ভারত কেন পারছে?

ভারত কেন পারছে?

ভারতে দারিদ্র্য আমাদের চেয়ে কম নয়। সন্ত্রাস, দুর্নীতি, রাহাজানি, মারামারি এগুলোও আমাদের চেয়ে কম নয়। ভারতে নারী নির্যাতন, ধর্ষণ, কুসংস্কার, ধর্মীয় উগ্রতা আমাদের চেয়েও অধিক! তাহলে ভারত কী করে মহাকাশে যান পাঠায়? ভারত কী করে গবেষণায় স্বতন্ত্র হয় উঠছে? কী করে সেখানে এত এত গবেষণাকেন্দ্র গড়ে উঠছে? কী করে তারা নিজের পণ্যে ও অভ্যন্তরীণ উৎপাদনে স্বনির্ভর হচ্ছে? কী করে তারা উদ্ভাবনে। স্বনির্ভর হচ্ছে? এগুলোর গভীরে একটাই কারণ। সেটা হলো, শিক্ষা ক্ষেত্রে ভারতের অবকাঠামো আমাদের চেয়ে অনেক শক্তিশালী হচ্ছে।

ভারতের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে নিয়োগপ্রক্রিয়া কত কঠিন, সেটা যদি আপনি জানেন, তাহলেই বুঝতে পারবেন তাদের উন্নয়নের মূলমন্ত্র। তাদের গবেষণাগারে নিত্যদিন কী চর্চা হয়, সেটা জানুন। ভারতের অসংখ্য ছেলেমেয়ে ইউরোপ-আমেরিকায় গবেষণা করছেন। তাদের ফিরিয়ে নেওয়ার জন্য ভারত নানান ব্যবস্থা করে রেখেছে। তাদের শুধু পিএইচডি-পোস্টডক থাকলেই হয় না। খুব ভালো ভালো গবেষণা আর্টিকেল থাকতে হয়। তারা। কোথায় এবং কোন গবেষকের অধীন কাজ করেছেন, সেটা দেখা হয়। তারা কী গবেষণা করবেন, সে বিষয়ে বিস্তর আইডিয়া (রিসার্চ প্রপোজাল) লিখে জমা দিতে হয়। একজন প্রতিযোগী। ল কিংবা কংগ্রেস করলেই শিক্ষক বা গবেষক হতে পারেন না। একজন শিক্ষক পদপ্রার্থীকে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসির কক্ষে গিয়ে ভাইভা দিতে হয় না। বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন ভিসি হয়তো অর্থনীতি পড়েছেন। তাহলে, মহাকাশবিজ্ঞানের একজন শিক্ষক নিয়োগে তার কী কাজ? তিনি বড়জোর নিয়মমাফিক সে প্রয়োগের অনুমোদনে স্বাক্ষর করবেন। আবেদন যাচাই-বাছাই সবার এবং প্রার্থী নির্বাচিত করার জন্য প্রত্যেক ক্ষেত্রে এক্সপার্ট টিম থাকবে। সে টিম যোগ্য প্রার্থীদের আবেদন বাছাই করবে। এক্সপার্ট টিমের পরিচয় গোপন থাকবে।

ভারত তার দেশের গবেষণার জন্য যেমন দিনে দিনে বাজেট বদ্ধি করছে, তেমনি সে টাকাটা খরচ করার মতো মাথা নিয়োগ দিচ্ছে। সে মাথা যাচাইয়ের মাপকাঠি হলো একমাত্র মেধা! তারা বিদেশের টেন্ডার কোম্পানিকে না এনে, বিদেশ থেকে লোন না। এনে, বিদেশের এক্সপার্ট এনে নিজ দেশের তরুণদের যোগ্য করার চেষ্টা করছে। আমরা হাজার কোটি টাকার অস্ত্র কিনতে পারি, তবে শত কোটি টাকা খরচ করে বিদেশের বিজ্ঞানী এনে নিজের দেশের ছেলেমেয়েদের মেধাবী করার সুযোগ তৈরি করতে চাই না! এই হলো আমাদের দূরদর্শিতা!

ভারতের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো রাজনীতি দিয়ে নিয়ন্ত্রিত নয়। বিশেষ করে, আইআইটিগুলোর গবেষণার মান যে কত উন্নত, সেটা অনেকেরই ধারণাতীত। আইআইটিতে কাজ করে এমন কয়েকজন তরুণ শিক্ষককে আমি চিনি। তাঁদের নিয়োগপ্রক্রিয়া। সম্পর্কে তাদের কাছ থেকে জেনেছি। আর অবাক হয়েছি, কেন আমার দেশে এমন নিয়োগপ্রক্রিয়া চালু হয় না! ভারতের বিশ্ববদ্যালয়ে পিএইচডি করে, ছেলেমেয়েরা ইউরোপ আমেরিকার সেরা সেরা স্কুলে সরাসরি পোস্টডক করতে চলে যান। বাংলাদেশের একটা প্রতিষ্ঠান নেই, যেখান থেকে গবেষণা করে প্রতিবছর মাত্র কুড়িজন গবেষক উন্নত বিশ্বে সরাসরি পোস্টডক করতে যান! বুয়েট কিংবা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি করেও এটা প্রায় অসম্ভব! ৫০ বছরে কি এই সামান্য উন্নয়নটুকু হওয়ার কথা ছিল না?

ভারতে ফি বছর প্রশ্ন ফাস হয় না। তাদের দেশের শিক্ষ। গবেষণা, নিয়োগ রাজনৈতিক নেতারা ঠিক করে দেন না। তাদের গবেষণাগার নিয়ন্ত্রণের জন্য সচিব বসিয়ে রাখা হয় না। রাজনীতির প্রভাবমুক্ত শিক্ষা গড়ে তুলতে পারছে ওরা। শিক্ষাকে তুলে দিয়েছে প্রকৃত শিক্ষিত ও মেধাবীদের হাতে। একটা দেশের হাজারো সমস্যা থাকার পরও দেশটাকে দাঁড় করাতে হলে যেটা ঠিক রাখতে হয়, ভারত সেটাই ঠিক রাখার চেষ্টা করছে। আমরা কী তেমনটা করতে পারি না?