থেমে থেকো না

থেমে থেকো না

জ্ঞান-বিজ্ঞানের এই প্রতিযোগিতাময় কালে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে টিকে থাকা মুখ্য হয়ে পড়েছে। এখন শুধু নিজের সমাজে বা নিজের দেশে ভালো করাই যথেষ্ট নয়। বিশ্বায়নের এই যুগে, বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা (Global Competition) বেড়েছে। আর এই প্রতিযোগিতায় আমাদেরও দাঁড়িয়ে থাকতে হবে। নিজেকে যোগ্য করার জন্য বৈশ্বিক সুযোগ (Global Opportunities) নেওয়ার প্রস্তুতি থাকতে হবে। উন্নত বিশ্ব থেকে জ্ঞানার্জনের মাধ্যমে নিজেদের ও সমাজের ভিত শক্ত করার লক্ষ্য অটুট রাখতে হবে। আর তাই শুধু নির্দিষ্ট কিছু দেশ থেকে জ্ঞানার্জনের কথা না ভেবে সারা দুনিয়ায় ছড়িয়ে পড়ার সময় এসেছে।

উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার জন্য ইউরোপ-আমেরিকার দেশগুলোতে আবেদন করতে জিআরই, টোফেল, আইএলটিএস ইত্যাদি পরীক্ষার স্কোর দরকার হয়। আর এসবের জন্য একটা ভালো সময় ব্যয় করতে হয়। দেখা গেল অনেক কষ্ট করেও অনেকে কাঙ্ক্ষিত স্কোর তুলতে পারেন না। এর মানে কিন্তু এই নয় যে তার মেধা খারাপ। কেউ হয়তো এই টেস্টগুলোতে ভালো স্কোর তুলতে পারেন না কিন্তু তিনি যেই বিষয়ে পড়াশোনা করেছেন সেটাতে খুব ভালো। নিজের স্টাডি ফিল্ডে গবেষণা করলে তিনি অনেক ভালো করবেন। কেউ আঁকতে না জানলে যে গাইতে জানবে না, এমন তো কোনো কথা নেই।

 চীন দেশের বহু ছেলেমেয়ে আমেরিকায় পোস্টডক (পিএইচডি নয়) করতে আসেন। তাদের কোনো জিআরই-আইএলটিএস স্কোর থাকে না। অনেকেই ইংরেজিতে খুব কাঁচা। অথচ তারা কাজ করছেন আমেরিকার সেরা সেরা প্রতিষ্ঠানে। গবেষণায় তাঁরা অপ্রতিদ্বন্দ্বী। আমার নিজেরই কোনো জিআরই স্কোর ছিল না। টোফেল স্কোর ছিল না। আইএলটিএস স্কোর ছিল শুধু। ইউরোপে পিএইচডি করতে সাধারণত জিআরই দরকার হয় না। স্টকহোম ইউনিভার্সিটিতে পিএইচডির ভর্তি আবেদনের জন্য জিআরই এ টোফেল স্কোর চেয়েছিল। এসব স্কোর ছাড়াই প্রফেসর আমাকে অ্যাকসেপ্ট করেছিলেন শুধু মাস্টার্স থিসিসের কাজে মুগ্ধ হয়ে।

এই টেস্টগুলোতে ভালো স্কোর তুলতে পারলেই যেমন কেউ বড় গবেষক হয়ে যান না, আবার তেমনি ভালো স্কোর তুলতে না পারলেও কারও জীবন শেষ হয়ে যায় না। বাস্তবতা হলো, এই স্কোরগুলো ভর্তির আবেদনের জন্য আবশ্যক। তবে গবেষণা জীবনে এগুলো কোনো কাজেই আসে না। তুমি যখন গবেষণা করবে, তখন তোমার জিআরই স্কোর দিয়ে একটি ভালো পাবলিকেশন করতে পারবে না। এমনকি তোমার সুপারভাইজারও গুরুত্ব দেবে না, তুমি কত স্কোর পেলে। সে দেখবে, তুমি তোমার বিষয়ে কত এক্সপার্ট।

টোফেল, জিআরই, আইএলটিএস পরীক্ষা অবশ্যই তুমি দেবে। ভালো করার চেষ্টাও রাখবে। ভর্তির জন্য এটা দরকার। তবে যদি ভালো না হয়, থেমে থেকো না। সেটার পেছনে বছর কয়েক নষ্ট কোরো না। লক্ষ্য যদি উচ্চশিক্ষা হয়, জ্ঞান অর্জন হয়, গবেষণা হয়, তাহলে অন্য দেশেও যাও। চীন সে ক্ষেত্রে একটা লক্ষ্য হতে পারে। জাপান চলে যাও। ভারতের আইআইটিতে যাও। দক্ষিণ কোরিয়া, সিঙ্গাপুর বা তাইওয়ানে যাও। সেসব দেশেও এই স্কোরগুলো কখনো কখনো চাইতে পারে, তবে শিথিলতা আছে।

চীন এখন গবেষণায় বহু দূর চলে গেছে। দক্ষিণ কোরিয়া ও তাইওয়ানে এখন বিশ্বমানের গবেষণা হয়। কয়েক বছর ধরে শুধ। জিআরইর জন্য সময় নষ্ট না করে সেসব প্রতিষ্ঠানে গিয়ে গবেষণা শেখো। মাস্টার্স করো। একটা ভালো মাস্টার্স থিসিস করলে বহু দেশের ভালো ভালো প্রফেসর তোমাকে নেওয়ার জন্য বসে থাকবেন। কার অধীনে কাজ করছ, কোন প্রতিষ্ঠানে কাজ করছ। এগুলো অনেক গুরুত্বপূর্ণ। আসল কথা হলো, কাজ শিখলে। সম্ভাবনার দুয়ার খুলে যাবে। চীন থেকে মাস্টার্স করে ইউরোপে পিএইচডি করো। অথবা চীনে পিএইচডি করে আমেরিকায় পোস্টডক করো। কোন দেশে গিয়ে শিখলে সেটা বড় নয়, কী শিখলে সেটাই বড়। দেশের চেয়ে জ্ঞানার্জনটাই বড়।

ভালো করার উপায় অনেক থাকে। অনেক পথ অনুসরণ করে ভালো করা যায়। আমরা যেন শুধু একটি পথেই পড়ে না রই। একটি পথে গন্তব্য খুঁজে না পেলে যেন থেমে না যাই। মনে রাখতে হবে,  A journey of thousand miles begins with a single step (Chinese proverb).