উপন্যাস
গল্প
1 of 2

১০. রাত্রে

১০। রাত্রে

আরও শোচনীয় হয়ে উঠল আমার অবস্থা। এতদিন শুধু ভেবেছি, কী করে ফিরে পাওয়া যায় টাইম মেশিন। কিন্তু মর্লকদের আস্তানা আবিষ্কার করার পর থেকে নতুন একটা দুশ্চিন্তা দেখা দিল। সে দুশ্চিন্তা অমাবস্যার অন্ধকারকে নিয়ে।

অবাক হচ্ছেন আপনারা। ভাবছেন, অমাবস্যার অন্ধকারকে এত ডরানোর কী আছে। কিন্তু উইনাই এ দুশ্চিন্তা ঢোকালে আমার মাথায়। অবোধ্য শব্দ আর দুর্বোধ্য ভাবভঙ্গি দিয়ে সে বুঝিয়ে দিলে রাতের অন্ধকারের বিভীষিকা। প্রতিরাতে অন্ধকারের অন্তরকাল একটু একটু করে বেড়েই চলেছে, এগিয়ে আসছে অমাবস্যা। সেই প্রথম উপলব্ধি করলাম, অন্ধকারকে কেন ইলয়রা এত ভয় পায়। না জানি অন্ধকারের সুযোগ নিয়ে মর্লকরা কী নরকলীলা চালায় মাটির ওপর। আমার দ্বিতীয় অনুমান যে একেবারে ভুল, সে বিষয়ে আরও কোনও সন্দেহ ছিল না। বহুকাল আগে ইলয়রা ছিল মর্লকদের প্রভু। কিন্তু বহু বছর নিশ্চিন্ত জীবনযাপনের ফলে ইলয়রা কারলোভিগনিয়ান রাজাদের মতো আরও সুন্দর হয়ে উঠলেও একেবারে অপদার্থ বনে গেছে। আর মর্লকরা হয়ে দাঁড়িয়েছে তাদের প্রভু। বহুকাল মাটির নিচে থাকার ফলে ওপরের আলো-হাওয়া মোটেই সহ্য হয় না মকদের, তাই ইলয়দের তারা ওপরেই থাকতে দিয়েছে। বহুদিনের মজ্জাগত অভ্যাসের ফলে ইলয়দের পোশাক ইত্যাদির জোগান দিলেও মনিব-চাকরের পুরানো সম্পর্ক আর নেই। বহুকাল আগে মানুষ তার যে ভাইকে নির্বাসনে পাঠিয়েছিল মাটির নিচে–সেই ভাই ফিরে এসেছে অন্য রূপ ধরে। ভয় কী বস্তু, তা ইলয়রা জেনেছিল অনেক আগেই। ধীরে ধীরে আবার নতুন করে এই ভয়ের আস্বাদ তারা পেতে শুরু করেছে। নিচের টেবিলের ওপর রাখা মাংসের দৃশ্যটা চোখের সামনে ভেসে উঠল। হাড়ের আকারটা একটু চেনা মনে হলেও বুঝলাম না ঠিক কোন প্রাণীর।

ভয় পেয়ে খুদে মানুষরা অসহায় হয়ে থাকতে পারে, কিন্তু আমার পক্ষে তা শোভা পায় না। প্রতিজ্ঞা করলাম, সবার আগে একটা হাতিয়ার আর একটা নিরাপদ আশ্রয় জোগাড় না-করা পর্যন্ত দ্বিতীয় কোনও কাজ আর নয়। ঘুমের সুযোগে ওরা যে ইতিমধ্যেই আমাকে পরীক্ষা করে গেছে, ভাবতেই গা শিরশির করে উঠল আমার।

বিকেলের দিকে টেম্স উপত্যকায় অনেক খুঁজেপেতেও আশ্রয় কোথাও পেলাম না। কুয়োর গা বেয়ে মর্লকদের ওঠানামা করার ক্ষমতা আমি নিজের চোখে দেখেছি। কাজেই গাছে চড়া বা বাড়িতে ঢোকা তাদের পক্ষে মোটেই কষ্টকর নয়। হঠাৎ সবুজ পোর্সেলিনের প্রাসাদের বেজায় উঁচু ঝকঝকে চুড়োগুলো আমার মনে ভেসে উঠল। তখনই সেই ভরসন্ধের সময়ে ছোট উইনাকে কাঁধে চাপিয়ে চললাম দক্ষিণ-পশ্চিমে সবুজ প্রাসাদের দিকে। ভেবেছিলাম, সাত-আট মাইল দূরে হবে প্রাসাদটা, কিন্তু হাঁটতে হাঁটতে বুঝলাম আমার ধারণা একেবারেই ভুল। তার ওপরে জুতোর একটা পেরেক বেরিয়ে পা ছিঁড়ে ক্ষতবিক্ষত করে দিয়েছিল। খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটতে গিয়ে দেরি হল আরও। সূর্য তখন ডুবে গেছে পশ্চিমে, ফ্যাকাশে হলদেটে আকাশের পটে দেখলাম, ছবির মতো ফুটে রয়েছে প্রাসাদের কালো রেখা।

কাঁধে চড়ে যাওয়া আর পছন্দ হল না উইনার, আমার পাশে পাশে ছুটে চলল। প্রথম প্রথম আমার পকেটগুলো উইনাকে বেশ ভাবিয়ে তুলেছিল, শেষকালে চমৎকার ফুলদানি হিসেবে ওগুলোকে কাজে লাগায় সে। সে সন্ধ্যাতেও কতকগুলো ফুল দিয়ে সাজিয়ে দিলে আমার দুই প্যান্টের পকেট। প্যান্ট পালটাবার সময়ে…

সময়-পর্যটক একটু থেমে প্যান্টের পকেট থেকে দুটো আশ্চর্য ধরনের শুকনো ফুল বার করে সামনের টেবিলে রাখলেন। তারপর আবার বলে চললেন।…

বহুক্ষণ হাঁটবার পর একটা গভীর বনের সামনে হাজির হলাম। ডাইনে-বামে যাওয়ার উপায় নেই, কিন্তু আঁধারে বনের মধ্যে ঢুকে নতুন বিপদ ডেকে আনার সাহসও আমার হল না। ইতিমধ্যে শ্রান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়ায় কোলে তুলে নিয়েছিলাম উইনাকে। এদিকে ওদিকে তাকিয়েও যখন সবুজ পোর্সেলিন প্রাসাদের কোনও চিহ্ন দেখলাম না, তখন সন্দেহ হল, বোধহয় পথ হারিয়েছি। উইনাকে ঘাসের ওপর সন্তর্পণে শুইয়ে আমি পাশে বসলাম, কখন চাঁদ উঠবে সেই প্রতীক্ষায়।

চারদিক নিঝুম নিস্তব্ধ। কখনও সখনও অবশ্য বনের ভেতর জীবন্ত প্রাণীর নড়াচড়ার ক্ষীণ শব্দ শুনতে পাচ্ছিলাম। পরিষ্কার রাত। মাথার ওপর তারার ঝিকিমিকি স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল। পুরানো নক্ষত্রগুলোর একটাও দেখতে পেলাম না। একশো জনমেও (generation) যে তারার দলের ধীরগতি ধরা সম্ভব হয় না, তারাই লক্ষ বছরের মধ্যে নতুনভাবে সাজিয়ে নিয়েছে নিজেদের, কিন্তু ছায়াপথটা আগের মতোই ধূলিকণার মতো রাশি রাশি তারায় বোঝাই। দক্ষিণদিকে আমাদের এখানকার SIRIUS-এর চাইতেও ঢের বেশি জ্বলজ্বলে

একটা লাল তারা দেখলাম। আর এইসব মিটমিটে আলোর মালার মধ্যে পুরানো বন্ধুর মতো জেগে ছিল একটা জ্বলজ্বলে গ্রহ।

সমস্ত রাত মকদের চিন্তা মন থেকে সরিয়ে রাখলাম জ্যোতিষচর্চা দিয়ে। মাঝে মাঝে অবশ্য ঢুলছিলাম। কতক্ষণ বাদে পুবের আকাশে বর্ণহীন আগুনের আভা ছড়িয়ে দেখা দিল চাঁদের মরা মুখ। আর তারপরেই আস্তে আস্তে তা ঢাকা পড়ে গেল ভোরের আলোয়। ধীরে ধীরে লাল হয়ে উঠতে লাগল পুবের আকাশ। সারারাত কোনও মর্লক হানা দেয়নি আমাদের ওপর। বোধহয় জানতে পারেনি তখনও।

উঠে দাঁড়াতে গিয়ে দেখি, জুতো আর পায়ের অবস্থা শোচনীয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। গোড়ালি ফুলেছে, পায়ের তলাও অক্ষত নেই। কাজেই জুতোজোড়া খুলে নিয়ে ফেলে দিলাম বনের মধ্যে। তারপর উইনাকে ঘুম থেকে তুলে আবার হাঁটা দিলাম। ভোরের আলোয় নির্ভয়ে এদিকে-ওদিকে খেলে বেড়াচ্ছিল কয়েকজন ফুটফুটে ইলয়। আনমনাভাবে তাকিয়ে ছিলাম ওদের দিকে। এমন সময়ে আচমকা পুরানো দৃশ্যটা ভেসে উঠল আমার মনের চোখে। না, কোনও সন্দেহই আর নেই। মাটির নিচে টেবিলে যে মাংস দেখেছি, তার সাদৃশ্য খুঁজে পেলাম। ভাবতেও শিউরে উঠলাম আমি। কোনও সুদূর অতীতে মর্লকদের খাবারের ভাঁড়ার নিশ্চয় ফুরিয়েছিল। খুব সম্ভব হঁদুর-টিদুর খেয়ে বেঁচে থাকত ওরা। এ যুগেও খাওয়ার বাছবিচার মানুষের মধ্যে বিশেষ আর দেখা যায় না। হাজার তিন-চার বছর আগে নরমাংসেও অরুচি ছিল না আমাদের পূর্বপুরুষদের। তারপর কত লক্ষ বছর গেছে কেটে, দারুণ খাদ্যসংকটে পড়ে পাতালবাসী মর্লকদের মধ্যে সে অভ্যাস ফিরে আসা মোটেই বিচিত্র নয়। আমরা যেমন গোরু-ভেড়া-মুরগি পুষি, ওরাও তেমনি পুষছে ইলয়দের শুধু নিজেদের উদরসেবার জন্যে! একশ্রেণির সুবিধাবাদীদের চরম স্বার্থপরতার কী শোচনীয় শাস্তি।