নিজেকে আবিষ্কার করো

নিজেকে আবিষ্কার করো

একজন মানুষ জীবনে কী করবেন, সেটা অবশ্যই তার ব্যক্তিগত স্বাধীনতা। তাঁর নিজস্ব চিন্তা-চেতনা। কেউ যদি তবলা বাজাতে চান, তিনি তবলা নিয়ে ঘুরবেন। কেউ যদি চৌকিদার হতে চান, তাহলে চৌকিদার হবেন। তাতে কারও আপত্তি নেই। তবে কেউ যদি নিজেকে যাচাই না করে, নিজেকে পরখ না করে শুধু একমুখী ঝোঁকে, ঝাঁকের পালের সঙ্গে দৌড়ান–সেটা দুঃখজনক। ছেলেমেয়েরা যখন নিজের ভিতরের সম্ভাবনাকে যাচাই করতে চায় না, তখন কষ্ট হয় ( আমাদের দেশে যে বিসিএস জ্বর এসেছে, সেখানে সম্ভাবনার খুন হতে আমি দেখেছি। বিসিএস দিয়ে চাকরি করবেন, তাতে দোষের কিছু নেই। দেশের সরকারি-বেসরকারি প্রতিটি কর্মকর্তা-কর্মচারীরই নিজস্ব গুরুত্ব ও অবদান আছে।

সমস্যা হলো, একজন তরুণ-তরুণী যখন মনে করছেন তার সামনে বিসিএস ছাড়া আর কিছু নেই–এটা নিজের জন্য ও সমাজের জন্য ক্ষতিকর। কেউ যখন ভাবছেন, তাঁকে দিয়ে বিসিএস ছাড়া কিছু হবে না–সেটা আত্মঘাতী। ২২-২৩ বছর। বয়স, পৃথিবীর সবকিছু বোঝার বয়স নয়। সে বয়সের ছেলে মেয়েগুলো যখন নিজেকে শুধু একটি গণ্ডির মধ্যে বেঁধে রাখেন, তাতে তিনি নিজে বঞ্চিত হন। সমাজকেও বঞ্চিত করেন।

সমাজের সবাই একই কাজ করতে পারে না। একই বিষয়ে আগ্রহ নিয়ে দৌড়াতে পারে না। তাতে সমাজ ভেঙে পড়ে। ১৮। থেকে ৩০ হলো গড়ার বয়স। নিজেকে শেইপ দেওয়ার বয়স। চলেঞ্জ নেওয়ার বয়স। নিজেকে পরখ করার বয়স। নিজেকে দিয়ে কী হবে, কী হবে না–সেটা পরীক্ষা করার বয়স। যে ছেলে। বা মেয়েটি নিজেকে পরখ না করে, একজন বিসিএস কর্মকর্তা হয়ে রইলেন–তিনি তো জানতেই পারলেন না তাকে দিয়ে কী হতো, কী হতো না। একটা দেশের তরুণ-তরুণীদের রাষ্ট্রীয়। চ্যালেঞ্জ যেমন নিতে হয়, বৈশ্বিক বা গ্লোবাল চ্যালেঞ্জও নিতে। হয়। তা না হলে সমাজটা পৃথিবীর মঞ্চে দাঁড়াবে কাদের নিয়ে?

বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিজিকসের একজন স্টুডেন্ট হয়তো হতে পারতেন অ্যাস্ট্রনমির অধ্যাপক, কিংবা থিওরেটিক্যাল ফিজিসিস্ট। মেঘনাদ সাহার মতো ভাবতে ভাবতে একটি ইকোয়েশন দাঁড় করিয়ে ফেলবেন। সে ইকোয়েশেনের সঙ্গে তাঁর নাম জড়িয়ে থাকবে অনাগত কাল। কেমেস্ট্রির একজন শিক্ষার্থী হয়তো কাজ করতে পারতেন প্রিন্সটন ইউনিভার্সিটির ফ্রিক রিসার্চ সেন্টারে। হয়তো উদ্ভাবন করতে পারতেন নতুন কোনো ম্যাটেরিয়ালস কিংবা ড্রাগ মলিকিউল। কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষার্থী হয়তো গবেষণা করতে করতে উদ্ভাবন করতে পারতেন নতুন কোনো ধান, সবজি কিংবা অন্যান্য শস্য। যে তরুণ ডাক্তার বিসিএস দিয়ে সার্জন হয়ে বসে আছেন, তিনি হয়তো গবেষণা করতে পারতেন স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটির ব্যাকম্যান রিসার্চ সেন্টারে। তিনি কাজ করতে পারতেন ফাইব্রোটিক ডিজিজ, আলঝেইমার কিংবা অন্যান্য রোগ নিয়ে। কিন্তু এঁরাই যখন কায়মনোবাক্যে হাতে জপমালা নিয়ে সকাল-সন্ধ্যা বিসিএস জপতে থাকেন, তখন খুবই করুণা হয়। কষ্ট বোধ করি।

কেউ যদি নিজেকে আবিষ্কারের চেষ্টা না করে নিজেকে সঁপে দেন, তাহলে তিনি বহুজনকে বঞ্চিত করেন। একটা বিশাল পৃথিবী থেকে নিজেকে বঞ্চিত করেন। এটা দুঃখজনক। আমার জীবনে একটি মাত্র বিসিএস পরীক্ষাই দেওয়ার সুযোগ হয়েছিল। সে পরীক্ষার লিখিত পর্ব দিয়ে আমাকে দেশ ছাড়তে হয়েছিল। বিদেশে আসার পর ফল বের হলো। লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছিলাম। সে ফলাফল পেয়ে খুব দ্বিধান্বিত ছিলাম। পরে। বুঝলাম, এই যে পৃথিবীকে দেখার এবং জানার সৌভাগ্য হয়েছে, নিজেকে যাচাই না করলে কোনো দিনই উন্মোচন করতে পারতাম না। নিজেকে আবিষ্কার করেছিলাম নতুন পৃথিবীতে। যেখানে। নিত্যদিনের সাথিরা হলেন কালের সবচেয়ে আলোকিত মানুষ। এই গ্লোবাল প্রতিযোগিতায় যেমন চ্যালেঞ্জ আছে তেমনি আনন্দ এবং অর্জনের ব্যাপ্তিটাও অনেক বেশি। আমাদের দেশটার জন্য অনেক গবেষক, উদ্ভাবক প্রয়োজন। আমাদের বিজ্ঞানের ছেলেমেয়েরা যদি শুধু বিসিএস পরীক্ষাকেই আরাধনার বিষয় মনে করেন, তাহলে কী করে আমরা বিজ্ঞানী ও গবেষক পাব? কী করে উদ্ভাবনে সারা দুনিয়ায় খ্যাতি অর্জন করব? সঁপে দেওয়ার আগে নিজেকে পরীক্ষা করো, প্লিজ! তুমি যে যেতে পারো বহুদূর, সেটা তোমাকেই পরখ করতে হবে। ঝাঁকের সঙ্গে দৌড়ে নিজের বৃহত্তর সম্ভাবনাটুকু খুন করো না।