক হতে চাইছে। ১০ বছর আগেও এতটা ঝোঁক ছিল না। অনেক ছেলেমেয়ে ডাক্তার না হয়ে, বিসিএস পরীক্ষা না দিয়ে এখন গবেষক হতে চায়! সংখ্যায় কম হলেও এটাই বা কম কী!

তরুণদের বলছি, গবেষণার জন্য দেশ খোঁজার অ প্রতিষ্ঠানের মান দেখো। দেশ মখ্য বিষয় নয়। তোমার জ্ঞান, দক্ষতা ও পারদর্শিতাই তোমার জীবনের পথকে সুগম করবে। সুতরাং আগে হলো দক্ষতা অর্জনের লক্ষ্য। কোথায় তুমি শিখতে পারবে, কত ভালো করে শিখতে পারবে, কত আধুনিক কিছু। খেতে পারবে–সেটাই হোক প্রধান লক্ষ্য। যেসব প্রতিষ্ঠানে তোমার কাঙ্ক্ষিত বিষয়ে ভালো গবেষণা হয়, সেসব প্রতিষ্ঠান খুঁজে বের করো। প্রফেসরদের প্রোফাইল ও খ্যাতি দেখো। গবেষণার দুনিয়ায় দেশের চেয়ে প্রতিষ্ঠান ও সুপারভাইজারদের। ওজন (Raputation) অনেক গুরুত্বপূর্ণ। গবেষণার সুযোগ সবিধা ইত্যাদি অনেক গুরুত্বপূর্ণ। যেমন : আমেরিকায় প্রায় চার হাজার কলেজ-ইউনিভার্সিটি আছে। বহু কলেজ-ইউনিভার্সিটিতে। গবেষণার মান এশিয়ার বহু প্রতিষ্ঠানের চেয়ে দুর্বল। সিঙ্গাপুর, দক্ষিণ কোরিয়া, চীন, জাপান, ভারত এসব দেশের বহু প্রতিষ্ঠান। এখন জগৎখ্যাত। সেখানে দুনিয়াসেরা গবেষণা হয়। ইউরোপের অনেক দেশ যেমন গবেষণায় কালের সেরা, আবার অনেক দেশ বর্তমানকালে এসেও অনেক পিছিয়ে আছে। সুতরাং দেশ বা মহাদেশ বিষয়টা মুখ্য না।

তুমি যদি গবেষণা শিখে গবেষক হতে চাও, তাহলে এক হিসেব। আর তুমি যদি ডিগ্রি গলায় ঝুলিয়ে চাকরির প্রমোশন পেতে চাও, তাহলে সম্পূর্ণ আলাদা হিসেব। গবেষক হতে চাইলে অন্তত দু-তিনটি প্রতিষ্ঠানে, একাধিক সুপারভাইজারের অধীন। কাজ শিখতে হবে। সে প্রতিষ্ঠানগুলো দু-তিনটা আলাদা দেশেও হতে পারে। কেউ যদি সত্যিকারের একজন স্মার্টও আধুনিক গবেষক হতে চায়, তাহলে তাকে আগে নামকরা সুপারভাইজার, (প্রফেসর, পিআই) খুঁজতে হবে। নামকরা প্রতিষ্ঠান বা নামকরা ডিপার্টমেন্ট খুঁজতে হবে। বিদেশের সব প্রতিষ্ঠান সব বিষয়ের জন্য সেরা নয়। বিষয়টা বিবেচনায় রাখতে হবে। অনেক স্টুডেন্ট হয়তো শুরুটা অনেক ভালো প্রতিষ্ঠানে বা বড় সুপারভাইজারের সঙ্গে করতে পারে না কিন্তু পরে অনেক সফল হয়। সুতরাং বসে না থেকে নিজের ওজন, সামর্থ্য, মেধা যাচাই করে কাজ শুরু করে দাও। দক্ষতা অর্জনের নেশা থাকলে, সময়ই তোমাকে পৌঁছে দেবে লক্ষ্যে। আমি অনেক স্টুডেন্টকে চিনি, যারা হয়ত আমেরিকায় পিএইচডি শুরু করতে পারেনি, কিন্তু চীন-কোরিয়া এমনকি ভারত থেকে কাজ করে আমেরিকায় চলে এসেছে। এবং এমনকি ভারত থেকে কাজ করে আমেরিকায় চলে এসেছে। অনেক সফল হয়েছে।

তুমি কি মধ্যবিত্ত ঘরের সন্তান, নাকি পিতমাতম মানষ সেটা হিসেব করার জন্য গবেষণার দুনিয়ায় কেউ বসে নেই। জ্ঞানের দুনিয়ায় তোমার পরিচয় তুমিই। তোমার উচ্চ পরিশ্রম, মেধা ইত্যাদির সমন্বয়ে তুমি আজ যা, কাল আর থাকবে না। গবেষণার দুনিয়ায় ডেডিকেশন হলো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কত ভিন্নভাবে একটা বিষয়কে ভাবা যায়, ব্যাখ্যা করা যায়। কত নতুন নতুন আইডিয়া দাঁড় করানো যায়। এই বিষয়গুলো মুখ্য। গবেষণা করতে গেলে বোঝা যায় কত সহজ-সাধারণ বিষয়গুলো কত অসাধারণ হয়ে ধরা। পড়ে–যেভাবে হয়তো আগে কখনো ভাবিনি, কখনো চিন্তা। করিনি। আলকেমিস্ট বইয়ে পাওলো কোয়েলো facf26090+The simple things are also the most extraordinary things, and only the wise can see them.. গবেষণা একজন মানুষের দৃষ্টিকে তেমনভাবেই তৈরি করে, যা। দিয়ে সাধারণের মাঝে অসাধারণের অনুসন্ধান মেলে।

জ্ঞান কোনো তীর্থযাত্রা নয় যে সেটার জন্য শুধু গয়া, কাশি, মক্কা কিংবা জেরুজালেমেই যেতে হবে। জ্ঞানের জন্য জ্ঞানী খোঁজো, জ্ঞানীর আলয় খোঁজো–দেশ কি খুব মুখ্য সেথা!