প্যারালাইজড মাইন্ড!

প্যারালাইজড মাইন্ড!

আমার বাল্যবন্ধু জাহাঙ্গীর বা হাতে লিখত। স্কুলে একবার নতুন। টিচার এলেন। খুব বদমেজাজি সে শিক্ষক। (আমাদের বহু শিক্ষকই বদমেজাজি। কারণ, যাদের মগজ নেই তাদের মেজাজ থাকতে হয়!) পৃথিবীর যত বীরত্ব ছিল, সেটা তিনি আমাদের সঙ্গেই দেখাতেন। যা-ই হোক, জাহাঙ্গীরকে কোন এক ছুতায় ধরলেন একদিন। তারপর শুরু হলো তার গর্জন। একপর্যায়ে, জাহাঙ্গীরের বাঁ হাতে লেখা নিয়েও তিনি ক্ষুব্ধ হলেন। যে হাত দিয়ে মানুষ টয়লেটের কাজ সারে, সে হাত দিয়ে কেন লিখবে? এই ছিল স্যারের যুক্তি! জাহাঙ্গীরের ওপর দিয়ে সে দিন এক ঝড় গিয়েছিল। ভয়ে তটস্থ হয়ে থাকা ছাড়া, আমাদের কিছুই করার ছিল না।

ডান হাত দিয়ে মানুষ মানুষকে খুন করে। ডান হাত দিয়ে মানুষ ঘুষ নেয়। ডান হাত দিয়ে মানুষ মানুষকে নির্যাতন-নিপীড়ন করে। সেই ডান হাত দিয়ে যদি লেখা যায়, বা হাত দিয়ে কেন লেখা যাবে না? পৃথিবীর বহু মানুষ বাঁ হাত দিয়ে লেখে। বা হাত দিয়ে খায়। বহু শিশু বা হাত দিয়ে লিখতে সহজবোধ করে। কারণ তার মস্তিষ্ক সেভাবেই তাকে সাড়া দেয়। আমেরিকার প্রোসডেন্ট বারাক ওবামা বাঁ হাতে লেখেন। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ভিড ক্যামেরন বা হাতে লেখেন। মারি কুরি, লিনাস পাউলিংসহ জগৎখ্যাত বহু বিজ্ঞানী বা হাতে লিখতেন। বা ত লেখা, কোনো কারণেই সমস্যা নয়!

এমন বহু বিষয়ে আমরা শিশুদের ওপর মানসিক নির্যাতন করি। অকারণে, অযৌক্তিকভাবে শিশুদের সঙ্গে চড়াও হই। আমাদের মতো কিংবা প্রচলিত ধারার বিপরীতে কিছু করলেই আমাদের কাছে বেখাপ্পা মনে হয়। শিশুদের মনে অসম্ভব সুন্দর আমাদের কাছে বেখাপ্পা মনে হয়। শিশুদের মনে বাসনা থাকে। একটা সৃষ্টিশীল জগৎ থাকে। আমাদের অভিভাবক কিংবা শিক্ষকগণ কি কখনো সেটা আড়াল থেকে আবিষ্কারের চেষ্টা করেন! শিশুদের কথাকে আমরা ধমক দিয়ে চাপাই। কত বাসনাকে ঠান্ডা মাথায় শুনতে চাই না। তাদের ইচ্ছার সঙ্গে মাতা নেড়ে, হাসি মুখে সম্মতি দিই না।

আমাদের শিক্ষকেরা শিশুদের সঙ্গে বীরত্ব দেখান। শিশুদের ওপর চড়াও হন নানান ছল-চাতুরীতে। তুচ্ছতম কারণে। আমাদের অভিভাবকেরাও কাজটা করেন। অথচ একটি শিশু যে বোধ নিয়ে জন্মায়, সে বোধটুকুও তাদের মধ্যে নেই! যদি থাকত, তাহলে শিশুদের সঙ্গে বীরত্ব দেখাতেন না। যে সমাজের শিশুরা ভয়ের সংস্কৃতিতে বেড়ে ওঠে, তাদের মন কোনো দিন সঠিকভাবে জাগ্রত হয় না। সে মনে দ্বিধা, ভয়, সংকোচ চিরস্থায়ী হয়! এ যেন প্যারালাইজড মাইন্ড! দুঃখ হয়, আমাদের বহু শিশু এমন। প্যারালাইজড মাইন্ড নিয়ে বড় হচ্ছে। আমরা কি সেটা বোঝার চেষ্টা করি কখনো?