চিত্ত যেথা ভয়যুক্ত, নিচু যেথা শির

চিত্ত যেথা ভয়যুক্ত, নিচু যেথা শির

জুলাই মাসের ৪ তারিখ হলো আমেরিকার স্বাধীনতা দিবস। সরকারি ছুটির দিন। এখানের দোকানপাট, শপিংমলও সেদিন বন্ধ থাকে। অথচ ল্যাবরেটরিতে গিয়ে দেখতাম অনেক ছেলেমেয়েই কাজ করছেন। দেখতাম, আমার প্রফেসরসহ আরও কয়েকজন শিক্ষকের রুমের দরজা খোলা। স্বাধীনতা দিবসেও তারা কাজ করতে চলে এসেছেন। তাদের দেশ তাদেরকে জীবন, চিন্তা ও কর্মের প্রকৃত স্বাধীনতা দিয়েছে। এসব দৃশ্য অবশ্য বিদেশে নতুন কিছু নয়। ইউরোপ-আমেরিকায় বড়দিনের ছুটি হলো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। সে সময় পাবলিক ট্রান্সপোর্ট সচরাচর থাকে না। অথচ ছেলেমেয়েরা ল্যাবরেটরিতে কাজ করতে চলে আসতেন। জাতীয় নির্বাচনের দিন তারা কাজ করেন। কাজের জন্য তাদের দরজাগুলো কখনো বন্ধ থাকে না। এসব দেশে সব দিবসই কর্মদিবস–যদি কেউ কাজ করতে চান।

একটা দেশের শিক্ষক, গবেষক, তরুণেরা যদি এক মিনিট সময়ও ভালো কাজে মাথা খাটান, সে সময়টা দেশের সম্পদে পরিণত হয়। সেটা রাষ্ট্রের কোষাগারে জমা হয়। বিষয়টা বোঝার মতো জ্ঞান পৃথিবীর সব সমাজের মানুষের হয়নি। যাদের হয়েছে, তারাই আজ দুনিয়ায় নেতৃত্ব দিচ্ছেন। তারাই আজ জগৎটাকে উল্টেপাল্টে দেখছেন। পশ্চিমের শিক্ষক-গবেষকরা কি দেশকে ভালোবাসেন না? দেশকে তারা আমাদের চেয়ে অনেক বেশি ভালোবাসেন! তবে তারা দেশপ্রেম দেখানোর জন্য ওয়াশিংটনের ছবি গলায় ঝুলিয়ে রাস্তায় ঘুরে বেড়ান না। তারা বরং কালে। নেশায় ওয়াশিংটনকেই ভুলে গেছেন। স্বাধীনতা দিবস ভুলে গেছেন। দেশকে তারা ভালোবাসেন বলেই ক্লান্তিহীন কাজ যাচ্ছেন। আর সে কারণেই ওয়াশিংটনের রেখে যাওয়া দেশ আজ দুনিয়ায় সবচেয়ে শক্তিশালী।

জর্জ ওয়াশিংটনের জন্মদিনকে আমেরিকায় প্রেসিডেন্ট ডে হিসেবে উদ্যাপন করা হয়। আমার প্রফেসর, প্রেসিডেন্ট ডেতে কাজ করতে চলে এসেছিলেন। তাকে দেখে বিস্মিত হয়ে বললাম, তুমি আজও কাজ করতে চলে এলে? ওয়াশিংটন ডেতে বিশ্রাম। করতে পারতে। প্রফেসর উত্তর দিয়েছিলেন, Washington did his job. I must do my job. His life and work wont make me great!–ওয়াশিংটন তার কাজ করে গেছেন। আমাকে আমার কাজ করতে হবে। সে নিশ্চয় আমাকে মহান করবে না।–এই হলো ওদের দৃষ্টিভঙ্গি।

খবরে দেখলাম, পনেরোই আগস্ট দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক ক্লাস নিচ্ছেলেন। সে সময় কিছু মূর্খ, নরাধম গিয়ে সে শিক্ষককে হেনস্তা করে, অপদস্থ করে। শিক্ষকটির অপরাধ–তিনি জাতীয় শোক দিবসে পড়াচ্ছেন! এই খবরটা পড়ে আমি বিমর্ষ হয়ে যাই। ঘৃণায়-ক্ষোভে মনে হয়েছিল, কোন দেশে জন্মেছিলাম! ছুটির দিনেও যে একজন শিক্ষক ক্লাস নিচ্ছেন, সেটার জন্য তাকে সাধুবাদ দেওয়া দরকার ছিল। তার। গলায় মাল্য দিয়ে বলা দরকার ছিল, স্যার, দেশটা আপনাদের দিকে তাকিয়ে আছে। আপনারা নুয়ে পড়লে দেশটা নুয়ে যায়। মেরুদণ্ড সোজা রাখুন। আমরা আপনাদের পাশে প্রহরা হন থাকব। অথচ এই কীটগুলো একজন শিক্ষককে অপদস্থ করে। বঙ্গবন্ধুর প্রতি মহান শ্রদ্ধা দেখিয়েছে? শোক দিবসে কি না মহৎকর্ম সাধন করেছে?

শোক দিবসে কি জ্ঞানচর্চা নিষিদ্ধ? শোক প্রিন্স HOW বিষ। শিক্ষার্থী কিংবা শিক্ষক পড়াশোনা করতে পারবেন না? এমন কি নিয়ম আছে কোথাও? তা ছাড়া একজন শিক্ষককে ক্লাসে গিয়ে বাধা দেওয়ার মতো এমন স্পর্ধা ওরা পায় কোথায়? সমাজটা কি এসব গজমূর্খ অসভ্যদের কথায় চলবে?

পৃথিবীর এক প্রান্তের মানুষ যখন জ্ঞানসাধনায় ক্লান্তি ভুলে গেছে, অন্য এক প্রান্তের মানুষ সে সাধনায় বাধা দিয়ে বীরত্ব। দেখাচ্ছে। আমাদের শিক্ষাঙ্গনে চিত্ত ভয়শূন্য থাকে না। শির উঁচু। করে রাখা যায় না। কীটদের গ্রাসে যেন অন্ধকার নেমে আসছে সেখানে!