১০. নারদের বুদ্ধি

১০

নারদের বুদ্ধিতে একেক ভাইয়ের ঘরে দ্রৌপদীর বার্ষিক পালা ঠিক হইবার পর অর্জুন যাইচা অপরাধ করে বারো বচ্ছরের নির্বাসন-শাস্তি নিয়া পথে পথে তিনটা বিয়া কইরা শেষে ফিরছিল। দেশে। আর বনবাসের শুরুতেই আবার সে অস্ত্র সংগ্রহের নামে আরো পাঁচ বচ্ছরের লাইগা চইলা যায় দ্রৌপদী থাইকা দূরে। তাই এইবার অর্জুন ফিরা আসলে সমস্ত পালাটালা ভাইঙ্গা যুধিষ্ঠির দ্রৌপদীরে বরাদ্দ দেয় অর্জুনের ঘরে। কিন্তু এই অর্জুন তো আর সেই অর্জুন নাই। পাঁচ বচ্ছরের অস্ত্র সংগ্রহকালে কোথায় যেন কী করতে গিয়া বিচি হারাইয়া ফিরতে হইছে তার…

দ্রৌপদী হাসে- থাউক। সময়কালে দূর কইরা দিয়া অসময়ে কাছে আসার দরকারই বা কী?

আগে গেছে ছয় বছর। এখন গেলো চাইর। এগারো বছরের শুরুতে ভীম কয়-  এইবার তো আমাগো প্রস্তুতি নেওয়া লাগে। যুধিষ্ঠিরও যুক্তি মানে। ভীমের সংবাদ পাইয়া আবার আইসা হাজির হয় ঘটোৎকচ। অর্জুন খুঁইটা খুঁইটা ভাতিজার যুদ্ধকৌশল দেখে। অর্জুন যুদ্ধ করে লক্ষ্য নির্দিষ্ট কইরা। নির্দিষ্ট শত্ৰু লক্ষ্যের ভিতরে না আসলে অস্ত্র উঠায় না সে; যেইখানে ভীমের কৌশল গণমাইর; কে মরল আর কে বাকি থাকল তা দিনের শেষে গিয়া সে হিসাব করে। ঘটোৎকচ বাপের গদাম। কৌশলের লগে আয়ত্ত করছে তার মাতৃবংশের মায়াযুদ্ধের কৌশল। তার উপরে হাতল অস্ত্রে দুর্ধর্ষ সে। বল্লম কুড়াল তলোয়ার তিনটাই চালাইতে পারে ম্যাজিকের মতো। এর শরীরটা যেন লোহার হাড্ডির উপর রাবারের মাংস দিয়া তৈরি। মারলে মাইর ফিরা আসে কিন্তু কিছুই লাগে না ঘটার। ভাতিজার লড়াইকৌশল দেইখা অর্জুন যুধিষ্ঠিরের দিকে তাকায়- ঘটায় কিন্তু কর্ণরে ফাইট দিবার যোগ্যতা রাখে ভাইজান…

খুশিতে ডগমগ করে ভীম। ফকিন্নির পোলা কর্ণ তারে মাকুন্দা কইয়া গালি দিলেও সে তার কিছু করতে পারে নাই কোনো দিন। তার পোলায় যদি কর্ণরে কিলাইতে পারে তয় ভীমের থাইকা বেশি খুশি হইব না কেউ…

লোমশ থাইকা গেলেন গন্ধমাদনে। পাণ্ডবরা রওনা দেয় ফিরতি পথে। সতিনের পোলা ঘটার কান্ধে চইড়া ফিরতে ফিরতে মুখ লুকাইয়া কান্দে পাঁচ পোলার জননী দ্রৌপদী। যুধিষ্ঠির-কৃষ্ণ- অর্জুন। সকলেই সর্বদা কর্ণরে ফাইট দিবার মতো যোদ্ধা খোঁজে। কৃষ্ণ আগে ইঙ্গিত দিয়া গেছে ঘটার শক্তি বিষয়ে। এইবার অর্জুন সেই ইঙ্গিতরে প্রায় সিদ্ধান্তে নিয়া গেছে। অর্জুনের আগে পাণ্ডব বংশের কেউ যদি কর্ণের সামনে খাড়ায় তবে নিশ্চিত সেইটা ঘটোৎকচ। কিন্তু দ্রোণ আর পরশুরামের শিষ্য কর্ণের সামনে কতক্ষণ টিকব স্বশিক্ষিত ঘটার রণকৌশল? ঘটার কান্ধে বইসা নিঃশব্দে তড়পায় দ্রৌপদী। তার অভিশাপ কি তবে সত্যিই ফলে যাবে একদিন?

বৃষপর্বার আশ্রমে এক রাইত আর বদরিকায় এক মাস থাইকা সকলে কিরাতরাজ সুবাহুর রাজ্যে উপস্থিত হইলে ঘটা বিদায় নেয়। ভীম তার কান্ধে চাপড় দেয়-যা বেটা পোলাগো নিয়া তৈয়ার হ…

ঘটোৎকচ বাপ-কাকা আর মায়েরে পেন্নাম কইরা গিয়া যুধিষ্ঠিরের সামনে খাড়ায়- ভাতিজা এখনই যুদ্ধের লাইগা তৈয়ারি জ্যাঠা; খালি তোমার নির্দেশখান বাকি…

যুধিষ্ঠির বুকে বল পায়। ঘটোৎকচের বাহিনী আসন্ন মহাযুদ্ধে পাণ্ডবপক্ষের পয়লা বাহিনী; কর্ণের

সামনে খাড়াইবার মতো পয়লা যোদ্ধাও ঘটোৎকচ। যুধিষ্ঠির ঘটারে জড়ায়ে ধরে- সময় আসুক বাপ…

ঘটা বিদায় নিবার পর তারা আইসা উপস্থিত হয় যমুনার উৎপত্তিস্থান বিশাখাযুপ। বিশাখাযুপে এক বছর বাসকালে এইখানেও ঝামেলা করতে গিয়া ভীম বান্ধা খায় নহুষ বংশের কাছে আর আবারও যুধিষ্ঠির গিয়া হাত জোড় কইরা তারে ছাড়াইয়া আইনা সইরা আসে দ্বৈতবনে…

বারো বচ্ছর পূর্ণ হইবার কয়েক মাস আগে কৃষ্ণ আবার আইসা হাজির হয় পাণ্ডবগো কাছে। এইবার সত্যভামা ছাড়া কাউরে সে সাথে আনে নাই। সকলের লগে কুশল বিনিময় কইরা কৃষ্ণ তাকায় যুধিষ্ঠিরের দিকে- মহারাজ। যাদবসেনারা যুদ্ধের লাইগা এখন সম্পূর্ণ প্রস্তুত। চাইলে এখনই আমরা যুদ্ধ কইরা আপনারে আপনের রাজ্য জয় কইরা দিতে পারি। আপনি ইচ্ছা করলে সেই রাজ্যে এখনই যাইতে পারেন আবার চাইলে বনবাসের মেয়াদ শেষ কইরাও ফিরতে পারেন…

যুধিষ্ঠির হালকা স্বরে কয়-  অত দিন যখন অপেক্ষা করছি বাকি কয়টা দিন না হয় অপেক্ষাই করলাম। খামাখা কয়টা দিনের লাইগা আর পণ না ভাঙ্গি…

মুনি মার্কণ্ডেয় আইসা পড়ায় কথা আর বেশিদূর আগায় না। কৃষ্ণ আর পাণ্ডবেরা শুনতে থাকে মুনি মার্কণ্ডেয়র পুরাণকথা আর সত্যভামা দ্রৌপদীরে নিয়া গিয়া আড়ালে খাড়ায়- তুমি তো পাঁচ-পাঁচটা স্বামীরে সামলাইয়া রাখো; আমারে একটু বুদ্ধি দেও তো বইন যাতে কৃষ্ণরে আমি ধইরা রাখতে পারি?

দ্রৌপদী হাসে- ভাতার যদি টের পায় তুমি তারে বাইন্ধা রাখতে চাও তাইলে কিন্তু পলাই পলাই করব। তুমি বরং স্বাভাবিক থাইকো। তয় মাঝে মাঝে যদি তারে বুঝাইয়া দেও যে তারে ছাড়া তুমি দুনিয়ার কাউরে পোছো না তাইলেই সোনায় সোহাগা। তবে একটা কথা; স্বামীর সামনে নিজের পোলারেও কিন্তু বেশি খাতির কইরো না কোনো দিন…

বারো বচ্ছরের বাকি সময় পাণ্ডবরা দ্বৈতবনেই ঘর তুইলা থাকে। সংবাদ পাইয়া দুর্যোধনের মনে হয় যাই নিজের চোক্ষে একবার পাণ্ডবগো দুর্দশা দেইখা আসি…

পাণ্ডবগো আস্তানার কাছেই আছিল দুর্যোধনের গোপপল্লি। দুর্যোধনের প্রস্তাব নিয়া কর্ণ আর শকুনি যায় ধৃতরাষ্ট্রের কাছে- এই বছর পালের গরুবাছুর তো গোনাগুনতি দরকার। শিকারের লাইগাও সময়টা উপযুক্ত। তাই দুর্যোধনের ঘোষযাত্রা আর শিকারের অনুমতি প্রার্থনা করি মহারাজ…

আন্ধা ধৃতরাষ্ট্র চোখ পিটপিট করেন- প্রস্তাব ভালো আর দরকারিও বটে; কিন্তু হুনছি গোপপল্লির কাছেই এখন পাণ্ডবেরা থাকে। যুধিষ্ঠির ঠান্ডা মানুষ; তোমাগো দেখলে সে কিছু বলব না। কিন্তু ভীমের মেজাজ আর পাঞ্চালীর রাগের কথা ভাইবা আমার বড়ো ডর লাগে। তোমরা সেইখানে গিয়া লাফালাফি করবা আর তারা বইসা থাকব এইটা ভাবতে আমার কষ্ট হয়। তাছাড়া শুনছি এর মধ্যে অর্জুন নাকি বহুত অস্ত্রও জোগাড় কইরা ফালাইছে…

শকুনি কয়-  কথা দেই মহারাজ; পাণ্ডবরা যেই দিকে আছে সেই দিকে আমরা পাও বাড়ামু না। আমরা খালি পালের গরুবাছুর গোনাগুনতি কইরা দুই-চাইরটা শিকার সাইরা আবার ফিরা আসব ঘরে…

ধৃতরাষ্ট্র মিনমিন কইরা অনুমতি দিলেও দুর্যোধনরে ডাইকা কন- তোর যাওয়ার কাম নাই বাপ। তুই বরং ঘোষযাত্রায় অন্য লোক পাঠা…

কিন্তু অন্যের চোখ দিয়া কি আর ছালবাকলা পরা পাণ্ডব আর দ্রৌপদীর দুরবস্থা দেইখা সুখ পাওয়া যাবে? দুর্যোধন বরং বাড়ির সব বৌদের বস্ত্রে অলংকারে সাজুগুজু করাইয়া সাথে নিয়া রওনা দেয় মৃগয়ায়। কৌরবগো শান শওকত দেইখা নিশ্চয় মনের জ্বালা আরেক কাঠি বাইড়া যাবে পাণ্ডব আর পাঞ্চালীর…

গেছে গরুবাছুর গুনতে আর শিকার করতে। তাই হাতে গোনা কিছু দেহরক্ষী আর কামলা গোছের মানুষ ছাড়া দুর্যোধনের লগে তেমন সৈন্যসামন্ত নাই। তারা ঘুণাক্ষরেও ভাবতে পারে নাই যে পাণ্ডবগো আশেপাশেই মৃগয়ার নামে সৈন্যসামন্ত নিয়া অর্জুনের দোস্ত গান্ধর্বরাজ চিত্রসেন পাহারা দিতাছে তাদের। ঝামেলাটা সেইখানেই ঘটে। দুর্যোধনের খেলাধুলার ঘরবাড়ি বানাইতে গিয়া তার কামলারা মারামারি বাঁধাইল চিত্রসেনের আর্মিগো লগে আর চিত্রসেন আইসা দিলো সব তছনছ কইরা। রথ হারাইয়া কর্ণ দিলো চম্পট আর চিত্রসেন দুর্যোধনের লগে বাড়ির সব মাইয়াদের বাইন্ধা রওনা দিলো নিজের শিবিরে…

দুর্যোধনের চ্যালারা আইসা পড়ল যুধিষ্ঠিরের পায়- রক্ষা করেন মহারাজ। আপনার পরিবারের মাইয়াগো ধইরা নিয়া গেছে চিত্রসেন…

ভীম কয়-  খারাপ কী? আমরা যা করতে চাই; চিত্রসেন তা আগেই কইরা ফালাইছে। ভালৈ তো…

কিন্তু বংশের নারীগো নিয়া চিত্রসেনের টানাটানি পছন্দ করে না যুধিষ্ঠির। সে ভীম আর অর্জুনরে পাঠায় তাগোরে উদ্ধার কইরা আনতে। অর্জুনরে দেইখা চিত্রসেন হাসে-কও দোস্ত। কী করতে হবে? অর্জুন কয়-  মেয়েদের ছাড়ো আর দুর্যোধনরে বাইন্ধা নিয়া চলো যুধিষ্ঠিরের কাছে…

ছালবাকলা পইরা বইসা আছে যুধিষ্ঠির আর তার সামনে রাজার পোশাক পরা দুর্যোধনরে বাইন্ধা নিয়া আসছে চিত্রসেন। বাড়ির যে মাইয়াগো সে নিয়া আসছিল দ্রৌপদীর দুর্দশা দেখাইতে; তারা এখন দ্রৌপদীর উঠানে দুর্যোধনরে দেখতাছে যুধিষ্ঠিরের সামনে হাঁটু মুইড়া বসতে…

দুর্যোধন মাথা তোলে না। যুধিষ্ঠির চিত্রসেনরে কয় হাতের বাঁধন খুইলা দিতে। দুর্যোধন উইঠা খাড়ায়। যুধিষ্ঠির তার দিকে তাকাইয়া কয়- যাও বাড়ি যাও। সব জায়গায় বাহাদুরি দেখাইতে যাইও না…

শত্রুর দয়ায় প্রাণ নিয়া বাঁইচা থাইকা কী লাভ? দুর্যোধন সবাইরে হস্তিনাপুর ফিরা যাইবার আদেশ দিয়া নিজে সিদ্ধান্ত নেয় আত্মহত্যার। ভাইয়েরা তার পায়ে ধইরা কান্দাকাটি করে। মামা শকুনি হাতে ধইরা বোঝায় কিন্তু দুর্যোধন এই জীবন রাখব না আর। সব দেইখা কর্ণ আইসা খাড়ায় দুর্যোধনের সামনে-হইছেটা কী শুনি? যুদ্ধে সেনাপতিরা শত্রুর হাতে ধরা খায় এইটা কি নতুন কিছু? বন্দি। হইবার পরে সৈন্য আর প্রজারা আবার সেনাপতিরে শত্রুর হাত থাইকা ছাড়াইয়া আনে; সেইটাও তো নতুন কিছু না। পাণ্ডবগোরে তুমি শত্রু মনে করতাছ কেন? তারা এখন তোমার রাজ্যে বসবাস করা প্রজা। তাগোর দায়িত্ব হইল রাজা দুর্যোধনরে শত্রুর হাত থাইকা ছাড়াইয়া আনা। তারা যা করছে তা

অনুগত প্রজার দায়িত্বের বেশি কিছু করে নাই। তুমি তাগোরে ধন্যবাদ দিছ তাতেই তাগো জীবন ধন্য হইবার কথা। এইবার লও বাড়ি যাই…

কিন্তু এই যুক্তি দিয়া কি দুর্যোধন নিজেরে সান্ত্বনা দিতে পারে? সে কয়- কর্ণ তোমরা যাও; গিয়া রাজ্য শাসন করো। আমি বরং মরি…

কর্ণ এইবার দুর্যোধনরে একটা ঝাঁকি দেয়-বেকুবি কইরো না কইলাম। মান-অপমান ওইগুলা ব্রাহ্মণের বিষয়। ক্ষত্রিয়ের কাজ শত্রুমারা। নিজে মইরা গেলে কোনো দিনও শত্রু মারার সম্ভাবনা নাই বরং বাঁইচা থাকলেই কিছু না কিছু চান্স পাওয়া যায়। চলো গিয়া সেই বন্দোবস্ত করি…

হস্তিনাপুর ফিরা আইসাই দুর্যোধন পড়ে ভীষ্মের সামনে- কইছিলাম না যাইও না? লাফাইতে লাফাইতে তো গেলা; সেইখানে কী হইছে তার সংবাদ রাখি না মনে করো? তোমার গাড়োয়ানের পোলা কর্ণ তো পয়লা ধাক্কাতেই তোমারে থুইয়া পলাইছে। শেষ পর্যন্ত তো পাণ্ডবগো দয়াতেই বাঁইচা বাড়ি ফিরলা? কই? নিজের শানশওকত ঠিকমতো দেখাইতে পারছিলা তো পাঞ্চালীরে?

দুর্যোধন ভীষ্মের কথার কোনো উত্তর না দিয়া হাঁটে। বাড়িতে গিয়া ঝিমায়। বাঁচা-মরার প্রশ্নে না হয় মান-সম্মান তুচ্ছ কিন্তু বাঁইচা থাকলে তো সম্মান লাগে। ভীষ্ম খোঁচাইব; প্রজারা হাসব এইটা তো হইতে পারে না। এমন একটা কিছু করতে হবে যাতে সবাই এই প্রসঙ্গটা ভুইলা যায়…

রাজা হিসাবে বড়োসড়ো কিছু করা মানে হইল বড়োসড়ো যুদ্ধের জয় না হয় বড়ো একখান যজ্ঞ করা। বড়ো যুদ্ধের যেহেতু আপাতত সুযোগ নাই তাই যজ্ঞই করব দুর্যোধন। যজ্ঞের মইদ্যে সবচে বড়ো রাজসূয় যজ্ঞ। কিন্তু সেইখানে একটা সমস্যা আছে। বংশে রাজসূয় যজ্ঞ করছে আপনা কাকাতো ভাই যুধিষ্ঠির। আর রাজা হিসাবে এখনো জীবিত আছে নিজের বাপ ধৃতরাষ্ট্র যার আবার রাজ্যে অভিষেক হয় নাই কোনো দিন। সে মূলত এখনো ভাই পাণ্ডুর রাজ্যের ভারপ্রাপ্ত রাজা। বংশে রাজসূয় যজ্ঞ করা ব্যক্তি জীবিত থাকতে যেমন দ্বিতীয় কেউ তা করতে পারে না তেমনি নিজের বাপ ভারপ্রাপ্তেরও রাজসূয় করার সুযোগ নাই। তাই দুর্যোধনের লাইগা একমাত্র বিকল্প হইল রাজসূয় যজ্ঞ থাইকা কিছুটা কম মর্যাদার বৈষ্ণব যজ্ঞ; করদ রাজাগো কাছ থিকা কর তুইলা সেই টাকায় সোনার লাঙ্গল বানাইয়া মাটি চইষা উদ্বোধন হবে এই যজ্ঞের…

কিন্তু যজ্ঞের ঝকমকানি ছালবাকলা পরা পাণ্ডবগো তো দেখাইতে হয়। দুর্যোধন পাণ্ডবগো নিমন্ত্রণ পাঠায় যজ্ঞে যোগদানের। যুধিষ্ঠির বিনয়ের সাথে প্রত্যাখ্যান কইরা কয়-  এখন হস্তিনাপুর গেলে যে বনবাসের শর্ত লঙ্ঘন হয়; তাই আমরা যাইতে অপারগ। তয় দুর্যোধনের লাইগা আমার আশীর্বাদ থাকল। তারে কইও আমাগো তেরো বচ্ছর পূর্ণ হইলে হস্তিনাপুরে আবার দেখা হইব আমাদের…

ভীম কয়- হ। তেরো বছর পূর্ণ হইলে আমরা হস্তিনাপুর গিয়া দুর্যোধনরে আগুনে ফালাইয়া যে যজ্ঞ করুম; সেইখানে তার লগে দেখা হইব আমাদের…

যজ্ঞ শেষে কেউ কয় যুধিষ্ঠিরের রাজসূয় যজ্ঞ থাইকা ভালৈছে; কেউ কয় খারাপ। কর্ণ কয়- দুঃখ কইরো না দুর্যোধন। পাণ্ডবরা নিপাতে গেলে রাজসূয় যজ্ঞ করবা তুমি। তবে তোমার এই যজ্ঞ যেমনই হোক না কেন; এই যজ্ঞের পুণ্যের লগে তুমি কর্ণের একটা একটা পণ যোগ করো আইজ যত দিন অর্জুন বাঁইচা থাকব তত দিন এই কর্ণ মদ-মাংস খাবে না আর কেউ কিছু চাইলে কোনো অবস্থাতেই তারে না বলব না আমি…

যজ্ঞের কোনো সংবাদেই কান তোলে না যুধিষ্ঠির। সে খালি ভাবতে থাকে কর্ণের পণ-যত দিন অর্জুন জীবিত থাকব তত দিন কেউ তার কাছে কিছু চাইলে কোনো অবস্থাতেই তারে না বলবে না সে। তার মানে অর্জুনরে হত্যা না করার বর চাইলেও কর্ণ তা দিব। যুধিষ্ঠির ভাবতে থাকে কর্ণের কাছে কী চাওয়া যায়। এমন সময় দ্বৈপায়নের কথায় পাণ্ডবরা জায়গা বদলাইয়া ফিরা আসে কাম্যকবনে। কারণ বনের এক জায়গায় বেশি দিন বসবাস করলে বনের যেরম ক্ষতি হয় সেরম নিজেরও শিকড় গজায়। ওই দিকে দুর্যোধন কোনোমতেই ভুলতে পারে নাই কোনো অপমান। পাণ্ডবরা তার যজ্ঞের নিমন্ত্রণেও সাড়া দেয় নাই। এরি মধ্যে এক দিন মুনি দুর্বাসার দেখা পায় দুর্যোধন। একটু খবিস কিসিমের এই মুনি। বদরাগী আর কথায় কথায় মাইনসেরে অভিশাপ দেওয়া তার কাম। তেলবাজ মুনি দুর্বাসারে খুশি করা খুব কঠিন। সেই যুগে একবার মাত্র তারে খুশি করতে পারছিল কুন্তী আর এই যুগে তারে তেল মারতে মারতে খুশি কইরা ফালায় দুর্যোধন। মুনি তার। সেবায় খুশি হইলে সে কয়-  আমার উপ্রে যদি আপনি খুশি হইয়া থাকেন তয় আমার একটা অনুরোধ রাখেন। আপনি তো জানেন যে আমার বড়ো ভাই যুধিষ্ঠির খুব ভালা মানুষ। সে এখন বনে আছে। আমারে সে কইয়া দিছে যে আপনারে পাইলে যেন কই আপনি আপনের শিষ্যগো নিয়া তার বনবাসের বাড়িতে এক দিন নিমন্ত্রণ খাইতে যান…

পঙ্গপালের মতো এক পাল শিষ্য নিয়া সত্যি সত্যি এক দিন যুধিষ্ঠিরের কাম্যকবনে গিয়া হাজির হয় দুর্বাসা মুনি- খাইতে আইলাম তোমাদের ঘরে…

দুর্যোধন দুর্বাসারে যুধিষ্ঠিরের ঘরে খাইতে পাঠায় নাই। পাঠাইছে যুধিষ্ঠিরের বাড়িতে খাইতে না পাইয়া দুর্বাসা কী অভিশাপ দেয় তা দেখার লাইগা। কিন্তু কৃষ্ণ যে সেই দিন সেইখানে উপস্থিত সেইটা তো আর জানে না কেউ। মুনি আইসা খাইতে চাইলে যুধিষ্ঠির কয়-  ঠিকাছে; যান নদী থাইকা স্নান কইরা আসেন। দ্রৌপদী কপাল থাবড়ায়- এখন কেমনে কী করি। বনবাসে আসার শুরুতেই ধৌম্য তারে যে তামার পাত্রখান দিছে; তাতে খুব দ্রুত রান্না হইলেও দুর্বাসার পঙ্গপালের লাইগা খাওন পাকানোর টাইম তো তাগো গোসলের টাইম থাইকা বহুত বেশি হওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু স্নান শেষ কইরা আইসা যদি দুর্বাসা খাওন না পায় তো ছারখার কইরা দিব সব… কৃষ্ণ দ্রৌপদীরে থামায়-খাড়াও দেখতাছি আমি…

কৃষ্ণ এক লোকেরে দিয়া দুর্বাসার কাছে সংবাদ পাঠায়-কও গিয়া বসুদেবের পোলা কৃষ্ণ যুধিষ্ঠিরের বাড়ির সব খাওন খাইয়া ফালাইছে আইজ…

কৃষ্ণের নাম শুইনা দাড়ি লোম সব খাড়া হইয়া উঠে দুর্বাসার। গোসলটোসল বাদ দিয়া সে শুরু করে দৌড়। শিষ্যরা জিগায়- গুরু কই যান? দৌড়াইতে দৌড়াইতে মুনি কয়- পলাও। যাদব জাউরা কৃষ্ণের লগে মুনিগিরি করা ঠিক না। মাইরা থুইয়া কইয়া দিব পূর্বজন্মে আছিলাম রাক্ষস। খাওনের কাম নাই পলাও…

কাম্যকবনেই আরেক ঘটনা ঘটে অন্য দিন। পাণ্ডবরা গেছে শিকারে। বাড়িতে দ্রৌপদী আর পুরোহিত ধৌম্য। এই সময় ধৃতরাষ্ট্রের মাইয়া দুঃশলার জামাই সিন্ধুরাজ জয়দ্রথ আরেকটা বিয়ার আশায় যাইতেছিল শারাজ্যে। পথে কাম্যকবনে দ্রৌপদীরে দেইখা তার মাথা আউলা- এই বনে এমন সুন্দরী নারী কেমনে কী? এর সামনে তো অন্য মাইয়ারা বান্দরের সমান…

জয়দ্রথের চ্যালা কোটিকাস্য সংবাদ নিয়া আইসা বিস্তারিত জানাইলে জয়দ্রথ কয়-  শারাজ্যে গিয়া কাম নাই। এরেই বিয়া করব আমি…

জয়দ্রথ নিজে আউগাইয়া গিয়া প্রস্তাব তোলে দ্রৌপদীর কাছে-ফকির পাণ্ডবগো লগে থাইকা কী করবা তুমি? তার থাইকা আমারে বিবাহ কইরা তুমি হও সিন্ধুর রানি…

দ্রৌপদী ধাক্কা মাইরা জয়দ্রথরে মাটিতে ফালাইয়া দিলেও জয়দ্রথ তারে বাইন্ধা নিজের রথে তুইলা ফালায়। রথ চলা শুরু করলে দ্রৌপদী চিক্কর দিয়া ডাকে ধৌম্যরে আর চলন্ত রথের পিছনে দৌড়াইতে দৌড়াইতে ভীমের নাম ধইরা চিল্লায় ধৌম্য পুরোহিত- ভীম। কই গেলিরে ভীম…

ধৌম্যের চিকুর আর ঘোড়ার দাগ দেইখা পাণ্ডবেরা পৌঁছাইয়া যায় জয়দ্রথের কাছে। মাইরের শুরুতেই ভীমের হাতে চ্যাপটা হয় কোটিকাস্য। দ্রৌপদীরে ছাইড়া জয়দ্রথ পলায়। যুধিষ্ঠির আশ্রমে ফিরা আসে দ্রৌপদী ধৌম্য আর নকুল সহদেবরে নিয়া। ভীম আর অর্জুন ধাওয়া দেয় জয়দ্রথের পিছে। যুধিষ্ঠির অর্জুনরে কইয়া দেয়- ওরে জানে মাইর না। ও আমাগো বইনের জামাই…

ভীম তার চুলের মুঠি ধইরা আছড়ায়। অর্জুন কয়- যুধিষ্ঠির কইছেন তারে জানে না মারতে… ভীম কয়- এ হালা দ্রৌপদীরে অসম্মান করছে এর বাঁচার কোনো অধিকার নাই…।

কিন্তু অর্জুন ভীমেরে সামলায়। ভীম টাইনা জয়দ্রথের মাথার চুল ছিঁড়া ফালাইয়া ধইরা নিয়া আসে দ্রৌপদীর কাছে…

যুধিষ্ঠির কয়- যথেষ্ট শিক্ষা হইছে তার। এইবার জননী গান্ধারী আর বইন দুঃশলার কথা ভাইবা এরে ছাইড়া দেও…

ভীম কয়-  তোমার কথায় ছাড়া যাইবা না তারে। পাঞ্চালী যদি ছাড়তে কয় তবেই শুধু ছাড়া পাইব সে…

যুধিষ্ঠিরের দিকে তাকাইয়া দ্রৌপদী হাসে- যে আমারে জুয়ার দানে তুলতে পারে তার কাছে আমার অসম্মান আর কী এমন বিষয়? দেও। তোমাগো বোনাইরে ছাইড়াই দেও…

অজ্ঞাতবাসে যাইবার আগে আগে জয়দ্রথরে ধরা-মারার থাইকা কর্ণের নিবীর্যকরণ বেশি গুরুত্বপূর্ণ যুধিষ্ঠিরের কাছে। কর্ণের কাছে অর্জুনের প্রাণভিক্ষা চাওয়া হবে চূড়ান্ত অসম্মানের বিষয়। তাই কর্ণের প্রতিজ্ঞার ফাঁক দিয়া কর্ণরেই কাবু করার বিষয়ে লোমশ মুনি পরামর্শ দিছেন এবং নিজেই দায়িত্ব নিছেন কর্ণরে দুর্বল করার। সেই সংবাদটা এইমাত্র আইসা পোঁছাইছে যুধিষ্ঠিরের কানে। আইজ এক ব্রাহ্মণ কর্ণের কাছে গিয়া চাইয়া বসছে তার তামার তৈয়ারি অভেদ্য বর্ম আর কানবন্ধনীখান…

কর্ণের তামার বর্মটা তির দিয়া ভেদ করা সম্ভব না। বনবাসের শুরুতে পুরোহিত ধৌম্য দ্রৌপদীরে যে পাত্রখান দিছেন সেইটাও একই ধাতুর জিনিস; সূর্যের আলো পড়লে ঝকঝক করে বইলা সকলে দ্রৌপদীর পাত্রখানরে সূর্যদত্ত কয়। কর্ণের বর্মখানও সূর্যবর্ম নামে বিখ্যাত। মূলত বহু দূরের বঙ্গ মুল্লুকে আছে এই ধাতুর খনি। আর্যগো হাতে সিন্ধুপারের দেশগুলা ধ্বংস হইবার আগে বঙ্গের বেপারিরা এই সব ধাতুর জিনিসপত্র আইনা বেচাবিক্রি করত সিন্ধুপারের নগরে বাজারে। কিন্তু এখন সেই সব বাজার-হাটও নাই; তাই বেপারিগো যাতায়াতও নাই। দুয়েকটা তামার জিনিস শুধু টিকা আছে কারো পারিবারিক সংগ্রহে নাইলে কোনো ভবঘুরে ব্রাহ্মণের পোঁটলায়…

কর্ণের বর্মন ঘটোৎকচের কাসার বর্ম থাইকাও বেশি সুবিধার। গদার বাড়ি পড়লে কাঁসা ফাইটা টুকরা হইয়া যায়। কিন্তু তামা ভাঙ্গে না; একটু চ্যাপা হয়। পরে টোকা দিলে আবার তা ঠিক হইয়া যায়। কর্ণের কানবন্ধনীটাও একই ধাতুর; কান-মুখ ঢাইকা রাখা মুখোশের মতো। এমন বর্ম আর কানবন্ধনী পইরা নামলে কর্ণের মুখসহ সবই থাকে তিরের নাগালের বাইরে। কিন্তু নিজের প্রতিজ্ঞার ফান্দে পইড়া আইজ সেই বর্ম আর কানবন্ধনীটাই এক ব্রাহ্মণরে দান কইরা দিতে হইছে কর্ণের…

যুধিষ্ঠির স্বস্তি পায়-কর্ণ তাইলে এখন অর্জুনের তিরের নাগালের ভিতর…

.

১১

ভাগ্যের ভাটিযাত্রায় সম্রাজ্ঞী দ্রৌপদী এখন স্বৈরিন্ধী ছদ্মনামে মৎস্যদেশের রানি সুদেষ্ণার দাসী। বহু হিসাব-নিকাশ কইরাই তেরো নম্বর বচ্ছরে অজ্ঞাতবাস করতে পাণ্ডবরা বাইছা নিছে মৎস্যদেশের রাজা বিরাটের প্রাসাদ। পাশা খেলার শর্ত হিসাবে দুর্যোধন যদি এখন পাণ্ডবগো খুঁইজা বাইর করতে পারে তয় আরো বারো বচ্ছরের বনবাস আর এক বচ্ছর অজ্ঞাতবাস…

বিরাট রাজা পাশামশগুল আর শকুনির হাতে ধরা খাওয়ার পর গত বারো বচ্ছর প্র্যাকটিস কইরা যুধিষ্ঠির এখন পাশা এক্সপার্ট। কঙ্ক নাম নিয়া যুধিষ্ঠির দখল কইরা ফালায় বিরাট রাজার পাশাসঙ্গীর পদ। ভীম খায় যেমন বেশি রান্নাও করে ভালো; বল্লব ছদ্মনামের ভীম জায়গা পায়। বিরাটের বাবুর্চিখানায়। অর্জুনের পক্ষে ছদ্মবেশ নেওয়া কঠিন। কারণ ধনুকের ছিলার ঘষায় তার বাহুতে যে দাগ পড়ছে তা দেইখা যেকোনো আন্ধায়ও তারে তিরন্দাজ বইলা চিনা নিতে পারে। তাই বাজুবন্ধ-জাতীয় অলংকার দিয়া বাহুর দাগ ঢাইকা কানে দুল-হাতে শাঁখা- চুলে বেণি কইরা ছাইয়া পোশাকে হিজড়া হইয়া সে গিয়া খাড়ায় বিরাটের কাছে- মোর নাম বৃহন্নলা। বাড়ির মাইয়াগো নাচ গান বাদ্য শিখাইবার চাকরি প্রার্থনা করি মহারাজ…

পাঁচ বচ্ছরের অস্ত্র সংগ্রহকালে গন্ধর্বরাজ চিত্রসেনের কাছে শিখা নাচ গান বাজনার বিদ্যায় বিরাটের পরীক্ষায় পাশ দিয়া মহিলামহলের ড্যান্স মাস্টারের পদ পায় বৃহন্নলা অর্জুন। গ্রন্থিক নামের নকুল চাকরি পায় বিরাটের ঘোড়াশালে। তান্তিপাল নামের সহদেব হয় বিরাটের গরুর রাখাল আর নিজেগো মধ্যে কথাবার্তার লাইগা আরো পাঁচটা গুপ্তনাম রাখে পাঁচ ভাই; জয় জয়ন্ত বিজয় জয়সেন আর জয়দবল…

পাণ্ডবেরা জীবনে মাইনসের বাড়িতে খাটে নাই তাই আসার আগে ধৌম্য তাগোরে শিখাইয়া দেন। রাজার বাড়িতে থাকার কিছু নিয়ম-কানুন; পয়লা কথা হইল রাজার বাড়ি থাকার সময় না শব্দটা এক্কেবারে ভুইলা গিয়া রাজার সকল কথায় হ্যাঁ জনাব- জ্বি জনাব বলাটা আয়ত্ত করতে হবে সবার। রাজা যদি মিথ্যাকথা কন; তয় তারে সত্য বইলা মাইনা নিতে হবে; না হয় ধইরা নিতে হবে তোমার কান তা শোনে নাই। রাজা যেখানে বসেন; তা আসন হোক আর হাতিঘোড়াই হোক তাতে বসলে যেমন বেয়াদবি হয় তেমনি রাজার মুখামুখি বসলেও তুমি মারাত্মক বেয়াদব। রাজার পিছন দিকে থাকে বডিগার্ড তাই রাজার ডানে কিংবা বামেই বসা লাগে মুখে তালা দিয়া। রাজারে কোনোভাবেই কোনো উপদেশ যেমন দেওয়া যাবে না তেমনি রাজার সামনে নিজের বুদ্ধি কিংবা বীরত্বেরও বড়াই করা যাবে না। কিছু কইতে হইলে কওয়ার আগে রাজারে কিছু তেল মারা যেমন সাধারণ নিয়ম তেমনি কথার উপসংহার যেন রাজার পক্ষেই যায় সেইটাও চিরস্মরণীয় বিধান। কথাবার্তা যা। কওয়ার কইতে হইব আস্তে এবং বিনয়ের সাথে অনুমতি নিয়া। হা হা কইরা হাসা যাইব না। রাজার কথায় খুশিতে ডগমগ হওয়া যাইব না আবার দুঃখে কঁদুদু ভাবও দেখান যাইব না। হাঁটাচলা করতে হইব নিঃশব্দে। আর ফাইনাল কথা হইল রাজবাড়ির মাইয়াগো লগে পিরিতি; শত্রুগো লগে খাতির আর রাজার সামনে হাঁচি কাশি থুতু পাদ ঢেঁকুর এক্কেবারে নিষিদ্ধ জিনিস…

পাণ্ডবগো অজ্ঞাতবাসের মন্ত্রণা জানল শুধু ধৌম্য আর কৃষ্ণা দ্রৌপদীর সকল দাসদাসী বাবুর্চি রথের সারথি আর বাকিসব কর্মচারীগো সাথে যুধিষ্ঠিরের অগ্নিহোত্র নিয়া ধৌম্য চইলা গেলো পাঞ্চাল দেশে। ঘোড়া রথ গরুবাছুর গেলো দ্বারকায় কৃষ্ণের জিম্মায়। আর অস্ত্রগুলা থাকল মৎস্যদেশে ঢোকার মুখে বিশাল একটা গাছের খোড়লে লুকানো অবস্থায়…

বিরাটের ঘরে দশ মাস ভালোই গেলো সকলের। খালি দ্রৌপদীর রূপ নিয়া একটু দুশ্চিন্তায় থাকলেন বিরাটের রানি সুদেষ্ণা। যদি রাজার চোখে এই রূপ পড়ে তো নির্ঘাত তার কপালটা পুইড়া যাইতে পারে। এর মধ্যে এক দিন মৎস্যদেশে আইসা উপস্থিত সুদেষ্ণার ভাই আর বিরাটের সেনাপতি কীচক। দ্রৌপদীরে দেইখা তার চক্ষু ছানাবড়া। রাজবাড়ির দাসীর কাছে ঘুরাইন্যা-পেচাইন্যার কিছু নাই তাই কীচক সরাসরি যায় দ্রৌপদীর কাছে-বহুত টেকাপয়সা আর বৌয়ের সম্মান দিমু দাসী; তুই মোর কাছে আয়…

দ্রৌপদী বিনয়ের মধ্যেই থাকে- আমি মহাশয় এক বিয়াইত্তা নারী; এই সব করলে আমার ডর লাগে স্বামীর হাতে না আমার লগে আপনারও জান যায়…

বিরাটের সেনাপতি সে। দাসীর স্বামীরে ডরানোর কী কাম তার। সোজা আঙ্গুলে যখন ঘি উঠে না তখন সে তার বইনের কাছে যায়- তোমার দাসীরে আমার ঘরে পাঠানোর বন্দোবস্ত করো বইন…

সুদেষ্ণা দেখেন ভালৈ তো। স্বৈরিন্ধীরে যদি স্বামীর চোখ থাইকা সরাইতে হয় তবে ভাইয়ের ঘরে ঠেইলা দেওয়াই ভালো। তিনি কন- তুই ঘরে যা। আমি মদ আনার লাইগা তারে তোর ঘরে পাঠামু আইজ। তারপর যা করার কইরা নিবি তুই…

দ্রৌপদী মদ আনতে কীচকের ঘরে যাইতে গাঁইগুঁই করে- আপনের ভাইরে আমার কেমন জানি লাগে। আপনে মদ আনতে অন্য কাউরে পাঠান…

সুদেষ্ণা কয়-  আমি পাঠাইছি জানলে কীচক তোমারে কিছুই করব না। যাও…

কীচকের ঘরে পৌঁছাইলে কথা দিয়া দ্রৌপদীরে পটাইতে না পাইরা কীচক তার কাপড় ধইরা টানে। দ্রৌপদী কাপড় টাইনা নিলে কীচক ধরে হাত। এইবার দ্রৌপদী তারে ধাক্কা দিয়া দৌড় লাগায় রাজসভার দিকে আর পিছন পিছন গিয়া সকলের সামনে চুলের মুঠায় ধইরা কীচক দ্রৌপদীরে লাগায় কয়খান লাথি…

যখন সে সম্রাজ্ঞী আছিল তখন পাঁচ স্বামীর সামনে তার লাঞ্ছনার সময় ভীম আগাইতে গেলে আটকাইছে অর্জুন আর আইজ দাসী অবস্থায় ভীমেরে আটকায় যুধিষ্ঠির। তাই দ্রৌপদী কাইন্দা বিচার চায় বিরাটের কাছে। কিন্তু এক দাসীর লাইগা নিজের শালার আর কী বিচার করবেন বিরাট?

দ্রৌপদী কান্দে আর যুধিষ্ঠির কয়-  ভিত্রে যাও। এইখানে কান্নাকাটি করলে সভাসদের পাশা খেলায় ডিস্টার্ব হয়…

রাইতে সে যায় বল্লব ভীমের ঘরে- যুধিষ্ঠির যার স্বামী তার কপালে দুঃখ ছাড়া আর কিছু থাকব না সেইটা আমি জানি কিন্তু শুইনা রাখো; আগামীকাল সূর্য উঠা পর্যন্ত যদি কীচক বাঁইচা থাকে তবে বিষ খাওয়া দ্রৌপদীর মরা মুখ দেখবা তুমি…

ভীম তারে থামায়- প্রকাশ্যে করা যাবে না কিছু। তুমি তারে কাইল সন্ধ্যায় অন্ধকার নাচঘরে আসার লোভ দেখাও…

পরের দিন কীচক আবার দ্রৌপদীরে আটকায়- দেখলা তো; আমারে কিছু কওয়ার সাহস রাজারও নাই। তাই তোমারে কই; এখনো সময় আছে লাইনে আসো; টেকাপয়সা যা চাও দিমুনে…

দ্রৌপদী হাইসা কয়-  জানো তো আমি পরের বৌ। যদি কথা দেও যে তোমার আমার মোলাকাতের কথা কেউ জানব না; আর আসার সময় একলাই আসবা তাইলে তোমার প্রস্তাবে আমি রাজি…

সন্ধ্যা-রাত্তিরে একলা অন্ধকার নাচঘরে হাতড়াইয়া দ্রৌপদীরে পাইতে গিয়া কীচক সাক্ষাৎ পায় ভীমের। তারপর দ্রৌপদী গিয়া সকলরে ডাকে- নাচঘরে গিয়া দেখো আমার লগে বেয়াদবি করায় আমার স্বামীর হাতে কী দশা হইছে কীচকের…

সক্কলে গিয়া দেখে নাচঘরে পইড়া আছে কীচকের ভর্তা। কীচকের লাশ নিতে গিয়া দ্রৌপদীরে খাড়াইয়া হাসতে দেইখা কীচকের চ্যালারা কয়-  তোর লাইগা সেনাপতি মরছে তাই তোরেও তুইলা দিমু সেনাপতির চিতায়…

কীচকের চ্যালারা দ্রৌপদীরে বাইন্ধা রওনা দেয় আর দ্রৌপদী লাগায় এক চিক্কর- জয় জয়ন্ত বিজয় জয়সেন জয়দবল…

চিৎকারটা যে শোনার সে ঠিকই শোনে। কাপড় দিয়া মুখ বাইন্ধা ঘুরপথে গিয়া একটা গাছ উপড়াইয়া কীচকের সবগুলা চ্যালারে চ্যাপটা করার পর দ্রৌপদী এক পথে আর ভীম ঘুরপথে যখন রাজবাড়ি যায় তখন মৎস্যদেশের লোকজন দ্রৌপদীরে দেইখা ডরে কাপে আর ছাইয়াবেশী অর্জুন আইসা জিগায়- হুনলাম কী জানি কী গিয়াঞ্জাম হইছে? কও তো কেমনে কী হইল পরে? দ্রৌপদী কয়-  মাইয়ালোকের মাঝখানে তো আরামেই আছ। খামাখা এক দাসীর দুঃখ শুইনা তোমার কী কাম? অর্জুন দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে- হ। সকলেরই দুঃখু আছে খালি আমার কিছু নাই…

এক দাসীর লাইগা সন্ধ্যায় মরছে সেনাপতি আর ভোরে মরছে একশো পাঁচটা সৈনিক। রাজা বিরাট গিয়া রানি সুদেষ্ণারে কয়-  তোমার দাসীরে যেখানে ইচ্ছা যাইতে কও। তার স্বামী কোন দিন না জানি আমারেও মাইরা ফালায়…

রানি সুদেষ্ণার কথায় দ্রৌপদী কয়- অত দিন যখন রাখছেন আর তেরোটা দিন আমারে থাকতে দেন…

পুরা একটা বচ্ছর পাণ্ডবগো গরু খোঁজা খুঁজছে দুর্যোধন কিন্তু কোথাও কোনো সংবাদ পায় নাই। একেকবার মনে হইত মনে হয় বাঘ-ভাল্লুকের পেটে গেছে সব। কিন্তু আবার মনে হয় অতটুকু আশা করা বেকুবি ছাড়া কিছু না। অবশেষে কীচকের মরণবর্ণনা আর গাছের বাড়িতে একশো পাঁচ কীচক-চ্যালার চ্যাপটা হওয়ার সংবাদে লাফ দিয়া উঠে দুর্যোধন-পাইছি। এমন মাইর ভীম ছাড়া মারতে পারে না কেউ। আমি নিশ্চিত ওই সবগুলা মৎস্যদেশেই ঘাপটি মাইরা আছে। এখন গিয়া যদি তাগোরে ধরা যায় তবে নির্ঘাত আরো বারো বচ্ছরের বনবাস…

সাজাও সৈন্য লাগাও আক্রমণ…

দুর্যোধনের বন্ধু ত্রিগর্তরাজ সুশৰ্মা মৎস্যদেশের দক্ষিণ দিকে আক্রমণ কইরা বিরাটের বহু গরুবাছুর দখল কইরা নেয়। সংবাদ পাইয়া সৈন্যদের লগে যুধিষ্ঠির ভীম নকুল সহদেবরে নিয়া দক্ষিণ সামলাইতে আইসা সুশর্মার হাতে বিরাট রাজা ধরা খাইলে যুধিষ্ঠির কয়-  অত দিন যার ভাত খাইলাম তার বিপদে তো সাহায্য করতে হয়। ভীম একটু আউগা দেখি…

ভীম থাবা দিয়া গাছ উপড়াইতে গেলে যুধিষ্ঠির দাবড়ানি দেয়- হালা বেকুব। গাছ উপড়াইয়া লড়াই করতে গেলে পাব্লিকে যে তোরে চিনা ফালাইব সেই খেয়াল আছে? গাছ বাদ দিয়া তুই অন্যকিছু নে…

বিরাটরে মুক্ত কইরা সুশৰ্মারে চটকনা দিয়া গরুবাছুর উদ্ধার কইরা গদাই লস্করি চালে রাজা বিরাটের লগে চার পাণ্ডব বিজয় উদ্যাপন করে মৎস্যদেশের দক্ষিণ সীমানায় আর ঠিক তখনই দেশের উত্তর সীমানায় ভীষ্ম কৃপ দ্রোণ কর্ণ অশ্বত্থামারে নিয়া আক্রমণ শানায় দুর্যোধন…

রাজধানীতে যখন উত্তর সীমান্তের সংবাদ আসে তখন বাড়িতে একলা বেটামানুষ বিরাটের পোলা উত্তর। সংবাদ শুইনা মহিলামহলে গিয়া উত্তর লাফায়-ভীষ্ম কৃপ দ্রোণ কর্ণ অশ্বত্থামা দুর্যোধনের আমি একলাই পাদানি দিয়া চ্যাপটা কইরা দিতে পারি। কিন্তু আমার রথের সারথি তো মইরা গেছে কিছু দিন আগে। যুদ্ধের লাইগা আমিই যথেষ্ট কিন্তু আমার ঘোড়া চালাইব কেডায়?

উত্তরের ভড়ং দেইখা দ্রৌপদী কয়- যুবরাজ। তোমার বইন উত্তরার হিজড়া ডান্স মাস্টর কিন্তু খুব ভালো রথ চালাইতে পারে। দ্রৌপদীর কথা শুইনা উত্তরা দৌড়াইয়া গিয়া অর্জুনরে ধরে- খালি সারথির অভাবে আমার ভাই আইজ ভীষ্ম কৃপ দ্রোণ কর্ণ অশ্বত্থামা দুর্যোধনরে মারতে পারছে না। তুমি নাকি রথ চালাইতে জানো? তয় যাও না আমার ভাইটার লগে…

উত্তরের তাফালিং দেইখা অর্জুন হাসে আর উল্টাপাল্টা কইরা বর্ম কবচ পরতে গিয়া রাজমহলের মাইয়াগো হাসায়। বীরপুরুষের বেশে রথে উইঠা বৃহন্নলার ঘোড়া দাবড়ানি দেইখা টাসকি খায় উত্তর যুবরাজ আর কাছে গিয়া দুর্যোধন বাহিনীর আওয়াজ শুইনা মিনতি শুরু করে অর্জুনের কাছে-ও। খালাম্মা গো। বাজানে সকল আর্মি নিয়া গেছে। আমি একলা একটা ছুটু মানুষ; অতগুলা মাইনসের লগে আমি কেমনে কী করি কও? তোমার পায়ে ধরি গো খালাম্মা তুমি রথ ফিরাও। যুদ্ধ করব না। আমি…

লাফ দিয়া রথ ছাইড়া উল্টা দিকে দৌড় লাগায় উত্তর আর চুড়ি বাজাইয়া বেণি দুলাইয়া গিয়া তার চুলের মুঠায় ধইরা আটকায় অর্জুন আর তা দেইখা হাসে দুর্যোধনের সৈন্যসেপাই- হালার একটা কাপুরুষ আর একটা আধাপুরুষের লগে মারামারি করতে নি অত বড়ো বাহিনী আনছে দুর্যোধন?

উত্তররে রথে তুইলা অর্জুন কয়- যুদ্ধ করা লাগব না তোর। তুই রথ চালা…

উত্তররে নিয়া অর্জুন সেই অস্ত্রলুকানো গাছের কাছে গিয়া তারে ডালের খোড়লটা দেখায়-গাছে উঠ

গাছ থিকা নাইমা উত্তরের হার্ট অ্যাটাক হইবার জোগাড়- এইগুলা কার হাতিয়ার?

অর্জুন কয়-  পাণ্ডবগো

উত্তর কয়-  তারা তয় কই?

অর্জুন কয়-  তোমার বাপের লগে যে পাশা খেলে সে যুধিষ্ঠির। যে লোকটা তোমাগো রান্না পাকায় সে ভীম। তোমার সামনে খাড়া অর্জুন। ঘোড়ার পাহারাদার নকুল আর গরুর রাখালটা হইল সহদেব…

উত্তর কয়-  তোমার কাণ্ডে তাব্দা খাইলেও বিশ্বাস যাইতে কষ্ট হয় যে তোমরাই পাণ্ডব। তয় তুমি যদি অর্জুনের দশটা নাম কইতে পারো তবে তোমার সকল কথা মাইনা নিমু আমি…

— ধনঞ্জয় বিজয় শ্বেতবাহন ফালগুন কিরীটী বিভৎসু সব্যসাচী অর্জুন জিষ্ণু আর কাইলা বইলা ছুডুকালে বাজানে ডাকত কৃষ্ণ; হইছেনি দশটা নাম?

ধনুকের টঙ্কার শুইনাই দ্রোণ কন- নিশ্চিত অর্জুন…

দুর্যোধন কয়- তাইলে তো অজ্ঞাতবাসের এক বচ্ছর পূর্ণ হইবার আগেই ধরছি তারে। এখন নিশ্চিত আরো বারো বচ্ছর বনবাস…

দ্রোণ কন- তার তির সামলাইতে হাগা বাইরাইব এখন; বনবাস তো পরে

দুর্যোধন কয়-  এই বুড়া খালি অর্জুন অর্জুন করে। এরে পিছনে যাইতে কও…

কর্ণ সর্বদাই দুর্যোধনের পক্ষ আর অর্জুনের বিপক্ষে থাকে। বাপের অপমানে অশ্বত্থামা দুর্যোধনরে কিছু কইতে না পাইরা কর্ণের লগে কাইজা বাঁধায়। ভীষ্ম কাইজা থামাইয়া দুর্যোধনরে দিয়া গুরু দ্রোণের কাছে মাপ চাওয়ান আর কৃপ দ্রোণ কর্ণ ভীষ্মের তেলানিতে দ্রোণ তারে মাপ কইরা দিলে জ্যোতিষ-টুতিশ নক্ষত্র গণনা কইরা ভীষ্ম কন- তেরো বচ্ছর তো পুরা হইয়া গেছে তাগো…

দুর্যোধন কয়-  আমার হিসাবে এখনো তিন দিন বাকি

ভীষ্ম কন- তেরো বচ্ছর পুরা না হইলে অর্জুন দেখা দিত না তোমারে

দুর্যোধন কয়-  আপনে বরাবরই পাণ্ডবগো সাপোর্ট করেন; এখনো করতাছেন আর ভবিষ্যতেও করবেন। কিন্তু জাইনা রাখেন; বচ্ছর পুরা হউক আর না হউক। পাণ্ডবগো একমুঠা মাটিও দিমু না আমি। আপনে যুদ্ধের আয়োজন করেন…

যুদ্ধের সিদ্ধান্ত হইলে চাইর ভাগের এক ভাগ সৈনিক নিয়া হস্তিনাপুর রওনা দেয় দুর্যোধন। এক ভাগ সৈনিক সামলায় দখল করা গরু আর বাকি দুই ভাগ তৈয়ারি হয় অর্জুনের মোকাবেলায়…

অর্জুন উত্তররে কয়-  রথ ঘোরাও। আগে গরু আর দুর্যোধনরে ধরি…

দ্রোণ বুইঝা ফালান অর্জুনের প্লান। তিনি সবাইরে নিয়া রওনা দেন অর্জুনের পিছে। কিন্তু পৌঁছাইবার আগেই গরু উদ্ধার কইরা দুর্যোধনরে ধাওয়া করে অর্জুন। এমন সময় কুরু বাহিনী দেইখা অর্জুন কয়-  মুরব্বিরা থাউক। তুমি ঘুরুন্টি দিয়া কর্ণের কাছে যাও…

অর্জুনের হঠাৎ আক্রমণে কর্ণ পিছাইলে কৃপাচার্য আগাইতে আইসা রথের ঘোড়া খোয়াইয়া ভাগল দিলে অর্জুন মুখামুখি হয় দ্রোণের- আপনে আমার গুরু। আপনেরে মারব না আমি…

দ্রোণ কন- আমি দুর্যোধনের ভাত খাই। তুমি না মারলেও তোমারে যে আমার মারতে হবে বাপ…

অর্জুন কয়-  ঠিকাছে তয় তির চালান

দুইজনেই দুইজনের আশপাশ দিয়া কতক্ষণ তিরাতিরি করে আর বাপেরে অর্জুনের লগে যুদ্ধ করতে দেইখা অশ্বত্থামা আগাইয়া আসলে চামে কাইটা পড়েন দ্রোণ। অশ্বত্থামার তির শেষ হইলে তারে ছাইড়া কর্ণের শরীরে একটা তির বিধাইয়া অর্জুন গিয়া তিরাতিরি শুরু করে ভীষ্মের সাথে। এর মাঝে দুর্যোধন আইসা পড়লে ভীষ্মের দেহে একটা তির ঢুকাইয়া অর্জুন সরাসরি তির চালায় দুর্যোধনের বুকে…

তীর খাইয়া দুর্যোধন রক্তবমি করতে করতে দৌড়ান দিলে অর্জুন রওনা দেয় বিরাটের রাজধানীর দিকে। ফিরতে ফিরতে উত্তররে কয়-  খবরদার। বাড়ি গিয়া আমার পরিচয় দিবা না কলাম। বলবা যা কিছু ঘটছে তার সবই ঘটাইছ তুমি…

বাড়ি ফিরা বিরাট আছড়ায় কপাল- ভীষ্ম কৃপ দ্রোণ কর্ণ অশ্বত্থামা দুর্যোধনের লগে যুদ্ধ করতে গেছে তার নাদান পোলা এক হিজড়ারে নিয়া। সে বুক থাবড়ায় আর কয়-  তোমরা আউগাইয়া দেখো আমার পোলায় অতক্ষণ বাঁইচা আছে কি নাই…

কিন্তু উত্তরের সন্ধানে নামার আগেই লোকজন শোনে জয়জয় ধ্বনি। সবাইরে ডিফিট দিয়া গরু নিয়া ফিরতাছে উত্তর। পোলার কীর্তি দেইখা বিরাট লাফ দিয়া উঠলে উত্তর কয়-  আমি কিছু করি নাই। একজন দেবতা আইসা যা কিছু করার কইরা দিয়া চইলা গেছেন আবার…

তিন দিন পর অজ্ঞাতবাসের এক বচ্ছর পূর্ণ হইলে পাণ্ডবেরা বিরাটের কাছে নিজেগো পরিচয় দেয়। বিরাট তাব্দা খাইয়া কয়-  অত বড়ো মানুষগুলা যখন অত দিন আমার বাড়িতে ছিলেন তখন এই পরিচয় সূত্রটারে আমি আত্মীয়তায় স্থায়ী কইরা নিতে চাই অর্জুনের লগে আমার মাইয়া উত্তরার বিবাহ দিয়া…

অর্জুন কয়-  আপনের কইন্যা আমার ঘরে যাবে। তয় সেইটা হবে আমার পুত্রবধূ হিসাবে। আমার পোলা আর কৃষ্ণের ভাগিনা অভিমন্যুর সাথে বিবাহ হইব তার…

অর্জুনের প্রস্তাবে দ্রৌপদী মুখটিপা হাসে। এমন বিয়ার প্রস্তাব অর্জুন কেন ফিরাইয়া দিছে আর কেউ জানুক; দ্রৌপদী তো জানে…

.

১২

তেরো বচ্ছর দূরে দূরে বড়ো হইয়া জোয়ান পোলারা যেমন না পারে মায়েরে মায়ের মতো ভাবতে তেমনি দ্রৌপদীও পারে না ফিরাইয়া আনতে তেরো বচ্ছর আগে হারাইয়া ফেলা মাতৃত্বের রূপ। তাই অভিমন্যুর বিবাহেও দ্রৌপদী নেহাত পাণ্ডববধূরূপে রূপের ঝলকানি দেওয়া সাজগোজ করে আর উত্তরার লগে ছোট ভাই অভিমন্যুর বিবাহে যোগ দিয়া দ্রৌপদীর পাঁচ পোলা; প্রতিবিন্ধ্য- সুতোসোম শ্রুতকর্মা- শতানীক আর শ্রুতসেন থাকে দূরে দূরে সাধারণ অতিথির মতো…

উত্তরা অভিমন্যুর বিবাহ উসিলায় মৎস্যদেশের উপপ্লব্য নগর পরিণত হইছে কুন্তী আর দ্রৌপদীর পিতৃ বংশের সমাবেশস্থলে। নিজের দুই পোলা বলরাম আর কৃষ্ণরে নিয়া হাজির হইছেন স্বয়ং বসুদেব; যাদব বংশীয় অসংখ্য যোদ্ধা আর প্রধানের লগে আছে প্রদ্যুম্ন- শাল্ব আর সাত্যকিও। দুই পোলা ধৃষ্টদ্যুম্ন আর শিখণ্ডীর লগে বিশাল এক সেনাবাহিনী নিয়া আসছেন দ্রৌপদীপিতা পাঞ্চালরাজ দ্রুপদ…

বিবাহের পর দিনই বসে পাণ্ডবগো বনবাসোত্তর প্রথম রাজনৈতিক সভা। দ্বারকা-পাঞ্চাল গোত্রের সাথে এই সভায় যোগ দেয় পাণ্ডবগো নতুন সম্বন্ধী মৎস্যদেশের রাজপরিবার আর সকলের সামনে সভায় প্রসঙ্গটা উত্থাপন করে কৃষ্ণ…

সংক্ষেপে কাহিনি বয়ান শেষে কৃষ্ণ সকলের দিকে তাকায়-যুধিষ্ঠির এইবার তার ন্যায্য পাওনা চান; আপোসে যদি তা না পাওয়া যায় তবে যুদ্ধেও পিছপা হবেন না তিনি। এখন আমাদের দায়িত্ব হইল দ্বিতীয় পন্থার লাইগা যুধিষ্ঠিরের হাত শক্তিশালী করা। তয় যুদ্ধ ঘোষণার আগে দুর্যোধনের মনোভাব জানা প্রয়োজন। তাই আমার প্রস্তাব হইল; একজন চালাকচতুর দূত পাঠানো হউক দুর্যোধন কী করতে চায় না চায় তা জানতে আর পাশাপাশি চলুক নিজেগো শক্তির সমন্বয়…

কৃষ্ণ তার কাহিনি বয়ানে যুধিষ্ঠিরের প্রশংসা আর দুর্যোধনের পুরাটাই বদনাম করে। এই জিনিসটা পছন্দ হয় না বলরামের-দূত পাঠানোর প্রস্তাব ভালো। তয় সেইটা যেন যুদ্ধ বাঁধানোর দূতিয়ালি না হইয়া সত্যি সত্যি শান্তির লাইগাই হয় সেইটাও খেয়াল রাখতে হবে। কারণ আমার মতে দুর্যোধন কোনো অন্যায় যেমন করে নাই তেমনি পাণ্ডবগো পৈতৃক সম্পত্তিও সে দখলও করে নাই। পাশা খেলার শর্তমতেই পাণ্ডবরাজ্যের ন্যায্য অধিকারী হইছে সে। বেকুবি আর অন্যায় যদি কেউ কইরা থাকে তয় তা করছে যুধিষ্ঠির। কারণ লাফাইতে লাফাইতে সে নিজের বুদ্ধিতেই শকুনির লগে পাশা খেইলা হারাইছে বাপের রাজ্যপাট…

বলরামের কথায় খেইপা উঠে সাত্যকি- তুমি যেমন চাষা। তোমার কথাবার্তাও সেই রকম চাষামার্কা খ্যাত; দুর্যোধন কোনো অন্যায় করে নাই; ঢংয়ের কথা কও? কথা যদি কইতেই হয় তো এইখানে আমরা দুর্যোধনরে সাপোর্ট করতে আসছি না যুধিষ্ঠিররে সাহায্য করতে আসছি সেইটা বুইঝা কথা কইলে সবার লাইগাই ভালো। কৌরবরা যতই কউক না কেন অজ্ঞাতবাসের তিন দিন থাকতেই পাণ্ডবগো তারা খুঁইজা বাইর কইরা ফালাইছে; কিন্তু এইখানে আমাদের সকলের সিদ্ধান্ত হইল কথাটা আমরা মানি না। আমরা সকলেই মনে করি পাণ্ডবরা পাশা খেলার সবগুলা শর্তই অক্ষরে অক্ষরে পালন করছে। তাই এখন আমাগো দায়িত্ব হইল পাণ্ডবগো তাদের ন্যায্য মাটি ফিরা পাইতে সাহায্য করা। দুর্যোধন যদি ভালোয় ভালোয় ফিরাইয়া দেয় তয় ভালো। আর যদি না দেয় তয় আমরা সকলেই যুধিষ্ঠিরের পক্ষে যুদ্ধ করব। এইটাই সারকথা…

দ্রুপদ সাত্যকিরে সমর্থন কইরা কথা আগে বাড়ায়-দুর্যোধন এমনি এমনি দিব না। ধৃতরাষ্ট্র পোলার কথায় উঠেন বসেন; সুতরাং তিনিও ভিন্ন কিছু বলবেন না। ভীষ্ম দ্রোণ কৃপ কুরুরাজের বেতনভুক পোষ্য; দুর্যোধনের সিদ্ধান্তের বিপক্ষে যাওয়ার ক্ষমতা তাগো নাই। আর কর্ণ শকুনি দুঃশাসন তো সর্বদাই দুর্যোধনের পক্ষের মানুষ। সুতরাং বলরামের কথা আমিও সমর্থন করতে পারলাম না। আমি বরং মনে করি দুর্যোধনের কাছে গিয়া বেশি মিঠা কথা কইলে সে আমাগো দুর্বল ভাবতে পারে। তাই আমার মত হইল দেরি না কইরা আরো সৈন্য সংগ্রহের লাইগা এখনই বিভিন্ন দিকে সুযোগ সন্ধান শুরু করা ভালো। আমি যদ্দুর জানি দুর্যোধন অলরেডি সৈন্য সংগ্রহ শুরু কইরা দিছে। তাই যত আগে আমরা মিত্রগো পক্ষে টানতে পারি তত লাভ। তয় এই সবের লগে দূতিয়ালিও চলুক। সেই ক্ষেত্রে দূত হিসাবে আমি আমার পুরোহিতরে হস্তিনাপুর পাঠাইতে পারি; কৃষ্ণ তারে বুঝায়ে দিবেন তিনি কী কইবেন না কইবেন কুরুরাজের কাছে…

বলরাম বেকুবটা যেখানেই থাকে সেখানেই প্রসঙ্গ না বুইঝা কথা কইতে গিয়া সব মাটি কইরা দেয়। আর সেইটা কাটাইতে গিয়া সাত্যকি আবার পুরাটাই গান্ধা কইরা ফালায়। এই বলরাম আর সাত্যকির ঠোকাঠুকির লাইগা একবার ভীমের পোলা কী নাকান-চুবানটাই না দিছে কৃষ্ণরে। তাই এইবার আগে থাইকাই কৃষ্ণ যুধিষ্ঠিররে কইয়া দিছে এই আলোচনায় যেন ঘটোৎকচ না থাকে। কৃষ্ণের কথায় যুধিষ্ঠির তারে বিয়াতেও নিমন্ত্রণ করে নাই। কিন্তু নিজের সাক্ষাৎ বড়ো ভাই বলরাম; সারা বংশের মানুষ যেখানে আসতাছে সেইখানে ভাগিনার বিয়ায় তো আর তারে আসতে নিষেধ করা যায় না…

আলোচনাটা আর চালানোও সম্ভব না। সংক্ষেপে সভা শেষ করার লাইগা কৃষ্ণ পয়লা বলরামরে সাপোর্ট কইরা ঠান্ডা করে- ভাইজানের কথাটা ফালান দিবার মতো না। কুরু-পাণ্ডব দুই বংশের লগেই আমাদের সমান সম্বন্ধ। দুর্যোধন আমার পোলার শ্বশুর আর আমি পাণ্ডবগো মামাতো ভাই। অন্য দিকে ভীম আর দুর্যোধন দুইজনই বলরামের সাক্ষাৎ শিষ্য। তাই আমরা দুই পক্ষেরই যেমন মঙ্গল চাই তেমনি শান্তিও চাই। তয় মূল কথা হইল এইখানে আমরা উত্তরা-অভিমন্যুর বিবাহে দাওয়াত খাইতে আসছি; যুদ্ধের আলোচনা করতে আসি নাই। তাই আমি কই কি; দ্রুপদরাজ যে প্রস্তাব দিছেন সেইটাই সবচে ভালো প্রস্তাব। আপনি আপনের পুরোহিতরেই হস্তিনাপুর পাঠান। আপনে মুরুব্বি মানুষ কী কইতে হইব না হইব তা আপনিই তিনারে বুঝাইয়া দেওয়া সব থিকা ভালো। আর এরপরে কী করতে হবে না হবে তা থাউক পাণ্ডবগো সিদ্ধান্তের উপর। বিবাহের খানাপিনা আর আদর আপ্যায়নের লাইগা সকলের পক্ষ থিকা আমি মৎস্যদেশের রাজা বিরাট আর তার পরিবাররে ধন্যবাদ জানাই। সুখী জীবন কামনা করি উত্তরা আর অভিমন্যুর। অনুমতি দিলে আমরা এখন সকলে যার যার ঘরে ফিরা যাই। তারপর পাণ্ডবগো আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব পাওয়ার পর স্বতন্ত্রভাবে সিদ্ধান্ত নিমু কে কার পক্ষে যুদ্ধ করব আর কার পক্ষে না…

দ্বারকাবাসীরা চলে যায়। দ্রুপদের পুরোহিত রওনা দেয় হস্তিনাপুর। যুধিষ্ঠির-বিরাট আর দ্রুপদ নিতে থাকেন যুদ্ধের প্রস্তুতি। সকল সংবাদ পৌঁছায় দুর্যোধনের কানে এবং দ্রুততালে সে চালায়ে যায় তার মিত্র আর সৈন্যের সন্ধান…

যুদ্ধে সহায়তার আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব নিয়া একই দিনে একইসাথে কৃষ্ণের ঘরে হাজির হয় দুর্যোধন আর অর্জুন। দুইজনেই কৃষ্ণের আত্মীয়। কাউরেই যেমন ফিরান সম্ভব না তেমনি উচিতও না। তাই কৃষ্ণ তার সামরিক ক্ষমতারে দুই ভাগে ভাগ করে; এক ভাগে থাকে তার দুর্ধর্ষ নারায়ণী গোপ সৈন্য আর অন্য ভাগে থাকে নিরস্ত্র কৃষ্ণ নিজে। নারায়ণী সৈন্য যাবে ভাড়ায় আর কৃষ্ণ যাবে বিনা। পয়সায়। কৃষ্ণ পক্ষ নিব কিন্তু যুদ্ধ করব না কোনো পক্ষেই। আর অর্জুন যেহেতু বয়সে দুর্যোধন থাইকা ছোট তাই কৃষ্ণ প্রথমে অর্জুনরেই সুযোগ দেয় দুই ভাগ থাইকা যেকোনো একটা পছন্দ কইরা নিতে…

–কৃষ্ণ বিন্দুমাত্র দ্বিধা না কইরা নিরস্ত্র কৃষ্ণরেই বাইছা নেয় অর্জুন আর কৃষ্ণের গোপ সৈন্য ভাড়া পাইয়া খুশি হইয়া বলরামের কাছে যায় দুর্যোধন। সিধাঁধা এই মানুষটার কাছে কুরু-পাণ্ডব যুদ্ধ মানে তার দুই সাক্ষাৎ গদার শিষ্য ভীম আর দুর্যোধনের লড়াই। সে দুর্যোধনরে কয়- বহুত চেষ্টা করলাম যুদ্ধ থামাইতে। কিন্তু দেখলাম কৃষ্ণ এর মধ্যেই পক্ষ ঠিক কইরা ফালাইছে। কিন্তু আমি যেহেতু কাউরে ফালাইয়া কাউরে টানতে পারব না। তাই আমার সিদ্ধান্ত হইল আমি কারো পক্ষেই যামু না। যুদ্ধ করব না আমি…

দুর্যোধন দ্বারকা থিকা আরো কিছু কমবেশি প্রতিশ্রুতি নিয়া বাড়ি যায় আর অর্জুন কৃষ্ণরে কয় যুদ্ধে তুমি হইবা আমার সারথি…

যুধিষ্ঠিরের আমন্ত্রণে নকুল সহদেবের মামা মদ্ররাজ শল্যে আসতাছিলেন ভাগিনার কাছে। কিন্তু আসার পথে দুর্যোধন তারে পটাইয়া নিজের পক্ষে নিয়া যায়। তিনি পক্ষ পরিবর্তনের সংবাদটা ভাগিনারে জানাইতে আসলে যুধিষ্ঠির কয়- অসুবিধা নাই মামা আপনে দুর্যোধনের পক্ষেই যুদ্ধ করেন। কারণ আমি জানি শত্রুপক্ষে যুদ্ধ করলেও আপনে আমাগোরে মায়া কইরা মারবেন যাতে না মরি। সেইটা নিয়া আমি ভাবি না। তয় আপনে যেহেতু মামা কৃষ্ণের সমান যোদ্ধা তাই দুর্যোধন যেন আপনের সম্মানটা রাখে সেইটা একটু দেইখেন…

এমন তেলানিতে শল্য চক চক কইরা উঠে- তুমি সর্বদাই সত্য কথা কও; আর আমি যে কৃষ্ণের সমান এই কথাটাও তুমি ছাড়া কেউ স্বীকার করতে নারাজ। তয় সম্মান রাখার কথাটা একটু বুঝাইয়া কও তো ভাগিনা…

যুধিষ্ঠির কয়-  নিশ্চয়ই শুনছেন মামা; কৃষ্ণ কিন্তু যুদ্ধে যোগ দিলেও যুদ্ধ করব না। সে হইব পাণ্ডবপক্ষের সবচে বড়ো যোদ্ধা অর্জুনের সারথি। এখন আপনে যদি অস্ত্র লইয়া সৈনিকগো লগে দৌড়াদৌড়ি করেন তাইলে তো কৃষ্ণের লগে আর আপনের সমানে-সমান মর্যাদাটা রক্ষা হয় না। তাই আমি কই কি; আপনে যদি কুরুপক্ষের শ্রেষ্ঠ যোদ্ধা কর্ণের সারথি হইতে পারেন তাইলে কৃষ্ণের লগে আপনের সমান মর্যাদা রক্ষায় আর কোনো সমস্যা থাকে না…

শল্য কয়- বুদ্ধি খারাপ দেও নাই ভাগিনা। কিন্তু তাই বইলা ছোটলোকের পোলার রথ চালাইতে হইব মোর?

যুধিষ্ঠির কয়-  সেইটা করলে আপনে ভাগিনাগো সবচে বড়ো উপকারটাও করতে পারবেন মামা…

শল্য কয়-  কেমনে?

যুধিষ্ঠির কয়- কর্ণের রথ চালাইতে চালাইতে আপনে মনের সাধ মিটাইয়া সারাক্ষণ তারে গালাগালি করবেন। তাতে মাথাগরম কর্ণ আউলা হইয়া উল্টাপাল্টা অস্ত্র চালাইব আর এক ফাঁকে আপনের ভাগিনা অর্জুন তারে পাইড়া ফেলব খ্যাতে…

শল্য হিসাব কইরা দেখে মন্দ না। কৃষ্ণের সমান মর্যাদাও পাওয়া যাবে আর ভাগিনাদের উপকারও করা যাবে সব থিকা বেশি- আমি রাজি ভাগিনা…

মোট সাতটা বাহিনী জোগাড় হইছে পাণ্ডবগো। তার মধ্যে বড়ো তিনটা আত্মীয় বাহিনী: দ্রুপদের পাঞ্চালসেনা; বিরাটের মৎস্যসেনা আর ঘটোৎকচের একচক্রাসেনা। এর বাইরে আছে সাত্যকির যাদবসেনা; ধৃষ্টকেতুর চেদিসেনা; জয়ৎসেনের মগধসেনা আর খুচরা কিছু সৈনিক নিয়া পাণ্ডবগো নিজস্ব একটা বাহিনী…

অন্য দিকে ধৃতরাষ্ট্রপুত্র বিন্দু আর অনুবিন্দুর অবন্তি বাহিনী; মেয়েজামাই জয়দ্রথের সিন্ধু বাহিনী; দুর্যোধনের শ্বশুর ভগদত্তের চীনা আর কিরাতসেনা এবং নিজস্ব তিনটা বাহিনী নিয়া দুর্যোধনের পারিবারিক বাহিনীর সংখ্যা ছয়। কৃষ্ণের কাছ থিকা আনা কৃতবর্মার অন্ধক ও যাদবসেনা; শল্যের মদ্রসেনা; যবন আর শক সেনা নিয়া সুদক্ষিণের কম্বোজ বাহিনী; নীলের নেতৃত্বে দক্ষিণাত্যের মহিষ্মন্তিসেনা আর সোমদত্তের পুত্র ভূরিশ্রবার বাহিনী। মোট এগারোটা বাহিনী প্রস্তুত দুর্যোধনের পক্ষে লড়াই করার লাইগা…

দুই পক্ষে সেনাসংগ্রহের মাঝে এক দিন সন্ধির প্রস্তাব নিয়া দ্রুপদের পুরোহিত আইসা হাজির হন। রাজা ধৃতরাষ্ট্রের কাছে। পয়লা মিঠা কথায় বনবাসে পাণ্ডবগো দুর্দশার কথা কইয়া রাজা ধৃতরাষ্ট্রের মন গলানোর চেষ্টা করেন। তারপর পাণ্ডবগো লগে শকুনি দুর্যোধনের দুষ্কর্ম আর অন্যায়ের কিছু ইঙ্গিত দিয়া তিনি সভাজনের কাছে অনুরোধ করেন যেন তারা পাণ্ডবগো ন্যায্য পাওনার লাইগা। রাজা ধৃতরাষ্ট্ররে সুপারিশ করেন। তারপরে তিনি এইটাও স্মরণ করাইয়া দেন যে পাণ্ডবরা মোটেই বিবাদ চায় না কিন্তুক কুরুদের সৈন্যসংখ্যা যত বেশিই হোক না ক্যান; যুদ্ধ শুরু হইলে পাণ্ডবগো সামনে টিকতে পারব না তারা। কারণ ভীম অর্জুনের অস্ত্রের লগে কৃষ্ণের বুদ্ধিও যোগ হইছে পাণ্ডব শিবিরে এখন…

ভীষ্ম কন-কথা ঠিকাছে; পাণ্ডবগো অধিকারও ঠিকাছে আবার আপনার প্রস্তাবও ঠিকাছে। কিন্তু মনে লয় আপনে আমাগো ডর দেখাইতে আসছেন। কথা কইবেন কন; কিন্তু ভয়টয় কিছু দেখাইয়েন না কলাম…

কর্ণ খেইপা উঠে পুরোহিতের দিকে-ব্রাহ্মণ হইয়া অন্যায় আব্দার আপনে ক্যামনে করেন? পাণ্ডবরা যদি প্রতিজ্ঞা পালন করত তবে আপনে না কইলেও দুর্যোধন সসম্মানে তাগোর রাজ্য ফিরাইয়া দিত। কিন্তু তারা তো অজ্ঞাতবাসের এক বচ্ছর পুরা হইবার তিন দিন আগেই ধরা খাইছে। এখন তারা যদি রাজ্য ফিরা পাইতে চায় তবে গিয়া কন যেন শর্তমতে আরো বারো বছর বনবাস আর এক বচ্ছর অজ্ঞাতবাস শেষ কইরা যেন আসে…

হস্তিনাপুরের রাজনীতিতে কর্ণরে কোনো দিনও সহ্য করতে পারেন না ভীষ্ম। তিনি এইবার পুরোহিতরে ছাইড়া কর্ণরে ধরেন- অত লাফাইও না তুমি। মৎস্যদেশে অর্জুন কী পাদানিটা দিছিল মনে আছে তো? এই ব্রাহ্মণের কথা না শুনলে যুদ্ধক্ষেত্রে কিন্তু মাটি খাইতে হইব সবার…

ধৃতরাষ্ট্র দুইজনরে থামাইয়া দ্রুপদের দূতরে কন- যা কইছেন তা আমি শুনছি আর বিবেচনাও করতাছি। এখন চিন্তাভাবনা কইরা উত্তর দিবার লাইগা আমারে কিছু সময় দেন। আমি আমার বক্তব্য দিয়া পাণ্ডবগো কাছে অতি শিল্পির সঞ্জয়রে পাঠামু কইয়েন…

ধৃতরাষ্ট্র সঞ্জয়রে ডাইকা কন- আমি কিন্তু পাণ্ডবগো কোনো দোষ দেখি না। কুরুদেশে দুর্যোধন আর কর্ণ ছাড়া অন্য কেউ তাগোর দোষ দেখে কি না তাও আমার জানা নাই। কিন্তু কী আর করব কও? নিজের পোলারে তো ফালাইতে পারি না। যাই হউক; আমিও মনে করি ভীম অর্জুন আর কৃষ্ণ। যেইখানে একলগে আছে সেইখানে যুদ্ধের আগেই যুধিষ্ঠিররে তার রাজ্য ফিরাইয়া দেওয়া ভালো। অজ্ঞাতবাসের তিন দিন বাকি না বচ্ছর পুরা হইছে তা এখন ভাবা অবান্তর। আমার চরদের কাছে বসুদেবের পোলা কৃষ্ণের যে কাহিনি শুনছি তাতে রাত্তিরে আমার ঘুম হয় না সঞ্জয়। তার উপ্রে শুনতাছি অর্জুন আর কৃষ্ণ সর্বদা একই রথে থাকব। বিষয়টা তুমি বুঝতে পারতাছ সঞ্জয়? তুমি যুধিষ্ঠিরের কাছে গিয়া কও- তোমার জ্যাঠা মোটেও যুদ্ধ চান না। তারপর নিজের বুদ্ধি খাটাইয়া এমন কিছু কইবা যাতে যুধিষ্ঠির খুশি হয়। তয় আমাগো লগে কারা কারা আছে তাও একটু শুনাইয়া দিও; যাতে আমাগো অতটা ফেলনা মনে কইরা না বসে। অবশ্য খেয়াল রাইখ যেন তারা খেইপা না যায়…

সঞ্জয় যুধিষ্ঠিররে যথেষ্ট তেলাইয়া কয়-  রাজা ধৃতরাষ্ট্র তার ভাতিজাগো মঙ্গলকামনার লগে লগে সকলের লাইগা শান্তি চান। তাছাড়া পঞ্চপাণ্ডবের লগে যেইখানে কৃষ্ণ ধৃষ্টদ্যুম্ন চেকিতানরা আছে সেইখানে যুদ্ধ কইরা খামাখা বংশক্ষয় করার মতো বোকা তিনি নন। কারণ কুরু-পাণ্ডব দুই বংশেরই অভিভাবক তিনি। তাই আমি কই তোমরাও শান্তির পথে ভাবো। কারণ বুইঝা দেখো; যুদ্ধ চাইলে কিন্তু তোমাগো যুদ্ধ করতে হইব ভীষ্ম দ্রোণ অশ্বত্থামা কৃপ শল্য কর্ণ আর দুর্যোধনের লগে। সেইটাও কিন্তু খুব সোজা কাম না তা নিশ্চয়ই তুমি ভালো কইরা জানো যুধিষ্ঠির…

সঞ্জয় এইবার কৃষ্ণ আর দ্রুপদের দিকে ফিরে- আপনেরা মুরুব্বি মানুষ। আপনাগোরেই কই; ভীষ্ম ও ধৃতরাষ্ট্র চান যে আপনেরাই দুই বংশে শান্তির ব্যবস্থা করেন…

যুধিষ্ঠির কয়- যুদ্ধ ছাড়াই যদি যুদ্ধের জিনিস পাওয়া যায় তো কোন আক্কেলে আমি যুদ্ধ করতে যামু? কিন্তু জ্যাঠা ধৃতরাষ্ট্রের নিজের বুদ্ধি ভালো হইলেও চলার সময় তো তিনি তার পোলা দুর্যোধনের বুদ্ধি নিয়া চলেন; যে আবার লাফায় দুঃশাসন কর্ণ আর শকুনির কথায়। কথা হইল; বহু দিন তারা পুরা রাজ্য ভোগ দখল করছে। এইবার আমারে আমার ইন্দ্রপ্রস্থ ফিরাইয়া দিলে আমিও আগে যা হইছে তা ভুইলা গিয়া যুদ্ধটুদ্ধের কথা চিন্তাও করুম না আর…

সঞ্জয় কয়-  এমন কথা কইও না যুধিষ্ঠির। আমার মতে তারা যদি রাজ্যের ভাগ নাও দেয়; তবু তোমার শান্তির পথে যাওয়াই উত্তম। শান্তি বহুত বড়ো জিনিস। তুমি যদি কৃষ্ণের গ্রামে গিয়া ভিক্ষা কইরাও খাও তবুও বহুত শান্তিতে থাকবা; যা তুমি যুদ্ধ কইরা রাজ্য পাইলেও পাইবা না কোনো দিন। জীবন আর কয় দিন বলো? আমি কই কি তুমি তাগোরে যা দিছ তা তো দিয়াই দিছ; এইবার বাকি জীবনটা শান্তিতে কাটানোর ব্যবস্থাই দেখো…

যুধিষ্ঠির এইবার সঞ্জয়রে ঠেইলা দেয় কৃষ্ণের দিকে আমরা দুইজনেই দুইজনের বক্তব্য কইলাম। কৃষ্ণ নিরপেক্ষ মানুষ; আমি তার কাছেই তুইলা দিলাম বাকি বিচারের ভার…

কৃষ্ণ আবার বল ঠেলে যুধিষ্ঠিরের দিকে-বুঝলা সঞ্জয়। যুদ্ধ না কইরা যদি উপায় থাকে তবে যুধিষ্ঠির নিজের ভাই ভীমরে হাত পা বাইন্ধা আটকাইয়া যুদ্ধ থামানোর পক্ষে আছেন। তয় কথা হইল কি; কৌরবরা তো ডাকাইত। আর তুমি তো জানোই যে ডাকাইত মারা পুণ্যের কাম। আর ধরো গিয়া ভীষ্ম দ্রোণ ধৃতরাষ্ট্র কৃপ এরা মুরুব্বি হইলেও তারা ডাকাইতের ঠাঙ্গিদার। কারণ দ্রৌপদীর লগে যা করা হইছে তা তো তাগো চোখের সামনেই হইছে। এই সব বুইড়ারা তো সেই কলঙ্ক না থামাইয়া দুর্যোধনরে বলতে গেলে ইন্ধনই দিছেন। আমার মনে হইতাছে সঞ্জয়; পাশা খেলার পরে কুরুসভায় পাঞ্চালীর লাঞ্ছনার ঘটনাটা তুমি নিজে ভুইলা গিয়া আমাদেরও ভুইলা যাইতে কইতাছ। তা যাই হউক; পাণ্ডবগো ক্ষতি না কইরা যদি শান্তি করা যায় তয় আমি সেইটার পক্ষে কাজ করতে রাজি। কিন্তু আমার কথা কি তোমার কৌরবরা মানব? মনে তো হয় না। তাই আজকের আলোচনার সারকথা হিসাবে তুমি রাজা ধৃতরাষ্ট্ররে কইবা যে; পাণ্ডবগো যুদ্ধ করার যথেষ্ট ক্ষমতা থাকলেও তারা মূলত শান্তিকামী। তারা তাগো ন্যায্য পাওনাটা চায়; আপনি সেই ব্যবস্থা করেন…

–হহ। জ্যাঠারে আমার প্রণাম দিয়া কইও আমরা পাঁচ ভাইরে যদি পাঁচটা গ্রাম দেওয়া হয় তবে আর কিছুই চাওয়ার নাই আমাদের…

ধুম কইরা যুধিষ্ঠিরের এই প্রস্তাবে বেকুব হইয়া বইসা থাকে কৃষ্ণসহ সবাই আর হস্তিনাপুর ফিরা গেলে সঞ্জয়রে জাপটাইয়া ধরেন ধৃতরাষ্ট্র-কী সংবাদ কও?

সঞ্জয় কয়-  মহারাজ অবস্থা খারাপ। এর বেশি কিছু এখন কইতে পারব না। আমারে এক রাইত ঘুমাইতে অনুমতি দেন; বিস্তারিত কাইল সকালে সকলের সামনে কমু মহারাজ…

ভোরবেলা প্রধানমন্ত্রী বিদুররে ডাকেন ধৃতরাষ্ট্র- পাণ্ডবগো শিবিরে গিয়া ডর খাইছে সঞ্জয়। তার ডর দেইখা সারা রাইত ডরে আমারও ঘুম হয় নাই ভাই…

বিদুর কয়-  আপনি তো মহারাজ একান্তে আমার সব কথাই বোঝেন কিন্তু পোলার সামনে গেলে তো আবার নিজের বুঝ পাল্টাইয়া ফেলেন। তা আমি আর কী কমু কন? যুধিষ্ঠির তো আপনেরে মান্যই করত; এখনো করে। আপনি খালি তার বাপের অংশটা তারে দিয়া দেন; আমি নিশ্চিত কইতে পারি যে সে আপনেরে আবার মাথায় তুইলা রাখব…

ধৃতরাষ্ট্র স্বীকার যান-কথা সত্য বিদুর। দুর্যোধন সামনে না থাকলে কোনো দিনও তোমার মতের লগে কোনো অমত হয় না আমার। কিন্তু পোলাটা সামনে আসলে যে কী হয় আমার। কপাল বিদুর। সবই কপাল…

পর দিন সকালে রাজসভায় সঞ্জয় বিস্তারিত কইয়া উপসংহার টানে-যুদ্ধ লাগলে পাণ্ডবরা আমাগো নির্বংশ কইরা ফালাইব মহারাজ…

সঞ্জয়রে সমর্থন করেন ভীষ্ম- আমিও তাই বলি দুর্যোধন। কৃষ্ণ আর অর্জুন যেইখানে একসাথে আছে সেইখানে যুদ্ধে আমাগো পরাজয় ছাড়া কিছুই দেখি না আমি। যদিও তুমি দুঃশাসন শকুনি আর ছোটলোক কর্ণ ছাড়া কারো কথা কানে তোলো না; তবুও তোমারে কই; যুদ্ধের চিন্তা বাদ দিয়া তুমি পাণ্ডবগো সম্পত্তি ফিরাইয়া দেও…

ভীষ্ম চান্স পাইলেই কর্ণরে ধুইতে যান। কর্ণও ভীষ্মের কথা ধরে আর বহু কষ্টে দুইজনরে থামাইয়া দ্রোণ ধৃতরাষ্ট্ররে পরিষ্কার জানায়ে দেন ভীষ্মের মতই তার মত। কিন্তু সেই দিকে নজর না দিয়া ধৃতরাষ্ট্র সঞ্জয়রে জিগান-আইচ্ছা আমাগো এগারোটা বাহিনী জোগাড় হইছে শুইনা কী কইল যুধিষ্ঠির?

সঞ্জয় কিছু কয় না। ধৃতরাষ্ট্র আবার প্রশ্ন করেন- আইচ্ছা তার লগে আর কারা কারা আছে সেই সম্পর্কে তুমি কিছু কও তো সঞ্জয়…

সঞ্জয় কয়- বহু লোক মহারাজ। দুই পোলা নিয়া রাজা দ্রুপদ; কেকয়রাজের পাঁচ পোলা; সাত্যকি; কাশীরাজ; দ্রৌপদীর পাঁচ পোলা; সুভদ্রার পোলা অভিমন্যু; শিশুপালের পোলা ধৃষ্টকেতু; জরাসন্ধের পোলা সহদেব আর জয়ৎসেন। তবে সব থাইকা বড়ো কথা হইল; কৃষ্ণ সর্বক্ষণ আছে যুধিষ্ঠিরের লগে…

সঞ্জয়রে থামাইয়া ধৃতরাষ্ট্র কন- এগো কাউরে নিয়া আমার কোনো ডর নাই। আমার খালি ডর কুন্তীর মাইজা পোলা ভীমেরে। যুধিষ্ঠিরের কাছে মাপ চাইলে সে মাপ কইরা দিব। কৃষ্ণ-অর্জুনের কাছে আত্মসমর্পণ করলে তারাও আর অস্ত্র উঁচাইব না। কিন্তু বদমেজাজি ভীমটার ভিত্রে এক ফোঁটা দয়ামায়া যেমন নাই তেমনি জীবনে কোনো দিন প্রতিশোধের কথাও ভোলে না সে। অন্য কে কী করব না করব জানি না; কিন্তু আমার সব সময়ই ডর লাগে আমার সবগুলা পোলাই হয়ত মারা পড়ব এই নির্দয় ভীমের গদায়…

ধৃতরাষ্ট্র এইবার নিজের পোলার দিকে ফিরেন- আমরা যুদ্ধ করতে পারি। ভীষ্ম কৃপ দ্রোণ আছেন আমাগো লগে। কিন্তু এরা আমাগো পক্ষে যুদ্ধ করলেও এই তিনজনের কেউই পাণ্ডবগো উপর অস্ত্র উঠাইবেন না সেইটাও আমি জানি দুর্যোধন। আর অস্ত্র উঠাইলেই বা কী? বানপ্রস্থে যাওয়ার বয়সী মানুষের কাছে তুমি আর কতটাই বা যুদ্ধ আশা করতে পারো? তোমার পক্ষে যদি সততা নিয়া কেউ যুদ্ধ করে তবে সে একলা কর্ণ। কর্ণের ক্ষমতা নিয়া আমার সন্দেহ নাই। কিন্তু এই পোলাটা যেমন অতিশয় দয়ালু তেমনি অস্থির আর মাথাগরম। তার গুরু পরশুরাম ঠিকই কইছেন; চূড়ান্ত মুহূর্তে অতিরিক্ত উত্তেজনায় কর্ণের ভুল করার আশঙ্কা অতিশয় প্রবল। ভাবনা কইরা দেখো দুর্যোধন; একই রথে যখন থাকব কৃষ্ণের বুদ্ধি আর অর্জুনের অস্ত্র তখন তোমার অস্থিরচিত্ত কর্ণের কাছে ভুল করা ছাড়া আর কীইবা আশা করতে পারো তুমি? তাই মুরুব্বিগো লগে আমিও একমত। যুদ্ধে যাওয়া মোটেও ঠিক হইব না। আমি সন্ধির প্রস্তাবই পাঠামু যুধিষ্ঠিরের কাছে…

দুর্যোধন হাসে- অতটা ভয় পাওয়ার কোনো কারণ নাই মহারাজ। পাণ্ডবরা বনে যাবার শুরুতে যখন কৃষ্ণ আর পাঞ্চালরা আইসা আমাগো হুমকি-ধামকি দিতাছিল তখন একবার আমি ভাবছিলাম থাউক। এই সব ঝামেলায় গিয়া খামাখা আব্বা আর প্রজাগো কষ্ট না বাড়াই। তার থাইকা ভালো; পাণ্ডবগো ডাইকা তাগো রাজ্য দিয়া সন্ধি করি। তখন দাদা ভীষ্ম আর গুরু দ্রোণ আমারে তা করতে নিষেধ কইরা কইছিলেন যে যুদ্ধ কইরা যাদব পাঞ্চালরা কুলাইতে পারব না আমাগো লগে। কিন্তু। এখন বুঝতাছি বয়সের কারণে তারা ডর খাইছেন। তাতে আমার কোনো অসুবিধা নাই। কারণ এখন আমাগো অবস্থা আগের থিকা শতগুণে ভালো। আর অন্য দিকে তেরো বচ্ছর বনে-জঙ্গলে থাইকা পাণ্ডবগো অবস্থা এখন আগের থিকা বহুত খারাপ। তার অকাট্য প্রমাণ তো সঞ্জয়ের মুখে নিজের কানেই শুনলেন। যুদ্ধ ডরাইয়া যুধিষ্ঠির এখন রাজ্যের বদলা পাঁচখান গ্রাম ভিক্ষা চাইতাছে পাঁচ ভাইয়ের লাইগা। আর আরেকটা কথা; ভীম সম্পর্কে আপনার দুর্ভাবনা এক্কেবারে খামাখা। ভীম আর আমি তো একলগে বলরামের কাছে গদা শিখছি। উস্তাদের ভাষ্যমতেই গদাযুদ্ধে আমি ভীম থাইকা বহুগুণ বেশি ক্ষমতাশীল। সে যদি আমার সামনেও আসে তবু তার বেশিক্ষণ টিকার কোনো সম্ভাবনা নাই। আর সৈনিকের সংখ্যার দিকে আমরা পাণ্ডবগো থাইকা এখন দেড়গুণেরও বেশি। সেইটা তো সকলেই জানে…

ধৃতরাষ্ট্র দীর্ঘশ্বাস ছাড়েন-যুদ্ধের হিসাব তোমার হিসাবের মতো সোজা হইলে তো হইতই বাপ। তুমি সবকিছু হিসাব করলা কিন্তু যাদব বংশীয় কৃষ্ণের বুদ্ধির হিসাবটা বাদ দিয়া নিজের হিসাবে বড়ো বেশি ফাঁক রাইখা দিলা দুর্যোধন। আইচ্ছা সঞ্জয়; কও তো যুদ্ধের লাইগা যুধিষ্ঠিররে সবচে বেশি নাড়া দিতাছে কেডায়?

— ধৃষ্টদ্যুম্ন। দ্রৌপদীর ভাই ধৃষ্টদ্যুম্ন আর তার লগে আছে তার ভাই শিখণ্ডী…

ধৃতরাষ্ট্র আরেকটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়েন- শুনছি দ্রুপদের এই দুই পোলা আরো বেশি নিষ্ঠুর। অস্ত্র চালাইতে গেলে মুরব্বি কিংবা ব্রাহ্মণেরও ধার ধারে না তারা…

যুধিষ্ঠিরের কথায় উপপ্লব্য নগরে বইসা ঝিমায় কৃষ্ণ। যুদ্ধের লাইগা সকলরে জড়ো কইরা শেষে সঞ্জয়রে কী কথা কইয়া পাঠাইল যুধিষ্ঠির? সে এখন মাত্র পাঁচটা গ্রাম চায় দুর্যোধনের কাছে? কিন্তু বেকুব হইবার তখনো অনেক বাকি কৃষ্ণের। যে ভীম ধৃতরাষ্ট্রের পোলাগো মারবার লাইগা সারাক্ষণ যুদ্ধমন্ত্র জপে; বনবাস আর লাঞ্ছনার রাগে একলা একলা কথা কয়; হাসে; রাগে হাঁটুর ভিতর মুখ লুকাইয়া কান্দে; সেই ভীমও গলা নামাইয়া কয়- যুদ্ধ না কইরা যা পাওয়া যায় তাই ভালো কৃষ্ণ। তুমি সেই ব্যবস্থাই করো…

অর্জুন মূলত যুধিষ্ঠিরের ছায়া। যুধিষ্ঠিরের বাড়া কোনো সিদ্ধান্ত থাকে না তার। নকুলও রিপিট করে যুধিষ্ঠিরের কথা…

কৃষ্ণ অবাক হইয়া তাকায় উনষাট বছর বয়সের যুধিষ্ঠির- আটান্ন বছরের ভীম আর সাতান্ন বছর বয়স অর্জুনের দিকে। আইজ প্রথম কৃষ্ণের মনে হয় বয়স যেমন পাণ্ডবগো জাপটাইয়া ধরছে। তেমনি বনবাসের কষ্টে সত্যিই এরা এখন একদল ভাইঙ্গাপড়া মানুষ। এরা সৈন্যসমাবেশ করছে শুধু দুর্যোধনরে ডর দেখাইতে; যুদ্ধ করতে না…

কৃষ্ণ আমতা আমতা করে-ঠিকাছে; তোমাগো প্রস্তাব নিয়া তবে আমি হস্তিনাপুর যাব। কিন্তু যুদ্ধ আটকাইতে পারব কি না তার গ্যারান্টি দিতে পারব না আমি…

— আমি যুদ্ধই চাই। যুদ্ধ যাতে হয় সেই ব্যবস্থাই তুমি করবা হস্তিনাপুর গিয়া…

গলাটা সহদেবের। যেখানে ভীম পর্যন্ত ভচকাইয়া গেছে সেইখানে সহদেবরে কিছু জিগানোরই দরকার মনে করে নাই কৃষ্ণ। সহদেব কৃষ্ণের চোখে চোখ রাইখা কয়-  কৌরবরা যদি শান্তিও চায় তবুও তুমি যুদ্ধ ঘটাবা এইটাই আমার কথা। যুধিষ্ঠির ভীম আর অর্জুন যদি যুদ্ধ না করতে চান তবে আমি একলা হইলেও যুদ্ধ করব। কারণ রাজ্য পাওয়া না পাওয়ার থাইকা আমার কাছে পাঞ্চালীর লাঞ্ছনার প্রতিশোধ নেওয়াটই বড়ো…

সাত্যকিও চিৎকার দিয়া উঠে- পাঁচ গ্রামের হিসাব বুঝি না আমরা। আমরা যুদ্ধই চাই…

প্রবীণ সভাসদগণের পরামর্শ আর সঞ্জয়ের বর্ণনা বিবেচনা কইরা কুরুসভায় রাজা ধৃতরাষ্ট্র সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেন- শোনো দুর্যোধন। যুদ্ধের চিন্তা বাদ দিয়া তুমি পাণ্ডবগো তাদের সম্পত্তি ফিরাইয়া দিবার আয়োজন করো। বাকি যে অর্ধেক রাজ্য থাকব তাতে কোনোকিছুরই কোনো অভাব হইব না তোমার। যুদ্ধে ভীষ্ম দ্রোণ কৃপের যেমন মত নাই; আমারও নাই…

– একটা সুঁই পরিমাণ মাটিও পাণ্ডবগো দিমু না আমি রাজার সিদ্ধান্তের উপর দুর্যোধনও তার পরিষ্কার সিদ্ধান্ত জানায়ে দেয়- আর কেউ যদি যুদ্ধ নাও করে তবু আমি দুঃশাসন আর কর্ণই যুদ্ধ করব পাণ্ডবগো লগে…

কর্ণ দুর্যোধনরে সমর্থন করে আর দুর্যোধনরে কিছু কইতে না পাইরা ভীষ্ম শুরু করেন কর্ণরে গালাগাল- তুমি আর কতা কইও না। তুমি কৃষ্ণরে চিনো? কৃষ্ণের চক্রের ক্ষমতা জানা আছে তোমার? কৃষ্ণের চক্রের কাছে তোমার জারিজুরি মুহূর্তও টিকব না সেইটা জানো? তুমি আসোলে কোনো যোদ্ধাই না। তুমি একটা ফালতু ভণ্ড। তোমার সকল জারিজুরি খালি মুখে। তুমি পরশুরামের কাছে নিজের মিথ্যা পরিচয় দিয়া যেইভাবে তার শিষ্য হইছিলা; এখনো তুমি সেই রকম মিথ্যা বড়াই করতাছ। তোমার আসোল পরিচয় পাইয়া পরশুরাম যেমন তোমারে আশ্রম থাইকা লাত্থি দিয়া বাইর কইরা দিছিলেন; এক দিন দেখবা দুর্যোধনও তোমার আসোল পরিচয় পাইয়া তোমারে থাবড়ায়ে বাইর করব হস্তিনাপুর থাইকা। কারণ অর্জুন আর কৃষ্ণরে যদি কেউ জয় করবার পারে তবে সেইটা তুমি না পারলে সেইটা একমাত্র আমার পক্ষেই সম্ভব। অথচ আমিই…

– ঠিকাছে দেখি তবে জয় করেন…

কর্ণ হাতের ধনুক ফিককা ফালায় দুর্যোধনের সামনে-তোমার দাদায় যখন আমারে অতটাই ছোট আর নিজেরে অতটা বড়ো মনে করেন তখন দেখি তোমার দাদায় কেমনে কৃষ্ণ আর অর্জুনরে জয় করেন। আমি এই অস্ত্র ছাড়লাম। তোমার দাদা ভীষ্ম না মরা পর্যন্ত আমি আর অস্ত্র ধরুম না কইয়া দিলাম। এইটা আমার প্রতিজ্ঞা দুর্যোধন। তোমার দাদা মরার পর আমার যোগ্যতা দেখবা তুমি…

– রাধাপুত্র কর্ণ। তোমার স্বভাবে অনেক গড়মিল থাকলেও যত দূর জানি একবার প্রতিজ্ঞা করলে তুমি সেইটা রাখো। মনে রাইখ আমি না মরা পর্যন্ত আর অস্ত্র ধরবা না তুমি…

ভীষ্মের কথার কোনো উত্তর না দিয়া গটগট কইরা কর্ণ বাইর হইয়া গেলে ধৃতরাষ্ট্র হাসেন-কইছিলাম

দুর্যোধন। কর্ণ পোলাটার মাথা গরম হইলে বুদ্ধিশুদ্ধিও লোপ পায়? দেখলা তো সে তোমার লাইগা যুদ্ধ করতে আইসা জ্যাঠার উপর রাগ কইরা তোমারেই সে একলা ফালাইয়া গেলো যুদ্ধের সামনে…

ভীষ্মও হাসেন- যাউক। এক পাগলরে তো যুদ্ধ থাইকা সরাইতে পারলাম। অন্তত আমি যদ্দিন বাঁইচা আছি তদ্দিন আর যুদ্ধ করব না কর্ণ। তা তুমি এখন কী সিদ্ধান্ত নিবা দুর্যোধন?

-যুদ্ধ। যেকোনো অবস্থায় যুদ্ধই আমার সিদ্ধান্ত পিতামহ। আর আপনি যখন কইছেন যে কৃষ্ণ অর্জুনরে আপনি পরাজিত করতে পারেন; তাই আমার সিদ্ধান্ত হইল আপনেই হইবেন আমার যুদ্ধের সেনাপতি…

পাণ্ডবগো দূত হইয়া হস্তিনাপুর যাইবার আগে কৃষ্ণ গিয়া খাড়ায় দ্রৌপদীর সামনে। অনেকক্ষণ চুপ। থাইকা অতি ধীরে মুখ খোলে পাঞ্চালী-হস্তিনাপুরে পাণ্ডবগো সন্ধির প্রস্তাব নিয়া যাও কৃষ্ণ। আমার আপত্তি নাই। কিন্তু যখন তুমি দুর্যোধনের কাছে সন্ধির প্রস্তাব করবা তখন তোমার সখীর এই খোলা চুলের কথা স্মরণ রাইখ; যা এক দিন হাত দিয়া টানছিল দুঃশাসন। আর সখীর কাছে করা তোমার নিজের প্রতিজ্ঞার কথাটাও যেন তোমার মনে থাকে। এর বেশি আমার আর বলার কিছু নাই। কিন্তু পাণ্ডবগো মতো তুমিও যদি মনে করো যে পুরানা দিনের সেই সব কথা আর মনে করতে চাও না। তবে জাইনা যাও; বৃদ্ধ বাপ; দুই ভাই আর অভিমন্যুর লগে এখন নিজের পাঁচটা জোয়ান পোলাও আছে দ্রৌপদীর। তোমরা না থাকলেও কেউ না কেউ তো থাকব যে দ্রৌপদীর লাইগা আগুন জ্বালাইব হস্তিনাপুর…

কৃষ্ণ মুখ খোলে-তুমি নিশ্চিন্ত থাকো পাঞ্চালী। পাণ্ডবরা কৌরবগো ক্ষমা কইরা দিলেও তাগো নরকে যাওয়া ঠেকাইতে পারব না কেউ…

.

১৩

তেরোটা বচ্ছর পর ভাতিজার কাছে ভাইঙ্গা পড়ে কুন্তী-কৃষ্ণরে; পুতুল খেলার বয়সে নিজের বাপ মোরে দান কইরা দিছিল ভিনগ্রামে। নিজের নাম পৃথা বাদ দিয়া পালকপিতা কুন্তীভোজের নামে কুন্তী বইনা বড়ো হইয়া বিবাহ করলাম এক সম্রাটরে; কিন্তু রাজনীতির খপ্পরে পইড়া জঙ্গলে সংসার করতে হইল ষোলোটা বছর। বিধবা হইবার পর ভাসুরের চক্রান্তে আদাড়ে-বাদাড়ে ঘুইরা নাবালক পাঁচটা পোলারে বড়ো কইরা বানাইলাম রাজা। তারপর পোলাগো অপকর্মে আরো তেরোটা বচ্ছর আমার বাঁচতে হইল দেবরের ভাতে। কৃষ্ণরে; পিতা স্বামী ভাসুর পুত্র; এমন কেউ নাই যে আমার লগে অবিচার করে নাই। এইবার ক দেখি বাপ; যে কারণে ক্ষত্রিয় নারী পোলা জন্ম দেয়; সেই কাল কি উপস্থিত হইছে আমার? কেমন আছে হতভাগী দ্রৌপদী? কেমন আছে পোলারা সবাই?

কৃষ্ণ কুন্তীর কাছে সকলের কুশল সংবাদ দিয়া তারে সান্ত্বনা দেয়- দুঃখ কইর না পিসি। ক্ষত্রিয় যাদব বংশের মাইয়া তুমি; কুন্তীভোজের বংশে গিয়া হইছিলা রাজকন্যা। তারপর সম্রাটরে বিবাহ কইরা তুমি যেমন সম্রাজ্ঞী হইছিলা তেমনি বীরপুত্র জন্ম দিয়া পাইছিলা রাজমাতার সম্মান। দুঃখ কষ্ট ক্ষত্রিয় জীবনে থাকেই; কিন্তু আবার সেই সময় উপস্থিত তোমার। শিগগিরই তোমার পোলাগো আবার দেখতে পাইবা পৃথিবীর অধিপতিরূপে। সেই নিমিত্তেই আমার হস্তিনাপুর আসা; কাইল সকালে প্রস্তাব নিয়া যাব ধৃতরাষ্ট্রের কাছে…

যুধিষ্ঠিরের পাঁচটা গ্রামের অনুরোধও প্রত্যাখ্যান হইলে কার্তিক মাসের এক সকালে দূতিয়ালির উদ্দেশ্যে কৃষ্ণ রওনা দেয় হস্তিনাপুর। যুধিষ্ঠির চায় নাই কৃষ্ণ হস্তিনাপুর আসুক; কিন্তু এটাও সে জানায়ে দেয়-কৃষ্ণ তুমি ভিন্ন এখন আমাগো উদ্ধারের আর কেউ নাই। তবে তোমারে অনুরোধ শান্তির চেষ্টাই বেশি কইরো তুমি…

ভোরবেলা উপপ্লব্য নগর থাইকা রওনা দিয়া এক রাত্রি বুকস্থল গ্রামে কাটাইয়া পরের দিন সন্ধ্যায় কৃষ্ণ আইসা হাজির হয় হস্তিনাপুর। আসার আগে যুধিষ্ঠিররে পরিষ্কার জানায়ে আসে- শান্তিপূর্ণ সমাধানের আশা বেশি না কইরা যুদ্ধের লাইগা তৈয়ারি থাকেন…

কৃষ্ণ আসার সংবাদে এক বিশাল সংবর্ধনার আয়োজন করে ধৃতরাষ্ট্র আর দুর্যোধন। বেশুমার খানাখাদ্যের লগে কৃষ্ণরে উপহার দিবার লাইগা রেডি রাখা হয় অঢেল স্বর্ণ মণিমুক্তা হাতিঘোড়া আর হাজারে হাজার দাসদাসী। এই সব দেইখা বিদুর কয়-  আপনের মতিগতি বোঝা মুশকিল মহারাজ। পাণ্ডবগো আপনে পাঁচটা মাত্র গ্রাম দিতে নারাজ অথচ অঢেল ঘুস দিয়া কৃষ্ণরে কিনতে চান…

ভীষ্ম সবাইরে সতর্ক কইরা দেন- সংবর্ধনা দেও আর নাই দেও; কৃষ্ণের লগে যেন কেউ খারাপ ব্যবহার না করে; খবরদার…

দুর্যোধন কয়-  খারাপ ব্যবহার করব না তার লগে। তয় তারে আমি বাইন্ধা থুমু কইলাম। তাইলেই আর পাণ্ডবরা লোম নাড়াইতে সাহস করব না…

ধৃতরাষ্ট্র পোলারে ধাতানি দেন- বেকুবি কইরো না দুর্যোধন। কৃষ্ণ দূত আর তোমার বেয়াই…

ভীষ্ম কন- ধৃতরাষ্ট্র তোমার পোলারে সামলাও। কৃষ্ণরে খালি সে বেয়াই হিসাবেই দেখছে; জীবনেও প্রতিপক্ষ হিসাবে দেখে নাই। কোনো বেয়াদবি যেন না হয় তার লগে। সাবধান…

নগর দুয়ার থিকা কৃষ্ণরে আউগাইয়া আনতে শত শত লোকের সাথে স্বয়ং উপস্থিত হন ভীষ্ম দ্রোণ কৃপের মতো মানুষ। দূতিয়ালির লাইগা আসছে কৃষ্ণ; কিন্তু সে সম্পূর্ণ সশস্ত্র আর বিশাল এক সেনাবাহিনী নিয়া তার লগে আছে তার ডাইন হাত দুর্ধর্ষ বৃষ্ণি বংশীয় সেনাপতি সাত্যকি। ভীষ্ম মনে মনে হাসেন। দূতিয়ালি করতে সেনাবাহিনী লগে নিয়া আসার মানে তিনি বোঝেন। রাজা সুবলের কাছে আন্ধা ভাতিজা ধৃতরাষ্ট্রের লাইগা তার মেয়ে গান্ধারীর বিবাহ প্রস্তাব নিয়া যাওয়ার সময় তিনি নিজেও লগে নিয়া গেছিলেন বিশাল এক সেনাবাহিনী। সুবল সেনাবাহিনীর দিকে তাকাইয়া আন্ধা ধৃতরাষ্ট্রের লগে নিজের মাইয়ার বিবাহে এক বাক্যে রাজি হইছিলেন সেদিন…

কৃষ্ণ কিছুই নিল না হাতে। না উপহার না খাবার। খালি পা ধোয়ার পানি নিয়া সকলের লগে সেলামালকি বিনিময় কইরা গিয়া হাজির হইল রাজা ধৃতরাষ্ট্রের সামনে। ধৃতরাষ্ট্র সিংহাসন ছাইড়া উইঠা অভিবাদন জানাইলেন কৃষ্ণরে। কৃষ্ণ তার লগে শুভেচ্ছা বিনিময় কইরা পিসি কুন্তীর লগে দেখা করতে সোজা গিয়া হাজির হয় বিদুরের ঘরে…

কুন্তীরে দেইখা কৃষ্ণ যায় বেয়াই দুর্যোধনের ঘরে। সেইখানে দুঃশাসন আর কর্ণের লগে আরো বহু রাজারা উপস্থিত। দুর্যোধন তারে আপ্যায়ন করে-বেয়াই খাও…

কৃষ্ণ কয়- বেয়াই আমি এখন তোমার প্রতিপক্ষের দূত। দূতিয়ালি সফল না হইলে যেমন দূতের পক্ষে খানাপিনা গ্রহণ করা সম্ভব না; তেমনি সম্পর্ক ভালো থাকলে কিংবা বিপদে পড়লেই শুধু অন্যের খাদ্য গ্রহণ করা যায়। তুমি আত্মীয় হইলেও যেহেতু পাণ্ডবগো শত্রুপক্ষ তাই তুমি এখন আমারও শত্রুপক্ষে আছ। আমি এখন সম্পর্কের খাতিরে যেমন তোমার খাবার খাইতে পারি না; তেমনি আমি এইখানে আইসা বিপদে পড়ছি সেইটাও মনে করি না। আপাতত মাফ করো আমারে। আমি হস্তিনাপুরে খালি বিদুরের দেওয়া খাবারই খামু; কারণ আমার পিসি আছেন তার ঘরে আর মানুষটাও নিরেট এবং নিরপেক্ষ…

কৃষ্ণ বিদুরের ঘরে গেলে ভীষ্ম দ্রোণ কৃপ আইসা কন- তোমার থাকা-খাওয়ার লাইগা আমরা বহুত আয়োজন করছি কৃষ্ণ; আইসো আমাগো লগে…

কৃষ্ণ কয়- আপনারা আমারে দেখতে আসছেন তাতেই সম্মানিত হইছি আমি। বিদুরের ঘর ছাড়া আর কোথাও খাবার নিতে অনুরোধ কইরেন না আমারে…

খাইতে বইসা বিদুর কন- তোমার এইখানে আসা বোধ হয় ঠিক হয় নাই কৃষ্ণ। যত যাই হোক; ভীষ্ম দ্রোণ কর্ণ সকলেই কিন্তু যুদ্ধ করব দুর্যোধনের পক্ষে। সে কারণে তোমার কোনো প্রস্তাবই মানব না দুর্যোধন। তাছাড়া যাগো লগে তোমার শত্রুতা আছে তারা সবাই আইসা হাজির হইছে হস্তিনাপুর আর কালকের সভাতেও তারা থাকব। আমি দুশ্চিন্তায় আছি কাইল এই সব শত্রুগো মাঝে তোমার যাওয়া ঠিক হইব কি না…

কৃষ্ণ কয়-  আপনের কথা ঠিক আছে। কিন্তু বিপদের আশঙ্কা যতই হোক; আমি না গেলে পরে কথা উঠব যে কৃষ্ণ পারলেও পারত কিন্তু তবুও সে কুরু-পাণ্ডবের যুদ্ধ থামাইতে চেষ্টা করে নাই। আর বিপদ নিয়া চিন্তা কইরেন না; সব ধরনের প্রস্তুতি আছে আমার…

পর দিন সকালে বিদুরের বাড়ি থিকা কৃষ্ণরে সভায় আউগাইয়া নিতে আসে শকুনি আর দুর্যোধন। কৃষ্ণ রওনা দেয় বিদুর আর সাত্যকির লগে আর তার পিছে পিছে যায় তার সেনাদল। সভায় প্রবেশ করলে রাজা ধৃতরাষ্ট্রসহ ভীষ্ম দ্রোণ আর যারা যারা আছিল সকলে খাড়াইয়া কৃষ্ণরে সম্মান জানাইয়া বসতে অনুরোধ করলে কৃষ্ণ কয়-  আমার লগে দ্বৈপায়ন- পরশুরাম- নারদসহ বেশ কিছু মুরুব্বি আছেন যারা আজকের সভায় থাকতে চান। তারা বাইরে খাড়াইয়া আছেন। তাগোরে আমন্ত্রণ দিয়া বসার আসন না দিলে তো আমার পক্ষে এই সভায় আসন গ্রহণ করা কঠিন…

ধৃতরাষ্ট্র বড়োই টাসকি খান এই কথা শুনে। গতকাল তিনি শুনছিলেন কৃষ্ণ বিশাল একটা সেনাবাহিনী নিয়া আসছে সাথে। কিন্তু ঘুণাক্ষরেও বুঝতে পারেন নাই যে সালিশদার হিসাবে এতগুলান মুনিঋষিও সাথে নিয়া আসছে সে। মনে মনে কৃষ্ণের বুদ্ধির তারিফ করেন ধৃতরাষ্ট্র। এমন লোকদের সাথে নিয়া আসছে কৃষ্ণ যাগো সামনে কোনো উল্টাপাল্টা করা সম্ভব না। বিশেষ কইরা সর্বজনশ্রদ্ধেয় তার নিজের ঔরসদাতা পিতা কৃষ্ণ দ্বৈপায়ন। দুর্যোধনরা যেমন তার পোলার ঘরের নাতি তেমনি পাণ্ডবরাও তার নাতি। কৃষ্ণ তারে সভা শুরুর আগেই বেশ চিপায় ফালাইয়া দিছে তিনি বুঝতে পারেন। বিষয়টা নিয়া পোলার লগে আগে কিছু আলোচনা কইরা নিলে সুবিধা হইত। কিন্তু এখন আর করার কিছু নাই। এখন চুপচাপ খালি শুইনা যাইতে হইব; দরকার পড়লে দুর্যোধনের বিপক্ষেও কথা কইতে হবে। যা করার পরে করা ছাড়া আপাতত কিছু করার নাই…

দ্বৈপায়নের লগে অন্য ঋষিদের কথা না হয় বোঝা গেলো; তারা মুনি ঋষি মুরুব্বি মানুষ সভাসমাবেশে গিয়া বসতে খাইতে বলতে কিংবা দান-প্রণাম নিতে পছন্দ করেন। কিন্তু পরশুরামরে কেন নিয়া আসছে কৃষ্ণ? তিনি তো এই সব সভা সমাবেশে যান না। ভাবতে ভাবতে কৃষ্ণের বুদ্ধিতে আরেকবার মুগ্ধ হন রাজা ধৃতরাষ্ট্র-কর্ণ; কর্ণরে দমাইয়া রাখতেই পরশুরামরে ধইরা নিয়া আসছে কৃষ্ণ। পরশুরাম সব সময়ই শিষ্য কর্ণরে পাতলা পোলা বইলা বকাঝকা করতেন। আইজ অত বছর পরে নিশ্চয়ই কর্ণ গুরুর কাছে নিজেরে আর মাথাগরম পাতলা পোলা হিসাবে প্রমাণ করতে চাইব না। পরশুরাম জ্যাঠা ভীষ্মেরও গুরু। জ্যাঠা ফাঁক পাইলেই নাতির বয়সী কর্ণের লগে খামাখা ঠোকাঠুকি করেন; জিনিসটা পছন্দ না হইলেও ধৃতরাষ্ট্র কিছু কইতে পারেন না। আইজ গুরুর সামনে ওমন কিছু কইরা নিশ্চয়ই ধাতানি খাইতে চাবেন না ভীষ্ম। দ্রোণেরও গুরু পরশুরাম। তিনিও নিশ্চয়ই আইজ নিজের শিষ্য অর্জুনের প্রশংসা করতে গিয়া গুরুর শিষ্য কর্ণরে গালাগাল করবেন নাভুলেও। ধৃতরাষ্ট্র মনে মনে হাসেন- পরশুরামের তিন জাতের তিন শিষ্য আছে ধৃতরাষ্ট্রের সভায়; ব্রাহ্মণ দ্রোণ; ক্ষত্রিয় ভীষ্ম আর নমশূদ্র কর্ণ; তিনজনরেই আইজ এক লাইনে নিয়া আসছে কৃষ্ণ পরশুরামরে সভায় হাজির কইরা। আর একইসাথে এই সভায় দুর্যোধনরে বড়ো একলাও কইরা ফালাইছে এই জাউরা যাদব…

ভীষ্ম আর বিদুর গিয়া মুরুব্বিগো আমন্ত্রণ কইরা সভায় নিয়া আসলে সকলে খাড়াইয়া সেলামালকি দিয়া তাগোর বসার ব্যবস্থা করেন। তারপর রাজা ধৃতরাষ্ট্ররে সম্বোধন কইরা কৃষ্ণ শুরু করে ধর্ম আর অধর্ম নিয়া শাস্ত্রসম্মত বয়ান। ধৃতরাষ্ট্র অধৈর্য হইলেও চাইপা যান; বহুত চালাক এই কৃষ্ণ। পয়লাই ধর্ম অধর্ম নিয়া কথা কইয়া মুরুব্বিগো পটাইতাছে হালায়…

ধর্ম-অধর্ম বয়ান শেষে কৃষ্ণ শুরু করে স্বয়ং রাজা ধৃতরাষ্ট্ররে তেলানি-মহারাজ চিন্তা কইরা দেখেন তো কুরুগো লগে আছেন ভীষ্ম দ্রোণ কর্ণ কৃপ আর পাণ্ডবগো লগে আছে সাত্যকি আর পাঞ্চাল। কুরুরা আপনার পোলা আর পাণ্ডবরা আপনার ছোট ভাইয়ের পোলা; পিতার অবর্তমানে আপনি নিজেই যাগো পিতা। একটু ভাবনা কইরা দেখেন তো মহারাজ এই কুরু-পাণ্ডব যদি তাগোর মিত্রদের নিয়া একসাথে আইসা আপনার ছাতার নিচে খাড়ায় তবে জগতে আপনার থাইকা শক্তিশালী রাজা আর থাকব কি না কেউ? আমার হিসাবে কেউ না; আমার এই হিসাবে যদি কোনো ভুল থাকে তো এইখানে উপস্থিত মুরব্বিয়ানরা আমারে সংশোধন করেন…

মুরুব্বিরা সকলে কৃষ্ণের কথায় সমর্থন জানাইলে কৃষ্ণ পরের প্রসঙ্গে যায়- আমার আগমনের মূল উদ্দেশ্য মহারাজ; একটু চেষ্টা কইরা দেখা যাতে আপনার নেতৃত্বে থাকা মহান ভারত বংশটা যেন ধ্বংস না হয়। যার সারকথা হইল শান্তি…

মুরুব্বিরা এইবার সশব্দে কৃষ্ণরে সমর্থন করেন। ধৃতরাষ্ট্র কোনো কথা কন না। শুরুতেই কৃষ্ণ তারে প্যাঁচ মাইরা ধরছে। এখন সভার সকলের সমর্থন আদায় কইরা অজগরের লাহান আস্তে আস্তে সেই প্যাঁচ টাইট দিতাছে সে। কিন্তু এখন কিছু কওয়া যাইব না। কান খাড়া কইরা ধৃতরাষ্ট্র খালি রেডি থাকেন কৃষ্ণের পরের কথা শুনতে…

কৃষ্ণ এইবার সকলের দিকে তাকায়- এইখানে যারা আছেন। ময়মুরুব্বি মুনিঋষি অস্ত্রগুরু যোদ্ধা আর রাজনীতিবিদগণ। তারা কেউই অশান্তির পক্ষে না। একলা সমস্ত দুনিয়া ধ্বংস কইরা দিবার ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও পরশুরাম যেমন শান্তি চান; তেমনি পাণ্ডব পাঞ্চাল যাদবদের ধ্বংস করার ক্ষমতা থাকার পরেও গঙ্গানন্দন ভীষ্মও চান শান্তি। আর আপনার ভাতিজা পাণ্ডবেরা যে শান্তিকামী তা তো আপনিও স্বীকার করবেন মহারাজ। কারণ আপনার আদেশের প্রতি শ্রদ্ধা জানাইয়াই তারা তেরো বচ্ছর বনে-জঙ্গলে কষ্ট করছে; কিন্তু আপনার আদেশ লঙ্ঘন করে নাই। অথচ চাইলে তো তারা আরো আগেই আইসা হাঙ্গামা বাঁধাইতে পারত। তো এখন মহারাজ; আপনার পিতৃহীন ভাতিজারা আপনের কাছেই প্রার্থনা করতাছে শান্তির বিধান। তাগো পিতার বড়ো ভাই হিসাবে আপনারে অভিভাবক মাইনাই তারা আপনার কাছে প্রার্থনা করতাছে তাগো ন্যায্য পাওনা আদায়ের বিচার। কারণ তারা মনে করে একমাত্র আপনেই পারেন শান্তিপূর্ণ উপায়ে তাগো ন্যায্য পাওনা দিতে। অন্য কোনোভাবে সেই পাওনা আদায় করতে গেলে যে ক্ষয় হইব তা মূলত আপনারই বংশের ক্ষয়। কারণ সকলে শান্তির পক্ষে থাকলেও আপনি জানেন যে আপনার পোলা দুর্যোধন শান্তির পক্ষে নাই। এখন আপনার পোলাদের সাথে যদি সম্পত্তি নিয়া আপনার ভাতিজাগো খুনাখুনি হয় তবে কি তাতে আপনের শান্তি হইব মহারাজ?

নিজেরে বড়োই কোণঠাসা অবস্থায় আবিষ্কার করেন ধৃতরাষ্ট্র। সকলের কাছ থিকা সমর্থন আদায় কইরা এইবার তার কাছ থিকাও সমর্থন আদায়ের জাল ফালাইছে কৃষ্ণ। সভার একটা মানুষও কোনো কথা কইতাছে না। কৃষ্ণ সরাসরি এইবার দুর্যোধনের নাম ধইরা অভিযোগ করল কিন্তু তারপরেও কর্ণ চুপ। অন্য সময় হইলে অতক্ষণে কর্ণ লাফ দিয়া ধইরা ফালাইত কৃষ্ণের কথা। কিন্তু পরশুরামরে হাজির কইরা সেই কর্ণরেও এক্কেবারে নিঃশব্দ কইরা ফালাইছে কৃষ্ণ কৃষ্ণ পোলাটা জানে কোন সাপের ফণা কোন জড়ি দিয়া ঠান্ডা করা লাগে…

ধৃতরাষ্ট্র কৃষ্ণের কৌশল বুইঝা চুপ কইরা থাকেন। আন্ধা চোখে তিনি কিছু না দেখলেও বুঝতে। পারেন সভার সকলেই এখন তার দিকে তাকাইয়া আছে। তার কাছ থিকা কোনো উত্তর না পাইয়া কৃষ্ণ তার আগের কথাটারে আরেকটু বিস্তার করে- মহারাজ আপনি নিশ্চয় স্বীকার করবেন যে পাণ্ডবরা কোনো দিনও আপনার লগে কোনো বেয়াদবি করে নাই। জতুগৃহ দাহের পর ফিরা আসলে আপনি যখন তাগোরে অনাবাদি খাণ্ডবপ্রস্থে পাঠাইলেন; বিনা বাক্যেই তো তারা আপনের বিচার মাইনা নিছে। তারপর দীর্ঘ দিন মেহনত কইরা সেই রাজ্য বিস্তার কইরা আশপাশের সকল রাজারে আইনা তো আপনারই অধীন করছিল তারা। তারা তো কোনো দিনও আপনার ক্ষমতা লঙ্ঘন করে নাই। এমনকি যুধিষ্ঠিরের রাজসূয় যজ্ঞে আপনারে যে সম্মান তারা দিছে তার সাক্ষী তো এইখানে। উপস্থিত অনেক মুরুব্বিয়ানই আছেন; বিশেষত মহাঋষি কৃষ্ণ দ্বৈপায়ন। তো এখনো তারা আপনার উপরে সেই শ্রদ্ধা রাখে আর সারা জীবনই আপনেরে সেই শ্রদ্ধা দিতে রাজি। কারণ তারা বিশ্বাস করে পিতার অবর্তমানে আপনিই তাগো পিতা। তারা মনে করে যে পিতার আদেশে তারা এক দিন বনবাসে গেছে; বনবাসের শর্তপালন শেষে সেই পিতার উদ্যোগেই ন্যায্য পাওনা আর অধিকার নিয়া ঘরের পোলারা আবার ফিরা আসব ঘরে। আপনেই এখন তাগো একমাত্র সহায় মহারাজ…

কৃষ্ণ বোঝে ধৃতরাষ্ট্র এইবারও উত্তর দিবেন না। তাই সে এইবার ধৃতরাষ্ট্রের দিক থাইকা চোখ ফিরাইয়া সভাজনদের দিকে তাকায়- এইখানে অনেক ময়মুরুব্বি আর রাজা-বাদশা আছেন। আপনারাই কন আমি যা কইলাম তার মধ্যে অন্যায্য কিছু কইলাম কি না যাতে মহারাজ ধৃতরাষ্ট্রের অসম্মান হয়?

সভাজনরা মাথা নাইড়া সমর্থন করলে কৃষ্ণ আবার ধৃতরাষ্ট্রের দিকে ফিরে- এই সভায় এমন একজন আছেন মহারাজ; যিনি পিতৃহত্যার প্রতিশোধ নিতে গিয়া এককালে একলাই সমস্ত ক্ষত্রিয়কূল নির্বংশ কইরা দিছিলেন। পরে নিজের পিতামহ ঋষি ঋচীকের আদেশে একলাই আবার শান্তি স্থাপন করছেন দুনিয়ায়। কারণ তারে বাধ্য কইরা শান্তিচুক্তি করানোর মতো দুনিয়াতে দ্বিতীয় কেউ আগেও যেমন ছিল না; এখনো নাই। যোদ্ধা হিসাবে তিনি যেমন সর্বশ্রেষ্ঠ তেমনি একইসাথে ঋষিপুত্র আর নিজেও ঋষি। তিনি রাজা ছিলেন; চাইলে এখনো দুনিয়ার রাজত্ব করতে পারেন। কিন্তু স্বেচ্ছায় রাজত্ব ছাইড়া তিনি এখন সন্ন্যাস জীবন যাপন করেন। এই সভাতেই যার তিন তিনজন মহারথী শিষ্য ভীষ্ম দ্রোণ কর্ণ আছেন; আমি সেই ভার্গব ব্রাহ্মণ জমদগ্নিপুত্র অস্ত্রগুরু পরশুরামরে এইবার অনুরোধ করব আমার বক্তব্য বিচার কইরা কিছু কথা কইতে- ভগবান পরশুরাম। আপনে কন; আমি যা কইলাম তাতে ভুল কিছু কইলাম কি না…

ধৃতরাষ্ট্র উসখুস করেন। ঠাইসা ধরছে তো ধরছে তার উপরে এখন এমন একজনরে তার সামনে খাড়া কইরা দিছে যার লগে বেদ ব্রাহ্মণ অস্ত্র যুদ্ধ রাজত্ব কোনো কিছুতেই দ্বিমত করার সাহস রাজা ধৃতরাষ্ট্রের নাই। রাজা ধৃতরাষ্ট্র চুপ কইরা অপেক্ষা করেন পরশুরামের কথার। পরশুরাম সংক্ষেপে সরাসরি কন-কৃষ্ণের যুক্তি আর ব্যাখ্যায় কোনো ফাঁক নাই; পক্ষপাতিত্বও নাই। অসাধারণ কইছে সে। শান্তির পক্ষে এর থিকা বড়ো কোনো উপায় যেমন নাই; তেমনি আপনার লাইগাও এর চেয়ে সম্মানজনক কোনো পন্থা নাই মহারাজ। যুদ্ধ আমি বহুত করছি জীবনে। রক্তক্ষয় কোনো সমাধান না। শান্তিই সব থিকা বড়ো; এইটা আমার নিজের জীবনের উপলব্ধি। তাই আমিও কই; আপনি ভাতিজাগো তাদের ন্যায্য পাওনা দিয়া মিটমাট কইরা নিয়া শান্তিতে থাকেন…

ধৃতরাষ্ট্র এইবারও কিছু কন না। পরশুরামের কথা শেষ হইলে ঋষি কশ্ব সরাসরি দুর্যোধনরে কন আমিও ঋষি পরশুরামের লগে একমত দুর্যোধন। খামাখা যুদ্ধ কইরা জীবন ক্ষয় করার কোনো মানে নাই। তুমি বরং কৃষ্ণের প্রস্তাব মাইনা নিয়া পাণ্ডবগো লগে আপোসরফা কইরা ফালাও…

এইবার নিজের উরু থাবড়াইয়া গলা খাকারি দেয় দুর্যোধন- আমি কী করব না করব সেই বুদ্ধি আপনের কাছে নিতে হইব আমার? আপনে চুপ থাকলে ভালো হয়…

নারদ দুর্যোধনরে থামান- অত রাগ আর জিদ কোনোটাই ভালো না দুর্যোধন। ময়মুরুব্বিগো কথা তোমার শোনা উচিত। আমিও মনে করি তুমি যদি পাণ্ডবগো লগে মিটমাট কইরা ফালাও তাতে সবারই মঙ্গল হয়; বিশেষ কইরা তোমার নিজের…

আর চুপ কইরা থাকার উপায় নাই। দুর্যোধন ঋষি কগ্ধের লগে বেয়াদবি কইরা ফালাইছে। এখনই না সামলাইলে অবস্থা বেগতিক হইতে বেশিক্ষণ লাগব না। আর মুরুব্বিগো লগে বেয়াদবি করলে কৃষ্ণ হয়ত এই সভাতেই দুর্যোধনের মাথা নামাইয়া ফালাইব সকলের সমর্থন নিয়া। কারণ এই মুরুব্বিরা আসছেন কৃষ্ণের নিমন্ত্রণে। যুধিষ্ঠিরের রাজসূয় যজ্ঞে শিশুপালের মাথাটা যেমনে কৃষ্ণ ভরা সভায় ফালাইয়া দিলো সেইটা মনে কইরা ভয়ে কাইপা উঠেন ধৃতরাষ্ট্র। ধৃতরাষ্ট্র দেরি না কইরা গলা খোলেন- আমি ঋষি কশ্ব আর নারদের কথা সম্পূর্ণ সমর্থন করি। কিন্তু আমি আন্ধা মানুষ। নামে রাজা হইলেও রাজত্বের কাম তো চালায় আমার পোলা দুর্যোধন। আমি কৃষ্ণের ব্যাখ্যা আর প্রস্তাবও সমর্থন করি। কিন্তু কী আর কমু আমার যে হাত-পা বাঁধা। আমার পোলা আমার কথা যেমন কানে তোলে না তেমনি তার মা গান্ধারী; কিংবা বিদুর কিংবা জ্যাঠা ভীষ্মের কথাও শোনে না সে। আমি কই কি; কৃষ্ণ। তুমি ঠান্ডা মাথার বুদ্ধিমান মানুষ। দুর্যোধনের আত্মীয়ও বটে। আমি তোমারেই অনুরোধ করি তুমি তোমার বেয়াই দুর্যোধনরে কথাগুলা একটু বোঝাও…

কৃষ্ণ বোঝে ধৃতরাষ্ট্র একটা চাল চাইলা দিলেন। অন্য কেউ দুর্যোধনরে কিছু কইতে গেলে সে যদি উল্টাপাল্টা কিছু কয় তবে বিষয়টা অন্য দিকে চইলা যাইব। তাই তারেই দিলেন দুর্যোধনের ভার; আর তার লগে দুইজন যে আত্মীয় সেইটা স্মরণ করাইয়া বুঝাইয়া দিলেন যাতে দুর্যোধন কিছু কইলে কৃষ্ণ মাইন্ড করে…

ঠিকাছে। কৃষ্ণ বুঝাইতে চেষ্টা করে দুর্যোধনরে-দুর্যোধন। তোমার বাবা কাকা দাদাসহ সকল মুরুব্বিগো কথা তো জানোই। অন্য দিকে তোমার সঙ্গীদের মধ্যে অশ্বত্থামা সঞ্জয়; তোমার ভাই বিকর্ণ আর বিবিংশতি; তোমার মিত্র সোমদত্ত; বাত্নীকরাজ সকলেই কিন্তু সন্ধির পক্ষে। আমিও কই; তুমিও তোমার বাবার কথা মাইনা লও…

দুর্যোধন কোনো কথা কয় না। কৃষ্ণ আরো আগে বাড়ে- পাণ্ডবগো লগে যুদ্ধে কী ফল হইতে পারে তা তো কিছু দিন আগে বিরাট নগরে অর্জুনের লগে যুদ্ধেই টের পাইছ তুমি। আমি তোমারে নিশ্চয়তা দিতাছি; পাণ্ডবগো লগে ভাগাভাগির পরও ধৃতরাষ্ট্রের মহারাজ পদ যেমন থাকবে; তেমনি যুবরাজ পদও হারাইতে হইব না তোমার। তুমি বহু দিন তাগো অংশও ভোগ করছ; এইবার তাদের পাওনাটা তাদের দিয়া দেও…

এইবার ভীষ্ম মুখ খোলেন-কৃষ্ণের কথাটা রাখ দুর্যোধন; আখেরে লাভ হইব তোর। এমন প্রস্তাব পায়ে ঠেইলা আন্ধা বাপ-মায়েরে কান্দাইস না…

দ্রোণও দুর্যোধনরে তেলান- গুরু হিসাবে কই; কৃষ্ণ আর ভীষ্মের কথাটা মাইনাল। ঘাউড়ামি কইরা বংশের সকলের মরার ব্যবস্থা করিস না। অর্জুনের লগে যেখানে কৃষ্ণ থাকব সেইখানে যুদ্ধ কইরা মরা ছাড়া আর কিছুই ভাবতে পারি না আমি…

বিদুর কন- তোমার লাইগা আমি ভাবি না ভাতিজা। কিন্তু তোমার বুড়া বাপ-মায়ের ভবিষ্যৎ দুঃখের কথা ভাইবা আমার বড়ো দুশ্চিন্তা হয়। তুমি মাইনা লও সকলের কথা…

ভীষ্ম দ্রোণ বিদুর ঘুরাইয়া ফিরাইয়া আরো বহুক্ষণ দুর্যোধনরে তেলান- মিটমাট কইরা ফালা সব। মাইনা নে সকলের প্রস্তাব…

অনেকক্ষণ সকলের কথা শুইনা দুর্যোধন কৃষ্ণের দিকে তাকাইয়া বেশ ঠান্ডা মাথায় শুরু করে আচ্ছা কৃষ্ণ। তুমি তো পাণ্ডবগো পক্ষে কইতে গিয়া আমারে গালাগালই করলা বেশি। আমার বাপ দাদা কাকা আর উস্তাদেও দেখি খালি আমারই দোষ দেখেন; কিন্তু আমি তো বহুত চিন্তা কইরাও আমার কোনো দোষ বাইর করতে পারি না। আমার দোষটা কই কও তো? যুধিষ্ঠির পাশা খেলা। পছন্দ করে; সেইটা খেইলা সে মামা শকুনির কাছে হারছে; তাতে আমারে তুমি কেমনে দোষ দিবা? আমি তো তাগো রাজ্য ছিনাইয়া নেই নাই। একবার পাশা খেলায় রাজ্য হারাইবার পর যখন বাবা তাগোরে আবার সবকিছু ফিরাইয়া দিলেন; তখনো তো আমি কোনো বাধা দেই নাই। ভাবছি আচ্ছা ঠিকাছে; বাবা মহারাজ; তিনি তার ভাতিজাগো রাজ্য ফিরাইয়া দিছেন। সেইখানে আমার কিছু কইবার নাই। কিন্তু এতেও যেমন যুধিষ্ঠিরের শিক্ষা হয় নাই তেমনি তার লোভও কমে নাই। সে পাশা খেইলা কুরুরাজ্য জিতার লোভে নিজের রাজ্য আর বারো বছর বনবাসের লগে এক বছর বাড়তি অজ্ঞাতবাসের বাজি রাইখা আবার খেলতে আসছিল মামা শকুনির লগে; এবং শর্তমতো খেলায় হাইরা সে বনবাসে গেছে ভাইবেরাদর নিয়া। সেইখানে আমার কী দোষ? আমিও তো একই বাজি ধরছিলাম; যদি যুধিষ্ঠির বাজিতে জিতা যাইত তবে আমিও তো আমার ভাইবেরাদর নিয়া বনবাসে যাইতাম এবং শর্তমতে বারো বছর বনবাস আর এক বছর অজ্ঞাতবাস শেষ কইরা ফিরতাম দেশে। কিন্তু পাণ্ডবরা তো পাশার শর্ত পুরা করতে পারে নাই। তাগো বারো বছর বনবাস শেষ হইছে ঠিক। কিন্তু অর্জুন বাহাদুরি দেখাইতে গিয়া অজ্ঞাতবাসের এক বছর পুরা হইবার তিন দিন আগেই ধরা খাইছে। নিয়ম অনুযায়ী তো তারা এখন আরো বারো বছর বনবাস আর এক বছর অজ্ঞাতবাস না কইরা রাজ্যের দাবি করতে পারে না। আমার যুক্তি সেইখানেই। পাণ্ডবরা নিজের দোষে শর্ত পুরা না করতে পাইরা এখন কেনই বা রাজ্য ফিরত চায় আর আমার বিরুদ্ধে কেন যুদ্ধ করতে চায় সেইটা তুমি আমারে একটু বুঝাইয়া কও তো কৃষ্ণ…

কৃষ্ণ কয়-  তাজ্জব বিষয়। তুমি কইতাছ নিজের কোনো দোষ দেখো না তুমি। কিন্তু কও তো ভাইয়ের বৌ দ্রৌপদীরে রাজসভায় যে লাঞ্ছনা করছিলা সেইটা কি তোমার দোষ না?

দুর্যোধন কয়- বা রে। দাসীর লগে সবাই যে ব্যবহার করে আমিও তা করছিলাম। সেইখানে দোষটা কী? যুধিষ্ঠির দ্রৌপদীরে হারার পরে সে তো আর আমার ভাইয়ের বৌ থাকে নাই; দাসী হইয়া। গেছিল। কিন্তু তার লগে রাজ্য ফিরত চাওয়ার কী সম্পর্ক?

কৃষ্ণ কয়- ঠিকাছে। তাইলে বারণাবতে কুন্তীসহ পাণ্ডবগো যে পুড়াইয়া মারার ব্যবস্থা করছিলা তুমি; সেইটারেও কি তুমি তোমার দোষ কইতে নারাজ?

দুর্যোধন কয়- বারণাবতে ঘর পোড়ানোর দায় তুমি আমারে কেমনে দেও কৃষ্ণ? পাণ্ডবরাই তো বরং বারণাবতে রাজকর্মচারী পুরোচনের লগে আরো ছয়জন মানুষ পুড়াইয়া পলাইছিল। এইরকম অপরাধ করার পরেও যখন তারা বিয়াশাদি কইরা ফিরা আসল তখন নিয়ম অনুযায়ী মানুষ হত্যার দায়ে তাগো শাস্তি দেওয়ার বদলা বাবায় দয়া কইরা তাগোরে অর্ধেক রাজ্য দিছিলেন। আমি কি একবারও পুরোচনসহ সাতজন মানুষ হত্যার লাইগা তাগো শাস্তি দাবি করছি? তারপর তারা রাজসূয় যজ্ঞসহ বহু বছর এইখানে থাইকা বহুকিছু করল; আমি কি বাধা দিছি? তাইলে সেইখানে তুমি কেমনে আমার দোষ খোঁজো?

কৃষ্ণ হতাশ হয়- ঠিকাছে। তুমি যদি তোমার কোনো দোষ দেখতে না পাও তবে আমিও আর দেখাইতে চাই না। তবে কথা হইল পাণ্ডবরা তো তোমার সম্পত্তির ভাগ চাইতাছে না। তারা তোমার দখলে থাকা তাগো বাপের সম্পত্তিটাই ফিরত চাইতাছে…

দুর্যোধন হাসে-বাপের সম্পত্তি বিক্রি কইরা দিলে কি তার উপর আর কোনো অধিকার থাকে কৃষ্ণ; তুমিই কও দেখি? যুধিষ্ঠিরে তো তার বাপের সম্পত্তি আমার কাছে হারাইয়া ফালাইছে। ওইটা এখন আর তার বাপের সম্পত্তি কেমনে থাকে?

কৃষ্ণ এই বিষয়ে আর কোনো কথা কয় না। শুধু কয়- দুর্যোধন। তোমার অবস্থা দেইখা মনে হয় তুমি সবকিছু ধইরা রাখতে গিয়া সবকিছু হারাইতে রাজি। তবু সবার অনুরোধ সত্ত্বেও সমঝতায় তোমার মত নাই…

– থাকার কথাও না কৃষ্ণ। যখন আমি ছোট ছিলাম তখন একবার বাবায় রাজ্যের অর্ধেক তাগোরে দিছিলেন। কিছু কই নাই। তারপর পাশা খেলায় সব আমার হইবার পরও বাবায় আবার সব তাগোরে ফিরাইয়া দিছিলেন। কিছু কই নাই। কিন্তু এখন অন্ধ পিতার এই রাজত্ব রক্ষার দায়িত্ব আমার। আমি একবিন্দু মাটিও দিমু না কাউরে। আমারে শত ভয় দেখাইলেও এইরকম অন্যায় শর্তে নত হমু না আমি। তোমরা যুদ্ধ করতে চাও তো করো। আমি রাজি। এর লাইগা যদি আমার মরতে হয় তবে মরব…

কৃষ্ণ কয়-  সেইটাই হয়ত হবে দুর্যোধন। পাণ্ডবরা তাগো রাজ্য ফিরা পাইব নিশ্চিত। তুমি প্রস্তাব মানলে পাইব তোমারে জীবিত রাইখা আর না মানলে পাইব তোমার মৃত্যুর পরে…

দুর্যোধনের এই সব যুক্তি ধৃতরাষ্ট্রের মনে ধরলেও তিনি পরিষ্কার যে এইখানে কারো দোষগুণ বিচারে কেউ আগ্রহী না। সকলেই পাণ্ডবগো রাজ্য ফিরাইয়া দেওয়া না দেওয়ার এক পয়েন্টে আইসা খাড়াইছে। তিনি কিছু বলেন না। কিন্তু সবকিছু বিবেচনা কইরা দুঃশাসন দুর্যোধনরে কয়-  ভাইজান।

অবস্থা যা দেখতাছি তাতে তো মনে হইতাছে সবাই মিলা এখন তুমি আমি আর কর্ণের হাত-পা বাইন্ধা নিয়া পাণ্ডবগো হাতে তুইলা দিব…

দুঃশাসনের কথায় দুর্যোধন ধুম কইরা উইঠা চইলা যায় সভার বাইরে। একটা দীর্ঘশ্বাস ছাইড়া ভীষ্ম কন- এই জেদেই খাইব পোলাটারে…

এইবার কৃষ্ণ ভীষ্মরে ঝাড়তে শুরু করে-ঝামেলাটা আপনাগো মতো মুরুব্বিরাই পাকাইছেন। একটা মূর্খরে আপনারা দিছেন রাজার ক্ষমতা কিন্তু এখন আর তারে সামলাইতে পারেন না। এখন তো আমারও মনে হইতাছে যে সবাই মিলা দুর্যোধন কর্ণ শকুনি আর দুঃশাসনরে বাইন্ধা পাণ্ডবগো হাতে না দিলে শান্তির আর কোনো উপায় নাই। অথবা অন্তত দুর্যোধনরে বান্ধা তো একান্তই ফরজ…

ভীষ্ম কোনো উত্তর দেন না কৃষ্ণের খোঁচার। কৃষ্ণ এইবার ধৃতরাষ্ট্ররে কয়-  মহারাজ। পোলার প্রতি আপনার ব্যক্তিগত দুর্বলতার লাইগা যেন বংশক্ষয় না হয় সেইটা দেইখেন। কারণ শাস্ত্রে কয় কুলরক্ষার লাইগা একজনরে ত্যাগ; গ্রামরক্ষার লাইগা কুল ত্যাগ; দেশরক্ষার লাইগা গ্রাম ত্যাগ আর আত্মরক্ষার লাইগা দুনিয়া ত্যাগ বুদ্ধিমানের কাজ…

কৃষ্ণের কথায় ময়মুরুব্বিরা আবার সায় দেন। ধৃতরাষ্ট্র বোঝেন কৃষ্ণ আস্তে আস্তে কড়া হইতাছে তার উপর। তার মুখ থাইকা একটা সিদ্ধান্ত বাইর করতে পারলে দুর্যোধনরে সে বাইন্ধাই নিয়া যাবে। পাণ্ডবগো কাছে। সেই ক্ষেত্রে এই সভায় দুর্যোধনরে রক্ষার কেউ নাই; কারণ পরশুরামের কারণে কর্ণও স্থবির হইয়া আছে। আপাতত দুর্যোধন যদি মিনরাজিও হয় তবে সব দিক রক্ষা। বহুক্ষণ চিন্তা কইরা ধৃতরাষ্ট্র বিদুররে পাঠাইলেন গান্ধারীরে নিয়া আসতে দুর্যোধনরে বোঝানোর লাইগা। কিন্তু সব শুইনা গান্ধারী উল্টা খেইপা উঠেন ধৃতরাষ্ট্রের উপর- বেয়াদব লোকের ক্ষমতা পাওয়াই উচিত না তবু সে পাইছে। এর লাইগা আপনেই দোষী মহারাজ। কুসঙ্গী পোলারে ক্ষমতা দিয়া এখন পস্তাইতাছেন…

ধৃতরাষ্ট্ররে ঝাড়লেও বিদুর যখন আবার গিয়া দুর্যোধনরে সভায় নিয়া আসে তখন গান্ধারী চেষ্টা করেন তারে বুঝাইতে-বাপ তোর আব্বা; তোর দাদা; তোর গুরু আর ময়মুরুব্বিগো কথাটা রাখ। পাণ্ডবগো লগে মিললে তোর শক্তি কমব না বরং আরো বাড়ব। তুই সবার কথা মাইনা নিলে কৃষ্ণ দুই পক্ষের মাঝেই সমঝোতা কইরা দিবে। যুদ্ধে মঙ্গল নাই বাপ; আর সব সময় জয়ী হওয়া যাবে এমন কথাও নাই। তাছাড়া কুরুরাজ্যের পোষ্য হিসাবে ভীষ্ম দ্রোণ কৃপ তোর পক্ষে যুদ্ধ করলেও পাণ্ডবগো তারা শত্রু মনে কইরা অস্ত্র চালাইবেন না এইটা নিশ্চয়ই তুই বুঝস। বেশি লোভ করিস না বাপ। শান্ত হ। সকলের কথা মাইনা ল…

দুর্যোধন গান্ধারীর কথায় কান না দিয়া শকুনি দুঃশাসন আর কর্ণের লগে কানাকানি কইরা আবার বাইর হইয়া যায়। সাত্যকিও দৌড়াইয়া বাইরে গিয়া সভাঘরের দরজায় নিজের সৈন্যসমাবেশ ঘটাইয়া ভিত্রে আইসা কয়-  মহারাজ ধৃতরাষ্ট্র; এই দিকে সবাই শান্তির আলোচনা করতাছে আর ওই দিকে আপনের পোলা দুর্যোধন ধান্দা করতাছে কৃষ্ণরে বন্দি করার। অবস্থাটা একটু বুইঝা দেখেন। মহারাজ…

সাত্যকিরে থামাইয়া কৃষ্ণ কয়- মহারাজ। দুর্যোধন যদি আমারে বন্দি করতে চায় তবে তারে অনুমতি দেন। তাইলে হয় সে আমারে বন্দি করব না হয় আমি তারে। তাতে অন্তত এক পক্ষের সমস্যা সমাধান হইব…

— আরে না না। এইটা কী কও? তোমার যদি দুর্যোধনের লগে মারামারিই করতে হয় তয় অত ময়মুরুব্বি এইখানে আছেনই বা ক্যান? খাড়াও খাড়াও দেখতাছি আমি…

ধৃতরাষ্ট্র আবার দুর্যোধনরে ডাইকা আইনা ঝাড়ি দেন- বেকুবি কইরো না দুর্যোধন…

কৃষ্ণ কয়- হ দুর্যোধন। বেকুবি করা ঠিক হইব না। আমারে একলা মনে কইরা তো বাইরে গেছিলা। গিয়া দেইখা আসছ তো যে আমি এইখানে একলা আসি নাই? তয় যা দেখছ তা একাংশ মাত্র; ভীষ্ম দ্রোণ সঞ্জয় বিদুর পুরাটা দেখছেন গতকাইল; যদি চাও তয় তোমারেও পুরাটা দেখাইতে আমার অসুবিধা নাই…

শত্রুরে কাবু করার লাইগা বেদে যে চাইরটা নীতির কথা আছে তার সবগুলাই ধৃতরাষ্ট্র আর দুর্যোধনরে পটানোর লাইগা কামে লাগায় কৃষ্ণ। বেদে কইছে পয়লা সাম করো। মানে শত্রুরে তেলাও। কৃষ্ণ ধৃতরাষ্ট্ররে তেলাইয়াই শুরু করছিল তার কথা। সেইটায় কাজ না হওয়ায় সে যায় দানে; দান মানে ভাগাভাগি; সেইটাতে রাজি হয় নাই দুর্যোধন। মিঠাইমার্কা দুইটা উপায় ফেইল। মারলে সে নিছে মিঠাকড়া পথ- ভেদ; মানে শত্রুপক্ষের মাঝে বিভাজন তৈরি কইরা দুর্যোধনরে একলাও কইরা ফালাইছে সে। কিন্তু সেইটাতেও কাম না হওয়ায় শেষ পন্থার প্রয়োগও করছে সে দণ্ড। মানে ডান্ডা গরম করা; মানে ডর দেখানো। কিন্তু বেদের কোনো পন্থাই কাম করে নাই দুর্যোধনের ক্ষেত্রে…

অবশেষে সকলে তেলাইয়া কৃষ্ণরে ঠান্ডা করলেও সভা শেষ হয় কোনো মীমাংসা ছাড়াই। পুরা সভায় একটাও কথা কয় না দুইটা মানুষ; দ্বৈপায়ন আর কর্ণ। সকলেই বারবার তাগো দিকে তাকায়। কিন্তু প্রতিবারই তারা এড়ায়ে যায়। ভালোই হইছে এক দিকে- দ্বৈপায়ন যদি কোনো প্রস্তাব রাখতেন আর সেইটা অমান্য করত দুর্যোধন তবে দুর্যোধনরে সত্যি সত্যিই বন্দি কইরা ফালাইত বাকিরা। আর পরশুরামের কারণে কর্ণ যে কিছু কয় নাই তাতে মঙ্গল হইছে সকলেরই; কারণ এই পোলাটাও কম বেয়াদব না…

সভা থিকা বাইর হইয়া কৃষ্ণ রথে উঠবার আগে ধৃতরাষ্ট্র তার হাত ধরেন- আমারে ভুল বুইঝ না। কৃষ্ণ। পোলাগো উপ্রে আমার কতটা নিয়ন্ত্রণ তা তো তুমি দেখলাই। যুধিষ্ঠিররে কইও আমি শান্তির পক্ষে কিন্তু আমি যে নিরুপায় মানুষ তাও তারে বুঝাইয়া কইও…

রথে উঠতে উঠতে কৃষ্ণ ভীষ্ম আর দ্রোণের দিকে ফিরে- সভায় যা হইল তা আপনেরা সকলেই দেখলেন। দুর্যোধন আমারে বন্দি করার চেষ্টা করছিল তাও দেখলেন। রাজা ধৃতরাষ্ট্রও পরিষ্কার জানাইলেন দুর্যোধনের উপর তার কোনো নিয়ন্ত্রণ নাই। এইবার আমারে অনুমতি দেন; আমি যুধিষ্ঠিরের কাছে গিয়া যা হয় একটা সিদ্ধান্ত নেই…

বিদায় নিয়া কৃষ্ণ ফিরা যায় কুন্তীর কাছে। এইবার কুন্তীরে পুরা কাহিনি বিস্তারিত কয়। পাণ্ডব পাঞ্চালী কে কী প্রস্তাব করছিল আর আইজ কী ঘটল কুরুসভায়…

কুন্তী কয়- যুধিষ্ঠিররে গিয়া কইবা তোর মায়ে তোরে ব্রাহ্মণ কইরা জন্ম দেয় নাই। জন্ম দিছে ক্ষত্রিয় কইরা। ব্রাহ্মণ কিংবা কাপুরুষের মতো কথা তোর মুখ থাইকা শুনতে চায় না তোর মা। আর ভীম অর্জুন নকুল; এই তিন কুলাঙ্গাররে কইবা পাঁচ পোলার মা হইয়াও আইজ তাগো মায় পরের ভাত খাইয়া বাঁচে পাঁচটা গ্রাম ভিক্ষা পাইবার আশায় না। কইও তোগো মায় তোগোরে রাজ্য দিছিল; সেই রাজ্যে তোগোরে সে আবার দেখতে চায়…

কৃষ্ণ কয়-  পিসি এইটাই পাঞ্চালী সহদেব আর আমার মত। যুদ্ধটা খালি যদি দুর্যোধনের লগে হইত তবে আমি আজকেই যুদ্ধ ঘোষণা কইরা দিতাম। কিন্তু সমস্যা অন্য জায়গায়। যুদ্ধ তো খালি ধৃতরাষ্ট্রের পোলাগো লগে তোমার পোলাগো হইব না। যুদ্ধ তো হইব তোমার এক পোলার বিরুদ্ধে তোমার অন্য পোলাদের। এর লাইগাই তোমার মতামত জানতে আসা। যুদ্ধ শুরু হইলে তোমার। নিজের পোলারাও যে পরস্পরের মুখোমুখি খাড়াইব সেইটা তো জানো পিসি। যুদ্ধ ঘোষণার আগে তোমার বড়ো পোলা কর্ণের বিষয়ে আমি তোমার মতামত জানতে চাই। দুনিয়ার সবাই দুর্যোধনরে ছাইড়া গেলেও তোমার পোলা কর্ণ কিন্তু তারে ছাড়ব না। এইবার তুমি কও কী কর্তব্য আমার?

কুন্তী অনেকক্ষণ ঝিম মাইরা ভাবে- যারে একবার ভাসাইয়া দিছি সে যদি আবার উল্টা স্রোতে ভাইসা আসে তয় তারে আমি কোলে নিমু। তবে তার লাইগা সাঁতার দিমু না আমি…

.

১৪

কুন্তীবুড়িটা বহুত হতভাগী হইলেও ভাবতে পারে নাই যে নিজের সবচে বড়ো দুর্ভাগ্যটা নিজেরই গর্ভে জন্ম দিছে সে। কুন্তী ঝিম ছাইড়া মুখ খোলে কৃষ্ণের কাছে- আমি তো কর্ণরে বাদ দিয়াই আমার সন্তান গণনা করি কৃষ্ণ। এখন সে যদি না আইসা যোগ দেয় আমার পোলাগো লগে তবে কোনো দিনও তারে যোগ করব না আমি…

কৃষ্ণ যে উত্তর খুঁজতেছিল তা সে পাইয়া যায়। কিন্তু কুন্তী একটা শর্ত জুইড়া দিছে- যদি সে যোগ না দেয়। তার মানে কুন্তীর পোলাগো লগে কর্ণ যোগ দিব কি না তা দেখার দায়িত্ব কুন্তী কৃষ্ণরেই দিছে…

কুন্তীর ঘর থিকা বাইর হইয়া ভীষ্ম দ্রোণ বিদুরের কাছে বিদায় নিয়া কৃষ্ণ গিয়া হাজির হয় কর্ণের কাছে- তোমার লগে নিরালায় কিছু কথা আছে আমার…

কর্ণরে নিজের রথে তুইলা যাইতে যাইতে কৃষ্ণ কয়-  তুমি খালি বড়ো যোদ্ধাই না; বুদ্ধিমানও বটে। তাই ভূমিকা বাদ দিয়া সরাসরি কই- আমি জানি যে তুমি জানো তুমি রাধার পালিত আর কুন্তীর গর্ভজাত সন্তান। সেই হিসাবে তুমি যুধিষ্ঠিরের বড়ো ভাই; আমারও পিসতুতো ভাই। আমি যা কইতে চাই তা হইল; তুমি দুর্যোধনরে ছাইড়া পাণ্ডবপক্ষে আসো। পাণ্ডবগো লগে যোগ দিলে হস্তিনাপুরের সিংহাসনে তুমিই হইবা রাজা; যেইখানে যুধিষ্ঠির যুবরাজ হইয়া তোমার মাথায় পাখা দুলাইব। ভীম অর্জুন নকুল সহদেব আর পাণ্ডবগো সকল পোলাপান যেমন তোমারেই কুর্নিশ করব তেমনি অন্ধক বৃষ্ণি পাঞ্চাল আর যাদবগো আনুগত্যও পাইবা তুমি। আর সবকিছুর উপ্রে; দ্রৌপদীরও এক ভাগ পাইবা তুমি অন্য ভাইদের লগে…

অতক্ষণ কর্ণ কোনো কথা না কইলেও এইবার হাসে- থামো কৃষ্ণ। লোভ দেখাইতে দেখাইতে একেবারে সীমা ছাড়াইয়া গেলা তুমি। কও তো; তুমি কেমনে আরেকজনরে দ্রৌপদীর ভাগ দেও? নাকি তুমিও দ্রৌপদীরে যুধিষ্ঠিরের মতো নিজের সম্পত্তি মনে করো যে ইচ্ছামতো তারে বাজিতেও যেমন ধরা যায় তেমনি যার তার কাছে তারে দানও করা যায়?

কৃষ্ণ একটু থতমত খায়। আমতা আমতা করে- না মানে এককালে দ্রৌপদীর স্বয়ংবরায় তো তুমিও প্রার্থী হইয়া খাড়াইছিলা; তাই কইলাম আরকি…

– দ্রৌপদীর স্বয়ংবরায় তো তুমি নিজেও একজন প্রার্থী আছিলা কৃষ্ণ। পাণ্ডবপক্ষে যোগ দিয়া কি তবে তুমিও দ্রৌপদীর ভাগ পাইছ?

— না না না সেইটা কেন হবে? আমি তো পাণ্ডবগো লাইগা সেই দিনই প্রতিযোগিতা থাইকা নিজেরে প্রত্যাহার কইরা নিছিলাম। কিন্তু তুমি যেমন নিজেরে প্রত্যাহার করো নাই। তেমনি শুধু ক্ষত্রিয় পরিচয় না থাকার কারণে যোগ্যতা প্রমাণের সুযোগ ছাড়াই দ্রৌপদী তোমারে অপমান কইরা খেদাইয়া দিছিল সেদিন। তাই ভাবছিলাম দ্রৌপদীর প্রতি এখনো হয়ত তোমার অনুরাগ আছে…

— অনুরাগ না কৃষ্ণা দ্রৌপদীর উপর রাগ আছিল আমার। সুযোগ পাইয়া কুরুসভায় সেই রাগ ঝাড়তেও দ্বিধা করি নাই আমি। কিন্তু সেই সভাতেই দ্রৌপদীর উপর শ্রদ্ধাও তৈরি হইছে আমার; যা আমি সেই দিনের সভাতেই সকলের সামনে প্রকাশ্যে বলছি। কারণ এমন নারী কেউ আগে যেমন দেখে নাই; তেমনি কোনো দিন শোনেও নাই এমন নারীর কথা; যে নিজে নৌকা হইয়া দুর্দশার সাগরে ভাসা পাণ্ডবগো দাসত্ব থাইকা উদ্ধার কইরা নিছিল সেদিন। তাই অনুরোধ করি; আমারে লোভ দেখাইতে গিয়া তারে আর অসম্মান কইরো না তুমি। সে তোমারে খুব বড়ো বন্ধু হিসাবেই জানে…

কৃষ্ণ চুপ কইরা থাকে। কর্ণ কথা আগে বাড়ায়- দ্রৌপদীর স্বয়ংবরায় শূদ্র বইলা দ্রৌপদী আমারে যে অপমান করছিল সেইটার লাইগা কিন্তু দ্রৌপদী দায়ী না কৃষ্ণা দায়ী তোমার পিসি কুন্তী। আমারে তো পরিচয়হীন শূদ্র দ্রৌপদী বানায় নাই; বানাইছে তোমার পিসি কুন্তী…

— সেই কুন্তীই এখন তোমার যথার্থ পরিচয়ে তোমারে প্রতিষ্ঠিত করতে চান কর্ণ…

হা হা কইরা হাইসা উঠে কর্ণ- আমার কি এখন পরিচয়ের অভাব আছে যে তোমার পিসির কাছ থিকা আমারে পরিচয় ধার নিতে হবে?

কর্ণের প্রশ্নে কৃষ্ণ কথা বদলায়- না না না। তোমার পরিচয়ে অভাব থাকব ক্যান? এই আর্যাবর্তে শিক্ষাদীক্ষা বীরত্ব রাজত্ব বন্ধুত্ব দানশীতা এমন কোনো ক্ষেত্র নাই যেইখানে মাইনসে তোমারে এক নামে না চিনে। আমি সেইটা কই নাই। আমি কইতেছিলাম কুন্তীর মাতৃত্ব আর পাণ্ডবগো লগে ভ্রাতৃত্বের পরিচয়ের কথা…

কর্ণ আবার হাসে- শূদ্র হইলেও মা-বাবা কিংবা ভাইয়েরও কিন্তু কোনো অভাব কোনো দিন আমার। হয় নাই কৃষ্ণ। শূদ্রাণী রাধা সেদিন যেমন বেওয়ারিশ শিশু কর্ণের মা হইছিল; আইজ বিখ্যাত কর্ণের মাও শুধু রাধা। আমারে যে বুকের দুধ দিয়া গুমুত পরিষ্কার কইরা তিলে তিলে বড়ো কইরা তুলছে; সেই রাধার বদলা অন্য কাউরে মা বলা আমার পক্ষে সম্ভব না কৃষ্ণ…

কৃষ্ণ মিন মিন করে- ভুল বুইঝ না। তোমারে মা বদলাইতে কই নাই আমি। আমি কইতে চাইছিলাম যে; তুমি যদি আইজ কুন্তীপুত্র হিসাবে পরিচিত হও তবে যুধিষ্ঠির না; কুরুরাজ্যের অজেয় রাজা হইবা তুমিই…

ঠা ঠা কইরা আবার হাইসা উঠে কর্ণ- তোমারে আমি রাজা ধৃতরাষ্ট্র থাইকা বেশি বুদ্ধিমান মনে করতাম কৃষ্ণ। কিন্তু এখন দেখি বুদ্ধিতে ধৃতরাষ্ট্র আর তোমার মধ্যে তেমন কোনো ফারাক নাই। রাজা ধৃতরাষ্ট্র যেমন ঘুস দিয়া তোমারে পক্ষে নিবার ধান্দা করছিলেন। তেমনি তুমিও দেখি ঘুস দিয়া আমারে পক্ষে টানতে চাইতাছ…

— না না না। ঘুস না। পাণ্ডবগো বড়ো ভাই হিসাবে তোমার ন্যায্য অধিকারের কথাই আমি তোমারে কইতে চাইতাছি কর্ণ…

— ন্যায্য-অন্যায্য তোমাগো যেমন ইচ্ছা তোমরা তেমন হিসাব করতে পারো। কিন্তু মনে রাইখ তুমি যদি আইজ আমারে কুরুরাজ্য দানও করো; তবু সেই রাজ্য আইনা আমি আবার দুর্যোধনরেই দান কইরা দিমু…

কৃষ্ণ হা কইরা তাকাইয়া থাকে কর্ণের দিকে- কিন্তু কেন কর্ণ?

–কারণ আমার অসহায় কালে অধিরথ আর রাধা যেমন আমারে সহায় দিছিলেন; তেমনি আমার পরিচয়হীনতার কালে দুর্যোধনই আমারে দিছিল প্রথম ক্ষত্রিয় পরিচয়…

কৃষ্ণ উৎসাহী হয়ে উঠে- আমি তো সেই কথাই কই। দুর্যোধন তোমারে ক্ষত্রিয় পরিচয় দিছে। আর কুন্তীপুত্র হিসাবে তুমি হইবা ক্ষত্রিয় মহারাজ…

কর্ণ কৃষ্ণরে থামায়- তুমি ভালো কইরাই জানো রাজত্ব কিংবা ক্ষমতার লোভ আমার কোনো দিনও আছিল না। আমার শুধু লোভ আছিল শিক্ষায়। শূদ্রপুত্র বইলা যখন প্রায় সকল গুরুই আমারে শিক্ষার্থী হিসাবে গ্রহণ করতে আপত্তি জানাইল তখন শুধুই শিক্ষার সুযোগ পাওয়ার লাইগা আমি নিজেরে ব্রাহ্মণ পরিচয় দিয়া ভর্তি হইছিলাম পরশুরামের গুরুকুলে। শুধু এই একটা ক্ষেত্রে আমি আমার পরিচয় গোপন করছি; এর বাইরে সব জায়গাতে সব সময়ই কিন্তু গর্ব নিয়া আমি অধিরথ সূতপুত্র রাধাগর্ভজাত কর্ণ হিসাবেই নিজের পরিচয় দিছি আর আইজও দেই। পরশুরামের কাছে শিক্ষা গ্রহণের পর আমার চাওয়া আছিল আমার পরিচয় যেন আমার যোগ্যতা দিয়া হয়। অথচ সেইখানেও দেখলাম আমার অযোগ্যতা মাপা হইতে আছে আমার বাপের শূদ্রত্ব দিয়া। তখন দুর্যোধন আমারে রাজা বানাইয়া আমারে সুযোগ দিলো আমার নিজের যোগ্যতা প্রমাণের…

কৃষ্ণ স্বীকার করে- সেইটা একটা ভালো কাম করছে দুর্যোধন। সে তোমারে রাজা বানাইছে দেইখাই তুমি তোমার যোগ্যতা প্রমাণ দিয়া আইজ মহাবীর এবং দানবীর কর্ণ হইছ। এখন তুমি আরেক ধাপ আগাইয়া হইবা মহারাজা; সেইটাই বলতে চাই আমি…

হাত তুইলা কৃষ্ণরে থামায় কর্ণ- থামো কৃষ্ণ। রাজত্বের লোভ আর আমারে দেখাইও না তুমি। রাজত্ব আর ক্ষমতার লোভ যদি আমার থাকত তবে যুধিষ্ঠিরের ছাইড়া যাওয়া ইন্দ্রপ্রস্থ রাজ্যেরও রাজা হইতে পারতাম আমি। দুর্যোধন আমারেই সেই রাজ্যের রাজা হইবার অনুরোধ করছিল। এর বাইরেও চাইলে আমি যে নিজেই রাজ্য জয় কইরা নিতে পারি তাও নিশ্চয়ই তুমি স্বীকার করো…

কৃষ্ণ কয়- ঠিকাছে। তুমি হস্তিনাপুরের সিংহাসন না নেও; কুন্তীরে মা নাইবা কও; কিন্তু যেহেতু জানো যে পাণ্ডবরা তোমারই ছোট ভাই; তাই তোমারে অনুরোধ করি তোমার মায়ের পেটের ছোট ভাইগো লাইগা অন্তত যুদ্ধ থাইকা তুমি বিরত হও। তুমি যুদ্ধবিমুখ হইলে কোনোভাবেই পাণ্ডবগো বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার সাহস পাইব না দুর্যোধন…

– ঠিক এই কারণেই যুদ্ধ থাইকা বিরত থাকা আমার পক্ষে সম্ভব না কৃষ্ণ। আমার ভরসাতেই দুর্যোধন যুদ্ধের সিদ্ধান্ত নিছে; আমারেই দ্বৈরথে অর্জুনের প্রতিযোদ্ধা হিসাবে নির্বাচন কইরা রাখছে সে। সারা দুনিয়া দিলেও দুর্যোধনের এই ভরসার লগে বিশ্বাসঘাতকতা করব না আমি। আমি জীবন দিতে পারি; কিন্তু দুর্যোধনরে ছাড়তে পারব না; অতক্ষণে কথাটা তোমার কাছে পরিষ্কার হওয়া উচিত কৃষ্ণ…

কৃষ্ণ এইবার প্রসঙ্গ পাল্টায়- ঠিকাছে। দুর্যোধনের পক্ষ ছাড়বা না তুমি। ঠিকাছে। কিন্তু পাণ্ডবগো লগে যুদ্ধ হইলে তার পরিণতি নিশ্চয়ই ভাইবা দেখছ তুমি?

কর্ণ হাসে- লোভ দেখাইয়া ব্যর্থ হইয়া এখন আমারে তুমি ডর দেখাইতে শুরু করলা কৃষ্ণ? দুর্যোধনের দলে লোক বেশি হইলেও তার পক্ষের লোক আমি ছাড়া কেউ নাই সেইটা সকলেই জানে। আমি পরিষ্কার জানি আসন্ন যুদ্ধটা পাণ্ডবগো সাত বাহিনীর বিরুদ্ধে কৌরবগো এগারো বাহিনীর যুদ্ধ না; যুদ্ধটা মূলত হইব পাণ্ডবগো সাত বাহিনীর বিরুদ্ধে দুর্যোধন আর কর্ণ; মাত্র দুইটা মানুষের যুদ্ধ। যার ফলাফল যেকোনো শিশুও বইলা দিতে পারে। হউক; তাই হউক। যুধিষ্ঠির বহু বছর ধইরা রাজা হইবার লাইগা কাঙ্গাল হইয়া আছে। যুদ্ধের পর সেই রাজা হউক। আমার কোনো আপত্তি নাই। আমার দুর্যোধনের পক্ষে যুদ্ধ করার কথা; সৎভাবে আমি শুধু সেইটাই করব। একজন ক্ষত্রিয় হিসাবে যুদ্ধক্ষেত্রে অস্ত্রহাতেই যেন আমার মৃত্যু হয় সেইটাই আমার একমাত্র কামনা কৃষ্ণ। বন্ধুর লগে বেইমানি কইরা সারা জগতের রাজা হইতেও আমার কোনো আগ্রহ নাই। আরেকটা কথা। পাণ্ডবরা জানে কি না জানি না যে আমি তাগো বড়ো ভাই। তোমারে একটা অনুরোধ করি; কথাটা তাগোরে জানাইবার দরকার নাই। আমি না হয় জানলাম তারা আমার ভাই। তারা যেন আমারে শত্রু হিসাবেই জানে। ভাই পরিচয়ে যুদ্ধের ময়দানে আমি কোনো সুবিধা কিংবা দয়া পাইতে চাই না কারো…

হা কইরা অনেকক্ষণ কর্ণের দিকে তাকাইয়া তারে জড়ায়ে ধরে কৃষ্ণ- কঠিন মানুষ তুমি। সারা দুনিয়া দিলেও তুমি যেমন নিতে চাও না তেমনি বিজয়ীও হইতে চাও না তুমি। ঠিকাছে তয়; প্রত্যাশা করি অধিরথ এবং রাধার পুত্র আর দুর্যোধনের বন্ধু হিসাবেই যেন তুমি মৃত্যুটা বরণ করতে পারো…

কৃষ্ণ একটু থাইমা আবার শুরু করে- এখন সময়টা ভালো। বৃষ্টিও নাই; রাস্তাঘাটে কাদাও নাই। বেশি গরমও না; বেশি ঠান্ডাও না। এই কার্তিক মাসেই তবে যুদ্ধটা হউক। ফিরা গিয়া ভীষ্ম দ্রোণ আর কৃপাচার্যরে কইও যে সাত দিন পরে যেদিন অমাবস্যা; সেই দিনই যুদ্ধের তারিখ ঠিক করছি আমরা দুইজন…

বিদুরের মুখে যুদ্ধের তারিখ শুইনা ছটফট করে কুন্তী। অমীমাংসিত কুরুসভার শেষে উপপ্লব্য নগরে গিয়া পাণ্ডবগো লগে আলোচনার পর কৃষ্ণ যে সিদ্ধান্ত জানাইবার কথা; সেইটা সে হস্তিনাপুরে কর্ণের লগে আলোচনার পরেই জানাইয়া গেছে। তার মানে মাতৃত্ব ভ্রাতৃত্ব রাজত্ব যেমন কর্ণরে পাণ্ডবপক্ষে টানতে পারে নাই তেমনি মৃত্যুর ভয়েও সে ছাড়ে নাই দুর্যোধনের পক্ষপাত। যুদ্ধ হইব কুরু আর পাণ্ডবে। কিন্তু ভাগ্যের ফেরে তার পোলাগো বিরুদ্ধে সেই যুদ্ধের সিদ্ধান্ত নেয় কি না তারই আরেক পোলা…

কর্ণের মৃত্যু নিয়া কুন্তীর বেশি মাথা ব্যথা নাই। কিন্তু পরশুরামের শিষ্য কর্ণের মৃত্যু ঘটানোর ক্ষমতা নিয়া বহুত দুশ্চিন্তা তার…

কর্ণের লগে এখন আর তার তামার অভেদ্য বর্মটা নাই। পায়েও কোনো জুতা পরে না সে। যুধিষ্ঠিরের পরিকল্পনামতে যুদ্ধের সময় শল্য কর্ণরে গালাগাল কইরা অস্থির রাখবেন। কিন্তু তার পরেও তিরে বর্শায়- ভল্লে-কুড়ালে-তলোয়ারে- গদায় কর্ণের সামনে খাড়াইবার মতো একক কোনো যোদ্ধা। পাণ্ডবপক্ষে নাই। ভীম স্বল্প পাল্লার গদায় ভালো হইলেও তির বর্শার দূরত্বে সে অসহায়। অর্জুন তিরে দুর্ধর্ষ কিন্তু বর্শা ছোঁড়ার শক্তিতে সে যেমন কর্ণের থাইকা পিছে তেমনি স্বল্পপাল্লার অস্ত্রে সে নিতান্তই নিরুপায়। কৃষ্ণ অর্জুনের সারথি হইব তাই অর্জুনরে নিয়া দুশ্চিন্তা কম। কৃষ্ণের পরিকল্পনা আর কৌশলী রথ চালানোর ফাঁক দিয়া অর্জুনের শীরের নিশানা করা যেমন কর্ণের পক্ষে কঠিন হইব তেমনি কৃষ্ণ আর অর্জুন; দুইজনের দুইটা ঢাল ভেদ কইরা অর্জুনরে বিদ্ধ করাও হইব প্রায় অসম্ভব। সাধারণ চামড়ার বর্ম পরা খালি পায়ের কর্ণের পক্ষে শুল্যের গালাগালি সহ্য কইরা কৃষ্ণের বুদ্ধি ঘোড়া দাবড়ানি আর অর্জুন-কৃষ্ণের ঢাল অতিক্রম কইরা সফলকাম হওয়া বহুত কঠিন। কিন্তু বাকিরা? বাকি চাইর পাণ্ডব? তাগোরে তো সুরক্ষা দিব না কেউ…

ভীষ্ম যত দিন জীবিত থাকবেন তত দিন যুদ্ধ করব না কর্ণ। কিন্তু কুরু-পাণ্ডব যুদ্ধে ভীষ্মের জীবনও আশঙ্কামুক্ত না। পাণ্ডবরা কেউ তারে হত্যা না করলেও তার নিজস্ব শক্র বেশুমার। ছোট ভাই বিচিত্রবীর্যের লগে বিবাহ দিবার লাইগা কাশীরাজের তিন কন্যারে ছিনাইয়া আনছিলেন তিনি; ছোট দুই বোন অম্বিকা-অম্বালিকারে জোর কইরা ভাইয়ের লগে বিবাহ দিলেও তার কাণ্ডের কারণে বড়ো বোন অম্বা আত্মহত্যা করে। কাশীরাজের বংশ সেই ক্ষতি এখনো ভুলতে পারে নাই। তারা আইসা যোগ দিছে পাণ্ডবপক্ষে; ভীষ্মের বিরুদ্ধে। ভীষ্মের ঊর্ধ্বতন ষষ্ঠ পুরুষ সংবরণ কাইড়া নিছিলেন পাঞ্চালগো দেশ; সেই থাইকা কুরুদের লগে পাঞ্চালগো বংশপরম্পরায় শত্রুতা। কুরুসভায় দ্রৌপদীর লাঞ্ছনার সময় মুখ ফিরাইয়া বইসা ছিলেন কুরুবৃদ্ধ ভীষ্ম; সেই কারণে বইনের অপমানের শোধ হিসাবে পাঞ্চাল রাজপুত্র শিখণ্ডী প্রতিজ্ঞা করছে ভীষ্ম হত্যার। আর তার উপর দ্রৌপদীর যমজ ভাই পাঞ্চাল যুবরাজ ধৃষ্টদ্যুম্নই হইল পাণ্ডবপক্ষের প্রধান সেনাপতি…

দেবব্রত ভীষ্ম এককালে আছিলেন অজেয়। সেনাপতি হিসাবে অভিজ্ঞতায় আর বুদ্ধিতে হয়ত এখনো তার জুড়ি নাই। কিন্তু শিখণ্ডীর মতো তরুণ শত্রুগো বিরুদ্ধে দ্বৈরথ যুদ্ধে নিজেরে আর কতটুকু রক্ষা করতে পারবেন এই শতবর্ষী লেতর বৃদ্ধ মানুষ? আর ভীষ্মের মৃত্যু মানেই যুদ্ধক্ষেত্রে কুন্তীর সন্তানদের বিরুদ্ধে কুন্তীরই আরেক সন্তানের প্রবেশ…

ভাবতে ভাবতে অস্থির কুন্তীর হঠাৎ মনে হয়-কর্ণ পোলাটা খালি বড়ো যোদ্ধাই না; অনেক বেশি দয়ালুও বটে। কৃষ্ণের দেখানো লোভ আর ভয়ে যখন কাজ হয় নাই তখন তার পোলাগো ঢাল হিসাবে কর্ণের দয়ারেই ব্যবহার করব সে…

প্রতি দিন ভোরে নদীতীরে সূর্যপূজা করা কর্ণের নিত্য অভ্যাস। গঙ্গার তীরে সূর্যোদয়ের নির্জন কালটাই কুন্তী বাইছা নেয় কর্ণের লগে দেখা করার সময় হিসাবে। কর্ণ তারে চিনে; তার পরিচয়ও জানে তবু পূজা শেষে তার নিজস্ব গম্ভীর অহংকার নিয়া নিজের পরিচয় দেয়- শূদ্র পিতা অধিরথ আর শূদ্রাণী রাধার সন্তান কর্ণ তোমারে প্রণাম করে গো অর্জুন জননী। কিছু যদি চাওয়ার থাকে তবে নির্দ্বিধায় চাইতে পারো রাধেয় কর্ণের কাছে…

কুন্তী চিৎকার দিয়া উঠে-রাধেয় না বাপ। কৌন্তেয় তুই। তুই আমার সন্তান। পঞ্চপাণ্ডবের বড়ো ভাই…

কর্ণ হাসে- যখন তোমারে আমার দরকার আছিল তখন তুমি আমারে লুকাইয়া ফালাইয়া দিছ। আর আইজ যখন আমারে তোমার দরকার তখন আবার লুকাইয়া আসছ আমারে কুড়াইয়া নিতে। অদ্ভুত মানুষ তুমি। কিন্তু একটা বিষয় তোমার বোঝা দরকার; তোমারও যেমন পোলার অভাব নাই; তেমনি তুমি ফালাইয়া দিলেও রাধার কারণে মাতৃস্নেহেরও অভাব হয় নাই আমার। তাই আইজ যখন রাধার সন্তানের লগে কুন্তীর পোলাগো দ্বৈরথ নিশ্চিত তখন কর্ণ আর শক্ৰমাতা কুন্তীর মাঝে নতুন সম্পর্ক পাতাইয়া জননী রাধারে কষ্ট দেওয়া যেমন অনুচিত; তেমনি অনুচিত বীর পাণ্ডবগো অপমান করা…

কুন্তী অনুনয় করে- সম্পর্ক নতুনও না। পাতানোও না। তোর লগেই সবথিকা পুরানা মাতৃত্বের সম্পর্ক আমার…

— হ। আবার আমার লগেই সবথিকা পুরানা অবিচারের সম্পর্কও তোমার…

কুন্তী অনেকক্ষণ চুপ কইরা মুখ খোলে- তুই আমার কোনো যুক্তিই শুনবি না জানি। তবু তরে একটা জিনিস ভাইবা দেখতে অনুনয় করি। নিজের ভাইগো চিনার পরেও তুই ক্যান তোর ভাইদের শত্রু দুর্যোধনের পক্ষ নিবি?

– পক্ষ নিমু কারণ তুমিই আমারে ঠেইলা দিছ দুর্যোধনের পক্ষে। তুমি আমার ক্ষত্রিয় পরিচয় ছিনাইয়া নিছিলা বইলাই আমারে দুর্যোধনের কাছ থিকা ক্ষত্রিয় পরিচয় ধার নিতে হইছে। সেই থাইকাই আমি দুর্যোধনের পক্ষে। অথবা বলতে পারো তোমার পোলাগো বিপক্ষে…

— তুই তোর ভাইগো পক্ষে আয় বাপ। বড়ো ভাই হিসাবে তুইই হবি হস্তিনাপুরের রাজা…

কুন্তীরে থামায় কর্ণ-যত রকম লোভ আর ডর দেখানো যায় সব তোমার ভাতিজা কৃষ্ণ দেখাইয়া গেছে গো পাণ্ডব জননী। অনুরোধ করি এই দুইটা জিনিস বাদ দিয়া যদি অন্য কিছু কইবার থাকে তবে কও…

— তুই একবার অন্তত আমারে মা বইলা স্বীকার কর বাপ

— তা হয় না। কারণ তাতে আমার রাধামায়ের অপমান হয়

— আমি তোর জন্মদাত্রী কর্ণ।

— তাতে কিছু যায় আসে না। কারণ নিজের ইচ্ছায় তুমি জন্ম দিয়া অদরকারি মনে কইরা যারে ফালাইয়া দিছ; তারে কুড়ায়ে দিনের পর দিন লালন-পালন করছে রাধা। এখন শুধু জন্ম দিবার কারণে তোমারে মা বইলা স্বীকার করলে রাধার দুধের লগে বেইমানি হয়। আমি তোমারে মা ডাকতে অপারগ অর্জুন জননী…

কুন্তী অনেকক্ষণ ঝিম মাইরা থাইকা কয়-  যোগ দিস না পাণ্ডবগো লগে। আমারে মা ডাকারও দরকার নাই। কিন্তু তার পরেও তোরে জিগাই; যুদ্ধ কইরা কি শান্তি হবে তোর? নিজের ভাইগো মাইরা কি শান্তি পাবি তুই?

— শান্তি হবে না। কে কারে মারব তাও জানি না; হয় আমি পাণ্ডবগো অথবা তারা আমারে। কিন্তু তার পরেও যুদ্ধ হওয়া লাগবে। কারণ আইজ যদি আমি দুর্যোধনরে ছাইড়া যাই তবে আমার পরিচয় হবে ভিতু লোভী আর বেইমান। আমি মৃত্যু মাইনা নিতে পারি কিন্তু লোভী কাপুরুষ কিংবা বেইমান পরিচয় না…

কুন্তী ভাইবা পায় না আর কী বলা যায়। বলে- দিবার সময়ে তোরে কিছুই দেই নাই আমি স্বীকার করি। এখন দিতে চাইলেও তা দরকার নাই তোর। তবু তোরে আমি জন্ম দিছি; সেই অধিকার থাইকা প্রার্থনা করি; তোর বীরত্বের মতো দয়ার সংবাদও সকলে জানে। হতভাগী জন্মদাত্রীরে অন্তত একটা দয়া কর বাপ…

— অর্জুনের প্রাণভিক্ষা চাইও না শুধু। আসন্ন যুদ্ধে অর্জুনের দ্বৈরথে আমার কোনো বিকল্প দুর্যোধনের হাতে নাই…

কুন্তী একটু ভাবে- ঠিকাছে। অর্জুন বিষয়ে তোরে কোনো অনুরোধ করব না আমি। তবে দয়া কইরা তোর জন্মদাত্রীরে অন্তত এইটুকু কথা দে; যে তোর বাকি চাইর ভাইরে হত্যা করবি না তুই…

একটা নিঃশব্দ হাসি খেইলা যায় কর্ণের মুখে- আমারে জন্ম দিবার দায় নিতে চাও নাই তুমি; অথচ আইজ আমারেই তুমি দিতে চাও জন্ম নিবার দায়? আইচ্ছা নিলাম। কথা দিলাম তোমার পাঁচ পোলার মাঝে রাধেয় কর্ণের হাতে যুধিষ্ঠির ভীম নকুল আর সহদেবের কোনো মৃত্যু আশঙ্কা নাই…

চোখ মুইছা কুন্তী ফিরে। পিছন থিকা ডাক দেয় কর্ণ- অর্জুন জননী; যুদ্ধের পরে তোমার বাকি চাইর পোলার লগে বাঁইচা থাকব হয় অর্জুন না হয় কর্ণ। সেই হিসাবে সারা জীবন যে পাঁচ পোলার হিসাব করছ তুমি; যুদ্ধের পরেও কিন্তু তোমার পোলার সংখ্যা পাঁচই থাকব। হয় কর্ণরে নিয়া পাঁচ; না হয় অর্জুনরে নিয়া পাঁচ। ছয় পোলা যখন জীবনেও গুনো নাই তখন বাকি জীবন না হয় আর নাই গুনলা ছয় সন্তান…

পালকপিতা কুন্তীভোজের বাড়িতে কুমারী কুন্তীর হইবে সন্তান প্রসব। দাঁতে দাঁত চাইপা সেই দিন প্রসব চিৎকারটা সামলাইছিল যাদব বংশজাত কুন্তী। আইজ অন্তত এক পোলার নিশ্চিত মৃত্যু আশঙ্কায় বৃদ্ধা কুন্তীর কণ্ঠ থাইকা বাইর হইয়া আসে তেষট্টি বছর আগেকার সেই বকেয়া প্রসব চিৎকার-কর্ণ। কর্ণরে বাজান আমার…

বুকমার্ক করে রাখুন 0