৩. কলিংবেল বেজে ওঠে

পরদিন দুপুরবেলা, বারোটার সময় কলিংবেল বেজে ওঠে। শুভা তখন ভিতরের ঘরে, খাটের ওপর এলিয়ে শুয়ে ছিল। বিছানার ওপরেই, এক পাশে কাগজ আর কলম পড়ে রয়েছে।

ওর মুখ দেখলেই বোঝা যায়, এখনও খায়নি। স্নান করেছে সকালেই। চুলে তেল দেয়নি। খোলা চুল ওর মুখের দুপাশে ছড়ানো। চোখ দুটো লাল। চোখের কোল বসা। অসহায় দুশ্চিন্তা ছাড়া, চোখে মুখে আর কিছু নেই।

গতকাল রাত্রে নরেশের সেই একই মূর্তিতে আবির্ভাব হয়েছিল। আরও মত্ত, আরও নিষ্ঠুর, আরও র। ভাষা কত কুৎসিত হতে পারে, নরেশের কথা না শুনলে বোঝা যায় না। শুভারও আত্মরক্ষার সেই একই পদ্ধতি। কিন্তু কতদিন, আর কতক্ষণ সে একটা মত্ত কামুক পশুর সঙ্গে এ লড়াই চালিয়ে যাবে। এখন বরং একটা আশঙ্কা জাগে শুভার মনে, কোনদিন কী ভাবে, কী দিয়ে নরেশকে সে আঘাত করে বসবে। পরিণামে নরেশ হয়তো নিহত হবে। আক্রমণের মুখে, আত্মরক্ষায় ওর কোনও হিতাহিত জ্ঞান থাকে না। যেভাবে পারে, তখন নরেশকে আঘাত করার জন্যে, ওর ভিতর থেকে যেন একটা বিশেষ শক্তি জেগে ওঠে। গতকাল রাত্রে, নরেশকে ও এত জোরে ধাক্কা দিয়েছে, খাটের গায়ে লেগে নরেশের কপাল ফুলে গিয়েছে। সেই অবস্থায়, শুভা পাশের ঘরে গিয়ে দরজা বন্ধ করে দিয়েছে।

যদি এমন হত, মধ্যরাত্রে নরেশকে দরজা খুলে দেবার কেউ থাকত, তা হলে আর কোনও ভাবনা ছিল না। কিন্তু আর কেউ এখানে নেই। আর, লোকচক্ষে, শুভার এই আশ্রয়ের মূল্যে, এ কাজটুকু সে কেন পারবে না।

এখন বরং মনে হয়, নরেশ প্রচুর মদ খেয়ে আসে বলেই দুর্বল। তার হাতে-পায়ে শক্তি হয়তো থাকে, কিন্তু লক্ষ্যভ্রষ্ট প্রতি পদে। মত্ত চোখের দৃষ্টি তার নির্দেশ মানে না। হাত-পা তার বশে থাকে না। যদিও আক্রমণের তীব্রতা, ভয়ংকরতা বাড়ে বই কমে না।

গতকাল রাত্রেই, শুভা মনে মনে স্থির করেছিল, কপালে যা-ই থাক, লজ্জার মাথা খেয়ে, রাত পোহালে, সমস্ত কথা জানিয়ে, মাকে চিঠি লিখবে। কলঙ্ক নিয়ে যে কোনও মেয়ে, গ্রামে আর কোনওদিন ফিরে আসেনি, পরিবারের সঙ্গে বাস করেনি, এমন তো নয়। তাদের নিয়ে হয়তো, শুভা, শুদের বাড়ির লোকেরা অনেক নিন্দা কুৎসা করেছে। সেই পাপেরই শাস্তি এ সব। ভেবেছিল, মাকে লিখে জানাবে,নতুন শহরে যে হোসিয়ারি কারখানা হয়েছে, যেখানে এখন অনেক মেয়েরাই কাজ করে, শুভা না হয় সেখানেই কাজ করে, নিজের ভরণপোষণ করবে। কেন না, বিয়ে তো আর কোনওদিন হবে না। ওর সব কথা জানবার পরে, কেউ-ই আর কোনওদিন ওকে বিয়ে করতে চাইবে না। তবু, মা যেন বাবাকে বলে, রাজি করায়। তবু শুভা আর এভাবে, আত্মীয়-স্বজনহীন, এই ভয়ংকর পরিবেশে, প্রতি মুহূর্তের ভয়ে সংশয়ে থাকতে পারছে না। কলকাতায় ওর এমন কেউ নেই যে, একটা কোনও কাজের ব্যবস্থা করে দেয়। একটা নির্ভয় নির্ভরযোগ্য আশ্রয় দেয়। তা হলে হয়তো ও কলকাতাতেই থাকত। কিন্তু আর এভাবেও থাকতে পারছে না। মায়ের পায়ে মাথা কুটে বলছে, মা যেন বাবাকে রাজি করায়। বাবাকে যেন মা বলে, এখনও সেরকম কিছু শুভার ঘটেনি, যাতে গ্রামে ফিরে গেলে, লোকে আঙুল দিয়ে কিছু দেখাবে। শুভার কোনও ছেলেপিলে হয়নি। আর যদি মা এই কথা না রাখতে পারে, তারা যদি রাজি না হয়, তবে দুটো পথই ওর সামনে খোলা থাকবে। মরণ অথবা নরেশের রক্ষিতা হওয়া।

সবই ভেবে রেখেছিল শুভা। রাত পোহালে, নরেশ যেমন বেরিয়ে যায়, তেমনি বেরিয়ে গিয়েছে। বিহানী ঝি যেমন আসে, তেমনি এসেছিল। শুভার কথা না শুনে, বাজার করে এনেছে। শুভাকে নানারকম সান্ত্বনা সাহস দিয়ে, রান্না করিয়েছে। বিহানী সমস্ত ব্যাপারটাই অনুমান করতে পারে এখন। তা-ই বলে, দুনিয়াতে বহুত কিসিম বিপদ আছে, কিন্তু ভুখ সব সে বড়া দুখ। যতক্ষণ জুটবে, ততক্ষণ, মেমসাব, পেটকে কষ্ট দেবেন না।

এখন বিহানীকেই তবু যা হোক একটু ভাল লাগে। শুভা তার সঙ্গেই একটু কথা বলে। আজ সে বিহানীকে জিজ্ঞেস করেছিল, সেই তালাগুনিনের চেহারা কেমন, সে জানে কি না।

বিহানী চোখ বড় করে, ফিসফিসিয়ে বলেছে, কভি তো দেখিনি মেমসাব। ও তো মন্তর গুণ জানে। ওকে কেউ দেখতে পায় না।

শুভা জিজ্ঞেস করেছিল, তবে যে তুমি বলছিলে, খবরের কাগজে ওর ছবি বেরিয়েছিল?

বাহার হইয়েছিল তো। আমি দেখি নাই। যারা দেখেছে, তাদের মুখে শুনেছি, আমার আদমির উমর হবে।

শুভা হতাশ ও অবাক হয়েছিল। বিহানীর আদমির উমর হলে, সে-মানুষ আর যে-ই হোক, কাল সন্ধ্যারাত্রের সেই লোক কখনওই নয়। কিন্তু লোকটা তো প্রায় স্বীকারই করেছে, সে চোর। পরশু রাত্রের পলাতক যে সে-ই, তাতে কোনও সন্দেহ নেই। সে কি তবে, বিহানীর সেই তালাগুনিন নয়? যে সমস্ত তালাকেই গুণ তুক করতে জানে।

তারপরেও শুভা জিজ্ঞেস করেছিল, চিচিং ফাঁক কী, জান?

বিহানী হেসে, সোজা আলিবাবা হিন্দি ছবির গল্প বলেছিল। সে কথা শুভারও জানা ছিল। কিন্তু চিচিং ফাঁক বস্তুটি তাকে সাহস করে দেখাতে পারেনি। তবে, গল্পটার প্রসঙ্গ আসবার পর, শুভার মনের মধ্যে চকিতে একটা ঝিলিক হেনে গিয়েছিল। চিচিং ফাঁক মানে কি তা হলে, যা দিয়ে সব খোলা যায়? লোকটা কি সেই ইঙ্গিতই করেছিল?

বিহানী চলে যাবার পরে, আর সে সব কথা শুভার মনে ছিল না। মাথায়ও ছিল না। নিজের চিন্তাতেই ডুবে গিয়েছিল। নেহাত বিহানীর কথায় রান্নায় হাত দিয়েছিল। নইলে মাছ আনাজ নষ্ট হত। তেমন অঢেল তো জীবনে কখনওই দেখেনি, যে কোনও কিছু নষ্ট করবে। তাই কোনওরকমে রান্নাটা করেছিল, খেতে আর ইচ্ছে করেনি। রান্না শেষ করেই, গতকাল রাত্রের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, কাগজ কলম নিয়ে বসেছিল, মাকে চিঠি লিখবে বলে। কিন্তু একটি লাইনও লিখতে পারেনি। কাগজে একটি আঁচড়ও লাগেনি। মায়ের মুখ মনে পড়তেই, ওর সমস্ত মন লজ্জায় ধিক্কারে কুঁকড়ে গিয়েছিল। হাত গুটিয়ে গিয়েছিল।

এতক্ষণ ধরে আকাশ-পাতাল ভেবেছে। অনেক চেষ্টা করেছে, কিছু লিখবে বলে। একটি কথাও লিখতে পারেনি। মনে হয়েছিল, ওর চোখের সামনেই যেন, সেই চিঠি ছিঁড়ে পায়ের তলায় মাড়িয়ে, বাবা-মা রাগে অপমানে জ্বলছে।

শুভার এই ভাবনার অবকাশেই কলিংবেল বেজে ওঠে। শুভা উঠে, এগিয়ে যেতে গিয়েও, মাঝখানের দরজায় থমকে দাঁড়ায়। গতকালের সেই লোকটা নিশ্চয়ই। লোকটা জানে, এ সময়ে ও একলা থাকে। খবর রাখে ঠিক। কিন্তু আজ ও দরজা খুলবে না।

বিজলি ঘণ্টা আবার বেজে ওঠে। এবার একটু বেশি সময় ধরে বাজে। এই দিনে-দুপুরে লোকটার এত সাহস। এখনও বেল বাজাচ্ছে। যে কোনও দিকের জানালা খুলে ও যদি লোকজন ডাকে, কেউ না কেউ এসে পড়বে। লোকটার কি সে খেয়ালও নেই।

কিন্তু বেল আবার বেজে ওঠে ঘন ঘন। শুভা তথাপি নড়ে না। তারপরে দরজায় ধাক্কা পড়ে, একটা গলার স্বরও যেন শোনা যায়। এবার আর শুভা না এগিয়ে পারে না। সে লোকটার নিশ্চয় এতখানি সাহস হবে না, দরজা ধাক্কা দিয়ে গলার আওয়াজ করবে। তবু দরজাটা খোলবার আগে ও এক মুহূর্ত ভাবে, তারপরে খুলে দেয়।

নরেশের ড্রাইভার। চামড়ার একটা বড় ব্যাগ তার হাতে। দেখেই মনে হয় খুব ভারী। বলে, বাবু এটা ঘরে রেখে যেতে বললেন।

শুভা সরে দাঁড়ায়। বাঙালি ড্রাইভার লোকটা তেমন খারাপ নয়। মাঝারি বয়স, দৃষ্টি ভদ্র, চালচলনও শালীন। আসে, জিনিস রাখে, চলে যায়। আজও তেমনি ঘরে ঢুকে ব্যাগটা ঘরের দেওয়ালের এক পাশে রেখে, বেরিয়ে যায়। শুভা দরজা বন্ধ করে। একটা উদ্বেগ থেকে যেন নিশ্চিন্ত হয়। ভাবে, বৃথাই আমি ভয়ে মরি। লোকটা নেহাত তার চিচিং ফাঁক খুঁজতেই এসেছিল। এবং এই বিশ্বাস নিয়েই ফিরেছে, ওটার বিষয়ে শুভা কিছুই জানে না। লোকটার ঘুরে আসার আর কোনও কারণ নেই।

আর যদি বা আসে, তাতেই বা শুভার ভয় কীসের। এখনও কি শুভার আর কোনও ভয় আছে। তবে লোকটার যদি নরেশের মতো কোনও মতলব থাকে, তা হলে হয়তো শুভা পারবে না। কিন্তু সে রকম কিছু মনে হয়নি।

শুভা ভিতরের ঘরে এসে, খাটের ওপর কাগজ কলমের দিকে তাকায়। না, পারবে না, মাকে সম্বোধন করে, একটা কথাও ও লিখতে পারবে না। কারণ এই পোড়ামুখ, কোনওরকমেই মাকে দেখাতে পারবে না। ও আবার বিছানাতেই এলিয়ে পড়তে যায়। আবার কলিংবেল বেজে ওঠে।

আবার কে? ড্রাইভারই ফিরে এল নাকি। দু মিনিট তো গেল লোকটা। তা ছাড়া, ভয়টা এখন আর তেমন নেই শুভার। হয়তো আবার কিছু বলতে এসেছে। কিংবা কিছু নিয়ে যাবার কথা, নিতে ভুলে গিয়েছে। এমন যে কখনও হয় না, তা নয়।

শুভা গিয়ে দরজা খুলে দেয়। তৎক্ষণাৎ ওর সমস্ত ভাবনাকে মিথ্যে করে দিয়ে গতরাত্রের সেই লোকটিই ঢোকে। ঢুকে একই ভঙ্গিতে, ঝটিতি ছিটকিনি বন্ধ করে দেয়।

শুভা সঙ্গে সঙ্গে একটু সরে গিয়ে, লোকটার দিকে তাকায়। আজ লোকটার পোশাক একটু অন্য রকম। প্যান্ট আর জামা, দুটোই আলাদা। জুতো সেই একই। একটু যেন ছিমছাম ভাব। চোখের দৃষ্টি যেন বাজের মতো, অনুসন্ধিৎসু অথচ শুভার প্রতি অমনোযোগী, নির্বিকার ভাব।

প্রথম প্রশ্ন, সেটা পেলেন?

শুভার জবাব, না।

কিন্তু আমি শিওর জানি, সেটা এখানেই আমি ফেলে গেছি।

বলেই সে ঢাউস আলমারিটার টানা ধরে টান দেয়। টানা খুলে যায়। পর পর সব টানাগুলোই সে খুলে খুলে দেখে। নিরাশ হয়ে, ফিরে বলে, কাল শুনেছিলাম, এ আলমারি বন্ধ।

শুভা কোনও জবাব দেয় না। লোকটা এগিয়ে আসে। শুভা সরে যায়। নরেশের আয়রন সেফের হাতল ঘোরায়। সেটা বন্ধ। শুভার দিকে চেয়ে সে বলে, ওটা রেখে কী লাভ? আপনার কোনও কাজেই লাগবে না।

শুভার মুখ দিয়ে পালটা প্রশ্ন বেরিয়ে যায়, তোমার কী কাজে লাগে?

লোকটার দৃষ্টি তীক্ষ্ণ হয়ে ওঠে। পরমুহূর্তেই ঠোঁটের কোণে একটু হাসির ঝিলিক খেলে যায়। বলে, যদি ফিরিয়ে দেন, এখুনি দেখিয়ে দিতে পারি।

শুভা হঠাৎ কোনও কথা বলতে পারে না। নিজের কথাটা, ওর নিজের কানেই যেন কেমন গোলমেলে লাগে। যেন ধরা পড়ে যাবার মতো কিছু বলে ফেলেছে। অথচ ওর ভিতরে, একটা কৌতূহলও তীব্র হয়ে ওঠে। এ কৌতূহল একান্ত মেয়েলি কি না কে জানে। কিন্তু ও নিজেও বোধ হয়, মনের এই আশ্চর্য গতিবিধির কথা জানে না। যাকে দেখে ও ভয় পাচ্ছে, যার কথায় ও গতকাল তীব্র অপমানে জ্বলে উঠেছিল, সেই লোকটার কথাতেই ওর কৌতূহল জেগে ওঠে। কী দেখাবে লোকটা, সেই জিনিসটা দিয়ে?

সত্যি কোনও জাদু দেখিয়ে দেবে নাকি! ও জিজ্ঞেস করে, কী দেখাবে?

চিচিং ফাঁক।

কথাটার উচ্চারণের দোষে বা লোকটার একদৃষ্টে চেয়ে থাকার জন্যই, এখন কথাটা যেন কী রকম খারাপ শোনায়। জিজ্ঞেস করে, মানে?

মানে, আগে জিনিসটা দিন, তবে তো দেখাব।

মুহূর্তের মধ্যেই শুভা সচেতন হয়ে ওঠে। তাড়াতাড়ি বলে ওঠে, আমি জানি না ওটা কোথায়।

লোকটা তৎক্ষণাৎ জিজ্ঞেস করে, কোনটা?

সেইটা।

লোকটা ওর চোখ থেকে চোখ নামায় না। শুভার মুখের চেহারা বদলে যায়। ধরা পড়ে যাবার একটা ছাপ ওর মুখে ফুটে ওঠে। ভাবে, ও বুঝি প্রায় স্বীকার করে ফেলেছে কথাটা।

লোকটা বলে, নিশ্চয়ই জানেন, আর চাপতে পারবেন না। চোখ-মুখ বলছে।

শুভা ঘাড় নেড়ে বলে, না না, জানি না।

আলবত জানো।

লোকটা এবার প্রায় ধমকে ওঠে। আর পাশ ফিরে এমনভাবে দাঁড়ায়, চোখের কোণ দিয়ে তাকায়, যেন এখুনি ঝাঁপিয়ে পড়বে শুভার ওপরে। ধমক শুনে শুভা শুধু অবাক হয় না, ভয়ে ওর ভিতরটা কীরকম কুঁকড়ে যায়। হঠাৎ কোনও কথা বলতে পারে না।

লোকটা যেন ছিটকে ওর কাছে চলে আসে, শাসিয়ে ওঠে, নিয়ে এসো, দাও, শিগগির দাও বলছি। হারি আপ।

শুভা কাঠ হয়ে যায়। লোকটা এখন ওকে তুমি বলছে না শুধু, ভয়ংকর মনে হচ্ছে। ওর মুখ দিয়ে হঠাৎ বেরিয়ে যায়, গায়ে হাত দিয়ো না, দিচ্ছি।

জলদি।

শুভা যেন লোকটার ছোঁয়া বাঁচাবার জন্যই তাড়াতাড়ি পাশের ঘরে যায়। সেই জিনিসটা ঢাউস আলমারিতে আর রাখেনি। পাছে সেটা নরেশের চোখে পড়ে যায়। তা হলে ওকেই কৈফিয়ত দিতে হত। গতকালই ও সেটা পাশের ঘরের খাটের বিছানার নীচে লুকিয়ে রেখেছিল।

শুভার প্রায় গা ঘেঁষেই, লোকটাও এল সঙ্গে সঙ্গে। শুভা একবার খাটের পাশে দাঁড়ায়। লোকটার দিকে তাকায়। তারপর সরে গিয়ে বলে, এখানে বিছানার নীচে আছে।

লোকটা তৎক্ষণাৎ বিছানা তুলে, লোহার পাতের সেই অদ্ভুত জিনিসটা তুলে নেয়। তার মুখে বিস্ময় এবং খুশি, চকিতে এক বার ঝলসে ওঠে। শুভার দিকে চেয়ে বলে, লক্ষ্মী মেয়ে একেবারে! কিন্তু কাল এটা এখানে দেখতে পাইনি তো। কোথায় রেখেছিলে?

শুভা কোনও জবাব দেয় না। লোকটাও শোনবার জন্যে তেমন আগ্রহ দেখায় না। সে তার বিচিত্র আকার লোহার পাতের জিনিসটাই ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখতে থাকে। আর শুভার ভয়ের মধ্যেও, লোকটার প্রতি রাগে মন জ্বলতে থাকে। একটা চোর, অনায়াসে ওকে তুমি বলে বলছে! লোকটার সেরকম বয়স হলেও বা কথা ছিল। একটা ছাব্বিশ-সাতাশ বছর বয়সের চোর মাত্র। লোকটা ওর দিকে চোখ তুলে বলে, চলো, তোমাকে যা দেখাব বলেছিলাম দেখিয়ে দিই।

শুভা ভয়ের মধ্যেও ফুঁসে ওঠে, কিছু দেখতে চাই না। তুমি বেরিয়ে যাও।

যাব। এটা কী কাজে লাগে, দেখবে না?

না।

লোকটা আস্তে আস্তে হেঁটে পাশের ঘরে যায়। কিন্তু দরজার দিকে যায় না। বাঁ দিকের আড়ালে চলে যায়। শুভা আর তাকে দেখতে পায় না। কী করছে লোকটা, ঘরের ওপাশে? ওর কানে আসে দু-একটা ঠুং ঠাং শব্দ। কৌতূহল না চাপতে পেরে ও মাঝখানের দরজায় এসে দাঁড়ায়। সঙ্গে সঙ্গে ওর বুকের মধ্যে যেন নিশ্বাস আটকে আসে। আতঙ্কে শিউরে উঠে, পাথরের মতো দাঁড়িয়ে থাকে। দেখে লোকটা সেই অদ্ভুত জিনিস দিয়ে, নরেশের আয়রন সেফের লক্ খোলবার চেষ্টা করছে। এবং সমস্ত ব্যাপারটার ভয়ংকর ভেবে ওঠবার আগেই, লোকটা অনায়াসে আয়রন সেফের ডালা খুলে ফেলে।

শুভার গলা দিয়ে একটা চাপা আর্তস্বর বেরিয়ে আসে। লোকটা ওর দিকে চেয়ে বলে, এর নাম চিচিং ফাঁক।

তারপরেই তার চোখ দুটি চক চক করে ওঠে। বলে, প্রচুর মালকড়ি। নিশ্চয়ই ট্যাক্স ফাঁকি দেওয়া কালো টাকা। তা নইলে কেউ এভাবে রাখে না।

বলতে বলতে সে, সেফের ভিতরে দু হাত গলিয়ে, দুই তাড়া নোটের বান্ডিল বের করে নিয়ে আসে। শুভকে দেখিয়ে বলে, দেখেছ?

শুভার তখন বুকের মধ্যে কীরকম করছে। সে বাইরের দরজাটার দিকে তাকায়। দু পা এগিয়ে ঘরের মধ্যে ঢুকে, প্রায় চিৎকার করে ওঠে, কী করছ তুমি!

লোকটা তৎক্ষণাৎ নোটের বান্ডিল সেফের মধ্যে ছুঁড়ে দিয়ে, ডালাটা ভেজিয়ে, নিচু গলায় শাসিয়ে ওঠে, চুপ, চেঁচিও না। তাতে সুবিধে হবে না।

কিন্তু শুভার ভিতরে যে কী হয়, নিজেই বুঝতে পারে না। ভয়ে আর কান্নায় ও হঠাৎ ভেঙে পড়ে। বলে, দোহাই, ও টাকা নিও না। নরেশ আমাকে কখনও বিশ্বাস করবে না। ভাববে আমিই সরিয়েছি।

লোকটা তীক্ষ্ণ চোখে, শক্ত মুখে কয়েক মুহূর্ত শুভার দিকে চেয়ে থাকে। লোহার পাতের বিচিত্র আকৃতি তিনটি চাবির, একটা তখনও সেফের লক-এর ছিদ্রে ঢোকানো।

লোকটা ঘুরে দাঁড়ায়। লোহার পাতের চাবি ধরে কয়েক বার এদিক ওদিক করে ঘোরায়। কটু করে একটা শব্দ হয়। সেফের হাতলটা চাপ দিয়ে দেখে নেয়, বন্ধ হয়ে গিয়েছে। তার ভাষায় চিচিং ফাঁক চাবিটা সে প্যান্টের পকেটে ঢুকিয়ে দেয়। আবার শুভার মুখোমুখি দাঁড়ায়। জিজ্ঞেস করে, ঠিক আছে?

শুভা কোনও কথা বলে না। ওর মুখে ভয় বিস্ময়ের বিহ্বলতা। চোখ দুটো প্রায় ভিজে উঠেছে। লোকটার ঠোঁট দুটো বেঁকে ওঠে। আবার জিজ্ঞেস করে, কিন্তু এ টাকা তুমি কতদিন যখ দিয়ে আগলে রাখবে?

শুভা তবু কথা বলতে পারে না। এখন বিহানীর কথা তার মনে পড়ছে। এ নিশ্চয় সেই তালাগুনিন। পরশু রাত্রের সেই প্রাণ-সংশয় করে পালানোর দৃশ্য ওর চোখের সামনে ভাসতে থাকে। কিন্তু বিহানী লোকটার চেহারা চেনে না। এখন সেই মারাত্মক লোকটা ওর সামনেই দাঁড়িয়ে।

সে আবার বলে, এ কথা নিশ্চয়, আজ রাত্রেই নরেশকে বলে দেবে? যাতে নিজেও বাঁচে, টাকাটাও নরেশ সরিয়ে ফেলতে পারে।

শুভা ঘাড় নেড়ে একবার উচ্চারণ করে, না।

 লোকটা আবার অপলক চেয়ে দেখে শুভকে। তারপর নরেশের খাটে গিয়ে বসে, দোলাতে দোলাতে আশেপাশে দেখে। হঠাৎ খাটের নীচে পা রেখে শুয়ে পড়ে, ড্রেসিং টেবিলের আয়নায় নিজেকে খানিকক্ষণ নিরীক্ষণ করে। কপাল থেকে চুলগুলো সরিয়ে দেয়। আবার উঠে বসে, আড়মোড়া ভাঙে। বলে, নাঃ, খুব খিদে পেয়েছে। আছে কিছু খাবারদাবার?

লোকটা শুধু ছেলে নয়, এখন তার ব্যবহারও যেন ছেলেমানুষিতে ভরতি। শুভা এতে অবাক হয়, কোনও জবাবই দিতে পারে না। কিন্তু ভয়টা তার অনেকখানি কেটে আসতে থাকে।

সে উঠে দাঁড়ায়। জিজ্ঞেস করে, নেই, না? আচ্ছা চলি।

দরজার দিকে এগিয়ে যায়। শুভার ভিতরটা কী রকম অস্থির হয়ে ওঠে। লোকটা এভাবে সত্যি খেতে চেয়ে ফিরে যাচ্ছে, তাও কোনওরকম দুর্ব্যবহার না করে, টাকা না নিয়ে, এটা যেন সে বিশ্বাস করতে পারছে না। অথচ খাবার সত্যি রয়েছে। খাওয়ালে কি খুবই অন্যায় হবে।

লোকটা যখন ছিটকিনিতে হাত দেয়, তখন শুভার মুখে উচ্চারিত হয়, আছে?

 খাবার আছে।

সে ঘুরে দাঁড়ায়। আবার জিজ্ঞেস করে, তোমার খাওয়া হয়নি বোধ হয়?

শুভা ঘাড় নাড়ে। লোকটা বলে, না। মুখের খাবার খেতে চাই না। এমনি কিছু আছে? পাঁউরুটি, বিস্কুট, যাহোক, তা হলেই হবে।

ভাতই আছে।

 তোমার ভাত?

এমনিতেই শুভা হয়তো খেত না। খেলেও, বেশিই আছে। বলে, বেশি আছে।

বলতে বলতেই শুভা পাশের ঘরে গিয়ে, সংলগ্ন রান্নাঘরে, ভাত বেড়ে ফেলে। রান্নাঘরটা খুব ছোট নয়। নরেশের একলার মতো ব্যবস্থা সবই আছে। একপাশে খাবার টেবিল-চেয়ারও রয়েছে। সেই টেবিলের ওপরেই শুভা তাকে ভাত বেড়ে দেয়। আলুভাতে কাঁচালঙ্কা আর মাছের ঝাল।

লোকটা এক মুহূর্ত দেখেই, বসে পড়ে। শুভা ভেবেছিল, লোকটা বোধ হয় হাতটা ধোবে। সে সবের ধারেকাছেও নেই। সোজা ভাতে হাত দিয়ে খেতে আরম্ভ করে। মুখে ভাত নিয়ে বলে, অনেক দিন এত তরিবত করে খাওয়া হয়নি মাইরি। বাজারটা খারাপ যাচ্ছে কিনা, বিজনেস হচ্ছে না, টানাটানি চলছে।

বলে, বিশ্রীভাবে হেসে, চোখ কোঁচকায়। আবার বলে, রোজ শালা ভাল করে জুটছেই না।

শুভা কোনও জবাব দেয় না। লোকটার খাওয়া দেখতে থাকে। তিন থাবাতেই প্লেট খালি। তাতে শুভা একেবারে অনভ্যস্ত নয়। প্লেটে খাওয়া বা খাবার বেড়ে দেওয়া, কোনওটাতেই ও অভ্যস্ত নয়। কটা ভাতই বা প্লেটে ধরে? ও আবার ভাত দেয়। সে খেতে খেতে আবার বলে, তবে, কাজ হাসিল হয়ে যাবে। লেগে যাবে ঠিক কোথাও না কোথাও।

শুভা ভাবে, তার মানে চুরির দাঁও। অনেক দিন কোনও লকার সিন্দুক ভাঙতে পারেনি। ওর চোখের সামনে ভেসে উঠে পরশু রাত্রের সেই দৃশ্য। পালাবার সেই ভয়ংকর দৃশ্য। ও সেই কথা বলবার জন্যে, মুখ খোলবার আগেই, কলিংবেল বেজে ওঠে। ও থতিয়ে গিয়ে চমকে ওঠে। আর একজনেরও খাওয়া থেমে যায়। চকিতে উঠে দাঁড়ায়। দুজনেরই চোখাচোখি হয়।

একজনের চোখে কুটিল সন্দেহ। আর একজনের চোখে আতঙ্ক। শুভা ভাবে, কে হতে পারে এ সময়ে? বিহানীর আসবার সময় তো এখনও হয়নি। সে আসবে চারটের সময়।

লোকটার নিচু সন্দিগ্ধ তীক্ষ্ণ গলা শোনা যায়, কে?

আবার কলিংবেল বেজে ওঠে। শুভা আর দেরি করতে পারে না। সে চট করে রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে, দরজা টেনে বন্ধ করতে যায়। লোকটা হঠাৎ ফুঁসে ওঠে, না, আমাকে বন্ধ করা চলবে না।

শুভা অবাক হয়ে বলে, না করলে দেখে ফেলবে যে! আগে দেখি, কে।

 লোকটার বাঁ হাতে একটা স্প্রিং-এর ছুরি চিকচিক করে ওঠে। বলে ওঠে, কিন্তু যদি—

কলিংবেল আবার বেজে ওঠে। শুভা প্রায় ধমকে ওঠে, চুপ করে বসে থাকো। যা বলছি তাই করো, না হলে বিপদে পড়বে।

দরজাটা টেনে শিকল বন্ধ করে ও তাড়াতাড়ি দরজা খুলতে যায়। পাশের ঘরে গিয়ে, ছিটকিনি খুলে দেখে, নরেশের ড্রাইভার। শুভা মুখ চোখ স্বাভাবিক রাখবার চেষ্টা করে বলে, কী হল আবার?

ড্রাইভার বলে, ব্যাগটা আবার নিতে এলুম। আবার নিয়ে যেতে বললেন। ..

শুভা সরে দাঁড়ায়। ড্রাইভার যেখানে ব্যাগটা রেখেছিল, সেখান থেকে নিয়ে বেরিয়ে যায়। ও দরজাটা বন্ধ করে ফিরে আসে। ওর বুকের মধ্যে তখনও ধক ধক শব্দ হচ্ছে যেন। বুঝতে পারে, ব্যাগের মধ্যে এমন কিছু ছিল, যেটা কোনও কারণে হঠাৎ লুকোবার দরকার হয়েছিল। বিপদ কেটে গিয়েছে, তখনই আবার নিতে পাঠিয়েছে।

ও ফিরে এসে রান্নাঘরের শিকলটা খুলে, দরজা ঠেলতেই দেখে, লোকটা দরজার পাশেই দাঁড়িয়ে আছে। খাবার পড়ে আছে। দুজনের চোখাচোখি হয়। শুভা বলে, চলে গেছে।

কে?

নরেশবাবুর ড্রাইভার। একটা ব্যাগ নিতে এসেছিল।

লোকটা আর এক বার শুভার দিকে চেয়ে খেতে বসে। ভাত মুখে তুলে বলে, শালা, খেতে বসেও শান্তি নেই।

শুভার ঠোঁট দুটো আপনা থেকেই একটু বেঁকে ওঠে। বলে, এইসব যারা করে, তাদের কোথাও শান্তি আছে নাকি?

প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই লোকটা জবাব দেয়, যারা অন্য কিছু করে, তাদের বুঝি খুব শান্তি আছে?

কথাটার কোনও জবাব দিতে পারে না শুভা। প্লেট খালি দেখে ও আবার ভাত দেয়। সে আবার বলে, ও সব শান্তি-টান্তি দুনিয়া থেকে হাওয়া হয়ে গেছে। খালি লড়াই আর লড়াই। একটু কাই পাওয়া যাবে?

শুভার লজ্জা করে ওঠে। লোকটা শুকনো ভাত খাচ্ছে, লক্ষই করেনি। তাড়াতাড়ি মাছের সব ঝোলটা ঢেলে দেয়। এখনও ওর মধ্যে, পাড়াগাঁ মফস্বলের, সেই ইস্কুল মাস্টারের মেয়েটাই আছে। কাকে খেতে দিচ্ছে, সেটা মনে থাকে না। খেতে দিয়ে, লক্ষ না রাখতে পারলে, এখনও লজ্জা পায়।

যে খায়, তার ও সব নেই। পাওয়া গিয়েছে, খেয়ে নিচ্ছে। শুভা ওর খাওয়া দেখতে দেখতে বলে, সে লড়াইয়ের নমুনা তো সেদিন রাত্রে দেখলাম। ওভাবে যে পাইপ বেয়ে যাচ্ছিলে, যদি নীচে পড়ে যেতে?

তুমি দেখেছিলে নাকি?

 হ্যাঁ।

কী আবার হত, মাংস তালগোল পাকিয়ে যেত। যতক্ষণ শ্বাস, ততক্ষণ আশ, আবার কী। মরার বাড়া তো কিছু নেই।

শুভার গায়ের মধ্যে শিউরে ওঠে। কোনও কথা বলে না। লোকটা আবার বলে, 

রিক্স না নিলে চলে? কেল্লা ফতে হোক বা না হোক। রিক্স বাবা সবাইকেই নিতে হয়। তুমিও তো নিয়েছিলে, বাড়ি থেকে পালিয়ে। ফসকে গেল তাই।

বলতে বলতে লোকটা শুভার দিকে একবার তাকায়। ঠোঁটের কোণে হাসি। শুভার মুখ গম্ভীর হয়ে ওঠে। লোকটাকে এখন ওর বিশ্রী লাগে। ওর মনে মনে রাগ হতে থাকে। একটা চোরের মুখে এ সব শুনতে চায় না ও।

লোকটা খাওয়া শেষ করে উঠে পড়ে। কোণের দিকে, কল খুলে মুখ ধোয়। পকেট থেকে একটা চিটচিটে ময়লা রুমাল বের করে মুখ মুছে ঢেঁকুর তোলে। তারপরে পকেট থেকে সস্তা সিগারেট বের করে জিজ্ঞেস করে, ম্যাচিস আছে?

শুভা তাক থেকে দেশলাই নিয়ে টেবিলের ওপর দেয়। নিজের হাতটা কলে ধুয়ে নেয়। ওর মেজাজ রীতিমতো বিগড়ে গিয়েছে।

লোকটা সিগারেট ধরিয়ে আরামসূচক শব্দ করে। দেশলাইটা পকেটেই রাখে। তারপর ঘরে এসে খাটের ওপর বসে বলে, সেদিন তোমার ওই নরেশকে আমি আর একটু হলেই ঝেড়ে দিতাম।

মানে?

ঘুষি পাকিয়ে বলে, হাঁকতাম।

কেন?

তোমাকে, আমার সামনেই ও যদি যা-তা আরম্ভ করত, মানে কামড়ে ছিঁড়ে যদি কিছু করত, তা হলে মারতাম।

কেন, তোমার তাতে কী?

আমার আবার কী। এক-এক সময় হয় না, ব্যাপার দেখলে, মেজাজ ঠিক রাখা যায় না। তখন তোমাকে দেখে নরেশের ওপর রাগ হচ্ছিল। একটা মেয়েকে বাগে পেয়ে ঘরের মধ্যে দরজা বন্ধ করে, মাল খেয়ে এসে–শালা!

গালি দিয়েই সে থেমে যায়। সিগারেটের ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে মুখ শক্ত করে। আবার বলে, তখন তোমাকে ভালই মনে হচ্ছিল। মানে তুমি যে ওর কেউ নও, একটা ভাল মেয়ে বেকায়দায় পড়েছ, তখন মনে হচ্ছিল।

কথাগুলো যে যথেষ্ট মনোযোগ দিয়ে বলছে, ওকে দেখে তা মনে হয় না। যেন নিজের মনেই বকবক করছে। এর মধ্যেই, এক বার আস্তে একটু শিস দিল। শুভার ইচ্ছে করল, জিজ্ঞেস করে, এখন কী মনে হচ্ছে ওকে? এখন কি খারাপ মেয়ে মনে হচ্ছে?

তবে নরেশ তোমাকে ছাড়বে না।

বলতে বলতে ও হঠাৎ উঠে দাঁড়ায়। বলে, যা দেখলাম সেদিন, ও তো একটা ডালকুত্তা। কাল রাত্রেই গোলমাল করে দেয়নি তো?

বলে, এমন বিশ্রী চোখে তাকায়, শুভার মনটা আবার দপ করে জ্বলে ওঠে। বলে ওঠে, দিলেই বা, তোমার কী?

লোকটা বাইরের ঘরের দিকে যেতে যেতে বলে, আমার আবার কী! দেখে শুনে যা মনে হল, তা-ই বলছি। ও তোমাকে খেয়ে ফেলে দেবে।

দিক। তুমি যাও এখন।

সে কথায় যেন লোকটার কানই নেই। বলে, তোমার সেই কী, তারকাটি কি সত্যি আর কোনওদিন আসবে, যার সঙ্গে বাড়ি থেকে পালিয়েছ?

আসুক বা না-আসুক, তাতেই বা তোমার কী?

কতকগুলো লোচ্চা বাটপাড়ের পাল্লায় পড়েছ, তা-ই বলছি।

ভূতের মুখে রাম নাম! চোরের আবার বড় বড় কথা! তুমিই বা কী? বেরোও, বেরিয়ে যাও এখান থেকে।

শুভার দু চোখ ধক ধক জ্বলে। ফুঁসে ফুঁসে ওঠে। লোকটা নরেশের আয়রন সেফের কাছে দাঁড়ায়। বলে, বেরিয়ে যাব না তো কি তোমার বাবুর ঘরে থাকব? তুমি যা মেয়ে, ঠিক জায়গাতেই এসে পড়েছ। তা নইলে আর জোচ্চোরের সঙ্গে বাড়ি থেকে পালিয়েছ?

তুমি যাবে কি না?

শুভা এত জোরে চেঁচিয়ে ওঠে যে, শুধু লোকটাই নয়, শুভা নিজেও চমকে ওঠে। তবু ও থামতে পারে না। আবার তেমনি গলাতেই বলে, তুমি না গেলে, আমি চেঁচিয়ে তোক ডাকব। নীচে দারোয়ানকে ডাকব।

লোকটা হঠাৎ ওর কাছে চলে আসে। চিবিয়ে চিবিয়ে বলে, তার আগে তোমার গলা টিপে শেষ করে দেব। চুপ!

শুভা সত্যি চেঁচিয়ে ওঠে, না, আমি চুপ—

কথা শেষ করবার আগেই, ওর মুখে শক্ত থাবা চেপে বসে। একটা শক্ত থাবা মুখে চেপে বসে, আর একটা থাবা ঘাড়ের কাছে চেপে ধরে। চাপা গলায় শাসানি শোনা যায়। চুপ বলছি।

শুভা হাত দিয়ে মুখের থাবাটা খুলতে চেষ্টা করে। পারে না। জোর করে সরে যাবার চেষ্টা করে। তাও পারে না। আস্তে আস্তে শান্ত হয়ে আসে। মুখের থাবাটাও সরে যায়। কিন্তু ঘাড়ের হাতটা তখনও সরে না দেখে, ঘাড় ফেরাবার চেষ্টা করে, লোকটার মুখ দেখবার চেষ্টা করে। তৎক্ষণাৎ লোকটার মুখটাকে ও ওর নিজের মুখের সামনেই দেখতে পায়। তার গরম নিশ্বাস ওর মুখে লাগে। তার চোখে তীক্ষ্ণ ক্রুদ্ধ দৃষ্টি। কী করবে লোকটা? কী চায়?

সহসা যেন পাথর হয়ে যায় শুভা। নড়তে চড়তে পারে না। ওর শিরদাঁড়ার কাছে, সেই ভয়ের কাঁপুনিটা যেন আবার অনুভব করে। আর ঠিক তখনই লোকটা ওকে ছেড়ে দিয়ে সরে যায়। ঠিক যেন একটা রাগি ছেলে, এমনি ভাবে, ক্রুদ্ধ চোখে চেয়ে, নাকের পাটা ফুলিয়ে কপালের চুলগুলো হাত দিয়ে সরায়। বলে, দুটো খেতে দিয়েছ তাই ছেড়ে দিলাম। বলো তো পয়সাও দিয়ে দিতে পারি। হীরা সরকারের এখনও এত পোকা-পড়া অবস্থা হয়নি, বুঝলে?

শুভা চুপ করে থাকে, কোনও কথা বলে না। লোকটাকে ওর এখন একটা রাগি বোকা ছেলের মতো লাগছে। কেন, ও তা নিজেও জানে না। ও যে রকম ভয়ংকর একটা কিছু আশঙ্কা করেছিল, সে রকম ঘটল না বলেই বোধ হয় এ রকম মনে হয়। এবং এই প্রথম ও লোকটার নাম শোনে, হীরা সরকার। হীরা কি পুরুষের নামও হয় নাকি? হবে হয়তো, হীরালাল বা ওইরকম কিছু। কিন্তু শুভা হীরা নামে একটা মেয়েকে, ওদের দেশে চিনত।

হীরা পকেট থেকে একটা চিরুনি বের করে মাথা আঁচড়াতে আঁচড়াতে আবার বলে, এত দিন ধরে বিজনেস নেই, তবু এত চোরাই টাকা থাকতেও ছেড়ে দিলাম, আবার বড় বড় কথা! আমিও দেখব, ওই তারকদাটি গেছে, এবার নরেশ মাক্ষীচুসের পাল্লায় পড়তে কত দিন লাগে। তারপরে কত পাল্লাতেই পড়তে হবে। তখন কোথায় এ সব বুকনি থাকে ছুকরির, দেখে নেব।

বলতে বলতে সে দরজার কাছে চলে যায়। আর শুভা অবাক হয়ে মনে মনে ভাবে, ওর যাই হোক, এ লোকটার তাতে কী যায় আসে। হীরা তো একটা চোর। ওর যন্ত্র ফিরে পেয়েছে, খেতে পায়নি, খেতে চেয়েছে, শুভা দিয়েছে। শুভার নিজের ভাতও খেয়ে নিয়েছে। এখন শুভকে নিয়ে ওর মাথাব্যথা কীসের! তারকা আসবে কি না, নরেশ কিছু করেছে কি না, সে খোঁজ নিয়ে ওর কী হবে। আর জিজ্ঞেস করার যা ছিরি, তাতে যে কোনও মেয়েরই খারাপ লাগবে।

অবশ্যি ওর কাছে ভাল-মন্দর আশাই বা কী থাকতে পারে? হীরা যে ওকে কী চোখে দেখছে, সে তো হীরার কথাবার্তা ভাব-ভঙ্গিতে বোঝা যাচ্ছে। শুভা একটা নোংরা খারাপ মেয়ে, জোচ্চোর লোচ্চাদের সঙ্গে বাড়ি থেকে পালিয়ে আসে, থাকে। আর ও নিজে যে একটা চোর, সে কথা যেন ভুলেই যাচ্ছে। শুভকে নোংরা খারাপ ভাববার লোকের অভাব নেই সমাজে। এ কেন, এই হীরা সরকার, নাকি তালাগুনিন, যে-ই হোক।

ছিটকিনি খোলার শব্দে শুভা দরজার দিকে ফিরে চায়। হীরা শক্ত মুখে তাকিয়ে, বুড়োআঙুল দেখিয়ে বলে, আমার কাঁচকলা, তুমি মরোগে। কিন্তু আমি এসেছিলাম, লকার খুলেছিলাম, এ সব যদি বলে দাও, তা হলে তোমাদের কারুরই ভাল হবে না বলে দিলাম। তারপরে আমার পেছনে ফেউয়ের মতো পুলিশ লেগে থাকবে। মালকড়িও হাতালাম না, ও সব ঝুট ঝামেলা আমার ভাল লাগে না।

বলেই সে দরজাটা খুলে বেরিয়ে যায়। শুভা তেমনি এক জায়গায় চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে। তারপরে ও যেন আস্তে আস্তে অবাক হয়ে, নরেশের স্টিল সেফের দিকে চায়। সত্যি নোকটা টাকা নিল না। শুভকেও কোনওরকম শারীরিক আঘাত বা অপমান করল না। মানুষের লোভের ক্ষেত্রে, এ ঘটনাকে, শুভা ওর অভিজ্ঞতার সঙ্গে মেলাতে পারে না। অথচ লোকটা একটা চোর। মানুষের টাকার আকাঙ্ক্ষা, তার জন্যে অন্যায়, ছেলেবেলা থেকে দেখে এসেছে। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দেখেছে, মেয়েদের প্রতি পুরুষদের লোভের নীচতা। কলকাতায় এসে তার ভয়াবহ রূপ দেখেছে। এখন সেই পরিবেশই ওর বাস। তার কোনওটার সঙ্গে এ ঘটনা মেলাতে পারে না।

পূর্বাপর, সমস্ত ঘটনাই আবার ওর মনে পড়তে থাকে। হীরা সরকার নামক একটা চোরের কথা ভেবে, ও যেন কোনও কিছুরই থৈ পায় না। তারপর এক সময়ে, সামান্য বাতাসে দরজাটা নড়ে উঠতে খেয়াল হয়, দরজাটা খোলা রয়েছে। ও দরজাটা বন্ধ করে দিয়ে, ভিতরের ঘরে গিয়ে, রান্নাঘরের সামনে এসে দাঁড়ায়। এঁটো থালাবাসনের দিকে তাকিয়ে দেখে। লোকটা সত্যি খেয়ে গিয়েছে। লোকটাকে নিজের হাতে শুভা খাইয়েছে।

কেন যেন, শুভার সমস্ত মন জুড়ে সহসা ছায়ার মতো, অন্ধকার ঘনিয়ে আসে একটা অচেনা-অজানা কষ্টে, ওর চোখে জল এসে পড়ে। খাটের উপর এসে, হাঁটুতে মুখ গুঁজে বসে। নিজের খাওয়ার কথা ওর আর মনে থাকে না।

বিকালে বিহানী আসে। শুভকে ঠাট্টা করে বলে, তবে যে মেমসাহেব বলেছিল রান্নাই করবে না। আজ তো দেখা যাচ্ছে একটু কিছু খাবার পড়ে নেই, সব খাওয়া হয়ে গিয়েছে। শুভা উপবাসী মুখ তুলে, বিহানীর দিকে চেয়ে হাসে। বলে, এত খেয়েও ওর খিদে যায়নি। এখন আবার একটু চা রুটি খাবে। বিহানী বলে, সে-ই তো ভাল। মেমসাহেবের শরীর ভাল হবে।

বিহানী চলে যায়। আবার আবার সেই রাত্রের প্রতীক্ষা। সে-ই ভয়ংকর রাত! তবু, সন্ধ্যা রাত্রে বারে বারেই শুভা চমকে উঠেছে। যেন ও কোনও শব্দের জন্যে উত্তর্ণ। কিন্তু রাত গড়িয়ে যায়। কোনও শব্দই হয় না। তারপরে থাকে শুধু মধ্যরাত্রের সেই কুৎসিত আক্রমণ আর আত্মরক্ষার প্রতীক্ষা।…

.

পরদিন বিকালে বিহানী এসে চলে যাবার পরে, শুভা সমস্ত বাতি নিবিয়ে অন্ধকার করে দেয়। কতক্ষণ চুপ করে জানালার ধারে দাঁড়িয়ে থাকে, নিজেরই খেয়াল থাকে না। আজ ও অন্যদিকের জানালা খুলে, হোটেলের নামে, সেই মেয়েদের বাড়িটার দিকে চেয়ে থাকে। মাঝে মাঝে, এক-একটা অদ্ভুত দৃশ্য ভেসে ওঠে। কখনও নগ্ন মেয়ে, নগ্ন পুরুষ আলাদা আলাদা। কখনও আলিঙ্গনাবদ্ধ। পান ভোজন আদিম রিপুর নানা লীলা, হঠাৎ হঠাৎ এ জানালায়, ও দরজায় ভেসে ওঠে, আবার ঢাকা পড়ে যায়। ও বাড়িটা, এদিকের অংশটাকে ভয় পায় না। ভয় হয়তো কোনও কারণেই পায় না। তবু আড়ালে রাখার যে একটা সাবধানতা আছে বা দেহব্যবসারও যে একটা গোপনীয়তা আছে, এদিক সম্পর্কে সেই সচেতনতাও যেন নেই।

শুভা ভাবে, ওরা কি সত্যি খুব দুঃখী। ওরাও হয়তো অনেকেই একদা শুভার মতো কুমারী ছিল। বাপ মা ভাই বোন ছিল। কেউ হয়তো বিবাহিতা, যে স্বামী ছাড়া কিছুই জানত না। কিন্তু সব ছেড়েই তো ওরা এসেছে এখানে। ওরা এমনকী ভিন্ন ধাতু দিয়ে গড়া, ওরা যা পারে, শুভা তা পারে না! আসলে শুভা হয়তো মিথ্যে ভয় পায়।

মিথ্যে ভয়। শুধু কি তাই! ভয় তো আছেই এবং তা মিথ্যা ভয়ও নয়। তার সঙ্গেও আরও অনেক বাধা, বীভৎস চিন্তা ওকে যেন শিউরে তোলে। অথচ, ওই বাড়িটার কোনও কোনও দৃশ্য, ওর রক্তের মধ্যে একটা উত্তেজনাও এনে দেয়। ওর রক্ত-মাংসের শরীরের মধ্যে, একটা সুপ্ত বাসনা আপনা থেকেই জেগে ওঠে। ওর মনকে অসুস্থ করে, ধিক্কার দিতে ইচ্ছা করে। শেষ পর্যন্ত বিষণ্ণ করে তোেল।

শুভা জানালার কাছ থেকে সরে আসতে যায়। তখনই কলিংবেল বেজে ওঠে। শুভা থমকে যায়। একটু থেমে আবার বেল বেজে ওঠে। শুভা যেন যন্ত্রচালিতের মতো এ ঘরের বাতি জ্বালায়। সামনের ঘরের বাতি জ্বালিয়ে দিয়ে দরজার ছিটকিনিটা খুলে দেয়।

হীরা ঢোকে। ঢুকেই দরজাটা বন্ধ করে দেয়। ওর হাতে কীসের একটা ছোট্ট প্যাকেট। প্রথমেই বলে, এসে পড়লাম। রাগ হচ্ছে না তো?

বলেই ও যেন চমকে ওঠে। বলে ওঠে, আরে, গালে কীসের দাগ? কেটে গেল কী করে?

এমন পরিচিতের মতো কথা বলে, যেন ওর নিজের পরিচয়টাও ভুলে গিয়েছে। শুভার অনেকখানি কাছে এসে বলে, নিশ্চয় নরেশের কীর্তি? ছুরি-টুরি চালিয়েছিল নাকি?

শুভা বলে, না। কিন্তু তুমি কী মনে করে?

আমি?

হীরা ঠোঁট বাঁকিয়ে হাত উলটে বলে, আমি কাজেই বেরিয়েছি। ভাবলাম, তোমার সঙ্গে একটু দেখা করে যাই। আর একটু ইয়ে নিয়ে এলাম–মানে খাবার। তুমি কাল আমাকে খাওয়ালে। আমিও একটু নিয়ে এলাম।

শুভা অবাক হয়ে লোকটার মুখের দিকে চেয়ে থাকে। শুভার জন্য খাবার নিয়ে এসেছে। হীরা আবার বলে, আর দেখেও মনে হচ্ছে, আজ সারাদিন খাওয়া হয়নি। কালও হয়নি। দুপুরেরটা তো আমিই সেঁটে গেছি। রাত্রে তো নরেশ খুবই খাইয়েছে। কিন্তু কী দিয়ে মারল বলো তো?

বলে, খাবারের প্যাকেটটা খাটের কাছে টেবিলের ওপর রেখে, চেয়ারে পা ছড়িয়ে বসে। যেন ব্যাপারটা খুবই স্বাভাবিক। ওর নির্বিকারত্বও তেমনি।

শুভা বলে, নরেশের ঘড়ির সোনার ব্যান্ডে লেগেছে।

 তার মানেই শালা হাত চালিয়েছিল। এবার একদিন মটকে দেব ওর সোনার ঘড়ি পরা হাতের কব্জি। হীরা শক্ত মুখে বলে।

শুভা বলে, কেন, তুমি ওর হাতের কবজি ভাঙবে কেন?

ও মারবে কেন?

তোমাকে তো মারেনি। তোমার কী?

আমার আবার কী, আমার কিছুই না। কিন্তু হাতে পেয়ে একটা মেয়েকে এরকম করবে কেন?

তুমি ওকে মারলে, আমার কী হবে?

 হীরা কোনও জবাব দিতে পারে না। তারপরে হঠাৎ প্রায় খেঁকিয়ে ওঠে, তোমার কী হবে, তা আমি কী জানি!

শুভা না-হেসে পারে না। এবং হেসে ও নিজেই অবাক হয়। সত্যি, এখনও ওর হাসি আছে তা হলে। এখনও হাসি পায়। কিন্তু হীরার রাগের ভঙ্গি আর কথা শুনলে না-হেসেও পারা যায় না। অথচ ওর দুর্গতি দেখে একটা ছেলে রেগে উঠছে দেখে শুভার ভিতরে একটা খুশির ভাবই শুধু আসে না, চোখ দিয়ে জল এসে পড়তে চায়।

গতকাল রাত্রে নরেশের সঙ্গে রীতিমতো হাতাহাতি হয়েছে। নরেশ ওকে মারতে পর্যন্ত দ্বিধা করেনি। যেদিন থেকে নরেশ শুভকে পাবার সংকল্প করেছে, সেদিন থেকেই সে সব কিছু করতেই প্রস্তুত, প্রয়োজনবোধে শুধু মারা না, তার চেয়ে বেশি কিছু করতেও রাজি। বিশেষ, মদ খেয়ে যখন আসে, তখন সে একেবারে বেপরোয়া পশু।

নরেশ গত রাত্রে শুভার মুখে ঘুষি মারবার জন্যেই হাতটা তুলেছিল। শুভা চকিতে সরে যাবার সময়, খুব জোরে ঘড়ির ব্যান্ড গালে ঘষে গিয়েছিল। শুভাও অন্ধের মতো নরেশের টেবিলের ওপর থেকে স্টিলের কলম আর পেন্সিল রাখবার পাত্রটা সজোরে ছুঁড়ে মেরেছিল। নরেশের গায়ে সেটা লাগেনি। কিন্তু শুভার গালে রক্ত দেখে সে একটু থমকে গিয়েছিল। সেই ফাঁকেই শুভা পাশের ঘরে ছুটে গিয়েছিল। তাও ওর একমুঠো চুল অন্তত নরেশের হাতে থেকে গিয়েছিল। দরজা বন্ধ করে দেবার পরে, অনেকক্ষণ ধরে দরজা ধাক্কা দিয়ে, আঁচড়ে, চিৎকার করেছে নরেশ।

গতকাল শুভা খায়নি, তবু বিহানীর কথায় রান্না করেছিল। আজ তাও করেনি। আজ মনস্থির করতে ওর সারাদিন গিয়েছে। তাই আজও নরেশের সঙ্গে ওকে মোকাবিলা করতে হবে। আগামীকাল সকালে, যেমন করে তোক হাওড়ায় গিয়ে, বাড়ি ফিরে যাবেই। এই ওর শেষ সিদ্ধান্ত। আত্মহত্যা যদি করতে হয় তবে সেখানে গিয়েই। তবু এক বার সবাইকে দেখতে পাবে। রাগ করুক ঘৃণা করুক, তাড়িয়ে দিক, মারুক-ধরুক তবু তো এক বার সবাইকে দেখতে পাবে। সবাইকে দেখে মরতে পারবে।

কিন্তু শুভার মনটা বিস্ময়ে ভরে যায় হীরার কথা শুনে। পৃথিবীতে এখনও যে ওর জন্যে কারুর করুণা হয়, ওর প্রতি অত্যাচারে কারুর রাগ হয়, এটা যেন বিশ্বাস করতে পারে না। শুধু তা-ই নয়, এখনও ওর মুখের দিকে চেয়ে কেউ যে ওর উপবাসের কথা ভাবে, বিশ্বাস করা যায় না। আর সে লোকটা একটা চোর। গতকাল চেয়ে খেয়ে গিয়েছিল বলে, সেই লোক আবার আজ হাতে করে খাবার নিয়ে এসেছে। কী অদ্ভুত ভাগ্য শুভার। হাসতে গেলে, রেগে নিজেকেই ধিক্কার দিতে ইচ্ছা করে। ধিক্কার দিতে গিয়ে কান্না পায়।

হয়তো এ মানুষ, আর দশ জনের মতো গলা নরম করে, মিষ্টি করে কথা বলতে পারে না। লোকটার ভিতরে আরও নিগূঢ় শয়তানি কিছু আছে কি না কে জানে। আপাতত, এ অবস্থায়, লোকটাকে কেন যেন খারাপ ভাবা যায় না কিছুতেই। বরং অনেক মানুষের থেকে, অনেক বেশি অন্য মানুষ বলে মনে হয়। এখন বুঝতে পারে শুভা, এ লোকটা আসুক, মনে মনে যেন এরকম ও চেয়েছিল। অন্য কোনও কিছুর জন্যে নয়, তবু একটা লোকের সঙ্গে ভয়ে রাগে সন্দেহে কথা বলা যায়। এমনকী ঝগড়াও করা যায়। অথচ সে কোনও ক্ষতিই করে যায় না।

হীরা আবার বলে, তবে আমি ভালভাবেই জানি, নরেশ তোমাকে ছাড়বে না।

 তার জন্যে আমি আর ভাবি না। কাল সকালেই আমি বাড়ি চলে যাব।

 হীরা অবাক হয়ে বলে, বাড়ি মানে তোমাদের দেশে?

হ্যাঁ।

তাড়িয়ে দেবে না? তুমি তো পালিয়েছিলে।

তাড়িয়ে দিক, তারপরে মরব। তবু তো সবাইকে দেখে মরতে পারব।

 হীরা হাঁ করে কয়েক মুহূর্ত চেয়ে থেকে বলে, যাঃ বাবা! দেখে যাবে, সবাইকে দেখে তারপরে মরে যাবে?

আগাগোড়া ব্যাপারটা সে হৃদয়ঙ্গমই করতে পারে না যেন। তারপরে হাত উলটে দিয়ে বলে, কী জানি বাবা, তোমাদের সব ব্যাপারই আলাদা। আমি ও সব বুঝি না।

হীরার মুখ দেখে, এমন দুঃসময়ে দুঃখেও, আবার হাসি পায়। হীরা শেষ পর্যন্ত এর একমাত্র উপায় হিসাবে বলে, বড্ড শীত করছে, একটু চা খাওয়াবে?

শুভা বলে, দেব।

হ্যাঁ, সেই ভাল। যে যার নিজের কাজ কর বাবা। তুমি মরতে যাও আমি আমার কাজে যাই, ফুরিয়ে গেল ল্যাটা।

তোমার কাজে যাওয়াও তো মরতে যাওয়াই।

তা মানুষের কখন মরণ আছে কেউ বলতে পারে?

তুমি মরতে যাও জেনেশুনে।

হীরা কোনও জবাব দেয় না। শুভা আবার বলে, এতে সুখ কীসের? অন্য কোনও কাজ করতে পার না?

তুমিই বা তারকার সঙ্গে পালাতে গেলে কেন? বাড়ি থেকে বিয়ে দিত না?

শুভা থমকে যায়। হীরার দিকে চেয়ে আজ তার রাগ হয় না। ওর উপবাসী ক্লান্ত বিষণ্ণ মুখে, লাল লম্বা কাটা ক্ষতের চিহ্ন যেন সমস্ত মুখটাকে বদলে দিয়েছে। বলে, যদি দিত, কোনও আশা থাকত, তবে কি এই ছলনায় ভুলি?

আমারও তাই ভাবনা, কেন। পরের সিন্দুক ভাঙতে কি আর এমনি শিখেছি? আপনি বাঁচলে বাপের নাম। কিছু না হোক ভাত তো জুটবে।

শুভা বলে ওঠে, না তো, মাংসের দলা পাকিয়েও মরা যাবে।

তা হলে তো সব ল্যাটাই চুকে যায়।

শুভা কয়েক মুহূর্ত হীরার মুখের দিকে চেয়ে থেকে বলে, কিন্তু আমার সঙ্গে তোমার তুলনা চলে না। আমি মেয়ে, তুমি পুরুষমানুষ।

হীরা অদ্ভুতভাবে ঘাড় দুলিয়ে হাত নেড়ে বলে, তবে আর কী, পুরুষ হলে দশটা হাত-পা বেশি গজায়।

তোমাদের কত সুযোগ-সুবিধা।

 ও সব ছেদো কথা ছাড়ো দিকিনি। সুযোগ-সুবিধেই যদি থাকবে তা হলে লোকের আর কষ্ট থাকত না। দেখছি তো, চারদিকে সুযোগ-সুবিধের ছড়াছড়ি!

তারপরে হঠাৎ উঠে দাঁড়িয়ে বলে, যাকগে, ও সব বলতে আমার ভাল লাগে না। জীবনে সুযোগ সুবিধের পেছনে অনেক ঘুরেছি। যাদের ষোলো বছর বয়স থেকে পেটের ধান্দায় ঘুরতে হয় তাদের আর ও সব শেখাতে হবে না। তার ওপরে যদি আবার কাঁড়িখানেক ভাই-বোন থাকে। সুযোগ-সুবিধে কাকে বলে, তা আর জানি না? টাকা থাকলে, ফেরববাজি বদমাইশি কালোবাজারি ফাটকা, এই যা সব করে তোমার নরেশ, সে সব সুযোগ-সুবিধে থাকলেও কাজ হয়। আর আমি না হয় তালা ভাঙি। তা বলে, আমি কুলিগিরি করতে পারব না।

শুভা বলে, চুরির থেকে, তাও ভাল।

হীরা হঠাৎ ভুরু কুঁচকে চায়। মুখটা শক্ত দেখায়। বলে, এই দ্যাখ, তোমার বক্তিমে শুনিও না মাইরি আমাকে। ও সব আমি অনেক শুনেছি। আরে বাবা, কিছু না হোক ক্লাস টেন পর্যন্ত তো পড়েছি। তারপরে বাবা মরে গেল বলে, আর হল না। কুলিগিরি করব কেন। যত হেঁজিপেজি মাল, হাজার দু হাজার টাকা লুটবে, আর আমি কুলিগিরি করব? চাকরির ব্যাপার আমার জানতে বাকি নেই, ওখানে কী হয়, সব জানি।

কী আবার হবে। তুমি একটা চাকরি জোগাড় করতে পারবে না?

যখন দরকার ছিল, তখন পারিনি। এখন আর ও সব হবে না।

 কেন?

হীরা বিরক্ত ক্রুদ্ধ মুখে তাকায়। বলে ওঠে, ধুত্তোরি তোর নিকুচি করেছে, এ দেখছি একেবারে গোঁসাই ঠাকরুন। বেশ্যাকে সতী না করে ছাড়বে না। আমি এখন একটা চোর, বুঝেছ? একটা চোর! ষোলো বছর বয়স থেকে বাইশ বছর পর্যন্ত মরতে মরতে চেষ্টা করেছি, তারপরে আমি আমার পথ পেয়েছি। এবার তুমি বকবক কর, আমি চললাম। আজ আমার রাত্রের যাত্রাটাই খারাপ।

সত্যি সে দরজার দিকে যায় দেখে শুভা বলে ওঠে, চা খাবে না?

 কোথায় আর দিচ্ছ, খালি তো ঠাকুরালি হচ্ছে।

শুভা ভিতরের ঘরের দিকে চলে যায়। লোকটার কথাবার্তা ওর খুব অদ্ভুত লাগে। ওর অনেকগুলো ভাই-বোনও আছে। কথাবার্তা ঠিক চোরের মতোও নয়। কিন্তু পথ পেয়েছি মানে কী। চুরি কি কারুর পথ হতে পারে। তাই যদি হয়, সে পথই বা তারা পায় কেমন করে। হিটার জ্বেলে চায়ের জল গরম করতে করতে, ওর এ সব মনে হতে থাকে।

শুভা!

শুভার বুকের মধ্যে একেবারে ধক করে উঠে। পুরুষের গলায় এরকম ডাক ও বহু কাল শোনেনি। নরেশের ডাক আলাদা। অনেক দিন পরে যেন একটা সুস্থ পরিচ্ছন্ন গলায় নিজের নামটা শুনতে পেল। পিছন ফিরে দেখে, হীরা দাঁড়িয়ে। হাতে খাবারের প্যাকেট। সে বলে, এটার কথা ভুলেই গেছলাম।

আর তুমিও সত্যি খাওনি, দেখেই বোঝা যাচ্ছে। এটা খেয়ে নাও, মাংসের রোল আছে।

শুভা ওর চমকানোটা কাটিয়ে, অবাক হয়ে বলে, রোল?

হ্যাঁ, ওই আর কী পরোটা মাংস মেশানো।

কীসের মাংস?

খাসির।

একটু যেন আশ্বস্ত হয় শুভা। তবু বলে, তুমি খাও না, আমার দরকার নেই।

 খুব দরকার আছে। আরে বাবা চোর হতে পারি, নজরটা তো খাইনি। দরকার আছে কি না, তা তো দেখতেই পাচ্ছি।

বলতে বলতে হীরা একেবারে রান্নাঘরে ঢুকে পড়ে। টেবিলের ওপর খাবারের প্যাকেটটা রেখে, শুভার দিকে তাকায়। শুভা তার খুব কাছেই দাঁড়িয়ে। হীরা শুভার গালের ক্ষতের দিকে তাকিয়ে হঠাৎ একেবারে গালে হাত দিয়ে বলে, দেখি।

শুভা মনে মনে ভীষণ চমকে যায়, শরীরটা শক্ত হয়ে ওঠে। কিন্তু এত সহজ আর স্বাভাবিকভাবে হীরা হাত দিয়ে গাল ফিরিয়ে ক্ষতটা দেখতে থাকে, প্রতিবাদ করাও যায় না। অথচ মনে মনে অবিশ্বাস, সংকোচ, ভয় সবই আছে।

গালটা ছেড়ে দিয়ে, এক পা সরে যায় হীরা তার মুখটা শক্ত হয়ে ওঠে। চোখের দৃষ্টি কঠিন। বলে, আমি হলে, শালার দুটো গালের মাংস ঝুলিয়ে দিতাম।

শুভা ততক্ষণে হীরার দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে গরম জলে চা ঢালে। কিন্তু ওর মুখে একটা লাল ছোপ পড়ে গিয়েছে ইতিমধ্যে। হীরার আচরণটা হয়তো খুবই সহজ। শুভা যেন লজ্জায় কেমন গুটিয়ে যায়। অথচ একটা রাগ রাগ ভাবও যেন ভিতরে বিচিত্র অনুভূতির সৃষ্টি করে। সেই সঙ্গেই, ওর মনে হয়, গালে যেন হীরার হাতের স্পর্শটা লেগেই আছে। ভারী সাহস তো ছেলেটার। অসভ্য। এ কথা মনে মনে বলে ওঠে শুভা। ওর মুখ গম্ভীর হয়ে ওঠে।

কিন্তু যার সম্পর্কে শুভা এ সব ভাবে, সে তখন রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে গিয়ে, শুভার খাটে বসে বলতে থাকে, কিন্তু এভাবে তো চলতে পারে না। আর কদিন চালাবে তুমি এভাবে। নরেশ তো কুকুরের মতো খেপে আছে। অবিশ্যি, আমার কিছু নয়, আমার আর কী। একটা খুনখারাপি হয়ে যাবে কখন…।

তার কথা শেষ হবার আগেই, শুভা চায়ের কাপ বাড়িয়ে দেয়। হীরা অবাক হয়ে বলে, কী হল?

কী হবে?

তোমার মুখটা কী রকম রাগ রাগ দেখাচ্ছে।

শুভা গম্ভীরভাবেই বলে, তোমাকে বাজে কথা কে বকবক করতে বলেছে। আমি তো বললামই, কাল সকালে আমি বাড়ি চলে যাব।

হীরার যেন হঠাৎ মনে পড়ে যায়। বলে ওঠে, ও হ্যাঁ হ্যাঁ, তুমি তো দেশে গিয়ে, তারপরে মরবে। ভুলেই গেছলাম।

শুভা ভুরু কুঁচকে তাকায় হীরার দিকে। হীরা খুব স্বাভাবিক মুখেই চায়ের কাপে চুমুক দেয়।

মনে হয় না যে, কথাটা কোনওরকম বিদ্রূপ করে বলেছে। সে চায়ের কাপ নিয়ে উঠে, পাশের ঘরে যেতে যেতে বলে, অদ্ভুত ব্যাপার বাবা, এ রকম যে কেউ করতে পারে, ভাবতেই পারি না, মাইরি।

হঠাৎ ঘুরে দাঁড়িয়ে বলে, আচ্ছা সত্যি বলছ, তুমি দেশে গিয়ে বাবা মাকে দেখে, তারপরে সুইসাইড করবে?

শুভা জবাব দিতে গিয়ে, অবাক হয়ে দেখে, হীরার মুখে একটা গভীর উদ্বেগ আর বিস্ময়। হীরার মুখ দেখে, বিষয়টা শুভার যেন নতুন করে মনে হয়। নিজেকেই মনে মনে প্রশ্ন করে, সত্যি কি আমি তা পারব? একটু আগেই ওর মনের মধ্যে, লজ্জার সঙ্গেই যে বিরূপতা এসেছিল, তা কেটে যায়। বলে, তা ছাড়া আর কী করব বলো। বাবা মা যদি তাড়িয়ে দেয়, আর আমার কী গতি আছে। কিন্তু এখানে আর একটা রাত্রিও থাকতে পারছি না। আজকের রাতটা কেমন করে কাটাব, তা-ই ভাবতে পারছি না।

হীরার দৃষ্টি এখন নরেশের লকারের ওপর পড়ে। বলে, দেখ বাপু, আমি একটা কথা বলি, শুনবে?

কী?

শঠে শাঠ্যংই ভাল। মরবার দরকার কী। লকার খুলে দিচ্ছি কিছু না হোক সত্তর-আশি হাজার টাকা নিশ্চয়ই আছে। টাকাটা নিয়ে কেটে পড়ো না তার চেয়ে।

শুভা অবাক হয়ে চেয়ে থাকে। হীরা আবার বলে, আর তোমার কাছে এত টাকা আছে জানলে, দেখবে বাবা মা হয়তো তাড়িয়ে দেবে না। চাই কী, টাকার জোরেই একটা ভাল বিয়েও হয়ে যেতে পারে।

কথাগুলো এমন বিশ্রী জঘন্য সত্যের মতো শোনায় যে, শুভার আজন্মের ভিতটাই ভেঙে চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যাবে বলে মনে হয়। শোনামাত্রই ও বুঝতে পারে, হীরার প্রত্যেকটা অনুমানই অক্ষরে অক্ষরে ফলে যেতে পারে। পারে নয়, ফলেই যাবে। কিন্তু কিন্তু একজনের লকার থেকে, এতগুলো টাকা, হাজার হাজার টাকা চুরি করে নিয়ে পালিয়ে যাবে শুভা!… না অসম্ভব, ওর দ্বারা তা হবে না। একটা লোকের সঙ্গে ও বাড়ি থেকে পালিয়ে আসা মেয়ে। নিজেকে ও ভাল ভাবে না। এমনকী, যার সঙ্গে এসেছিল, তাকে যে ভালবেসে এসেছিল, তাও ঠিক নয়। একটা চোখ ধাঁধানো ঝলকে চলে এসেছিল। একসঙ্গে সংসার করলে, কী হত, ও জানে না। নিজের সম্পর্কে শুভার কোনও ভাল ধারণা নেই। তবু লকারের টাকা চুরি করে, এভাবে ও পালাতে পারবে না। শুভা মাথা নেড়ে বলে, না, পারব না।

হীরা বলে, কেন? তুমি তো আর চুরি করছ না। করছি তো আমি। আমি তোমাকে চুরি করে দিচ্ছি।

 শুভা দৃঢ়ভাবে মাথা নেড়ে বলে, না না, কিছুতেই পারব না। তার থেকে মরা সহজ।

তার থেকে মরাও সহজ?

হীরা যেন রাগতে গিয়ে, অবাক হয়ে হেসে ফেলে। চায়ের শূন্য কাপ রেখে দিয়ে বলে, ঠিক আছে। তুমি কাল চলে গেলে, পরশু রাত্রে এসে আমি টাকাটা হাতিয়ে নিয়ে যাব। নরেশ আমার টিকিটিও ধরতে পারবে না। তা ছাড়া, আমি হলপ করে বলতে পারি, এত টাকা ঘরে রাখা মানেই কালো টাকা। তা নইলে নির্ঘাত ব্যাঙ্কেই রাখত। তাই, পুলিশকেও বলতে পারবে না।

শুভার দিকে চেয়ে আবার বলে, এখনও ভেবে দেখো।

শুভা ঘাড় নেড়ে বলে, দেখেছি। পারব না।

বোকার মরণ হলে যা হয়, তা-ই হবে। তোমার তারকা কোনওদিন আসবে না, নরেশ রোজ রাত্রে এসে মারপিট করছে, আর এখন তুমি দেশে যাচ্ছ মরতে, কোনও মানে হয়? আরে বাবা, এ উৎপাতের টাকা তো চিৎপাতেই যাবে। তুমি নিয়ে গিয়ে যদি নিজের একটা হিল্লে করতে পারতে, তা হলে একটা ভাল কাজে লাগত।

শুভা কোনও জবাব দেয় না। কথাগুলো যে তার মধ্যে কোনও আলোড়ন তোলে না, তা নয়। টাকা থাকলে জীবনের হিল্লে হয়। অন্তত শুভার বর্তমান অবস্থায়। এবং সম্ভবত এ টাকা চুরি গেলে নরেশ কাউকে প্রকাশ করতে পারবে না। শুভার পিছনে ধাওয়া করেও সে বিশেষ কিছু করতে পারবে না।

তবু মূলে তো সে-ই এক। তারকার সঙ্গে পালিয়ে ওর কোনও হিল্লে হয়নি। নরেশের টাকা নিয়ে পালানোও, আর একটা অন্যায় লোভ। প্রতি মুহূর্তে একটা উদ্বেগ থাকবে। ভিতরে ওর কোথাও কোনও সমর্থন নেই।

কিন্তু হীরার ওপর ওর রাগ হতে থাকে। হীরার যুক্তিপূর্ণ কথাগুলোও খণ্ডন করতে পারে না বলেই ওর রাগ হয়। তার ওপরে, ও চলে গেলেই হীরা টাকাগুলো নিয়ে যাবে, এ কথা ভেবে, হীরার ওপর যেন বিদ্বেষ অনুভব করতে থাকে। একটু পরে বলে ওঠে। আমার হিল্লে না হোক, চোরের হিল্লে তো হবে।

হীরা একটা সিগারেট ধরিয়ে বলে, যা খুশি তাই বলল, তোমাদের ও সব সতীগিরি আমি বুঝি না বাবা।

শুভার চোখ জ্বলে ওঠে, মুখ শক্ত। বলে, চোরেরা শুধু চুরিই বোঝে। খুব আশকারা দেওয়া হয়েছে একটা চোরকে। এখন তুমি যাও।

হীরার মুখে তীক্ষ্ণ বাঁকা হাসিতেও রাগের ঝিলিক হানে। একমুখ ধোঁয়া ছেড়ে বলে, আশকারা কে কাকে দিয়েছে, ভেবে দেখো। তোমার এত ডাঁট আর ঠাঁট অনেক আগেই আমি ভেঙে দিতে পারতাম। নেহাত।

নেহাত কী?

কী জানি শালা, সেই রাত্রে কী চোখে দেখে ফেললাম, মনটা একটু ইয়ে হয়ে গেল।

চোরের আবার মন।  

ও সব তোমাদের মতো ছুঁড়িদেরই থাকে, কী বলল, অ্যাঁ? যাকগে বাবা, আজ রাত্রের যাত্রাটাই আমার খারাপ মনে হচ্ছে। চলি…হ্যাঁ, খাবারটা খেলে না?

শুভা তৎক্ষণাৎ ভিতর ঘরে গিয়ে, রান্নাঘর থেকে খাবারের প্যাকেটটা এনে ছুঁড়ে ফেলে দিল মেঝেয়, নিয়ে যাও তোমার খাবার, বেরিয়ে যাও এখুনি।

কয়েকটা রোল ছড়িয়ে পড়ে মেঝেয়। মোড়ক খুলে, মাংস বেরিয়ে পড়ে। গন্ধ ছড়ায়। সেদিকে তাকিয়ে হীরা বলে, হ্যাঁ, এ খাবার তো ফেলে দেবেই। বড়লোক নরেশের ভাল খাবার খেয়ে খেয়ে।

কথা শেষ হবার আগেই, দরজায় শব্দ বাজে। সেই শব্দ, সেই উন্মত্ত, অন্ধ প্রচণ্ড করাঘাত। হীরা থেমে যায়। দুজনেরই মুখের ভাব বদলে যায়। দুজনেই অবাক হয়ে চোখাচোখি করে। হীরা চকিতে পকেটে হাত ঢুকিয়ে একটা হাতঘড়ি বের করে সময় দেখে। মাত্র দশটা! এ সময়ে নরেশ আসে না। অথচ শব্দ শুনেই বোঝা যাচ্ছে, সেই এসেছে।

দুজনেই কিংকর্তব্যবিমূঢ়। কিন্তু দরজায় সমানে শব্দ হয়ে যেতে থাকে। হীরা ভিতর ঘরের দিকে। কয়েক পা এগিয়ে, আবার ফিরে প্রথম দিনের মতো ঢাউস আলমারিটার পাশেই লুকিয়ে পড়ে। শুভা তখনও বিমূঢ়ভাবে হীরার দিকেই চেয়ে রয়েছে। হীরা দরজা খুলে দেবার ইশারা করে।

সেই ইশারাতেই যেন শুভার সংবিৎ ফিরে আসে। ও প্রায় একটা অন্যমনস্কতার ঘোরে এগিয়ে গিয়ে দরজা খুলে দেয়! নরেশ ঝড়ের বেগে ঢোকে এবং চকিতে শুভকে আঘাত করে গর্জে ওঠে, কোন নাগরের সঙ্গে শুয়েছিলে যে, এতক্ষণ লাগে দরজা খুলতে।

আঘাতটা শুভার কান ঘেঁষে গালের ওপরেই পড়ে। আজ যেহেতু ও তেমন সচেতন ছিল না, তাই প্রস্তুত ছিল না, সেজন্যেই আঘাতটা এড়িয়ে যেতে পারে না। শুধু তাই নয়, নরেশ মুহূর্তের মধ্যে, ওর ঘাড়ের কাছে জামাটা সুদ্ধ চেপে ধরে। এক হ্যাঁচকা টানেই, শুভাকে একেবারে বুকের কাছে আছড়ে ফেলে।

শুভার গলায় অস্ফুটে এক বার শোনা যায়, খবরদার!

তারপরে ও দুহাত দিয়ে নরেশকে ঠেলে দেবার চেষ্টা করে। নরেশের বুকের জামাটা চেপে ধরতে, জামাটা খানিকটা ছিঁড়ে যায়। কিন্তু নরেশের আর এক হাত তখন কঠিন পাশে শুভাকে বেষ্টন করেছে। তার গলায় শোনা যায়, কত তোমার তেজ আর জোর, আজ আমি দেখব। দরকার হয়, গলা টিপে নিকেশ করে দেব।

বলতে বলতে সে তার বীভৎস ভয়ংকর মুখটা শুভার মুখের ওপর নামিয়ে নিয়ে আসে। শুভার নিশ্বাস বন্ধ হয়ে আসে। ওর দুই চোখে আতঙ্ক, আর আত্মরক্ষার দুঃসহ চেষ্টা। কিন্তু কিছুতেই নরেশের হাত থেকে নিজেকে ছাড়াতে পারে না। ওর জামায় এত জোরে টান পড়ে, বেআবরু হয়ে যাবার মতো হয়। নরেশের সর্বগ্রাসী ঠোঁট ঝাঁপিয়ে পড়ে শুভার গালের ওপর।

শুভার গলার একটা আর্তধ্বনি শোনা যায়, না না।

সেই মুহূর্তেই ঘরটা অন্ধকারে হঠাৎ ডুবে যায়। নরেশ এত ত্ৰস্ততার মধ্যেও, চমকে ওঠে। বলে ওঠে, কে?

তার আলিঙ্গনও একটু শিথিল হতেই শুভা এক ঝটকায় নিজেকে ছাড়িয়ে নেয়। নরেশ আবার চিৎকার করে ওঠে, কে বাতি নেভাল, কে?

ইতিমধ্যে, শুভার হাতে একটা হাত এসে পড়ে। ও কিছু বুঝে ওঠবার আগেই, সেই হাত ওর হাত চেপে ধরে। বাইরের দরজার দিকে টেনে নিয়ে যায়। শুধু এক বার চুপিচুপি স্বর শুনতে পায়, চুপ কথা নয়।

মত্ত নরেশ যখন টলতে টলতে, অন্ধকারে সুইচের দিকে এগিয়ে যাবার চেষ্টা করে, শুভা দেখতে পায়, ততক্ষণে সে হীরার হাত-ধরা অবস্থায় ঘরের বাইরে। সমস্ত ঘটনার মধ্যেই এত চমক। এত দ্রুত চকিত যে, কী ঘটতে যাচ্ছে বোঝবার আগেই, সিঁড়ি দিয়ে নীচে নেমে, এ বাড়ির চৌহদ্দি পেরিয়ে একেবারে রাস্তার ওপরে এসে পড়ে।

রাস্তা লোকজন গাড়ি, সমস্ত কিছু দেখে, শুভা যেন থতিয়ে যায়। এক বার বলে ওঠে, কোথায় যাচ্ছি?

কোনও কথা নয়। রাস্তায় গোলমাল হয়ে যাবে। চুপ করে চলে এসো আমার সঙ্গে।

শীতের রাত্রি, দশটা বেজে গিয়েছে। লোকজন গাড়ি সবই কম। হীরা শুভকে নিয়ে বড় রাস্তা থেকে, একটা ছোট নির্জন রাস্তায় ঢুকে পড়ে। শুভার মনে হয়, এক বার যেন ও নরেশের ডাক শুনতে পায়, শুভা!

শুভা আর একবার জিজ্ঞেস করে, কোথায় নিয়ে যাচ্ছ তুমি আমাকে?

যেখানেই হোক, নরেশের থেকে ভাল জায়গায়।

আরও কয়েক পা যাবার পরেই, শুভা হঠাৎ থমকে দাঁড়াতে যায়। ওর ভিতরটা ভয়ে কেঁপে ওঠে। একটা মাতাল লম্পটকে ছেড়ে একটা চোরের সঙ্গে। ও হাত টেনে নেবার চেষ্টা করে। বলে, ছেড়ে দাও তুমি?

কোথায় যাবে? নরেশের কাছে?

তা জানি না, তুমি ছেড়ে দাও।

দেব না। জোর করলে, শেষ পর্যন্ত পুলিশ তোমাকে থানায় নিয়ে যাবে। আর আমি ঠিক কেটে পড়ব। ইচ্ছে হয়, কাল তুমি দেশে মরতে যেয়ো, আটকাব না। আজ রাত্রের মতো বেঁচে থাকো। এই ট্যাক্সি!

হীরা ডাক দিয়ে একটা খালি ট্যাক্সি দাঁড় করায়। শুভা হঠাৎ কোনও কথা বলতে পারে না। হীরা দরজা খুলে, ওকে ঠেলে নিয়ে ট্যাক্সিতে উঠে বলে, টালিগঞ্জ।

ট্যাক্সি চলতে থাকে। হীরা শুভার হাত ছেড়ে দিয়ে সরে বসে, তবু লক্ষ রাখে। শুভার চোখে অস্থিরতা, কিন্তু মুখে ও দেহে একটা আচ্ছন্নতার ঘোর। এই অস্থির ও আচ্ছন্নতার ঘোর আর একদিন ওর জীবনে এসেছিল। কিন্তু, সেদিন একটা অন্য অনুভূতিও ছিল ওর মনের মধ্যে। সেদিন ও তারকদার সঙ্গে দেশ থেকে পালিয়ে এসেছিল। সেদিন অবিশ্যি ওকে কেউ ঠেলে তোলেনি। ও নিজের থেকেই স্টেশন অবধি হেঁটে গিয়েছিল, গাড়িতে উঠেছিল। সেদিনও ছিল এক অপরিচয়ের যাত্রা। আজ রাত্রেও এক অচিন যাত্রা।

হীরা যেন নিজের মনেই বলে ওঠে, চোখে দেখে, ওভাবে রেখে আসা যায় না। নরেশ তো একটা পাগলা কুকুরের চেয়েও মারাত্মক হয়ে আছে। কী করে রেখে আসব আমি।

সে কথা অস্বীকার করবার উপায় নেই। আজ না পালাতে পারলে কী ঘটত কে জানে। কিন্তু কার সঙ্গে পালাচ্ছে শুভা। এই লোকটাই বা কোথায় নিয়ে যাচ্ছে। টালিগঞ্জ, একটা কানে শোনা জায়গা মাত্র। সেখানে আরও কী ভয়াবহ পরিণতি অপেক্ষা করে আছে, কে জানে। বিশ্বাস করতে ইচ্ছা করে না। তবু, কী জানি, হীরাকে সেরকম ভয়ংকর খারাপ বলে তো মনে হয় না। কিন্তু কতটুকুই বা জানে শুভা। তারকাকেই বা কতটুকু চিনতে পেরেছিল। অথচ তাকে তো কতকাল দেখেছে।

ট্যাক্সি ড্রাইভারের সামনে কিছু বলতে সংকোচ হয়। কিছু বলতে ইচ্ছে করে, কিন্তু কী বলতে হবে, তাও যেন জানে না।