কিশোর-কিশোরীর জ্ঞানানন্দ

কিশোর-কিশোরীর জ্ঞানানন্দ

দেশের কয়েক লাখ ছেলেমেয়ে জেএসসি পরীক্ষা দেয়। কিশোর কিশোরীদের জন্য অনেক চাপের সে পরীক্ষা। তাদের মা বাবাদের থাকে সীমাহীন চিন্তা। আমার একমাত্র ভাগনে পরীক্ষা দিচ্ছে। পরীক্ষার ভয়ে সে কাচুমাচু হয়ে আছে। আমাকে বলছে, তার খুব টেনশন হয়। তার ভয় হয়, যদি সে এ-প্লাস না পায়! আমি তার মানসিক যন্ত্রণাটা ধারণ করতে পারি। তাকে বললাম, জীবনে সফল হওয়ার জন্য এ-প্লাস অপরিহার্য নয়। সুতরাং রেজাল্টের চিন্তা মাথা থেকে দূর করে তুমি পরীক্ষা দাও।

তাকে কখনো আমি পরীক্ষায় ভালো করার কথা বলিনি। তাকে বলেছি, তুমি খেলো। বই পড়ো। ঘুরতে যাও। ছবি আঁকো। গান শেখো। পরীক্ষায় ভালো করার চেয়ে পড়াটা বুঝে। আনন্দ নিয়ে পড়ো (ক্লাসে প্রশ্ন করো) এই কথাগুলো ক্রমাগত বলে এসেছি। তার মাকেও বলেছি, ছেলের পরীক্ষার ফল নিয়ে। দুঃখ কোরো না। ছেলেকে বকো না। তাকে বলো, শেখো। আনন্দ নিয়ে পড়ো। চিন্তা করো।

একটা স্টুডেন্টের পঞ্চম শ্রেণির ফলাফলে কী হয়? অষ্টম। আণর ফলাফলে কী হয়? কিছুই হয় না। কিশোর বয়স হলো আনন্দ নিয়ে পড়ার বয়স। আনন্দ নিয়ে শেখার বয়স। সে বয়সে কেউ নম্বর কম পেলে, জীবন ব্যর্থ হয় না। আমরা বরং তাদের পরীক্ষায় ভালো করার চাপ দিয়ে, তাঁদের মধ্যে ভীতি তৈরি করি। বহু ছেলেমেয়ে পরীক্ষায় যাওয়ার আগে কাঁদে। পরীক্ষা দিয়ে এসে কাঁদে। পারিপার্শ্বিক চাপে পড়াশোনা বিষয়টা তাদের কাছে বিষময় মনে হয়। তারা প্রকাশ করতে পারে না। জ্ঞানার্জনের আনন্দকে তারা উপলব্ধি করতে পারে না। সৃষ্টিশীল হতে পারে না। আপনি একবার নিজের জীবন দিয়ে ভাবুন কী মানসিক চাপ ছিল সে সময়গুলোতে। এই কোমল মনে, কেন দিই আমরা নির্দয় আঘাত?

আপনার যে সন্তানেরা পিইসি, জেএসসি দিচ্ছে, তাদের মেধাকে পরীক্ষার ফলাফল দিয়ে পরিমাপ করবেন না। তাদের। বলুন, পরীক্ষার ফলের কথা চিন্তা না করে আনন্দ নিয়ে পড়তে। লক্ষ রাখুন, তারা যা পড়ছে তা ঠিকভাবে বুঝতে পারছে কি না। তার চিন্তাশক্তি কতটা প্রখর সেটা লক্ষ করুন। তার ভেতর সৃষ্টির ক্ষমতা আছে কি না, সেটা পরীক্ষা করুন। সে ক্লাসে প্রশ্ন করে কি না, সেটার খোঁজ নিন। দুনিয়ার বহু সফল মানুষ শিশু ও কিশোর বয়সে পরীক্ষায় খারাপ করেছেন। তাতে তাদের জীবন থেমে থাকেনি। কেউ যদি সত্যি সত্যি আনন্দ নিয়ে শেখে, বুঝে পড়ে, চিন্তা করে পড়ে, সে কোনোদিন ঠেকবে না। জীবনে চলার জন্য নতুন নতুন পথ সে নিজেই খুঁজে নেবে।

একজন কিশোর বয়েসের স্টুডেন্ট বহু কারণেই পরীক্ষায় কম নম্বর পেতে পারে। সে বয়সে তার শারীরিক পরিবর্তন হয়। মনোজগতের পরিবর্তন হয়। এই পরিবর্তন একটা মানুষের জীবনে একবারই আসে। এটা অনেক প্রভাব ফেলে। এ ছাড়া একজন স্টুডেন্টকে বাংলা পড়তে হয়। ইংরেজি, ভূগোল, সমাজবিজ্ঞান, ধর্ম, কৃষিশিক্ষা ইত্যাদি বহু বিষয় পড়তে হয়। কেউ হয়তো বাংলা পড়তে পছন্দ করে না। কেউ হয়তো কৃষিশিক্ষা পড়তে পছন্দ করে না। কোন একটা বিষয়ে নম্বর কম পেয়ে যায়। তার মানে এই নয়, সে খুব খারাপ স্টুডেন্ট। অভিভাবকদের বলছি, শিশু-কিশোরদের অযাচিত চাপ দিয়ে পড়াশোনা থেকে বিমুখ করবেন না। শিক্ষা জীবনটা অনেক বড়। এখানে লেগে থাকাটাই সবচেয়ে বড়ো সফলতা। মানুষের জীবন। কটি-দুটি পরীক্ষার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। কত কত পরীক্ষা তাকে জীবনে দিতে হবে! জীবনের চলার পথে পরীক্ষায় ভালো। বার চেয়ে, পরীক্ষার মুখোমুখি হয়ে, নির্ভয়ে মোকাবিলা করাই। বচেয়ে বড়ো সফলতা! আমরা কি সেটা বুঝি? সন্তানটিকে শিখতে দিন আনন্দ নিয়ে। জ্ঞানানন্দ মানুষের ভেতরকে স্বচ্ছ, অন্দর করে। সুন্দর মানুষ হওয়ার চেয়ে বড় সফলতা আর কী হতে পারে!