কোথায় ছুড়ছ তোমার সোনালি যৌবন?

কোথায় ছুড়ছ তোমার সোনালি যৌবন?

কয়েক বছর আগের কথা। রসায়নের তরুণ গবেষকদের নিয়ে এক সম্মেলন হচ্ছে স্পেনের বার্সেলোনায়। স্টকহোম ইউনিভার্সিটি থেকে আমিও সেখানে অংশগ্রহণ করি। ইউরোপের বিভিন্ন ইউনিভার্সিটি থেকে তরুণ-তরুণীরা এসেছেন। সবাই নিজ নিজ গবেষণা উপস্থাপন করছেন। প্রতিটি ছেলেমেয়ের চোখে কী স্বপ্ন! কেউ উদ্ভাবন করতে চান পরিবেশবান্ধব কীটনাশক। কেউ চান জটিল জটিল রোগের ড্রাগ তৈরি করতে। কারও স্বপ্ন জীববৈচিত্র্য সুরক্ষিত থাকে এমন রাসায়নিক দ্রব্য ব্যবহার করা। মুগ্ধ হয়ে তাদের মেধাদীপ্ত মুখের দিকে তাকিয়ে থাকি। এসব তরুণ গবেষকেরা পৃথিবীর বিভিন্ন ল্যাবরেটরিতে আবিষ্কার আর উদ্ভাবনের নেশায় নিরন্তর কাজ করে যাচ্ছেন। তাদের মগজে মগজে কত নতুন নতুন ভাবনা।

কোনো সমাজের তরুণেরা যখন নিবিষ্টচিত্তে সৃষ্টির নেশায় মেতে থাকেন, সে সমাজ আলোকিত হয়ে যায় সহসাই। সে সমাজকে রুখে দিতে পারে না কেউ। আমাদের তরুণেরা যখন আত্মজাগরণের পথ থেকে চ্যুত হন, তখন খুব কষ্ট হয়। তারা কি জানেন, একুশ শতকে একটি মেধাবী মনই একটি দুর্গ। এলান টুরিং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় নাৎসি বাহিনীর ল্যাঙ্গুয়েজ কোড উদঘাটন করেছিলেন। তাঁর সৃষ্টি নাৎসি বাহিনীর হাত থেকে বাঁচিয়েছিল হাজারো মানুষকে। মগজ খাঁটিয়ে শ্রেষ্ঠ প্রয়তি, তোলো। অটল প্রত্যয় নিয়ে একজন জগৎখ্যাত বিজ্ঞানী, দায়িত্ববান একজন চিকিৎসক হও। শব্দ চয়নে তুমি হয়ে যাও শ্রেষ্ঠ লেখক। ক্যামেরা হাতে তুলে ধরো পথিবীর অন্যায়।একজন আদর্শ শিক্ষক হয়ে তৈরি করো সহস্র প্রাণ। তাহলে বাংলাদেশ কেউ নিতে পারবে না। কারও হাতে যাবে না আমার দেশ। কিন্তু যৌবন ক্ষয়ে অস্ত্র হাতে নিয়ে নিরীহ মানুষ মারবে–এ কোন প্রতিজ্ঞা তুমি করছ যুবক? কেন এ বিধ্বংসী চিন্তা অঙ্কলিন হয় তোমার বিশুদ্ধ মগজে?

তোমার ধর্ম কোথাও যাবে না ডুবে। ধর্মকে বিনাশ করবে না কেউ। তোমার কর্মই মহান করতে পারে ধর্ম। তুমি যদি একজন সত্য-সুন্দর মানুষ হও, তোমার কাছেই আসবে মানুষ। তোমার। ধর্মের মানুষ মরছে শুধু–এমন কেন ভাবছ? পৃথিবীতে মানুষ। মরেছে সব সময়ই। প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে কত ধর্মের কত মানুষ মরেছে! হিরোশিমায়-নাগাসাকিতে মানুষ মরেছে। বিশ্বরাজনীতির সব ব্যথা তোমার মনে গাঁথো কেন? সে ব্যথা অনেকেরই ব্যথা। তাই বলে নিজের জীবন না গড়ে, সে নিয়ে পড়ে রইলেও জীবন চলে না। অন্যকে রক্ষার জন্য নিজেকে বাঁচতে হয় আগে বাঁচার মতো। ধর্মান্ধ হয়ে থেকো না। রাজনীতির জন্য দাস হয়ে থেকো না। আবেগকে ভারসাম্যতার মধ্যে আনো। ধর্মের জন্য, রাজনীতির জন্য, অশুভ কর্মের জন্য মানুষকে আঘাত না করে, নিজেকে গড়ায় সময় দাও।

তোমার মায়ের কথা ভাবো। কত দিন তোমার কথা ভেবে তিনি কেঁদেছেন। কত দিন ধরে তোমার বড় হওয়ার পথ চেয়ে কষ্ট করে যাচ্ছেন। তোমার বাবা চেয়ে আছেন তোমার প্রতিষ্ঠার দিকে। তোমার ভাই-বোনেরা কত অহংকারে তোমার কথা বলবে! তোমরা জাহিদ হাসানের কথা জানো। তার গবেষণা পথিবী আজ বিস্মিত! তোমার কি জাহিদ হাসান হতে ইচ্ছা করে না? তোমার কি আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ হতে ইচ্ছা করে না? তোমার কি ইচ্ছা করে না ড. ইউনূসের মতো একটি নোবেল মুকুট পরতে? কীর্তিমান স্থপতি ফজলুর রহমানের মতো হতে কি। কা করে না, যার কৃতকর্ম দাঁড়িয়ে আছে শিকাগো শহরে। তোমার কি ইচ্ছা করে না তোমার কর্ম দেখে কোটি মানুষ করতালি দিক। আনন্দে আত্মহারা হয়ে প্লাবিত হবে তোমার। চোখ। তোমার কীর্তিতে সুখের অশ্রুতে ভিজবে তোমার মা বাবার মুখ।

তোমার গৌরবের সৌরভে মোহিত হবে বিশ্ব। অপার হয়ে বসে আছে সে দিনের অপেক্ষায় বাংলাদেশ। তুমি অবনত দৃষ্টিতে। ভাবো। প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হও। পরিবার ও দেশের প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয়ে আত্মবিকাশের পথে এসো। নিজে জাগো, জগৎ জাগাও। সোনালি যৌবনকে অন্ধকারে ছুঁড়ে দেওয়ার আগে বহুবার ভাবো!