অধিকারবঞ্চিত হতভাগ্য শিক্ষার্থীরা

অধিকারবঞ্চিত হতভাগ্য শিক্ষার্থীরা

বিদেশে একজন তরুণ শিক্ষার্থী কোনো প্রফেসর বা গবেষকের। অধীনে কাজ শুরুর আগে তাঁর সম্পর্কে ভালো করে জেনে নেন। ওই প্রফেসরের গবেষণা সম্পর্কে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে জানেন। অন্য শিক্ষার্থী কিংবা বন্ধু-বান্ধবের কাছ থেকে জানেন। বহু প্রফেসর সম্পর্কে ঘেঁটেঘুঁটে জানার পর একজন প্রফেসর সিলেক্ট করেন। এতে করে একজন তরুণ শিক্ষার্থী সঠিক দিক খুঁজে পান। তার পছন্দমতো ফিল্ডে গবেষণা শুরু করতে পারেন।

শিক্ষার্থীরা এসব জানার জন্য প্রথমেই গবেষকদের ওয়েবসাইটে ঢু মারেন। প্রফেসরদের ওয়েবপেজ থাকে। কে কী বিষয়ে কাজ করেন, সেসব তথ্য সেখানে দেওয়া থাকে। কোন প্রফেসর কবে কোথায় পড়াশোনা করেছেন, কখন শিক্ষকতা ও গবেষণা শুরু করেছেন, কী নিয়ে কাজ করছেন, কতটা পাবলিকেশন আছে, কোন কোন জায়গায় লেকচার দিয়েছেন। ইত্যাদি সব তথ্য দেওয়া থাকে। একজন প্রফেসরের বাচ্চা-কাচ্চা। কয়জন, তিনি কয়টা বিয়ে করেছেন, কোন রাজনৈতিক দল। করেন, তিনি ভারত-চীন-জাপান ভ্রমণ করেছেন কিনা, এগুলো জানার প্রয়োজন পড়ে না। শিক্ষার্থীরা জানবেন তাঁর কাজ নিয়ে। কাজের গভীরতা নিয়ে। কাজের আধুনিকতা ও মান নিয়ে। ছেলেমেয়েরা যদি একজন মানুষের যোগ্যতা ও কাজ সম্পকেই না জানেন, তাহলে কিসের ভিত্তিতে তার সঙ্গে কাজ করবেন? যে মানুষটার সঙ্গে মাসের পর মাস গবেষণা করবেন, সে মানুষটার মেধা ও মেজাজ নিয়েই জানতেই হবে। আর এসব বিবেচনা করেই প্রতিটি অধ্যাপক তাদের কর্মজীবন সম্পর্কে সব তথ্য ওয়েবসাইটে দিয়ে রাখেন। তরুণ ও মেধাবী গবেষকদের আকর্ষণ করেন।

আমি যেসব প্রফেসরের সঙ্গে গবেষণা করেছি, তাঁদের সবার শিক্ষাজীবন আমার নখদর্পণে। আমার সুপারভাইজারদের সুপারভাইজ সম্পর্কেও আমি জানি। যেমন : আমার পিএইচডি সুপারভাইজার প্রফেসর কালমান, পোস্টডক করেছেন প্রফেসর ডিয়েটার ক্রেমারের সঙ্গে। ডিয়েটার ক্রেমার কাজ করেছেন নোবেল বিজয়ী বিজ্ঞানী জন পপলের (John Pople) সঙ্গে। আমার পোস্টডক সুপারভাইজার প্রফেসর গ্যারি পিএইচিডি করেছেন নোবেল বিজয়ী কেমিস্ট হার্বাট ব্রাউনের অধীনে। তাদের থিসিস আমি দেখেছি ও পড়েছি। এটাই স্বাভাবিক। যাদের অধীন কাজ করব, তাদের সম্পর্কে তো আমি এগুলোই দেখব। আমার স্টুডেন্টরাও আমার গবেষণা জীবন সম্পর্কে অন্তত জানবে। এটা তাদের অধিকার। আমি কী নিয়ে কাজ করেছি, সে সম্পর্কে প্রশ্ন করার অধিকার তারা রাখে। তারা অধিকার রাখে আমার থিসিস দেখার। তারা অধিকার রাখে আমার কাজ সম্পর্কে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে জানার।

কিন্তু দুর্ভাগ্য, আমাদের শিক্ষার্থীদের একরকম অন্ধের মতোই একজন প্রফেসরের সঙ্গে কাজ করতে হয়। একজন শিক্ষক/গবেষক সম্পর্কে শিক্ষার্থীদের জানার তেমন সুযোগ। নেই। উপায় নেই। কী করে জানবেন? এসব বিষয়ে কি প্রশ্ন করা যায়? তা ছাড়া কতজন শিক্ষকের একটি সুস্পষ্ট ও বিস্তারিত ওয়েবপেজ আছে? আজকাল গুগলেই একটি ফ্রি পেজ ওপেন করা যায়। অথচ ১০ ভাগ গবেষকেরও একটা ভালো ওয়েবপেজ নেই।

শিক্ষকদের শিক্ষা ও গবেষণা জীবন সম্পর্কে জানা শিক্ষার্থীদের একটা অধিকার। সারা দুনিয়ার শিক্ষার্থীরা এই অধিকারটুকু পান। অথচ অধিকার বলতে যে একটা বিষয় আছে আমাদের নিষ্পাপ, নিরপরাধ শিক্ষার্থীদের সেটা জানতেই দেওয়া হয় না। আমি সে অধিকার পাইনি। আমার অনুজেরা পাচ্ছে না। এভাবে কত ছেলেমেয়ে অধিকার থেকে বঞ্চিত হবে, কেউ কি বলতে পারেন?